ডায়লগটা ছিল— ‘চুপ, আসামি ফেরার’।

বিবেকের ডায়লগ। বিবেকের চরিত্রে পাড়ার লক্ষ্মীজেঠু। গালে ঠোসা খিলি পান।

সিনটা এ রকম: মঞ্চে আসামি মরে পড়ে রয়েছে আর বিবেক ঢুকে বলছে, ‘চুপ, আসামি ফেরার’।

কিন্তু হল কি, পান মুখে নিয়ে  ‘চুপ’ বলতে গিয়ে লক্ষ্মীজেঠু বলে ফেলল— হুপ! ব্যস, দর্শক হেসে কুটোপাটি, আর আমরা কে কোথায় পালাব বুঝে উঠতে পারছি না!

নাটকের নাম ‘আসামি ফেরার’। হাওড়া জগাছার ‘পদক্ষেপ’ নাট্যদল তখন এই নাটকটা করত। ওই দলেই আমার অভিনয়ের হাতেখড়ি।

আমি তো জগাছারই ছেলে। পড়তাম কেদারনাথ হাইস্কুলে। বাড়ির সামনেই ফ্রেন্ডস ক্লাবের ময়দান। খেলার যে খুব নেশা ছিল, তা নয়। ঝোঁকটা বরং অনেক বেশি ছিল ছবি আঁকা আর নাটকের দিকে। ঘরে বসে একা-একাই হরেক রকম আঁকতাম, নাটকের মহলা দিতাম।

মুশকিল হল, আমার বাবা-মা দু’জনেই পড়াতেন স্কুলে। ফলে যা হয়, ভাল করে লেখাপড়া করার জন্য আমার উপরে চাপ ছিল আর পাঁচটা ছেলের চেয়ে বেশি। নিয়ম মেনে পড়তে বসতে হত। মাঠেও যেতাম। তবে খেলার চেয়ে নতুন-নতুন বন্ধু জোটানোর তাগিদটাই ছিল বেশি। জুটেওছিল অনেক।

তবে আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু ছিল জুলু। পড়শিও বটে। আমাদের পাড়ার সবচেয়ে ভদ্র শান্ত কুকুর। কে যে ওর নাম ‘জুলু’ দিয়েছিল মনে নেই। তবে ওর জুলজুল করে চেয়ে থাকাটা ভোলার নয়। আমার ছবি আঁকা বা অভিনয় প্র্যাকটিস সে দেখে যেত জুলজুল করেই। দুপুরে পাড়ার অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গীও ছিল সে-ই। বাবা-মা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই জুলু উধাও। বন্ধুদের ভিড়ে যখন মিশে যেতাম, তখনও।

ছোটবেলায় মায়ের কাছে গান আর বাবার কাছে ছবি আঁকা শেখাই বেশি টানত আমায়। একটু দূরেই থাকত ঠাকুমা-কাকুরা। জীবনের শেষ দিন অবধি ঠাকুমার রবীন্দ্রসঙ্গীত বা অতুলপ্রসাদের গানে ভাটা পড়তে দেখিনি। কিন্তু ঝামেলা হত কিশোর-কণ্ঠী ছোটকাকুর সঙ্গে ঠাকুমার। কোনটা সঙ্গীত আর কোনটা অর্কেস্ট্রার বেলেল্লাপনা— তা নিয়ে। গোটা সময়টায় ফুটবলার অঞ্জনকাকু ছিল উদাসীন দর্শক। আমি আর আমার জ্যাঠতুতো বোন কুঁড়িও দর্শকাসনে, তবে উদাসীন নই, এই যা! দু’জনে ছাদে উঠে লুকিয়ে-লুকিয়ে হাসতাম।

বাড়ির পাশেই ছিল প্রবালকাকুর বাড়ি। ননদ-বৌদির নিত্যদিনের ঝগড়াও ছিল আমার পড়শি। চির-দার্শনিক সেজোকাকুর শখের ভাই রাজা আর বোন মানাইয়ের ঝগড়ায় অবিকল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়ে যেত।

পাড়ায় ভূমিকম্প হত যখন জগাছা ব্যায়াম সমিতির ব্যায়ামবীরেরা ভিড় জমাতেন অলোকজেঠুর বাড়িতে। তাঁদের গমগমে গলার আওয়াজ আর কিংকং-সুলভ পদক্ষেপে কেঁপে-কেঁপে উঠত মায়ের গানের গলা, বাবার ক্যানভাসের তুলি। পরে যখন শুনতাম অলোকজেঠুর এই শিষ্যেরা কেউ ‘ভারতশ্রী’ বা ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, গর্বও হত বৈকি।  অলোকজেঠুর তিন ছেলে আবার তিন রকম। গামদা (ব্যায়ামবীর), গুন্ডাদা (হিসেবি গায়ক) আর বুল্টিদা (তবলচি)। বুল্টিদা আবার ছিল আমার প্রাইভেট টিউটর। পড়ার চেয়ে সাধারণ জ্ঞানের আলোচনাই হত বেশি।

কলেজের গন্ডি পেরোনোর পরে ঠিক করলাম, সিনেমায় নামতে হবে। ভাবলেই তো আর হয় না। সে লম্বা লড়াই। সে লড়াই গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে থেকে লড়া শক্ত। পাড়া ছেড়ে ফ্ল্যাট নিলাম টালিগঞ্জে। সঙ্গী ছিল আরও তিন-চার জন। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই আলাপ নন্দনে। রাজু বলে এক জনের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হল। পরিচালক হতে চায় সে আর আমি অভিনেতা। কত দিন এক থালায় ভাত মেখে খেয়েছি। আস্তে আস্তে টুকটাক কিছু সিরিয়াল-সিনেমায় সুযোগ আসতে লাগল। যে দিন প্রথম বড় ছবির অফার পেলাম, রাজু বোধ হয় আমার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিল। পরে ওর কাছেও সহকারী পরিচালকের কাজ করার একটা সুযোগ এল। গা করছিল না। আমরা ঠেলে পাঠাই। সেই রাজুই আজকের রাজ চক্রবর্তী।

মহানগরের ভিড়ে এই ক’জনও কখন যেন পড়শি হয়ে উঠেছিল। যেমন পড়শি ছিল ছোটবেলার বন্ধুরা।  বুয়া, জিতেন, বুজান, সমীর, উত্তম—আম চুরি থেকে বারোয়ারি তলার দুগ্গাপুজো, রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছোটা থেকে খাট কাঁধে শ্মশানে, এরা পাশে-পাশে ছিল। সাঁতরাগাছি ঝিলে যে কত আড্ডা মেরেছি!

আজও সব রয়ে গিয়েছে চেনা একটা নদীর ও পাশে। মা শুধু চলে গিয়েছেন অলকানন্দা পেরিয়ে।