একশো দিনের প্রকল্পের হাল দেখেই ক্ষোভে প্রশাসনিক বৈঠক থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এগারো মাস পরে প্রশাসনিক বৈঠকেই প্রশংসা করে বললেন— ‘‘পুরুলিয়াতে ভালো কাজ হয়েছে। গতবার আমি রেগে বেরিয়ে গিয়েছিলাম কাজ না হওয়ার জন্য। এখন ভাল কাজ হয়েছে।’’ যাঁরা দুরুদুরু বুকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে ঢুকেছিলেন, প্রশংসা শুনে তাঁরা যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলেন। মঙ্গলবার চুম্বকে এটাই খবর।

পুরুলিয়া শহরের উপকন্ঠে বেলগুমা পুলিশ লাইনের কনফারেন্স হলে এ দিন মমতাকে খোশ মেজাজেই পাওয়া গিয়েছে। গোড়াতেই জেলায় এখনও পর্যন্ত কোন প্রকল্পে কী কাজ হয়েছে, উন্নয়নের আর কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীর হাতে দেন জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায়। রির্পোটে চোখ বুলিয়ে ও বিভিন্ন প্রকল্পের হাল প্রশাসন ও বিভিন্ন দফতরগুলির কাছে বিশদে জেনে মুখ্যমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন। ধন্যবাদ জানান জেলার মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোকেও।

গত বছরের এপ্রিল মাসে পুরুলিয়ায় প্রশাসনিক বৈঠকের গোড়াতেই মমতা একশো দিনের প্রকল্পে স্কুলে স্কুলে সাফাইয়ের কাজ কেমন হচ্ছে, খোঁজ নেন। সেই সময় এক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেছিলেন, স্কুলে স্কুলে সাফাইয়ের কাজ শুরুই হয়নি। তাতেই চটে মুখ্যমন্ত্রী বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। এ দিন অবশ্য প্রশাসনের কর্তারা ও জনপ্রতিনিধিরা বৈঠকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে গিয়েছেন।

বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন মুখ্যসচিব মলয় দে, রাজ্য পুলিশের ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ-সহ অন্যান্য দফতরের সচিবেরা। ছিলেন জেলার জনপ্রতিনিধিরা, জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের সমস্ত স্তরের কর্তা, আধিকারিকেরা। সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বণিকসভার প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়েছিল। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠকে বিভিন্ন দফতরের কাজের পর্যালোচনা হয়। বিভিন্ন বিষয়ের খোঁজ নেন তিনি।

মশা নিয়ন্ত্রণ

মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতর কী কাজ করেছে বৈঠকের শুরুতেই জানতে চান মুখ্য সচিব। শুধু শহরাঞ্চলে নয়, গত বার গ্রামেও মশাবাহিত রোগ ছড়িয়েছিল বলে গ্রামাঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণের হাল জানতে চান তিনি। জেলাশাসক জবাব দেন, ইতিমধ্যেই এ নিয়ে জেলায় তিনটি বৈঠক হয়েছে। ব্লক স্তরেও বৈঠক করে বিডিওরা বিভিন্ন পঞ্চায়েতে খোঁজ নিতে নিয়মিত যাচ্ছেন। মশানাশক ওষুধ ছড়ানোর যন্ত্র ও ধোঁয়া ছাড়ার মেশিন কেনা হয়েছে। নিয়মিত ব্যবহারও করা হচ্ছে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অনিলকুমার দত্ত জানান, বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা সমীক্ষা করেছেন। গত তিন মাসে মশাবাহিত রোগের ঘটনা পাওয়া যায়নি।

খরা নিয়ন্ত্রণ

রুখা জেলা পুরুলিয়াতে খরা নিয়ন্ত্রণ কী ভাবে করা সম্ভব, এই বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমেই জানিয়ে দেন, পানীয় জল সরবরাহ নিয়ে মানুষের অভিযোগ তিনি আর শুনতে রাজি নন। পুরুলিয়াতে জাইকা প্রকল্প এখনও রূপায়িত হয়নি। জাপানের ব্যাঙ্ককে রাজ্য সরকার এই প্রকল্প রূপায়ণে জোর করতে পারে না জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী গরমের শুরুতেই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার উপরে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘এখনই গরম পড়ে গিয়েছে। আগে থেকেই তৈরি থাকতে হবে। খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে মোকাবিলায় প্রশাসন কী ধরনের বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েছে, পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?’’ জেলা প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের কর্তারা তাঁকে জানান, ইতিমধ্যে জলবাহী দাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে সেই গাড়িতে করে জল সরবরাহ করা হবে। জেলায় প্রয়োজন ভিত্তিক টিউবওয়েল খোঁড়ার কাজ শুরু করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের সচিবকে খরা মোকাবিলায় ‘প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ তৈরি করে তাঁর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদিবাসী উন্নয়ন

আদিবাসীদের জমি যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে, সেই বিষয়টি প্রশাসনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে নির্দেশ দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘সাঁওতালদের জমি যেন কেউ দখল করতে না পারে, সেটা দেখতে হবে। অনেক বড়লোক জমি দখল করে নেয়। আমি কিন্তু দখল করা জমি কেড়ে ফেরত দিয়ে দেব।” তারপরেই জানতে চান, আদিবাসীদের জাহিরা থানের বেড়ার অবস্থা কী? সংশ্লিষ্ট দফতরের সচিব জানিয়েছেন, ৭৫টি জাহিরা থানে পাঁচিল দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। কেন্দু পাতা যাঁরা তোলেন, তাঁরা ষাট বছরের পরে পেনশন যেন পান, তা দেখার নির্দেশ দেন মমতা।

আইন রক্ষা

কোথায় কী ঘটছে, জানার জন্য পুলিশকে চোখ, কান খুলে রাখার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। এ জন্য পুলিশকে জনসংযোগ বাড়াতে নির্দেশ দেন। বিভিন্ন ক্লাব, মন্দির, মসজিদ কমিটির সঙ্গে আরও বেশি সম্পর্ক তৈরির পরামর্শ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলে ক্লাবের সদস্যেরা, মন্দির, মসজিদ কমিটি জানবে না, এটা হতে পারে না। ফলে নিবিড় জন সংযোগ তৈরি করুন। মহল্লায় মহল্লায় চায়ের দোকানে নজর রাখতে হবে।” 

জল সংরক্ষণ

জল ধরো জল ভরো হাল মুখ্যমন্ত্রী খোঁজ করেন। সেচ দফতরের কর্তারা জানান, ১০১টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পুকুর খোঁড়ার সময় গভীরতার দিকে নজর রাখার নির্দেশ দেন। সেচ-কর্তারা জানান, চেক ড্যাম তৈরি করে আগামী দু’বছরের মধ্যে দশ হাজার হেক্টর জমি সেচ সেবিত করার কাজ চলছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া জলাধার ও ক্যানালের সংস্কারের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

কিসান মান্ডি

পুরুলিয়াতে ১৩টি কিসান মান্ডির মধ্যে আটটি এখনও কেন পুরোদমে শুরু হয়নি, তার ব্যাখ্যা চান মুখ্যমন্ত্রী। জেলাশাসক বলেন, ‘‘কিছু ক্ষেত্রে কৃষকবাজারগুলি লোকালয় থেকে দূরে তৈরি হওয়ায় সমস্যা হয়েছে। তবে সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর পরামর্শ, স্থানীয় বাজারগুলিকে কিসান বাজারে স্থানান্তরিত করতে হবে। সেখানে হিমঘর তৈরি করতে হবে। সমবায় দফতরের সচিব জানান, জয়পুরে স্থানীয় কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতি কৃষক বাজারে হিমঘর বানাবে।

পর্যটন

অযোধ্যা পাহাড় থেকে শুরু করে বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর পর্যন্ত সার্কিট ট্যুরিজম তৈরির বিষয়ে ফের জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সারা জেলাতেই হোম ট্যুরিজম তৈরির কথা বলেন। লোকশিল্পকেও জুড়তে বলেছেন তিনি।

উদ্যানপালন

পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে থাকা (প্রায় চল্লিশ লক্ষ) পলাশ গাছের ফুলকে নিয়ে কিছু করার উপায় খুঁজতে উদ্যানপালন দফতর ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। উদ্যানপালন দফতর মুখ্যমন্ত্রীকে জানায়, তারা পরীক্ষামূলক ভাবে বিভিন্ন ফল, আনাজের চাষ করছে। 

ঝুমুরে আগ্রহ

মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে সিধো কানহো বীরসা বিদ্যালয়ের উপাচার্য দীপকরঞ্জন মণ্ডল জানান, সুষ্ঠ ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলছে। ছৌ নাচের উপরে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। তা শুনে ঝুমুরের উপরে কোর্স শুরুর জন্য উপাচার্যকে প্রস্তাব দেন মুখ্যমন্ত্রী।