মিরউগবা মনসুরের বাবা বাধা দেননি। তবে মেয়ের ইচ্ছাশক্তিকে সম্মান জানিয়ে শর্ত দেন, ‘‘খেলতে পারো, তবে ছেলেদের সঙ্গে নয়।’’

নাদিয়া নিঘাটের পরিবারেরও প্রবল আপত্তি ছিল ফুটবল মাঠে নামা নিয়ে। তাঁর বাবার শর্ত ছিল, খোলা মাঠে খেলা যাবে না। শুধু জার্সি বা প্যান্ট পরেও নামা যাবে না মাঠে।

জারা রিয়াজের মা আবার শর্ত দিয়েছিলেন, পুরুষ কোচের কাছে খেলা যাবে না। চাই মহিলা কোচ।

রবিবার সকালে বাংলা যখন সরস্বতী পুজোর আনন্দে ভাসছে, তখন শ্রীনগরের মেলেনসন স্কুলের মাঠে পাওয়া গেল ওঁদের তিন জনকেই। কোচ বা ফুটবলার হিসেবে বল পায়ে দৌড়োদৌড়ি করছিলেন জনা তিরিশ মেয়ের সঙ্গে। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে পরিবারের লোকজন। গোল হলে তাঁরাও উৎসাহ দিচ্ছেন। বোঝাই যাচ্ছিল, বাধা থাকলেও মেয়েদের ফুটবল খেলতে পাঠাচ্ছেন বাবা-মায়েরা।

সদ্য বারো ক্লাস পাশ করা মিরউগবা থাকেন শ্রীনগর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের বাগিমোহাতাম গ্রামে। সেখান থেকে নিয়মিত আসেন অনুশীলনে। বলছিলেন, ‘‘রিয়াল কাশ্মীর বা লোন স্টারের খেলা থাকলে আমরা সবাই দল বেঁধে খেলা দেখতে যাই। চিৎকার করি। আজ না-হোক কাল, নিজেদের একটা স্টেডিয়াম পেলে ওদের মতো আমরাও কাশ্মীরের জন্য লড়াই করব।’’ তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকা কাশ্মীরের প্রথম লাইসেন্স পাওয়া কোচ নাদিয়া বললেন, ‘‘আগে যখন মাঠে যেতাম, সবাই অন্য চোখে দেখত। এখন তারাই স্টেডিয়ামে মেয়েদের নিয়ে আসে ম্যাচ দেখতে। রাজ্য অ্যাকাডেমিতেও নিয়ে আসে আমার কাছে ফুটবল শেখাতে।’’

কাশ্মীরকে শান্ত করতে ফুটবলকে অন্যতম হাতিয়ার করেছে প্রশাসন। জওয়ান, পুলিশ, সরকার নানা প্রতিযোগিতা করে বছরভর। রিয়াল কাশ্মীর ভারতের সেরা দলগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ছে, এই আবেগের ঢেউ আছড়ে পড়ছে মেয়েদের মধ্যেও। রাজ্য ফুটবল সংস্থার হিসেব, এই মুহূর্তে স্কুল-কলেজ মিলিয়ে অন্তত দেড়শো মেয়ে ফুটবল খেলছেন। যাঁদের একটা বড় অংশ রয়েছেন রাজ্য অ্যাকাডেমিতে। 

কাশ্মীরে মেয়েদের মাঠে আনার বড় বাধা ছিল পোশাক। সেই বাধা তাঁরা অতিক্রম করেছেন অন্য ভাবে। ইরান, সৌদি আরব, বাহরিনের মেয়েদের জন্য ফিফা যে-বিশেষ পোশাক বেছে দিয়েছে, সেটাই পরে মাঠে নামছেন ভূস্বর্গের মেয়েরা। 

মিরউগবা বলছিলেন, ‘‘ওই পোশাক অনেকটা হিজাবের মতোই। পুরো শরীর ঢাকা থাকে। ওই বিশেষ স্কার্ফের উপরে জার্সি পরলে সমস্যা হয় না। সেটা ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছি। এটা পরে খেলতে বাধা পাইনি কারও কাছ থেকে।’’ অনুশীলনে দেখা গেল, রিবা পাজলি, সাবরিনা, জারা সেই পোশাকেই খেলছেন। কোনও সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু কথা বলে জানা গেল, সমস্যা অন্য জায়গায়। কাশ্মীর ফুটবল সংস্থার হয়ে মেয়েদের মাঠে টেনে আনার দায়িত্বে যিনি রয়েছেন, সেই ইন্তিখাব আলম বললেন, ‘‘মেয়েদের নিজস্ব স্টেডিয়াম দরকার। যেখানে পোশাক বদল করার ভাল জায়গা থাকবে। দরজা বন্ধ করে অনুশীলন করানো যাবে। মহিলা কোচ না-হলে বাবারা ছাড়তে চাইছেন না। দু’তিন জন ‘ডি’ লাইসেন্স পাশ করেছে। তাদের ব্যবহার করতে শুরু করেছি।’’ 

টিআরসি স্টেডিয়ামের বরফ এখনও না-গলায় সেখানে রাজ্য অ্যাকাডেমির অনুশীলন বন্ধ। তবে মেলেনসন স্কুল থেকে মেয়েদের একটি কলেজে গিয়েও দেখা গেল, সেখানে জনা পনেরো আট থেকে আঠারো বছর বয়সি মেয়ে ফুটবল খেলছে। বাধা পেরিয়ে মাঠে নেমে পড়লেও বোঝাই গেল, মেয়েদের স্কুল এবং কলেজই আপাতত ভূস্বর্গের মেয়েদের ফুটবলার তৈরির ধাত্রীগৃহ।

সীমান্ত অঞ্চল লাদাখের এক ঝাঁক মেয়েকে যিনি প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, সেই তারসিং সোমু বললেন, ‘‘পাহাড়ি মেয়েরা প্রচণ্ড শক্তি ধরে। ফুটবলে গায়ের জোর একটা ব্যাপার। একটু স্কিল হলেই দেখবেন মেয়েরা কেমন খেলে।’’ তাঁর কথা ঠিক। কারণ, এখন দেশের মেয়েদের ফুটবল শাসন করেন পাহাড়ের মেয়েরাই।

কাশ্মীর কখনও মেয়েদের সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় খেলেনি। দু’বছর আগে ভারতীয় মানচিত্রে কাশ্মীরের মেয়েদের অন্য রকম ছবি তুলে ধরতে অনূর্ধ্ব-১৯ একটি দল তৈরি হয়। শোনা যায়, সেখানে বেশির ভাগ ছিলেন হরিয়ানার মেয়ে। সেই দলে ছিলেন কাশ্মীরের মেয়ে— আফসানা আশিকি। তাঁকেই অধিনায়ক করা হয়। তার অন্যতম কারণ, আফসানা এক সময় সেনা-পুলিশের গাড়িতে পাথর ছুড়ে গ্রেফতার হন। ছাড়া পেয়ে ফুটবল খেলতে শুরু করেন ছেলেদের সঙ্গে। কেন্দ্রীয় স্বরাস্ট্রমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে শ্রীনগরে এসে কথা বলেন। আফসানার এই পরিবর্তন নিয়ে হইচই পড়ে যায় দেশ জুড়ে। তাঁকে নিয়ে একটি বায়োপিকও তৈরি হচ্ছে। আফসানার ঘটনার কথা বললে বিরক্ত হন এখনকার মেয়ে ফুটবলারেরা। বলে ওঠেন, ‘‘ভালবাসা থেকে আমরা ফুটবল খেলছি। ছেলেরা পারলে আমরা পারব না কেন?’’ 

মনে হল, কাশ্মীরেও তা হলে শুরু হয়েছে নতুন বিপ্লব— মেয়েদের ফুটবল ঘিরে।