‘আপনি ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখেন। সেক্স চ্যাটও করেন। আমাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে। এখনই ২২৫০ ডলার আমাদের অ্যাকাউন্টে ফেলুন। না হলে আপনার সেক্স চ্যাটের ভিডিয়ো ক্লিপ আপনার পরিচিতদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।’

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পরে নিজের ই-মেলের ইনবক্স খুলতেই এ রকম একটা মেল দেখে চমকে গিয়েছিলেন ঠাকুরপুকুরের বাসিন্দা অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় (নাম পরিবর্তিত)। নিজেকে রাসেল লেভেল বলে পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি অমিতাভকে মেল করে জানিয়েছে, তাঁর কম্পিউটার ও মেল অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করা হয়েছে। ওই ব্যক্তির দাবি, গত কয়েক মাস ধরে অমিতাভের সমস্ত অনলাইন কাজকর্মের খতিয়ান তারা জানে। তিনি যত পর্নোগ্রাফি দেখেছেন ও সেক্স চ্যাট করেছেন, তার ভিডিয়ো ক্লিপ দু’দিনের মধ্যেই ফাঁস করে দেওয়া হবে তার পরিচিতদের মধ্যে ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। এর থেকে বাঁচার একটাই উপায়। বিট কয়েনের মাধ্যমে ২২৫০ ডলার তাদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে।

রীতিমতো ব্ল্যাকমেল করে অভিনব এই পদ্ধতিতেই এ বার টাকা হাতানো শুরু করেছে সাইবার অপরাধীরা। তদন্তকারী অফিসারেরা জানাচ্ছেন, টাকা লুঠ করার নিত্যনতুন কৌশল বার করে ফেলছে এই জালিয়াতেরা। ব্ল্যাকমেল করে টাকা লুঠের এই নয়া কৌশল নিয়ে চিন্তিত লালবাজারের সাইবার অপরাধ দমন বিভাগের অফিসারেরা। এই ধরনের ই-মেল পেয়ে অনেকেই এসেছেন তাঁদের কাছে অভিযোগ জানাতে। কেউ কেউ আবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে আপস করেছেন ওই দুর্বৃত্তদের সঙ্গে।

ঠাকুরপুকুর এলাকার বাসিন্দা অমিতাভ ওই মেল দেখে প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও পরে সোজা চলে যান লালবাজারে, সাইবার অপরাধ বিভাগে অভিযোগ জানাতে। মধ্যবয়সী অমিতাভ একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। তাঁর স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা। অমিতাভ বলেন, ‘‘ওই ই-মেল পেয়ে প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। কোনও দিনই সেক্স চ্যাট করিনি। কিন্তু যারা মেল হ্যাক করতে পারে, তারা তো আমার নামে ভুয়ো সেক্স চ্যাটের ভিডিয়ো ক্লিপও তৈরি করতে পারে। সেটা ভেবেই খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ওই ভুয়ো ভিডিয়ো ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে আমার সামাজিক অবস্থান কী হবে, তা ভেবেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’’

লালবাজারের গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, রাসেল লেভেল নামের মেল অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ই-মেলটি এসেছে আমেরিকা থেকে। পরে অবশ্য দেখা যায়, ওই মেলের প্রক্সি সার্ভার দিল্লিতেও রয়েছে। তদন্তকারী অফিসারদের অনুমান, বিশ্ব জুড়ে এই নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ জাল বিছানো শুরু করেছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি দেখা ও সেক্স চ্যাট করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে আগের থেকে অনেক বেড়েছে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগাতে চাইছে সাইবার অপরাধীরা।

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিফোনে ডেবিট কার্ডের পিন অথবা কার্ডের নম্বর চেয়ে টাকা হাতানো বা ‘আপনার লক্ষাধিক টাকার লটারি লেগেছে’ বলে মেল করে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা লুঠ করার পদ্ধতি পুরনো হয়ে গিয়েছে। মানুষ সচেতন হয়ে ওঠায় ওই সমস্ত পদ্ধতি এখন প্রায় অচল। জালিয়াতেরা তাই নিত্যনতুন পদ্ধতিতে প্রতারণার উপায় বার করছে। তদন্তকারী অফিসারেরা জানান, এই ধরনের মেল পেলে ফাঁদে পা না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে থানায় অভিযোগ দায়ের করা উচিত। সেই সঙ্গে ই-মেল থেকে শুরু করে সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড নিয়মিত বদল করতে হবে। কম্পিউটারে অ্যান্টি-ভাইরাস বা ইন্টারনেট সিকিওরিটি সফ্‌টওয়্যার অবশ্যই লাগাতে হবে। তা ছাড়া, সন্দেহজনক ওয়েবসাইট না খোলারই পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।