ঢাল, তরোয়াল কিছু না কিছু আছে। কিন্তু বন দফতরে কর্মী-অফিসারই বাড়ন্ত! তাই বিরাট বনাঞ্চল রক্ষা করতে গিয়ে প্রায়শই নাকাল হচ্ছেন বনকর্মীরা। শনিবার রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৈপীঠে চোরাশিকারিদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বনকর্মীর অভাবটা স্পষ্ট। তবে এ ক্ষেত্রে ঘটনাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশকে সঙ্গে না-নিয়ে অভিযানের সিদ্ধান্ত। যাকে ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিচ্ছেন বন দফতরের একাংশ। 

‘‘পরিকল্পনাহীন, হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার। সাহস দেখানোর আগে হাতে লোকবল কতটা কী রয়েছে, তা যাচাই করা উচিত ছিল। মৈপীঠ এমনিতেই সমাজবিরোধীদের এলাকা বলে পরিচিত,’’ বলেন ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট সার্ভিস এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অমল সিংহ। এ ভাবে অভিযান চালানো যে ‘ঠিক হয়নি’, তা মেনে নিচ্ছেন বন দফতরের পদস্থ কর্তারাও। বন দফতরের সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের যুগ্ম অধিকর্তা সিঙ্গারাম কুলানদাইভেল বলেন, ‘‘একেই পুলিশ ছিল না। চোরাশিকারিদের ধরতে গিয়ে রাতের অন্ধকারে গ্রামে গিয়ে এতটা সময় নেওয়া ঠিক হয়নি।’’

কুলানদাইভেল জানাচ্ছেন, ভোটের ডিউটিতে জন্য ব্যস্ত থাকায় শনিবার রাতে মৈপীঠ উপকূল থানায় পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই পুলিশ না-নিয়ে চোরাশিকারিদের ধরতে যান বনকর্মীরা। ‘‘তবে দুষ্কৃতীরা যে-কায়দায় হামলা চালিয়েছে, তাতে পুলিশ থাকলেও একই ঘটনা ঘটতে পারত,’’ বলেন কুলানদাইভেল। তাঁর মতে, এক জন চোরাশিকারিকে পাকড়াও করে তার ঘণ্টাখানেক পরে ফের যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। কারণ, দ্বিতীয় অভিযানের খবর গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল। তাতেই এ ভাবে ঘিরে হামলা চালায় চোরাশিকারিরা। 

অরণ্য সুরক্ষায় কর্মী কম
    পদ             মোট                 আছেন              ঘাটতি
বনরক্ষী                ২৪৪৪                ১৫৯৮              ৮৪৬
বিট অফিসার          ১২৭৭                ৯৭৭      ৩০০
রেঞ্জার               ৫৮০               ৪৮০               ১০০
সূত্র: বন দফতর ও বনকর্মী সংগঠন

প্রশ্ন উঠছে, এমন হামলা বনকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরাতে পারে কি? সুন্দরবন এমনিতেই পরিবেশগত এবং জীববৈচিত্রের দিক থেকে সংবেদনশীল। চোরাশিকারের উপদ্রবও রয়েছে। সে-ক্ষেত্রে পরিবেশের বিপদ কি আরও বাড়বে না? রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণ) রবিকান্ত সিন্হা বলছেন, ‘‘পাচার-বিরোধী অভিযান বন্ধ হবে না। কর্মীদেরও মনোবল ভাঙেনি।’’

তবে বন দফতরের অনেকেই বলছেন, যে-ভাবে নিচু তলার কর্মী কমছে, তাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। দফতরের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বনরক্ষী, বিট অফিসারের মতো নিচু তলার বহু পদ খালি। কিন্তু সেই তথ্য ২০১৫ সালের পরে আর ‘আপডেট’ করা হয়নি। কর্মী সংগঠনের হিসেব বলছে, গত দু’বছরে কিছু নিয়োগ হলেও সেই ঘাটতি পূরণ হয়নি। তা ছাড়া কর্মীদের অনেকের বয়স বেড়ে গিয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই কর্মক্ষমতা কমেছে।

বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনা বা সুন্দরবন এলাকা নয়, রাজ্যের সব বনাঞ্চলেই এই হাল। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলও কর্মী অভাবে কার্যত ধুঁকছে। কর্মী সংগঠনের নেতারা জানাচ্ছেন, বাম আমলে নিচু তলার শক্তি বাড়াতে বনশ্রমিক, বনমজুরের পদ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সব পদে নিয়োগ বন্ধ। বনকর্মী ‘‘শুধু পদস্থ অফিসারদের পদই বেড়েছে। তাই বন বাহিনী মাথাভারী হয়েছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে অবিলম্বে নিচু তলায় নিয়োগ বাড়াতে হবে। এক হাজার বনরক্ষী, ৩০০ বিট অফিসার এবং ১০০ রেঞ্জারের ঘাটতি রয়েছে,’’ বলেন সংগঠনের নেতা অমলবাবু।

বনকর্তা রবিকান্ত জানান, সম্প্রতি বেশ কিছু নিয়োগ হয়েছে। আরও কিছু নিয়োগ চলছে। বেশ কিছু নিয়োগের অনুমোদনও মিলেছে। গোটা প্রক্রিয়ায় একটু সময়সাপেক্ষ। তবে নিয়োগ হলে এই সমস্যা অনেকাংশে মিটবে।