• বসন্ত সিংহরায়
  • বসন্ত সিংহরায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পর্বতারোহীদের কাছে কেন কঠিনতম চ্যালেঞ্জ কাঞ্চনজঙ্ঘা?

তুষারের পাঁচ রত্নের অতুলনীয় শোভার আড়ালে লুকিয়ে আছে দুর্গম এক গিরি। কেন কঠিনতম চ্যালেঞ্জ কাঞ্চনজঙ্ঘা? লিখছেন বাংলার অন্যতম সেরা অভিযাত্রী..

Kanchenjunga
তুষারশুভ্র: অজানা বিপদের আশঙ্কাকে হেলায় দূরে সরিয়ে প্রত্যেক বছর পর্বত অভিযাত্রীরা কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গের অমোঘ আকর্ষণে ছুটে যান। কেউ ফেরেন সাফল্যের তৃপ্তি নিয়ে। কেউ বা হারিয়ে যান বরফের কোলে। ফাইল চিত্র
  • বসন্ত সিংহরায়

Advertisement

বৃহস্পতিবার রাতেই শুনেছিলাম দুঃসংবাদটা। কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়ে মারা গিয়েছেন বাংলার দুই পর্বতারোহী বিপ্লব বৈদ্য ও কুন্তল কাঁড়ার। পাঁচ বছর আগে এই কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানেই হারিয়ে গিয়েছিলেন ছন্দা গায়েন। প্রশ্ন উঠতে পারে, ৮,৮৪৮ মিটারের এভারেস্টে ওঠা যখন কোনও সমস্যা নয়, তা হলে ৮,৫৮৬ মিটার উচ্চতার কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠতে গিয়ে এত দুর্ঘটনা কেন? উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি এই সব প্রশ্নের। 

আম গাছ বনাম তাল গাছ: আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গগুলির মধ্যে চারটি সব চেয়ে কঠিন। গডউইন অস্টিন বা কে টু, কাঞ্চনজঙ্ঘা, নাঙ্গা পর্বত ও অন্নপূর্ণা। আমি অনেক পেশাদার পর্বতারোহীকেই দেখেছি, এই চারটি শৃঙ্গে ওঠার চ্যালেঞ্জ শুরুতেই কেউ নিতে চান না। পরের দিকে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হলে তখন চেষ্টা করেন। খুব সহজ একটা উদাহরণ দিই। আপনি ১৮টি ফুট লম্বা একটি আম গাছে খুব সহজেই উঠে পড়তে পারবেন, যদি গাছে চড়তে জানেন। কিন্তু ১৮ ফুট উঁচু একটি তালগাছে ওঠা সহজ নয়। ওখানে খাড়া বেয়ে উঠতে হয়। সোজা কথায়, এটাই এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘার পার্থক্য।

দুর্গম গিরি: আমি এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দু’টি পর্বতশৃঙ্গেই উঠেছি। কাঞ্চনজঙ্ঘার পথ অনেক বেশি দুর্গম। ২০১০ সালে এভারেস্টে ওঠার পরের বছর ২০১১ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়েছিলাম। এক দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য যেমন অবর্ণনীয়, তেমনই প্রত্যেক পদে লুকিয়ে রয়েছে বিপদ। রডোডেনড্রনের শোভায় হারিয়ে যেতে যেতে জানাও যাবে না কখন তুষারধস ধেয়ে আসছে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার জন্য। 

সুযোগ নেই দড়ি ধরার: এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘার বেসক্যাম্প থেকে সামিট-ক্যাম্পের মাঝে রয়েছে আরও তিনটি ক্যাম্প। পর্বতারোহীদের অনেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা যাওয়ার আগে শুশুনিয়া পাহাড়ে ‘রক ক্লাইম্বিং’-এর অনুশীলন করে নেয়। সুস্থ শরীর থাকলে এভারেস্টে যে কেউ উঠতে পারেন। কারণ, শেরপারা দড়ি দিয়ে পথ তৈরি রাখেন এভারেস্টে। এদের বলা হয় ‘আইসফল ডক্টর’। নেপাল সরকার থেকেই এই ব্যবস্থা করা থাকে। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘাতে অনেক জায়গায় দড়ি ধরে ওঠার ব্যবস্থা নেই। সব সময় শেরপাদের সাহায্যও পাওয়া যায় না। 

স্যুপ, নুডল্‌স, হট চকোলেট: বেস ক্যাম্পে ভাত, ডাল, সব্জি, মাছ সব খাওয়া যায়। ক্যাম্প ওয়ান ও টু-তে স্যুপ ও খিচুড়ি। তিন নম্বর ক্যাম্প থেকে খেতে হবে হট চকোলেট, স্যুপ ও নুডল্‌স। কারণ তখন সেদ্ধ হবে না। জ্বালানিও সীমিত। এ রকমই প্রতিকূল পরিবেশ কাঞ্চনজঙ্ঘায়।

আবহাওয়া বোঝা কঠিন: কাঞ্চনজঙ্ঘায় আবহাওয়ার আভাস পাওয়া মুশকিল। উপরে কত বেগে হাওয়া বইছে বা তুষারপাত হচ্ছে কি না, বোঝা দুষ্কর। এই ভাল তো এই খারাপ। এভারেস্টে ওঠার সময় সামিট ক্যাম্প থেকে শৃঙ্গে আরোহণ করে দ্রুত নেমে আসতে হয়। ব্যাপারটা এক রাতের মধ্যে সারা হয়ে যায়। কিন্তু এই প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্যই সামিট ক্যাম্প থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ ঘুরে ফিরতে আমার লেগে গিয়েছিল চার রাত। প্রথম দু’দিন যেতে পারিনি। তৃতীয় দিন শিবির ছেড়ে বেরোতেই আকাশ কালো করে এল। চতুর্থ দিন শেষমেশ সফল হই।

সামিট ক্যাম্প থেকে শৃঙ্গ বেশি দূরে: এভারেস্টে সামিট ক্যাম্প থেকে শৃঙ্গের দূরত্ব ন’শো থেকে সাড়ে ন’শো মিটার। সময় লাগে ১২ ঘণ্টা। সেখানে কাঞ্ছনজঙ্ঘায় সামিট ক্যাম্প থেকে শৃঙ্গের দূরত্ব ১২০০ মিটার। সময় লেগে যায় ১৪-১৬ ঘণ্টা। এভারেস্টে ওঠার সময় রাত আটটার সময় বেরিয়ে পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটার সময় শৃঙ্গে উঠেছিলাম। আর কাঞ্চনজঙ্ঘায় ওঠার ক্ষেত্রে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বেরিয়ে পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটার সময় পৌঁছই।

অক্সিজেন ও জলের অভাবেই দুর্ঘটনা: নামার সময় বেশি সময় লাগে। এটা মাথায় রাখতে হয়। অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে থাকে। অতিরিক্ত সিলিন্ডার শেরপা নেয়। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে দেরি হলে দু’টোই ফুরিয়ে যেতে পারে। তাই নিরাপদ হল তিনটে সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়া। এর বেশি সিলিন্ডার নিতে পারবেন না। তার পরেও কিন্তু নামার সময় তিন-চার ঘণ্টার জন্য অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে। তাই অক্সিজেন ছাড়া তিন-চার ঘণ্টা নামার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে সামিট ক্যাম্পে ফিরেছিলাম সাড়ে ২৭ ঘণ্টা পরে। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। এর মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা অক্সিজেন ছিল না। সাড়ে ২৭ ঘণ্টা কোনও জল খাইনি। নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে কেন দুর্গম এই কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযান। যতদূর জেনেছি, বিপ্লব ও কুন্তল এই সমস্যাতেই পড়েছিল। 

অক্সিজেন কম থাকলে কী হয়:  শরীর ছেড়ে দেবে। হাঁটতে ইচ্ছে করবে না। বুকে জল জমতে থাকে কারও কারও। সেই সময় মৃত্যুকে হারাতে হলে হাঁটতেই হবে। এক বার বসে পড়া মানেই যমদূতের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। অক্সিজেন শূন্যতা হলেই আঙুল কালো হয়ে গিয়ে ফ্রস্ট বাইট, পেশির নমনীয়তা হারানো, চিৎকার-চেঁচামেচি করার প্রবণতা বাড়ে। চোখের মণি স্থির হয়ে যায় আর এটাই একজন পর্বতারোহীর চ্যালেঞ্জ। আর এটা যে কত বড় বিপদ তা আমি জানি। কাঞ্চনজঙ্ঘায় বেঁচে ফিরলেও ২০১৩ সালে ধৌলাগিরিতে নামার সময় আমার অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। শেরপাও চলে যায়। ১৬ ঘণ্টা অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম। গ্লাভস খুলতে পারছিলাম না। বরফ খুঁড়ে জল খাওয়ার জন্য তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছিল। চারপাশের গোটা জগত থেকে আমি যেন দূরে সরে যাচ্ছি এমন অনুভূতি হচ্ছিল। ভাগ্য ভাল ছিল যে, দাওয়া নামে এক বিখ্যাত শেরপা তখন উঠছিল। নিজের সিলিন্ডার দিয়ে ও-ই আমাকে বাঁচায়। 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন