চাকার ভরসায় চললেও ছক্কা মারা যায়!

আরও একটি ক্রিকেটের দল আছে এ দেশে। না, মহিলাদের ক্রিকেট দলের কথা হচ্ছে না। এমন একটি দল, যার খেলোয়াড়েরা হুইলচেয়ারে বসেই চার, ছয় মেরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশকে। কাল, শুক্রবার থেকে তিন দিন শহর কলকাতা সাক্ষী থাকবে এ বছরের সেই আন্তর্জাতিক হুইলচেয়ার ক্রিকেট প্রতিযোগিতার। নিউ টাউনের এনকেডিএ ক্রিকেট মাঠে ভারতের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শামিল হবেন পড়শি দেশ নেপাল এবং বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে খেলার ময়দানে এগিয়ে চলার চেষ্টা নানা ভাবেই হচ্ছে গোটা দুনিয়া জুড়ে। এক-এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে খেলার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কৌশল। সেটুকু শিখে নেওয়ার ব্যবস্থাও হচ্ছে সর্বত্র। হুইলচেয়ারে ক্রিকেটের পাশাপাশি ভলিবল, বাস্কেটবলও ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়। পায়ের একাংশ বাদ যাওয়ার পরেও যে মাঠে নেমে অংশ নেওয়া যায় ফুটবল খেলায়, তা-ও দেখিয়ে দিচ্ছে এই দেশ।

তবে দেশের অন্য শহরের তুলনায় যেন হুইলচেয়ার ক্রিকেটে উৎসাহীদের সংখ্যা তুলনায় কম এ শহরে, আয়োজকদের তরফে জানালেন শুভজিৎ মৌলিক। তিনি জানান, কলকাতায় হুইলচেয়ার ক্রিকেটের প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত থাকলেও এখানে দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো ভিড় হয় না। ‘‘মনের জোর থাকলে যে হুইলচেয়ারে বসেই খেলার ময়দান দাপিয়ে বেড়ানো যায়, সেটা দেখাতেই এ বার প্রথম এই প্রতিযোগিতা কলকাতায় করা হচ্ছে’’— বলছিলেন শুভজিৎ। আরও জানালেন, ভারতীয় ক্রিকেট দলটিতে এখনও এক জনও কলকাতাবাসী নেই। দিল্লি, হরিয়ানা, গুজরাত, পঞ্জাবের খেলোয়াড়ের সংখ্যাই বেশি। আছেন অন্য রাজ্যের মানুষও। তবে আয়োজকদের আশা, এ বার খেলা দেখে অনুপ্রেরণা পাবেন কলকাতার অনেকে।

প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিভিন্ন ধরনের খেলায় যোগ দেওয়া নতুন নয়। সেই গত শতকের গোড়া থেকেই চলছে প্যারা অলিম্পিক্স। শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে তাতে প্রতি বার যোগ দেন দেশ-বিদেশের খেলোয়াড়েরা। এরই পাশাপাশি নানা দেশে বেড়েছে ‘ডিসএবল্‌ড ক্রিকেট’ চর্চা। হুইলচেয়ার ক্রিকেটের পাশাপাশি ব্লাইন্ড ক্রিকেট এবং ডেফ ক্রিকেটও খেলা হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে।

কলকাতায় এই ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজকদের তরফে জানানো হল, এ শহরে প্রতিবন্ধীদের জন্য ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল, দৌড়, সাঁতার, সাইক্লিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। তাঁদের আশা, এই ক্রিকেট খেলা দেখে আরও অনেকে উৎসাহী হবেন প্রতিবন্ধী আত্মীয়-বন্ধুদের খেলার জগতে যোগ দিয়ে ভাল থাকার জন্য সচেতন করতে। উৎসাহ বাড়লে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো যাবে আরও।

সেই সচেতনতা বাড়লে কিছুটা অন্য রকম জীবন পেতে পারেন প্রতিবন্ধীরা, এমনই জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ফিজিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক রাজেশ প্রামাণিক যেমন মনে করেন, এমন খেলাধুলোয় যুক্ত থাকতে পারলে প্রতিবন্ধীদের শারীরিক এবং মানসিক ভাবে ভাল থাকার সুযোগ অনেক বেশি। তিনি বলেন, ‘‘অনেক সময়েই শুধু ব্যায়াম করে সুস্থ থাকা যায় না। যতটা ঘাম ঝরানো দরকার, তাতে কোনও একটা খেলায় যুক্ত থাকতে পারলেই ভাল।’’ তা ছাড়া, প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে সামাজিক মেলামেশারও একটা সমস্যা তৈরি হয়। এমন কোনও জায়গায় খেলাধুলো শিখতে গেলে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি হয় বলে মত রাজেশবাবুর। এতে মানসিক দিক থেকে অনেকটা ভাল থাকা যায় বলেও তাঁর বক্তব্য।