পরিবারে সীমাহীন দারিদ্র। কিন্তু, মনে মনে তাদের স্মার্টফোন হাতে পাওয়ার আকুলতা। স্মার্টফোন মানেই কানে হেডফোন গুঁজে রাস্তা দিয়ে হাঁটার হালফ্যাশন। আঙুলের ছোঁয়ায় গেমস ও ইন্টারনেট। উপরি হিসাবে সেলফি বা গ্রুপফি তো আছেই। বাড়িতে ফোন-প্রসঙ্গ তুলতেই অবশ্য কপালে জুটেছিল বাবা-মায়ের ধ্যাতানি। মোবাইলের স্বপ্নটা কিন্তু তাতে ফিকে হয়নি। বরং তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল তা সফল করতে।

সাধ ও সাধ্যের এই ফারাকটা মুছতে গিয়েই বাঁকুড়ার বারিকুলের দশ স্কুলপড়ুয়া চুরিতে হাত পাকিয়েছে বলে পুলিশের দাবি। রীতিমতো এলাকা ‘রেকি’ করে তার পরে দুই দোকানে তারা চুরি করেছিল গত মাসে। কিন্তু, শেষরক্ষা হয়নি। পুলিশের জালে পড়েছে ১০ জনই। ধৃতদের মধ্যে তিন জন ষষ্ঠ, বাকিরা সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়া। সকলেই বারিকুল থানা এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় দু’টি স্কুলের পড়ুয়া। এদের মধ্যে চার জন একটি স্কুলের হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে।

পুলিশের দাবি, সেই হস্টেল থেকেই ছ’টি মোবাইল সেট, কয়েকশো মেমরি কার্ড, টপ-আপ, হেডফোন, পেনড্রাইভ উদ্ধার হয়েছে। সোমবার বাঁকুড়ায় জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের সামনে ধৃতদের হাজির করা হয়। দুর্গাপুজো সামনে থাকায় পড়ুয়াদের অন্তর্বর্তিকালীন জামিন মঞ্জুর করা হয়। ছাত্রেরা তো বটেই, সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলতে চাননি তাদের অভিভাবকেরাও।

কী ভাবে ধরা পড়ল খুদেদের এই ‘গ্যাংস অব বারিকুল’?

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে চুরি হয় জঙ্গলমহলের বারিকুলের ফুলকুসমা এলাকার একটি বৈদ্যুতিন সামগ্রীর দোকানে। ওই ঘটনার দু’দিনের মাথায় এলাকারই এক মোবাইলের দোকানেও চুরি হয়। তদন্তে নেমে প্রথম দোকানটির সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, অ্যাসবেস্টসের ছাউনি কেটে দোকানের ভিতরে ঢুকে পড়ছে দুই কিশোর। দোকানে থাকা মোবাইলের টপ-আপ ভাউচার, হেডফোন, পেনড্রাইভ এমনকী টেবল ল্যাম্পও চুরি করে নিয়ে যায়। পালানোর সময় এক জনের মুখের গামছা খুলে যায়। জানা যায়, সে স্থানীয় স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে।

চোর ধরতে ফন্দি আঁটেন বারিকুল থানার আইসি দেবাশিস পাণ্ডা। থানার এসআই রামপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে পুলিশের পরিচয় গোপন রেখে ওই ছাত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বলেন। কখনও মিষ্টি, কখনও বা চকোলেট, চিপস খাইয়ে ওই ছেলেটির বিশ্বাস অর্জন করেন। এক দিন বন্ধুবেশী ‘পুলিশকাকুর’ কাছে মিষ্টি খেতে খেতে নিজের মনের দুঃখের কথা খুলে বলে ফেলে ওই ছাত্র। বলে, মেররি কার্ড, পেনড্রাইভ থাকলেও হাতে এখনও মোবাইল ফোন আসেনি। বাকি কয়েক জন বন্ধু অবশ্য পেয়েছে। এতেই সব জারিজুরি ফাঁস! পুলিশ তাকে চেপে ধরে জেরা করতেই সে গড়গড় করে বলে দেয় বাকি নয় সঙ্গীর নাম। পুলিশ ওই ছাত্রের হস্টেলে হানা দিয়ে ফোন-সহ চোরাই মালপত্র উদ্ধার করে।

ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, তাদের কিছু সহপাঠীর কাছে স্মার্টফোন দেখে তাদের লোভ বেড়েছিল। এর সঙ্গে ছিল মোবাইলে গান শোনা ও গেমস খেলার দুর্নিবার আকর্ষণ।

তা বলে এই একরত্তি বয়সেই চুরির ফন্দি?

এমনটা হতে পারে বলে জানাচ্ছেন মনোবিদ জয়রঞ্জন রাম। জয়রঞ্জনের কথায়, ‘‘কচি মনে বাইরের জগতের প্রভাব খুব বেশি পড়ে। চার পাশের লোকজন বা বন্ধুরা যা করছে, তা আমরা কেন পারছি না, সেই আকুতিটা ওদের মধ্যে বেশি কাজ করে।’’ তাঁর মতে, বাড়ির আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় হয়তো ওই ছাত্রেরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে এই কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে।

তবে, এক সঙ্গে ১০ জন মিলে কার্যত ‘গ্যাং’ বানিয়ে চুরি—এমন ঘটনা তিনি প্রথম শুনলেন বলেও জানিয়েছেন। পুলিশ বলছে, প্রয়োজনে ওই ছাত্রদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।