‘কাল কী হবে, আজ বলতে পারি না’
ছবি নয়, মেটিয়াবুরুজের শুরুওয়াত। আয়োধের শেষ বাদশাহ ওয়াজেদ আলি শাহের এলাকা এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চোখে ‘মিনি পাকিস্তান’।
mohammad kasem

মেটিয়াবুরুজের সুরিনাম ঘাটে মহম্মদ কাসিম। নিজস্ব চিত্র

এবড়োখেবড়ো সময়টা এখনও টান টান মনে আছে ভদ্রলোকের। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর। হাওয়ায় হাওয়ায় দাঙ্গার আগুন। আক্রমণ, প্রতি আক্রমণের গুজব। একই সঙ্গে বাতাসে উড়ছিল আর একটা খবর। আজানের সুরের মতোই তা পৌঁছে যাচ্ছিল মহল্লায় মহল্লায়। ‘প্রতিবেশীকে বাঁচাতে হবে।’ ভাঙতে থাকা সুরিনাম ঘাটে পড়ন্ত রোদে উসকো খুসকো আলো-ছায়া মুখে মেখে দু’দশক পিছনে ফিরলেন সত্তর পেরনো মহম্মদ কাসিম। 

খিদিরপুর থেকে কার্ল মার্কসের নামাঙ্কিত রাস্তা যত ডকের দিকে এগোচ্ছে, বদলে যাচ্ছে আশপাশের চেহারা। ষোলো চাকা, কুড়ি চাকার লরি যত্রতত্র ছিটিয়ে। পশ্চিমে ট্রামের টিকির মতো জাহাজ মাস্তুল আর ক্রেন আকাশমুখী। জাহাজ কারখানা। আর রাস্তার অন্য দিকে সারি সারি বিশাল বিশাল মালবাহী সমুদ্রাগত কন্টেনার একে অন্যের ঘাড়ে। জনমানবহীন এ সব অঞ্চলই তো বাংলা ছবির ভিলেনদের দুষ্কর্মের ঘাঁটি! 

ছবি নয়, মেটিয়াবুরুজের শুরুওয়াত। আয়োধের শেষ বাদশাহ ওয়াজেদ আলি শাহের এলাকা এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চোখে ‘মিনি পাকিস্তান’। তাদের মুখে মুখে ফেরে এ অঞ্চলের অপরাধপ্রবণতার গল্প। শুধু হিন্দুত্ববাদী নয়, আম-বাঙালির চোখেও মেটিয়াবুরুজ নামে দ্বিধা খেলে যায়। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সেই হেন মেটিয়াবুরুজের সুরিনাম ঘাটে আড্ডা হচ্ছিল কাসিম সাহেবের সঙ্গে। গড়গড়িয়ে ঘাটের গল্প বলছিলেন তিনি। ইংরেজ আমলে এ ঘাটে জাহাজ লাগত। সারা দেশ থেকে কয়েকশো শ্রমিক ধরে এনে বিলিতি সওদাগরের দল এই ঘাট থেকেই তাঁদের জাহাজে তুলে পাচার করে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার সুরিনামে। মানুষগুলো ফিরে আসেননি। মুখে মুখে থেকে গিয়েছে স্মৃতি। আর তারই জেরে ঘাটের নাম ‘সুরিনাম’। কয়েক বছর আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এসে ইতিহাস লেখা ফলকও উদ্বোধন করে গিয়েছেন। ঘাটের কথা গড়াতে থাকে। শক্ত চোয়ালে কাসিম ঢোকেন সম্প্রদায়ের গল্পে। ‘‘রাতের পর রাত জেগে প্রতিবেশী হিন্দু বাড়ি পাহারা দিতাম। যে গুন্ডারা ধর্মের নামে হামলা করতে আসত, তাদের বলতাম, ওদের গায়ে হাত দিতে হলে আমাদের মৃতদেহ টপকাতে হবে। হিন্দু বোনেরা তখন আমাদের শেল্টারে। তবু দোকান লুঠ আটকাতে পারিনি। বাড়িও জ্বলেছে দু’একটা। কিন্তু জান নিতে দিইনি।’’ 

‘‘জানে তো কোনও তফাত নেই! হিন্দু-মুসলিমের রক্তে কোনও তফাত আছে?’’ আড্ডা ফিরল ঘাটের আর এক কোণে। বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়েছেন বাঙালি বস্তির ব্যবসায়ী মুর্তুজা আলম। তাঁর প্রতিবেশীর নাম মেওয়ালাল। মুর্তুজা এবং মেওয়ালাল— দু’জনের পরিবারই কয়েক জন্ম আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে মেটিয়াবুরুজের ঘাটে এসে লেগেছিল জাহাজের কাজে। সেই থেকে তাঁরা ‘কলকাত্তাইয়া’। কিছু দিন আগে মেওয়ালালের দাদা দুখীরাম যখন উত্তরপ্রদেশে মারা গেলেন, মুর্তুজার স্ত্রী মেওয়াকে নিয়ে গিয়েছিলেন দেশের বাড়িতে। কেউ কাউকে সন্দেহ করেননি। ‘‘করার কারণও নেই! পাশাপাশি থাকতে থাকতে আমদের সম্পর্ক তো এখন দাদা-ভাইয়ের! ওদের ভালয় আমাদের ভাল। ওদের কষ্ট আমাদেরও।’’ হাঁটা লাগালেন মুর্তুজা। ঘাট ছাড়ার আগে কাসিম সাহেব শেষ এবং অমোঘ আশঙ্কাটা কানে দিয়ে গেলেন— ‘‘বিরানব্বই দেখেছি। ষাটের দশকের দাঙ্গাও দেখেছি। তখন বিশ্বাস করতাম মেটিয়াবুরুজের নবাবি সহবত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুর টলাতে পারবে না। আজও পারছে না। তবে কাল কী হবে জানি না। মানুষের চোখে মুখে বিশ্বাসগুলো নড়বড় করছে।’’

ওয়াজেদ আলি বিশ্বাস করতেন গঙ্গার একটাই ঘাট। হিন্দু-মুসলিম সেখানে এক সঙ্গে চান করবে। বিলিতি সাহেবদের চোখে সাজানো গোছানো যে নবাবি মেটিয়াবুরুজের বর্ণনা, তা কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, অন্তরের মেলবন্ধনও। নবাব দোলযাত্রা করতেন। কৃষ্ণ ভাবে মজতেন। আবার আল্লার নাম গেঁথে দিতেন শায়েরিতে।

সেই নবাব যখন লখনউ ছেড়ে কলকাতায় এলেন, সঙ্গী হল বিরিয়ানি আর অয়োধি পান। লখনউয়ের পান বিক্রেতা নরোত্তম সাইনি বাড়ি বানালেন মেটিয়াবুরুজে। নরোত্তমের নাতি ষাট ছুঁই ছুঁই রমেশ কুমার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাণিজ্যশাস্ত্রে স্নাতক। বসেন দাদুর তৈরি দোকানে। নবাবি পানের পরম্পরা ধরে রেখেছেন। গোধূলি বিকেলে আজানের সুর মিশছে বাস-অটোর হর্নের ক্যাকোফনিতে। চোখে চোখ রাখলেন রমেশ, ‘‘আমি কৃষ্ণভক্ত। আমার বাড়ির পুজো সম্পূর্ণ হয় না মুসলিম প্রতিবেশীরা খেয়ে না গেলে। ওদের ইদ সম্পূর্ণ হয় না, আমার পরিবার অংশ না নিলে। মেটিয়াবুরুজকে যারা ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে, তাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি নবাবি মহল্লায়। সংস্কৃতি শিখে যান এসে।’’

১৪ বছর আগে মেটিয়াবুরুজে এসে এই শিক্ষাই পেয়েছিলেন একদা ফৌজি, অধুনা পোর্ট ট্রাস্টের নিরাপত্তারক্ষী নারায়ণচন্দ্র দাস। সুরিনাম ঘাটের এক কোণে এক ঘরের চৌকি। সেখানেই রান্নাবান্না, সেখান থেকেই নজরদারি। হুগলিনিবাসী নারায়ণ এক সময় কাশ্মীরের সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন। কিন্তু বাড়িতে যখন বললেন মেটিয়াবুরুজে ডিউটি, ভয় পেয়েছিলেন সকলে— ‘মিনি পাকিস্তান’! গত ১৪ বছরে একটিও সাম্প্রদায়িক হানাহানি দেখেননি নারায়ণবাবু। তাঁর মতে, ‘‘এখানে গন্ডগোল যা হয়, তা ডকের গুন্ডাগিরি। তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও যোগ নেই।’’

নবাবের আমলে তৈরি দুই ইমামবাড়া বাঁচিয়ে রেখেছেন আরশাদ হুসেন আর সৈয়দ ওয়াসিফ হুসেন। ওয়াসিফের কথায়, ‘‘শুধু হিন্দু-মুসলিম নয়, সিয়া-সুন্নি সম্পর্কের কথাও লিখবেন। গোটা পৃথিবীতে যখন দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ, আমাদের ইমামবাড়া তখন সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছে। আর ইমামবাড়ার নিয়মিত দর্শনার্থীদের তালিকায় এক নম্বরে একটি পঞ্জাবি পরিবার।’’ ওয়াসিফের মতে, মেটিয়াবুরুজ নিয়ে যাঁরা ‘অপপ্রচার’ করেন, তাঁরা এই জায়গাগুলোয় কোনও দিন আসেননি। ওঁদের মানসিকতাতেই ‘বিদ্বেষ’।

আড্ডা ভাঙল মাইকের কান ফাটানো আওয়াজে। প্রচারে বেরিয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী। হাতে ফুল নিয়ে দৌড়ে গেলেন ওয়াসিফ। ‘‘আপনি কি তৃণমূলপন্থী?’’ পেশাদার সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ওয়াসিফের সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘‘এ রাস্তায় যাঁরাই প্রচারে আসেন, তাঁদেরই ফুল দিই। এটাই নবাবি আদব।’’

লম্বা মিছিলের মাঝে হুডখোলা গাড়িতে সামনে হিন্দু প্রার্থী, পিছনে মুসলিম নেতা। ঝটকায় মন ফিরল বিকেলে কাসিম সাহেবের সঙ্গে ঘাটের আড্ডায়। ‘‘মানুষের চোখেমুখে বিশ্বাসগুলো নড়বড় করছে। মুসলিম অধ্যুষিত মেটিয়াবুরুজে পুরসভা কিংবা বিধানসভা নির্বাচনে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই মুসলিম প্রার্থী দেয়। কিন্তু লোকসভার হিন্দু প্রার্থীরা এ অঞ্চলে একা আসেন না। সঙ্গে মুসলিম নেতা নিয়ে আসেন। সব দলের রাজনীতিই মানুষের মনের গোড়ায় অবিশ্বাসের বিষ ঢালছে জনাব। কাল কী হবে আজ আর বলতে পারি না।’’                           

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত