• পরমা দাশগুপ্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

স্কুলবাসের অন্দরমহল সরাসরি দেখাবে ক্যামেরা

school bus

স্কুলবাসে ঠিক এই মূহূর্তে কী করছে আপনার ছেলে বা মেয়ে? স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় সেটাই যদি দেখে নেওয়া যায় যখন খুশি?

স্কুলবাসে একা পেয়ে যৌন হেনস্থা, রেষারেষি বা দুর্ঘটনায় স্কুলবাসে বসে থাকা পড়ুয়ার আঘাত পাওয়া, অবরোধ-বিক্ষোভে আটকে পড়ে বাড়ি ফিরতে দেরি কিংবা বাসেই অসুস্থ হয়ে পড়া— সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দেওয়ার পর থেকে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার কারণ নেহাত কম নয়। সেই উদ্বেগে খানিকটা রাশ টানতেই এ বার স্কুলবাস থেকে ভিডিও রেকর্ডিং সরাসরি স্কুল ও অভিভাবকদের হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে চায় সুরক্ষার এক নতুন ব্যবস্থা।

বেসরকারি সংস্থা ‘স্কোর ইনফরমেশন টেকনলজিস লিমিটেড’-এর তৈরি স্কুলবাসে নজরদারির এই নতুন ব্যবস্থা ‘ফলোদ্যবাস ডটকম’-এ অন্তত ৩-৪টি ক্যামেরা ড্রাইভারের কেবিন-সহ স্কুলবাসের সর্বত্র সর্বক্ষণ ভিডিও রেকর্ডিং চালু রাখবে। ৩জি প্রযুক্তির সাহায্যে লাইভ স্ট্রিমিং-এর মাধ্যমে সেই ফুটেজ সরাসরি দেখা যাবে স্কুলের কন্ট্রোলরুমে। দেখা যাবে ওয়েবসাইটেও। ফলে স্কুলবাসের পরিস্থিতি, ড্রাইভার-অ্যাটেন্ড্যান্ট এবং পড়ুয়াদের গতিবিধি সর্বক্ষণই নজরে রাখতে পারবে স্কুল। চাইলে স্মার্টফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে বা ওয়েবসাইটে ঢুকে সেই ফুটেজ লাইভ দেখতে পাবেন অভিভাবকেরা। জিপিএস প্রযুক্তিতে জানা যাবে বাসের অবস্থানও। এ ছাড়াও বিপদে পড়লে বাসে থাকা প্যানিক-বোতাম টিপে সরাসরি কন্ট্রোলরুমকে খবর দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে মাইকে তাঁদের সঙ্গে কথাও বলতে পারবেন চালক। সংস্থার দাবি, স্কুল ও অভিভাবকদের চাহিদা মাফিক গোটা ব্যবস্থাটাকে সাজিয়ে নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে পড়ুয়া কখন স্কুলবাসে উঠল বা নামল, স্মার্টকার্ডের মতো প্রযুক্তিতে সেই তথ্য রেকর্ড করে অভিভাবককে জানানোর ব্যবস্থাও হতে পারে।

সংস্থার তরফে যোগেশ কঙ্করিয়া জানান, এর জন্য পড়ুয়া পিছু খরচও তেমন বেশি নয়, সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘‘রাস্তায় বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে তা জেনে ব্যবস্থা নিতে পারবেন স্কুল কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকেরা। ক্যামেরার নজরদারি থাকলে অপরাধ-প্রবণতাও কমবে, পড়ুয়ারাও বকুনি খাওয়ার ভয়ে বড়সড় দুষ্টুমি বা হাতাহাতিতে জড়াবে না।’’ নয়া এই ব্যবস্থায় এক মাসের ফুটেজ সংরক্ষিত হবে, কোনও কারণে এই ব্যবস্থা বিকল হলে মিলবে আগের ফুটেজও। প্রয়োজনে বিশেষ সময়ের ফুটেজ মুছে যাওয়া আটকানোর সুযোগও থাকছে। ফলে কোনও ঘটনায় বিষয়বস্তু জানতে বা অপরাধী চিহ্নিতকরণে এই ব্যবস্থা সাহায্য করবে। তবে যোগেশদের দাবি, নয়া এই ব্যবস্থায় সাফল্য তখনই মিলবে, যখন সরকার এটিকে বাধ্যতামূলক করবে। 

সুরক্ষার নয়া এই ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, তা নিয়ে সঠিক কিছু জানা না-গেলেও একে স্বাগত জানাচ্ছেন পুলিশ এবং পরিবহণ কর্তারা। কলকাতা পুলিশের ডিসি (ট্রাফিক) ভি সলোমন নেসাকুমার বলেন, ‘‘এ ধরনের ব্যবস্থা সত্যিই উপকারে লাগবে। ভিডিও ফুটেজ দেখে পড়ুয়ারা সুরক্ষিত আছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরাধ করার প্রবণতাও কমবে।’’ এক পরিবহণ কর্তাও বলেন, ‘‘বিষয়টা সত্যিই ভাল। কেউ নিজেদের বাস বা স্কুলগাড়িতে ক্যামেরার নজরদারি রাখতেই পারেন। কিন্তু বাধ্যতামূলক করতে গেলে পরিবহণ আইন বদলাতে হবে। সেটা সময়সাপেক্ষ।’’

সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই কলকাতার কিছু স্কুল আগ্রহ দেখিয়েছে। একটি স্কুল পরীক্ষামূলক ভাবে কিছু বাসে এই ব্যবস্থা চালুও করেছে কিছু বাসে। সেই স্কুলের এক প্রশাসনিক কর্তা জানান, ভিডিও-র ছবি এবং শব্দের মান মোটের উপরে সন্তোষজনক। তাঁরা ১৮টি বাসে পরীক্ষামূলক ভাবে এই নজরদারি শুরু করেছেন। সফল হলে তবেই পাকাপাকি ভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

নয়া নজরদারিতে আগ্রহী স্কুলবাস অপারেটর্স সংস্থাগুলিও। শহরের বহু স্কুলে বাস সরবরাহকারী সংস্থা ‘সিটি সার্ভিসেস’-এর ডিরেক্টর অনুরাগ অগ্রবাল বলেন, ‘‘কিছু স্কুলবাসে আমরা এই ব্যবস্থা চালু করতে চলেছি। আশা করছি খুব শীঘ্রই বাকি স্কুলগুলিও একই পথে হাঁটবে। কলকাতা ও শহরতলির বহু স্কুলে বাস রয়েছে ‘ওয়েস্টবেঙ্গল কন্ট্র্যাক্ট ক্যারেজ ওনার্স অ্যান্ড অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর। তার নেতা হিমাদ্রী গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আগামী ১৪ এপ্রিল সংগঠনের বৈঠকে আলোচনা করব। তবে বাধ্যতামূলক করার আগে স্কুলগুলি আর্থিক ভাবে সমর্থ কি না, তা-ও দেখতে হবে।’’

আর যাঁদের কথা ভেবে মূলত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভাবনা, কী বলছেন সেই অভিভাবকেরা? ক্লাস থ্রি-র এক পড়ুয়ার মা উৎসা সাহা বলেন, ‘‘মেয়ে বাড়ি না ফেরা অবধি অফিসে বসে স্বস্তি পাই না। চার দিকে যা সব ঘটে আজকাল! সর্বক্ষণের এই ভিডিও দেখতে পেলে অনেক নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।’’ পেশায় ইঞ্জিনিয়ার জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের ছেলের বয়স চার। ‘‘যানজট, অবরোধ-বিক্ষোভ লেগেই থাকে। ফিরতে দেরি হলে লাইভ ভিডিওয় অন্তত কোথায় আছে তো জানা যাবে’’, বলছেন তিনি।

এ শহরের স্কুলপড়ুয়াদের একটা বড় অংশ এখনও যাতায়াত করে স্কুলগাড়িতে (পুলকারে)। অভিভাবকদের ঠিক করা সে সব গাড়ির দায়িত্ব নেয় না স্কুল। ওই পড়ুয়ারা কি থেকে যাবে এই সুরক্ষা বলয়ের বাইরেই?

যোগেশ বলছেন, ‘‘স্কুলগাড়ি সংগঠন বা অভিভাবকেরা আগ্রহী হলে একই ব্যবস্থা করা যাবে স্কুলগাড়িতেও। তবে স্কুলগুলো মাঝখানে থাকলে সুরক্ষার বিষয়টা আরও নিশ্চিত হবে।’’

‘পুলকার ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর তরফে অরূপম দত্ত বলেন, ‘‘সন্তানের খোঁজ নিতে বারবার অভিভাবকেরা চালককে ফোন করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাই বাড়ে। এই ব্যবস্থা থাকলে তো ভালই। তবে বিষয়টি বাধ্যতামূলক হলে সুবিধা হতো।’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন