দুপুরেই তাঁকে ডেকে ধমক দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দমকল এবং আবাসন মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। নবান্ন সূত্রে খবর, মন্ত্রী শোভনের ইস্তফা গৃহীত হয়েছে। এর পরেই তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজভবনে।

পরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, যে দু’টি দফতর থেকে শোভন ইস্তফা দিয়েছেন তা আপাতত সামলাবেন পুর ও নগরোয়ন্নন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। পাশাপাশি, শোভনকে মেয়র পদ থেকেও পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। মমতা জানিয়েছেন, আপাতত পুর কমিশনার খলিল আহমেদ পুরসভার দায়িত্ব সামলাবেন। 

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার বিধানসভায়। আবাসন দফতরের প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতে এদিন সকালেই বিধানসভায় হাজির হন শোভন। ততক্ষণে বিধানসভায় পৌঁছে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্নোত্তরের আগে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি হন আবাসনমন্ত্রী। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী তাঁর কাছে জানতে চান, শোভন উত্তরসহ ঠিকঠাক তৈরি হয়ে এসেছেন কি না। সাধারণ কিছু কথাবার্তার পরে দু’জনেই অধিবেশনকক্ষে চলে যান। সরকারি আবাসন প্রকল্পের কাজ নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন বাম বিধায়ক সমর হাজরা। তারই জবাবের প্রসঙ্গে শোভন বলেন, ‘‘সামগ্রিক পরিকল্পনা রূপায়ণে রাজ্যে ২৫ লক্ষ বাড়ি অনুমোদন করে কাজ চলছে।’’ তার এই জবাবের পরই কয়েক সারি পিছনে বসে থাকা মুখ্যমন্ত্রী কিছুটা বিরক্তি দেখিয়েই উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘এই তথ্য ঠিক নয়। ২৫ লক্ষ বাড়ি তৈরি করা হয়ে গিয়েছে। সরকার অনুমোদন করেছে ৪০ লক্ষ বাড়ি।’’ এই ঘটনার সময়ই শাসক শিবিরে চূড়ান্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, প্রথমার্ধের অধিবেশন শেষ হলে শোভন কিছু বলতে মুখ্যমন্ত্রীর আসনের কাছে যান। কিন্তু তাঁকে হাত দেখিয়ে উঠে যান মমতা। তারপর বেরনোর আগে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সামান্য কিছু কথা হয় শোভনের।

যাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক, সেই বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শোভন চট্টোপাধ্যায়। 

আরও পড়ুন: কাজ ফেলে বৈশাখীর সঙ্গে শপিং? ক্যাবিনেট বৈঠক শেষে প্রশ্ন মমতার, বাদানুবাদে জড়ালেন শোভন

দুপুরে অধিবেশন শেষে স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে শোভন চট্টোপাধ্যায়কে ডেকে তাঁর কাজ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন মমতা। কাজ ফেলে মেয়র শাড়ি-চুড়ির দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ইঙ্গিত যে তাঁর বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে, তা বুঝতে পেরে এ দিন কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করেছেন শোভন। তৃণমূল সূত্রে খবর, এর পরেই মমতা তাঁকে দল বা বৈশাখীর মধ্যে কোনও এক দিক বেছে নিতে বলেন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ সচিব গৌতম সান্যালের হাতে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে আসেন শোভন। পরে শোভন তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে বলেন, ‘‘এ ভাবে অপমানিত হয়ে আর কাজ করা যাচ্ছিল না।’’

তখনও ছিল মমতার আশীর্বাদ। কালীঘাটে মমতার বাড়িতে সাড়ে তিন বছর আগের এই ছবি এখন অতীত। 

আরও পড়ুন: আগামী নির্বাচনে লড়বেন না, জানিয়ে দিলেন সুষমা স্বরাজ

এর আগেও বৈশাখীকে নিয়ে শোভনকে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন মমতা। ধমকেওছেন তিনি। তবে, শোভনকে কখনও তেমন ভাবে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি বলেই তৃণমূল সূত্রে খবর। ‘দিদি’র ধমকের প্রেক্ষিতে কখনও কখনও তিনি নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন। কিন্তু, এ দিন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে শোভনের কথায় কিছুটা উষ্মা দেখে রীতিমতো বিরক্তি প্রকাশ করেছেন দলনেত্রী। ‘‘আমার মাথা গরম করে দিস না,’’ এই মন্তব্য করতেও শোনা যায় মমতাকে।

আরও পডু়ন: সচিবালয়ের মধ্যেই কেজরীবালের চোখে লঙ্কার গুঁড়ো! গ্রেফতার আক্রমণকারী

ইঙ্গিত কার দিকে তা বুঝতে পেরে এর পরেই বিরক্তি প্রকাশ করেন শোভন। মেয়রের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্র জানিয়েছে, শোভন দলনেত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি বৈশাখীকে শাড়ি কিনে দেওয়ার কথা বলছেন কি না?একই সঙ্গে দলনেত্রীকে তিনি বলেন, তাঁর কাছ থেকে শাড়ি নেওয়ার প্রয়োজন বৈশাখীর পড়ে না। দলনেত্রী তখন শোভনকে জানান, তাঁর কাছে সব খবর আছে।আছে ছবিও। শোভনের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে দাবি, মেয়র তখন ক্ষোভের সঙ্গে দলনেত্রীকে জানান, তিনি বুঝতে পারছেন দলে তাঁর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাঁর উপর নজরদারিও চলছে। কোনও নজরদারির মধ্যে যে তিনি থাকতে চান না তা জানিয়ে মমতাকে মেয়র জানান, প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে মনে করলে বা তাঁকে না চাইলে সেটা যেন দলনেত্রী বলে দেন। তাহলে তিনি সব পদ ছেড়ে দেবেন। এর পরেই শোভন বিধানসভা ছেড়ে পুরসভায় চলে যান। তার আগেই যদিও স্পিকারের ঘর থেকে বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে মমতাকে।

পরে নবান্নে দমকল দফতরের একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শোভনও ছিলেন। সেই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কিছু ক্ষণ পরেই শোভন চট্টোপাধ্যায় তাঁর পদত্যাগপত্র দিয়ে আসেন গৌতম সান্যালের কাছে। দলীয় সূত্রে খবর, সেখানে শোভন লিখেছেন, ‘‘মন্ত্রিত্ব এবং মেয়রের পদ ছাড়তে আমি বাধ্য হলাম।’’ এদিন নবান্ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘শোভন পদত্যাগ করেছে। আগেও কয়েকবার দিয়েছিলেন। ভেবেছিলাম শুধরে যাবে। এদিন আবার করেছে। বিধানসভা চলছে। কাল ছুটি। পরশু খুলবে। মেয়র পদও ছাড়তে বলা হয়েছে।’’ নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত কমিশনারই কাজ দেখে নেবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘‘কলকাতার মানুষ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। উনি এত দিন ছিলেন কেন? কার দয়ায় ছিলেন? ওঁরও কষ্ট হচ্ছিল, মানুষেরও কষ্ট হচ্ছিল।’’ এই ঘটনায় বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘‘বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন এই ঘটনা ঘটেছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর আচমকা পদত্যাগের কারণ বিধানসভার জানার অধিকার আছে।’’ বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীর বলেন, ‘‘নারদ-কাণ্ড থেকে শুরু করে নানা বাবে তিনি পদের মর্যাদা খুইয়েছিলেন। তারপরেও পদে ছিলেন। এভাবেই যদু বংশ ধ্বংস হবে ।’’

(বাংলার রাজনীতি, বাংলার শিক্ষা, বাংলার অর্থনীতি, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার স্বাস্থ্য, বাংলার আবহাওয়া -পশ্চিমবঙ্গের সব টাটকা খবর আমাদের রাজ্য বিভাগে।)