Advertisement
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
ওয়ার্নের দুর্গে ভারতের স্পিন অস্ত্রকে নিয়ে অনিশ্চয়তা

পুরো সুস্থ নন অশ্বিন, তৈরি থাকছেন জাড্ডু

কিন্তু উইকেটসংখ্যার চেয়েও অনেক জরুরি ব্যাপার হচ্ছে, একটা এলেবেলে টিমের ধমনীতে জয়ের রক্ত সঞ্চালন করে দেন ওয়ার্ন।

চর্চায়: আর অশ্বিন এখনও সুস্থ নন। খেলা নিয়ে সংশয়। ফাইল চিত্র

চর্চায়: আর অশ্বিন এখনও সুস্থ নন। খেলা নিয়ে সংশয়। ফাইল চিত্র

সুমিত ঘোষ 
সাউদাম্পটন শেষ আপডেট: ২৮ অগস্ট ২০১৮ ০৪:৩৯
Share: Save:

নাপোলিতে গেলে যেমন অবিসংবাদী সম্রাট হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় দিয়েগো মারাদোনাকে, সাউদাম্পটনে এলে তেমনই পাওয়া যাবে শেন ওয়ার্নকে। ২০০০ থেকে ২০০৮— আট বছর হ্যাম্পশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন ওয়ার্ন। মারাদোনা যেমন আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন নাপোলিকে, তেমনই অস্ট্রেলীয় কিংবদন্তি লেগস্পিনার বদলে দিয়েছিলেন এই কাউন্টিকে।

Advertisement

আট বছরে ২৭৬টি প্রথম শ্রেণির উইকেট নেন তিনি। কিন্তু উইকেটসংখ্যার চেয়েও অনেক জরুরি ব্যাপার হচ্ছে, একটা এলেবেলে টিমের ধমনীতে জয়ের রক্ত সঞ্চালন করে দেন ওয়ার্ন। ক্রিকেট বিশ্বে অনেকে মনে করেন, অ্যালান বর্ডার পরবর্তী যুগে অস্ট্রেলিয়া তাদের সেরা অধিনায়ককে পায়নি। তাঁর নাম শেন ওয়ার্ন। সাউদাম্পটনে এলে সেই ভাবনার সঙ্গে একমত হওয়া লোকের সংখ্যার অভাব হবে না। এতটাই এখানে প্রভাব ওয়ার্নের যে, তাঁর নামে আলাদা স্ট্যান্ডও আছে। কোনও বিদেশি ক্রিকেটারের নামে স্ট্যান্ড খুব একটা অন্য দেশে দেখা যায় না।

এক অস্ট্রেলীয় স্পিনারের জ্বলজ্বল করা স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিকেট স্টেডিয়াম। আর সেখানে ম্রিয়মান হয়ে ঘুরে বেড়ানো এক ভারতীয় স্পিনার। সোমবার দু’টো ছবি মেলাতে গিয়ে বেশ ধাক্কা লাগল। আর অশ্বিনকে দেখে মনে হল, কোমরের নীচের দিকে লাগা চোট নিয়ে এখনও অস্বস্তিতে রয়েছেন। মনে করা হয়েছিল, লন্ডনে চার দিনের বিশ্রামে হয়তো অনেকটাই সেরে উঠছেন তিনি। ভারতীয় শিবিরের কাছে রিহ্যাবের প্রাথমিক রিপোর্ট ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সেটা ছিল হোটেলের ঘরের মধ্যে বসে হাতে পাওয়া রিপোর্ট। সোমবার দল মাঠে ফিরতেই অশ্বিনের যা অবস্থা দেখা গেল, তিনি সাউদাম্পটন টেস্ট খেলে দিলে অবাকই হতে হবে।

ওয়ার্নের কাউন্টি মাঠে এ দিন যাঁকে সব চেয়ে কম নড়াচড়া করতে দেখা গেল, তাঁর নাম অশ্বিন। দু’টো জায়গায় ভাগাভাগি হয়ে অনুশীলন করছিলেন বিরাট কোহালিরা। ফিল্ডিং প্র্যাক্টিস হচ্ছিল মূল মাঠে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল জোরদার ক্যাচিং প্র্যাক্টিস হচ্ছে। কিন্তু অশ্বিন দূরেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। কখনও গল্প করছেন ট্রেনারের সঙ্গে, কখনও ফিজিয়োর সঙ্গে, কখনও বা সাপোর্ট স্টাফের অন্য কারও সঙ্গে। মূল মাঠ থেকে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় আর একটি ছোট মাঠ। সেখানে ব্যাটিং, বোলিং চলছিল। বেশ তীব্রতাই দেখা যাচ্ছিল সেই প্রস্তুতিতে। অশ্বিন শুরুর দিকে সেখানেও ছিলেন না। পরে এলেও খুব বেশি ঘাম ঝরাতে দেখা গেল না। বরং হেঁটে যাওয়ার সময়েও দেখে বোঝা যাচ্ছে, পুরো সুস্থ নন।

Advertisement

সব চেয়ে খটকা লাগবে অশ্বিনের শরীরী ভাষা দেখে। ওয়ার্নের মতো আগ্রাসন তো দূরের কথা, মাঠের এক কোণ থেকে আর এক কোণে হেঁটে যাচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে যে, দেখেই মনে হবে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। যদিও টেস্টের মাঝে এখনও দু’দিন রয়েছে এবং আশাবাদীরা বলতেই পারেন, আটচল্লিশ ঘণ্টায় ওষুধ-টষুধ খেয়েও অনেক সুস্থ বোধ করতে পারেন ভারতীয় অফস্পিনার। সেটা সীমিত ওভারের ম্যাচ হলে হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে উঠলে টেস্ট ম্যাচে পাঁচ দিনের ধকল নেওয়া সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্ন থাকছে। আধা-ফিট অবস্থায় তাঁকে নামালে আরও বেশি সময়ের জন্য যদি তাঁকে ছিটকে যেতে হয়, তখন কী হবে? সেই প্রশ্নও নিশ্চয়ই ভারতীয় দলের পরিচালন সমিতির মাথায় ঘুরবে।

ওভালে শেষ টেস্টে অনেক বেশি করে স্পিনার কাজে লাগতে পারে। যদি এখানে সিরিজ ২-২ করে ফেলতে পারে ভারত, তা হলে ওভালে সিরিজ ফয়সালার মারকাটারি ম্যাচ। সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে সাউদাম্পটনে অশ্বিনকে বিশ্রাম দিয়ে ওভালের জন্য তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।

ওয়ার্নের আমলে হ্যাম্পশায়ারের এই মাঠের নাম ছিল রোজ বোল। ২০০৪ সালে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কিনিয়ার সঙ্গে এখানে খেলা পড়েছিল ভারতের। ৯৮ রানে জেতা ম্যাচে ৯০ করে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন সৌরভ। এখন স্পনসরশিপের জন্য নামকরণ হয়েছে ‘আজিয়াস বোল’। টেস্ট খেলতে এসে ভারতের অভিজ্ঞতা যদিও ভাল নয়। ২০১৪-র অভিশপ্ত সফরে ধোনির টিম ২৮৮ রানে দুরমুশ হয়। কিন্তু বিভ্রান্তিকর হচ্ছে, হ্যাম্পশায়ারের মাঠের বাইশ গজে গতি ও বাউন্স থাকলেও স্পিনাররাও ছোবল দিতে পারেন। চার বছর আগের সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে ভারতকে ভাঙেন জেমস অ্যান্ডারসন। দ্বিতীয় ইনিংসে ছয় উইকেট নেন তখন অনিয়মিত অফস্পিনার মইন আলি।

ভারত ও ইংল্যান্ড দু’দল অবশ্য মনে হয় না চার বছর আগের সেই ম্যাচে ফিরে যাবে বলে। রুট বা কোহালির কাছে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ট্রেন্ট ব্রিজের স্কোরকার্ড। যেখানে দেখা যাবে ইংল্যান্ডের ২০ উইকেটের মধ্যে ১৯টি নিয়েছেন ভারতীয় পেসাররা। অশ্বিন পেয়েছেন মাত্র একটি উইকেট। সাউদাম্পটনে পৌঁছে এ দিন দেখা গিয়েছে বেশ মেঘলা আকাশ রয়েছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। দুপুরের দিকে রোদ উঠলেও হাওয়া থামেনি। প্রাথমিক পূর্বাভাস যা পাওয়া গেল, আবহাওয়া এ রকমই থাকবে। ইউরোপ জুড়ে যে দাবদাহ চলছিল, তা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। তার মানে মোটামুটি ভাবে ‘ইংলিশ ওয়েদার’। মানে সুইংয়ের পরিবেশ, স্পিনের নয়। তাই অশ্বিন পুরো ফিট না হলে খুব জোরজার করে ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে দল।

বরং হ্যাম্পশায়ারের মাঠে কোহালিদের অনুশীলনে ভাবগতিক দেখে মনে হল, রবীন্দ্র জাডেজাকে তৈরি রাখা হচ্ছে বিকল্প হিসেবে। জাডেজা চার বছর আগের সেই টেস্টে এখানে খেলেছিলেন। যদি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু টেস্টের আগে অশ্বিন একশো শতাংশ ফিট না হতে পারেন, জাডেজার ভাগ্যে বহু দিন পরে বিদেশের মাঠে টেস্টের দরজা খুলতে পারে। আবার এক-এক সময় মনে হচ্ছে, কারও সর্বনাশ কারও পৌষ মাস প্রবাদ জাডেজার ক্ষেত্রে খাটবে কি না, কে জানে! সবই হয়তো নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত পিচ রিপোর্ট কী দাঁড়ায়, তার উপরে।

সোমবার প্র্যাক্টিস করতে এলেও পিচ দেখে খুব বেশি কিছু ভাবতে নারাজ ভারতীয় শিবির। কারণ টেস্টের এখনও দু’দিন বাকি। বাইশ গজের প্রকৃত রূপ কী দাঁড়াবে, সেটা এত আগে কোনও ভাবেই বোঝা সম্ভব নয়। তার উপরে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট এবং তাঁর দলবল এখনও হ্যাম্পশায়ারের মাঠে পা রাখেননি। আজ, মঙ্গলবার তিনি এবং কোচ ট্রেভর বেলিস এসে পিচ দেখে কিছু দাবি-দাওয়া রাখেন কি না, সেটাও দেখার। এমন প্রাণান্তকর চাপের মধ্যে ইংরেজ অধিনায়ক নিশ্চয়ই নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন, তাঁদের পছন্দের পিচ দেওয়া হোক।

এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হচ্ছে, রুটদের পছন্দের পিচ কী? পেসারদের সহায়ক পিচ মানে যেমন জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রডরা ফায়দা তুলবেন তেমনই যশপ্রীত বুমরা, ইশান্ত শর্মারাও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেন। সেটা তাঁরা ট্রেন্ট ব্রিজেই প্রমাণ করে দিয়েছেন। আবার মন্থর পিচ করা মানে ঐতিহাসিক ভাবে ভারতের শক্তির জায়গাকে প্রশ্রয় দেওয়া।

যা পরিস্থিতি, টেস্টের আগে প্রথম একাদশ নিয়ে টানা-হ্যাঁচরা বাড়বে বইকি কমবে না। যদি বাইশ গজ পেসারদের সাহায্য করে, অশ্বিনের বদলে বাড়তি পেসার হিসেবে উমেশ যাদবকে আনার কথা ভাবা হতে পারে। যদি স্পিনার লাগে, তা হলে বিকল্প তৈরি— জাডেজা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.