এক দিকে ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংঘর্ষ অন্য দিকে চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিবাদে জারি থাকা ধর্মঘটে ‘উদ্বিগ্ন’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আজ জোড়া ‘অ্যাডভাইসরি’ পাঠাল পশ্চিমবঙ্গকে। দু’টি ক্ষেত্রেই রাজ্য প্রশাসন কী পদক্ষেপ করেছে, তা জানতে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে অমিত শাহের মন্ত্রক। দু’টির মধ্যে রাজনৈতিক হিংসা সংক্রান্ত ‘অ্যাডভাইসরি’-তে রাজ্য সরকারকে চাঁছাছোলা ভাষায় বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে যে ভাবে ক্রমাগত হিংসার ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে প্রবল উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, রাজ্যের শাসক শিবির আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে যে ব্যর্থ, নিরবচ্ছিন্ন হিংসার ঘটনাই তা প্রমাণ করে দিয়েছে।

এ নিয়ে আজ নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টিকে ‘রুটিন ব্যাপার’ বলে মন্তব্য করেন। তার পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এটা সব থেকে শান্ত রাজ্য। উত্তরপ্রদেশ-গুজরাতে অ্যাডভাইসরি পাঠাতে বলুন। যোগীর রাজ্য উত্তরপ্রদেশে কত এনকাউন্টার হয়েছে? গুজরাতে তো এফআইআর করতেই দেওয়া হয় না।’’ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যকে সব দিক দেখতে হয়। বিদেশনীতি, সীমান্ত সুরক্ষার মতো সীমিত কিছু বিষয় দেখে কেন্দ্র। কাজেই যে সমস্ত বিষয় কেন্দ্রের এক্তিয়ারে, তারা সেগুলো দেখুক।

সন্দেশখালিতে রাজনৈতিক হিংসায় মৃত্যুর জেরে গত রবিবার প্রথম পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অ্যাডভাইসরি পাঠিয়েছিল অমিতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ঠিক সাত দিনের মাথায় নবান্নকে আজ ফের দু’টি ‘অ্যাডভাইসরি’ পাঠানো হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে কোনও একটি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার ব্যর্থতার নজির তুলে এ ভাবে পরপর তিনটি ‘অ্যাডভাইসরি’ পাঠানো কার্যত নজিরবিহীন ঘটনা বলেই মনে করছেন বর্ষীয়ান স্বরাষ্ট্র কর্তারা। তাঁদের মতে, এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির উপরে কড়া নজর রয়েছে অমিত শাহের। এক স্বরাষ্ট্র কর্তার বক্তব্য, ‘‘গোটা দেশ ভোটের পরে শান্ত। ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। রাজনৈতিক সংঘর্ষ জারি রয়েছে। সঙ্গে দেখা দিয়েছে চিকিৎসা-সঙ্কট। সব মিলিয়ে স্পষ্ট, রাজ্য সরকার প্রশাসনের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে।’’

এরই মধ্যে গত সোমবার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে রাজ্যে নির্বাচনোত্তর হিংসা পরিস্থিতিতে ৩৫৬ ধারা জারি করার সম্ভাবনা ভাসিয়ে দিয়েছেন। রাজ্য সরকারের উপরে চাপ বৃদ্ধির প্রশ্নে দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে সরব রয়েছেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। এখনই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার কোনও সম্ভাবনা নেই বলে স্বরাষ্ট্র সূত্র দাবি করলেও, একটি বিষয় স্পষ্ট। ভবিষ্যতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নবান্নের উপরে চাপ আরও বাড়তে চলেছে।

নিগ্রহের প্রতিবাদে জুনিয়র চিকিৎসকদের ধর্মঘট ঘিরে গত পাঁচ দিন ধরে গোটা রাজ্য উত্তাল। স্তব্ধ সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা। এই পরিস্থিতিতে আজ দুপুরে পাঠানো প্রথম ‘অ্যাডভাইসরি’-তে এনআরএস কাণ্ডের প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার চিকিৎসকদের সুরক্ষার প্রশ্নে কী পদক্ষেপ করেছে, তা জানতে চেয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করে কেন্দ্র। রাজ্য সরকারকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, ‘গত কয়েক দিন ধরেই কলকাতার নিগ্রহের ঘটনার উল্লেখ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসকেরা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে নিরাপত্তার দাবিতে সরব হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসকদের ধর্মঘট ও তাঁদের দাবিদাওয়া সম্পর্কে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট রাজ্য সরকার যেন দিল্লিকে পাঠায়।’

স্বরাষ্ট্র সূত্র বলছে, চিকিৎসা সংক্রান্ত অ্যাডভাইসরিটি রুটিন পর্যায়ের হলেও, পরে রাজনৈতিক হিংসা সংক্রান্ত যে বার্তাটি নবান্নে পাঠানো হয়েছে তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে এত মানুষের প্রাণ গিয়েছে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। মন্ত্রকের কাছে জমা পড়া রিপোর্টের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে— ২০১৬ সালে রাজ্যে যেখানে ৫০৯টি রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩৫-এ। আর এ বছরের প্রথম ছ’মাসে রাজ্যে ৭৭৩টি হিংসার ঘটনা ঘটেছে। যা প্রমাণ করছে, হিংসার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে রাজ্যে। বেড়েছে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণহানিও। ২০১৬ সালে ৩৬ জন মারা যান পশ্চিমবঙ্গে। ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা পৌঁছেছিল ৯৬-তে। আর চলতি বছরে ইতিমধ্যেই সংখ্যাটি হয়েছে ২৬।

কেন্দ্রের মতে, পরিসংখ্যানেই রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার ছবিটি স্পষ্ট। তাতে যথেষ্ট চিন্তিত নয়াদিল্লি। হিংসা থামাতে পদক্ষেপ এবং যারা হিংসার সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতারের প্রশ্নে রাজ্য প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে অবিলম্বে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন অমিত শাহ।