সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে ডাক্তারি পাশ করলেন উত্তর ২৪ পরগনার হুদা গ্রামের ছেলে প্রণব মণ্ডল। আর প্রণবের এই সাফল্যে খুশি কয়েকশো কিলোমিটার দূরের কোচবিহার জেলার জামালদহের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সেখানকার আরও অনেকে। 

এক সময় ডাক্তারি পড়া বন্ধ হতে বসেছিল উত্তর ২৪ পরগনার মেধাবী পড়ুয়া প্রণবের। তাঁদের পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। মা গৃহবধূ। বাবা রঞ্জন মণ্ডল অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে যেটুকু অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়েই চলত চারজনের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরনো এই সংসারে দুই ছেলের পড়াশোনা চালাতে হিমশিম অবস্থা হয় বাবার। এই পরিস্থিতির মধ্যেও রঞ্জনবাবুর বড় ছেলে প্রণব মাধ্যমিকে ভাল ফল করে। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার অনেক খরচ। কিন্তু মেধাবী ছাত্র প্রণব চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। সেই কারণে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি কেরোসিনের আলো জ্বালিয়ে রাতের পর রাত জেগে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। আত্মীয়-পরিজনদের কেউ কেউ প্রণবের পড়াশোনার খরচ জোগাতে প্রথমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন প্রণব। ছেলের স্বপ্নপূরণের জন্য কোনও মতে টাকা জোগাড় করে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি করান তাঁর বাবা। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে আর্থিক সঙ্কটের কারণে চতুর্থ সিমেস্টারের টাকা দিতে পারছিলেন না প্রণব। মাসছ’য়েক বাকি পড়ে ছিল ক্যান্টিন ও হস্টেলের খরচও। এক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, প্রণব ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। আর সেই সময়ই মালদহ মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর চেয়ে এক বছরের সিনিয়র আরেক দরিদ্র মেধাবী ডাক্তারির ছাত্র জামালদহের কমল রায়ের। কমলও তখন জামালদহের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় ডাক্তারি পড়ছিলেন। কমল ওই সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে প্রণবের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আর্থিক কারণে একজন মেধাবী ছাত্রের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে নষ্ট হতে দিতে চাননি সংস্থার সদস্যেরা। 

কমলই প্রণবকে জামালদহে নিয়ে আসেন। এর পর ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে প্রণবকে এককালীন আর্থিক সাহায্য করার পাশাপাশি পড়াশোনার জন্য সরকারি ঋণ পেতে সহযোগিতাও করা হয়। বর্তমানে প্রণব ডাক্তারি পাশ করে মালদহ মেডিক্যাল কলেজেই ইন্টার্নশিপ করছেন। প্রণবের এই সাফল্যে খুশি জামালদহের বাসিন্দারা। জামালদহের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার  তরফে মৃন্ময় ঘোষ বলেন, “শুধু প্রণব মণ্ডলকেই নয়, বর্তমানে আমরা ২১ জন ডাক্তারি পড়ুয়াকে এই ধরনের সাহায্য করছি। যার মধ্যে চার জনকে প্রতি মাসে অর্থ সাহায্য পাঠানো এবং বাকি ১৭ জনকে এককালীন অর্থ সাহায্যের পর সরকারি ঋণ পেতে সহযোগিতা করা হয়েছে।” প্রণব মণ্ডলের কথায়, ‘‘ছোটবেলা থেকেই খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। জামালদহের ওঁরা পাশে না থাকলে আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত।’’