শাসক দলের হিসেব বলছে, পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে হিংসায় তাদেরই অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ পুলিশকে শংসাপত্র দিচ্ছেন শাসক দলেরই মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়!

স্বয়ং পার্থবাবুর ব্যাখ্যা, ‘‘যে ভাবে হিংসা সংগঠিত হয়েছে, তাতে পুলিশকে দোষ দিয়ে কী হবে? পুলিশ তো বুথের পাহারায় ছিল। সামগ্রিক ভাবে সে কাজ তারা করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের তৎপরতা ছিল।’’ খোদ মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা নদিয়া জেলায় তৃণমূলের অন্তত চার জন মারা গিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে অবশ্য পার্থবাবুর বক্তব্য, ‘‘নদিয়ার ঘটনা সম্পর্কে যা জেনেছি, তাতে তিন থানার ওসি নিজেদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না বলেই মনে হচ্ছে। এটা প্রশাসন দেখবে।’’

নদিয়ার মতো প্রাণহানি হয়েছে মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও। কিন্তু রাজ্যের আর এক মন্ত্রী ও উত্তরবঙ্গের তিন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শুভেন্দু অধিকারীর মতও পার্থবাবুর মতোই। শুভেন্দুবাবু মঙ্গলবার বলেন, ‘‘পুলিশ ভাল কাজ করেছে। রাজ্যের ১০ কোটি মানুষকে তো আর পুলিশ নিরাপত্তা দিতে পারবে না!’’

আরও পড়ুন:
হিংসা চলছেই, রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১
‘অশান্ত বাংলায় নিহত গণতন্ত্র’, পঞ্চায়েত নিয়ে চড়া আক্রমণে মোদী
 
১৯ জেলায় ৫৭৩ বুথে আজ ভোট

কেন নিজেরা প্রাণের মাসুল দিয়েও শাসক দলের নেতৃত্বকে পুলিশের প্রশংসা করতে হচ্ছে, তার অবশ্য অন্য ব্যাখ্যা মিলছে বিরোধী শিবির সূত্রে। তাদের দাবি, সোমবার ভোটের দিন রাজ্যের নানা প্রান্তেই শাসক দলের ‘দুষ্কৃতী বাহিনী’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন মানুষ। কোথাও বাম, কোথাও বিজেপি, আবার কোথাও নির্দল প্রার্থীদের সামনে রেখে প্রতিরোধে হয়েছে। এবং তাতেই প্রাণ গিয়েছে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের। বিরোধী নেতাদের দাবি, পুলিশ সক্রিয় ভাবে শাসক দলের পাশে না দাঁড়ালে তৃণমূলের প্রাণহানি আরও বেশি হত।

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘তৃণমূল এখন লুটেরাদের দলে পরিণত হয়েছে। পুলিশের ঘেরাটোপ ছাড়া তাদের নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। তাই পুলিশকে শংসাপত্র তাদের দিতেই হবে!’’ সুজনবাবু উদাহরণ দিচ্ছেন, কাকদ্বীপে সিপিএম কর্মী এক দম্পতির পুড়ে মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যের দুই মন্ত্রী বাজ পড়া ও হুকিংয়ের দু’রকম তত্ত্ব দিয়েছিলেন। শেষমেশ পুলিশকে দিয়েই ‘শর্ট সার্কিট তত্ত্ব’ দিয়ে মুখরক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে তাঁর অভিযোগ। যদিও ঘটনার সময়ে এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের জানিয়েছেন। সিপিএমের অভিযোগ, ওই দম্পতিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, ‘‘পুলিশ আগে শাসক দলের তাঁবেদারি করত। কিন্তু এ বার পুলিশ সক্রিয় ভাবে বুথ দখল ও ভোটলুঠে সাহায্য করেছে!’’ ভোটের আগে মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় পুলিশ-প্রশাসন বিরোধীদের প্রার্থী প্রত্যাহারের তালিকাও তৈরি করে দিয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে ‘অভূতপূর্ব’ পরিস্থিতির কথা জানাতে রাষ্ট্রপতির কাছেও যাবেন অধীরবাবুরা।

একই সুরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, ‘‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে পুলিশ তৃণমূলকে ভোট লুটে ও হিংসায় মদত দিয়েছে। বেশির ভাগ জায়গাতেই তৃণমূলের দুষ্কৃতী বাহিনীর দাপট পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে। ভোটের পরে বাড়ি বাড়ি ঢুকে সেই সব লোকজনকে পুলিশ টেনে বার করে গ্রেফতার করেছে, যারা শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছে।’’ কলকাতার কাছেই জ্যাংড়ার ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন দিলীপবাবু।