সভাগৃহে তখন সরকারি প্রকল্পে বাড়ি পাওয়ার উপভোক্তাদের ভিড়। সামনে বসে স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তিনি জানতে চাইলেন, ‘‘বাড়ি পেতে কাউকে কাটমানি দিতে হয়েছে?’’ 

রবিবার সকালে এমনই দৃশ্য দেখা গেল হাবড়া শহরে জয়গাছি সুপার মার্কেট এলাকায়। গত কয়েকদিন ধরেই খাদ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কাটমানির প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন। গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ভয় পাবেন না, নির্ভয়ে সব খুলে বলুন। আপনারা যে সরকারি প্রকল্পে বাড়ি পেয়েছেন, তার জন্য কাউকে টাকা, কাটমানি দিতে হয়েছে কি?  অন্য কোনও সমস্যাতে কি পড়তে হয়েছে?’’ 

মন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কয়েকজন মন্ত্রীকে জানান, ঠিকাদার দিয়ে বাড়ি তৈরি করতে প্রভাবিত করা হয়েছিল। নিম্নমানের মালপত্র দিয়েও বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। নিয়ম মেনেও বাড়ি তৈরি করা হয়নি বলে অনেকের অভিযোগ। 

রবিবার সকালে জ্যোতিপ্রিয় বসেছিলেন পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জয়গাছি এলাকায় মানুষের সঙ্গে। ওই ওয়ার্ডের ৭ জন বাসিন্দা মন্ত্রীর কাছে এক ঠিকাদারের নামে অভিযোগ করেন। অভিযোগ শুনে মন্ত্রী ওই ঠিকাদারের নাম ঠিকানা জানতে চান। তাঁকে মঙ্গলবার পুরসভায় এসে দেখা করতে বলা হয়।

জ্যোতিপ্রিয় বলেন, ‘‘নিম্নমানের মালপত্র দিয়ে বাড়ি তৈরি করা হলে ওই ঠিকাদারকে আবার বাড়ি তৈরি করে দিতে হবে। তা না করা হলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’’     

কয়েকজন মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, পুরসভার কর্মীদের কয়েতজন তাঁদের নির্দিষ্ট দোকান থেকে ইমারতি মালপত্র কিনতে বাধ্য করেছেন। ওই দোকান থেকে মালপত্র কেনা না হলে, বাড়ি তৈরির কিস্তির টাকা আটকে দেওয়া হবে বলেও ভয় দেখানো হয়েছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা পরে জানান, শাসকদলের প্রাক্তন দুই পুরপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রীর সামনে এ বিষয়ে কেউ মুখ খোলেননি। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে,  ২০১৫-১৬ আর্থিক বর্ষ থেকে হাবড়ার ‘হাউজ ফর অল’ প্রকল্পে গরিব মানুষদের বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ১২৫০টি বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। ৫ হাজার ২৭৩টি বাড়ি তৈরির কাজ চলছে। হাউজ ফর অল প্রকল্পে সরকারি বাড়ি তৈরির জন্য একজন উপভোক্তাকে পাঁচ কিস্তিতে ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্র সরকার দেয়, ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। রাজ্য সরকার দেয়, ১ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা। উপভোক্তাকে দিতে হয় ২৫ হাজার টাকা। তা ছাড়া এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য রাজ্য ও পুরসভা আরও ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা বাড়ি পিছু ব্যয় করে থাকে।   

 জ্যেতিপ্রিয় বলেন, ‘‘হাবড়ার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় সাত হাজার বাড়ির মধ্যে ২০০টি বাড়ি নিয়ে কিছু অভিযোগ রয়েছে। তবে তৃণমূলের কেউ বাড়ি তৈরির জন্য কাটমানি নেননি। পুরসভার একাংশের কর্মীরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পেয়েছি। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ করা হবে। কাউকে ছাড়া হবে না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সকলকে বলে দেওয়া হয়েছে বাড়ি তৈরির জন্য কাউকে এক পয়সা দেবেন না। নিজের বাড়ি, নিজেরা করবেন।’’ প্রাক্তন পুরপ্রধান নীলিমেশ দাস বলেন, ‘‘সরকারি প্রকল্পে যাঁরা বাড়ি পেয়েছেন, সকলকে বলা হয়েছে কোনও ঠিকাদারকে দিয়ে বাড়ি তৈরি করাবেন না। ইমারতি মালপত্র নিজেদের ইচ্ছে মতো কিনবেন।’’ সিপিএমের হাবড়া শহর এরিয়া কমিটির সম্পাদক আশুতোষ রায়চৌধুরী অবশ্য বলেন, ‘‘এমন বহু মানুষ রয়েছেন যাঁরা বাড়ি পাওয়ার কথা নয়। তাঁরাও এই প্রকল্পে বাড়ি পেয়েছেন। বাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কাউন্সিলরদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কাটমানি নেওয়া হয়েছে।’’ বিজেপি নেতা বিপ্লব হালদার বলেন, ‘‘বাড়ি তৈরির কাটমানি নেওয়ার কথা শোনা যায়। তবে কেউ অভিযোগ করেন না। পাছে যদি বাড়ি তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।’’

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।