মনসা, শীতলারা কবেই পিছু হটছিলেন। এ বার পালা বিশ্বকর্মার। খাস কুমোরটুলির ঐতিহ্যশালী পটুয়াপাড়াতেও বিশ্বকর্মাকে পিছনে ঠেলে বীর বিক্রমে এগিয়ে আসছেন গণপতি।

নধর ভুঁড়ি! সুখী শরীর! বাঙালির প্রাণের আগমনী গানে, গণেশঠাকুর হল গিরিরাজজায়া মেনকার আদরের নাতিটি। দুগ্‌গাঠাকুরের কোলের ছেলের এমন পরাক্রমশালী রূপ কস্মিনকালেও চেনা ছিল না বাঙালির।

তবু গত কয়েক বছর ধরেই কুমোরটুলি কিন্তু বলছে, মাতৃবৎসল বাঙালির আরাধ্য দুর্গা, কালী, সরস্বতীদের পংক্তিতে ক্রমশ সগৌরব ঠাঁই করে নিচ্ছেন গণেশ বাবাজি। এ বছরেরই হিসেব, কুমোরটুলিতে দেবস্থপতি বিশ্বকর্মার থেকে গণেশের মূর্তি সংখ্যায় দ্বিগুণেরও বেশি এখন।  কাল, বৃহস্পতিবার গণেশ পুজো। পরের সোমবার ১৭ তারিখে বিশ্বকর্মা পুজো। বিশ্বকর্মার বায়না যদি সাকুল্যে দু’হাজার হয়, সিদ্ধিদাতা গণেশের সংখ্যা অন্তত ৫০০০।

চিরকেলে ভুঁড়িদার বাঙালি পুরুষের সঙ্গে কিন্তু মিল নেই এই গণেশের। কুমোরটুলির শিল্পীরাই বলছেন, ইনি অত্যন্ত সিরিয়াস প্রকৃতির ঠাকুর। ‘গণেশ দাদা, পেটটি নাদা’ বলে এঁর সঙ্গে মস্করার কথা  ভাবাই যায় না। দু’এক দশক আগেও ‘গণেশ চতুর্থী’র দিনটা কবে, টেরই পেতেন না বেশির ভাগ বাংলাভাষী। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই মুলুকেও সিদ্ধিদাতার উপাসক মহারাষ্ট্র, গুজরাতের ছায়া।

কুমোরটুলির শিল্পী সনাতন পাল বলছিলেন, ‘‘বেশ কয়েকটি বড় কলকারখানা বন্ধের পরে বিশ্বকর্মার জৌলুস আগেই কমছিল। কিছু ইলেকট্রিক সারাই বা কাঠের মিস্ত্রির দোকানে পুজোর হাল নমো-নমো। ক্রমশ পাড়ার রিকশাস্ট্যান্ডেই টিকে থাকছিলেন বাবা বিশ্বকর্মা।’’ এই সঙ্কটে বিশ্বকর্মার জায়গাটা গণেশ  দখল করে নেওয়াটা অশেষ সৌভাগ্য বলেই দেখছেন পটুয়াপাড়ার শিল্পীরা।

বাঙালির এই গণেশপ্রীতি অবশ্য একান্তই আনকোরা বলে মানতে রাজি নন সাহিত্যিক শঙ্কর বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শঙ্করের মনে আছে, তাঁর চাকরি-জীবনের শুরুতে সরকারি বেসরকারি বহু অফিসেই খাতায় বার কয়েক ‘গণেশায় নমঃ’ লিখে দিন শুরু করতেন গেরস্ত বাঙালি। গণেশ সাফল্যের দেবতা— এই রূপটি অতএব তাঁর মতে বাঙালি মানসে বরাবরই সুবিদিত।

কিন্তু সে তো নিছকই ‘গুডলাক চার্ম’-এর ব্যাপার! তাঁকে ঘিরে এই বারোয়ারি আবেগের উত্তরণ কোন পথে? গণেশ এমনিতে শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের আরাধ্য। আমবাঙালির মন যে তেমন ব্যবসামুখী— তা তো জোর গলায় কেউই বলছেন না! শঙ্করের মতে, ‘‘এ সবই ভিন্‌  রাজ্যের সংস্কৃতির হাট খুলে যাওয়ার পরিণাম!’’ যে ভাবে নেড়া পোড়ার বদলে ‘হোলিকা দহন’, ভূতচতুর্দশীর বদলে ধনতেরাস, সেই সঙ্গে রামনবমী, হনুমান-জয়ন্তী, তেমন করেই গণেশ চতুর্থীর রমরমা বাড়ছে। শীর্ষেন্দুর ব্যাখ্যা, ‘‘পাড়ায় পাড়ায় আমুদে চ্যাঙাব্যাঙাদের জন্য
নিত্যনতুন উৎসবের উপকরণ চাই তো!’’ এ সব জল্পনার সূত্র ধরেই অনেকে মনে করাচ্ছেন, আসন্ন দুর্গাপুজোয় সদ্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোর জন্য ২৮ কোটি বরাদ্দের কথা। এ রাজ্যে পুজো এখন স্পষ্টতই রাজনীতির ভিত।

প্রাক্তন আইএএস-কর্তা জহর সরকারের মতে, ‘‘রাজনীতির এই শর্ত মেনেই নিত্য নতুন দেবতার আমদানি আবশ্যক।’’ তাঁর কথায়, ‘‘মরসুমি রোগবালাই ঠেকাতে শীতলা-জ্বরেশ্বরদের আবেদন নিতান্তই সীমিত। সেখানে গণপতির মহিমা সর্বভারতীয়। আর কলকাতার যে কোনও পুজোর পৃষ্ঠপোষক অবাংলাভাষী ব্যবসায়ীকুলের কাছেও গণেশ সুপরিচিত।’’

এই সব কারণই কয়েক বছর ধরে গণেশের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সুনিশ্চিত করছে। আজ, বুধবার থেকে শুরু গণেশপুজোর উদ্বোধন। উত্তর কলকাতায় শশী পাঁজা, সাধন পান্ডে থেকে দক্ষিণের অরূপ বিশ্বাস— শহরের মন্ত্রীদের কারওরই ব্যস্ততার অন্ত নেই। বারোয়ারি, বাড়ির পুজো মিলিয়ে কোনও কোনও এলাকায় মন্ত্রীর জন্য কয়েকশোরও বেশি নেমন্তন্ন। দুই বা দেড় দিনে কেউ ২০টা, কেউ ১৭-১৮টা করে মণ্ডপের ফিতে কাটবেন। জোড়াসাঁকোর তারাচাঁদ দত্ত লেনের ব্যবসায়ী বুবাই সজ্জন বিশ্বকর্মাকে ছেড়ে গণেশ-অনুগামী। তাঁর বিশ্বাস, গণেশপুজো শুরুর পরে ব্যবসায় মুনাফা বাড়ছে।

পরিবর্তনের এই পটভূমিতে আফশোস একটাই। দুর্গা, কালী, সরস্বতী মায় বিশ্বকর্মাকে অবধি বাঙালি নিজের কল্পনায় চেনা আদলে গড়েপিটে নিয়েছিল। ‘‘কিন্তু ভিন্‌ রাজ্যের আদলে গণেশবন্দনা যেন এক ছাঁচে-ঢালা হিন্দুত্ব বা হিন্দি-হিন্দুস্তানের বহিঃপ্রকাশ,’’ বলছেন জহরবাবু। আগমনীর সুরে এখন কদাচ শোনা যায় দিদিমা মেনকার আর্তি, ‘সুরেশ কুমার গণেশ আমার তাদের না দেখিলে ঝরে নয়নবারি, গিরি গণেশ আমার শুভকারী!’