টানা কয়েক দিনের সতর্ক উৎকণ্ঠার পরে অবশেষে চিন্তামুক্তি। ফণীর দুশ্চিন্তা কাটিয়ে এ বার চেনা ছন্দে ফিরতে চাইছেন ওঁরা। 

ওঁরা মানে সুন্দরবন উপকূলের বাসিন্দারা। ওঁরা মানে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও সেচ, দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মী— সকলেই। ঘূর্ণিঝড় ফণীকে ঘিরে কয়েক দিনে যাঁদের চোখেমুখে চেপে বসেছিল দুশ্চিন্তার মেঘ। ১০ বছর আগেকার আয়লার ক্ষতে মলম দিতে এখনও প্রায় সারা বছর কাজ করে যেতে হচ্ছে সেচ দফতরকে। সুন্দরবনের কিছু জায়গায় পাকা বাঁধ তৈরির ক্ষেত্রে জমির সমস্যা আছে। দুর্যোগ-সহ আছে আরও কিছু প্রতিকূলতা। সেগুলোকে অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছতে হিমশিম অবস্থা। তার মধ্যেই এসে পড়ে ফণীর আতঙ্ক। 

ফণী বিদায়ে স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে বাঁচার লড়াইয়ের জন্য আবার শুরু হয়েছে কোমর বাঁধার পালা। সাগর পাড়ি দিয়ে, সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে মাছ ধরতে পারলে তবেই তো চলবে পেট। কাকদ্বীপের ত্রিলোকচন্দ্রপুরের আনন্দ সরকারেরা তাই আবার ট্রলার সাজাচ্ছেন। বারদরিয়ায় যাবে তাঁদের ট্রলার। দূর থেকে ভেসে আসবে, ‘আমায় ডুবাইলি রে, ভাসাইলি রে...।’

কাকদ্বীপ, নামখানা, ফ্রেজারগঞ্জ, বকখালি, সাগরদ্বীপ, পাথরপ্রতিমায় আয়লার দুর্দিন ফিরিয়ে আনেনি ফণী। কিন্তু ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের মনে ফিরিয়ে এনেছিল আয়লার ত্রাস। আতঙ্কের ‘জলোচ্ছ্বাস’ সুন্দরবন উপকূল ছাড়িয়ে ঝাপটা মেরেছিল শহরেও। তাই সাগরে ভাগ্নির বিয়েতে যোগ দিতে তিন-চার দিন আগে পরিবারকে নিয়ে কাকদ্বীপের লট-৮ জেটিতে হাজির হন বিরাটির বিভূতি গুড়িয়া। কিন্তু মুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসেল বন্ধ থাকায় নদী পেরোতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘‘ঝড় আসবে বলে ভাগ্নির বিয়েতে আসব না! আগেই চলে এসেছিলাম। কিন্তু ভাগ্য ভাল নয়। শুক্রবার রাতটা কাটিয়েছি 

জেটির সামনে শিবিরে।’’

শনিবার সকালের ঝলমলে রোদের মতোই হাসি ঝরেছে বিভূতিবাবুর মুখে, দিল্লির লক্ষ্মীনারায়ণ অরোরার মুখেও। ১৯ জনকে নিয়ে সাগর বেড়াতে এসে অরোরা আটকে ছিলেন নদীর পাড়ে। রবিবার ফোনে বললেন, ‘‘শনিবার সকালে ভেসেল চলতেই গঙ্গাসাগরে চলে এসেছি। আসলে জানেন তো, সবই ভগবানের খেলা!’’

বৃহস্পতিবার রাত থেকে প্রতিটা মুহূর্ত সংশয় আর আতঙ্কেই কাটছিল সেচ দফতরের সুন্দরবন উপকূলের কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, জয়নগর ডিভিশনের কর্তাদের। প্রায় তিন দিন ধরে সব ডিভিশনের কন্ট্রোল রুমে বসে থেকে সেচকর্তারা বারবার যোগাযোগ করেছেন সদর দফতর কলকাতার জলসম্পদ ভবনে। হুগলি নদী, মুড়িগঙ্গা, সাগরের জলস্তর কতটা বাড়ছে, নজর ছিল সেই দিকেই। ভরা কোটাল নিয়ে ভয় ছিল বেশি। সেচ কর্মী-অফিসারেরা জানাচ্ছেন, শুক্রবার রাতে সুন্দরবন উপকূলে যখন ঝোড়ো হাওয়া শুরু হল, সেই সময় নদীতে ভাটা চলায় সমস্যা প্রকট হয়নি। তবে ফণী আসার আগে দমকা হাওয়া, বৃষ্টিতে নদী ও সাগরের জলস্তর কিছুটা বেড়ে যায়। তাতে হাতি কর্নার, বোটখালি, ব্রজব্রহ্মপুর, গোপাল নগর-সহ কিছু এলাকায় বাঁধ ও নদীর ঘাটে ফাটল ধরে। ধস নেমে গ্রামে জল ঢোকার উপক্রম হয়। 

আয়লা বাঁধ তৈরির কাজ চলছে সুন্দরবন উপকূলের বিভিন্ন জায়গায়। পাথরপ্রতিমা ব্লকের জি প্লট দ্বীপে সমুদ্রবাঁধ রয়েছে। প্রাকৃতিক কারণে ফেব্রুয়ারির পরে বাঁধের সরঞ্জাম নদীপথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। মৌসুনি দ্বীপের কুসুমতলা, বাগডাঙা, বালিয়াড়া অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৪.১ কিলোমিটার এলাকায় চলছে বাঁধের কাজ। ফ্রেজারগঞ্জের হাতি কর্নারের বেশ কিছুটা অংশে রাজ্য সরকারের টাকায় শুরু হয়েছে সমুদ্রবাঁধ নির্মাণ। সেচকর্তাদের আশা, বর্ষার আগে সেই কাজ শেষ হবে। সাগর ঘেঁষা ওই গ্রামে আর জল ঢোকার আশঙ্কা থাকবে না।