বয়ান দিয়েছেন অন্তত ৫০ জন সাক্ষী। বর্তমান ও প্রাক্তন মিলিয়ে রাজ্যের বেশ কয়েক জন মন্ত্রীর নাম থাকছে অভিযুক্তের তালিকায়। সেই সব বয়ান ও নাম-সহ নারদ-কাণ্ডে চার্জশিট বা চূড়ান্ত রিপোর্ট দিতে চলেছে সিবিআই।

নারদ-কাণ্ডে রাজ্যের ১৩ জন প্রভাবশালী মন্ত্রী, নেতা, পুলিশকর্তার নামে সরাসরি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। স্টিং অপারেশনের ভিডিয়ো ফুটেজে ছদ্মবেশী সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েলের কাছ থেকে টাকা লেনদেনের ঘটনার সত্যতা মিলেছে বলে দাবি করেছে সিবিআই। এক সিবিআই-কর্তা জানান, চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করার জন্য তাঁদের সদর দফতরের সবুজ সঙ্কেত পাওয়া গিয়েছে। কিছু আইনগত বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহেই চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হতে পারে।

সিবিআই সূত্রের খবর, অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন প্রাক্তন তৃণমূল, বর্তমানে বিজেপি নেতা মুকুল রায়। তাঁর নামও থাকবে চার্জশিটে। যে-পুলিশকর্তা (বর্ধমানের তৎকালীন পুলিশ সুপার এসএমএস মির্জা) টাকা নেওয়ার সময় মুকুলের নাম করেছিলেন, চার্জশিটে তাঁর নামও থাকছে। তা ছাড়াও থাকছে তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার, শুভেন্দু অধিকারী, সৌগত রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অপরূপা পোদ্দারের নাম। তালিকায় রয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র, শোভন চট্টোপাধ্যায়, বর্তমান মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম এবং ডেপুটি মেয়র ইকবাল আহমেদ। ইকবালের দাদা, তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল। তিনি মারা গিয়েছেন। তাই চার্জশিটে অভিযুক্তের তালিকায় তাঁর নাম থাকছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা।

আরও পড়ুন: রাজ্যের এক নেতার ৩৪৫ কোটির তদন্তে আয়কর দফতর​

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে কলকাতায় আসেন ম্যাথু। এ রাজ্যে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক বলে জানিয়ে প্রভাবশালী কয়েক জনের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় নির্বাচনের আগে তাঁদের হাতে টাকা তুলে দেন এবং সেই লেনদেনের ছবি লুকিয়ে তুলে নেন মোবাইলের ক্যামেরায়। ২০১৬ সালে নারদ স্টিং অপারেশনের সেই ভিডিয়ো ফুটেজ সম্প্রচার করা হয়। সেই অভিযোগ নিয়ে জনস্বার্থ মামলা হয় কলকাতা হাইকোর্টে। ভিডিয়ো ফুটেজের ফরেন্সিক রিপোর্ট পাওয়ার পরেই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

সিবিআইয়ের দাবি, ম্যাথুর কাছ থেকে নির্বাচনী তহবিলে ওই টাকা নেওয়ার কথা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ ও পুলিশকর্তারা। বছর দুয়েক পরে সেই টাকার বিষয়টি উল্লেখ করে আয়করও দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন কয়েক জন নেতা। যেখানে ছদ্মবেশী ম্যাথুর কাছ থেকে তাঁদের টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে নতুন করে ভিডিয়ো তৈরি করে তার সঙ্গে ম্যাথুর ভিডিয়ো 

ফুটেজ মিলিয়ে দেখা হয়েছে। শুধু মুকুল ও মির্জার বাড়িতে লেনদেনের ঘটনার পুনরভিনয়ের বন্দোবস্ত করা যায়নি। এই বিষয়ে সাংসদ ও পুলিশকর্তার বক্তব্য চূড়ান্ত রিপোর্টে রাখা হয়েছে। 

অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ তো করা হয়েছেই। ম্যাথুর সঙ্গে টাকা লেনদেনের সময় উপস্থিত নেতা-মন্ত্রীর পার্শ্বচরদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সব মিলিয়ে ৫০ জন সাক্ষীর বয়ান নেওয়া হয়েছে বলে সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে। ম্যাথু তিনটি আইফোনের মাধ্যমে নারদ-কাণ্ডে টাকা লেনদেনের ভিডিয়ো তুলেছিলেন। ‘অ্যাপল’ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই মোবাইলের বিষয়ে লিখিত নথি নেওয়া হয়েছে।

শোভন-ঘনিষ্ঠ দম্পতিকে জেরা

নারদ কাণ্ডে প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ী দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। দিলীপ ও ঝুমা সাহা নামে ওই দম্পতিকে শুক্রবার সকালে থেকে দুপুর পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একটি সর্বভারতীয় তালা কোম্পানির ডিস্টিট্রিবিউটরের ব্যবসা রয়েছে তাঁদের। ওই দম্পতির আয়কর এবং সম্পত্তির নথিপত্রও সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ব্যবসা ও সম্পত্তির আরও নথি জমা দিতে বলা হয়েছে তাঁদের। নারদ-কাণ্ডে সম্প্রতি শোভনবাবু এবং তাঁর বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই সূত্রেই ওই দম্পতিকে ডেকেছিল ইডি।