নেশার টানে চাকরিও ছেড়েছেন। নেশা বলতে, সাইকেল চেপে পাহাড় অভিযান।

বিভূতিভূষণের শঙ্কর পারেনি, কিন্তু বীরভূমের উজ্জ্বল পেরেছেন। প্রজাতন্ত্র দিবসের সকালে তিনি আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো পর্বতের সর্বোচ্চ স্থান উহুরু শৃঙ্গে (৫,৮৯৫ মিটার) জাতীয় পতাকা ওড়ালেন। সঙ্গী তাঁর প্রিয় সাইকেল ‘চেতক’। এর আগেও বাঙালি পর্যটকেরা কিলিমাঞ্জারো অভিযানে গিয়েছেন। সাইকেলে পাহাড় অভিযানের নজিরও নতুন নয়। কিন্তু রাঢ়বঙ্গের উজ্জ্বল পালের এই অভিযানের সাফল্য আরও একবার বাঙালি পাঠককে চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর আর লবটুলিয়ার যুগলপ্রসাদের গল্প মনে করিয়ে দিল। কারণ উজ্জ্বলের মধ্যে এই দুই চরিত্রেরই অবস্থান।

মহম্মদবাজার ব্লকের গৌরনগরের উজ্জ্বলের নেশা সাইকেল অভিযান। গত বছর ২৪ নভেম্বর মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে সাইকেলে ‘গ্রিন অন হুইল’ অভিযান শুরু করেন উজ্জ্বল। প্রত্যেক মানুষ সারা জীবনে অন্তত একটি গাছ লাগিয়ে সেটিকে বড় করে তুলুন— এটিই তাঁর অভিযানের বার্তা। যেটুকু টাকা ছিল, তাই সম্বল করে বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রিয় সাইকেলটিকে নিয়ে। মিশর থেকে আফ্রিকার সুদান, ইথিওপিয়া, কেনিয়া পার হয়ে ১৬ ডিসেম্বর তানজানিয়ায় ঢোকেন উজ্জ্বল। চাঁদের পাহাড় জয় করতেই হবে এটাই ছিল লক্ষ্য। স্থানীয় পর্বতারোহীদের সংস্থা থেকে পরামর্শ ও সাহায্য নিয়ে মাসাইমারা  থেকে যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিন সাইকেলে কিলেমা গেট থেকে হোরম্বো পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া। দ্বিতীয় দিন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছুটা এগোনো। তৃতীয় দিন ন’কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কিবো হাট সামিটে পৌঁছন উজ্জ্বল। সেখান থেকে রাত ১২টার পরে ফের যাত্রা শুরু উহুরুর উদ্দেশে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ২৬ জানুয়ারি সকাল ৬টায় উহুরু শৃঙ্গে তেরঙ্গা পতাকা ওড়াতে পেরেছেন উজ্জ্বল।

কিলিমাঞ্জারো-কথা

• সোয়াহিলি ভাষায় অর্থ: উজ্জ্বল পর্বত

• আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত

• উত্তর-পূর্ব তানজানিয়ায়, কেনিয়া-সীমান্তে

• তিনটি আগ্নেয়িগিরির সমষ্টি— কিবো (সুপ্ত), মাওয়েসি (মৃত) এবং শিরা (মৃত)

• কিবো-র উচ্চতম শৃঙ্গ উহুরু (৫৮৯৫ মিটার)

ফোনে তানজানিয়া থেকে বলছিলেন, ‘‘এই অভিযান আমার স্বপ্ন ছিল। পাহাড়ে উঠতে খুব কষ্ট হয়েছে। রাস্তা দুর্গম হওয়ায় বেশির ভাগ পথই সাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে হয়েছে। প্রজাতন্ত্র দিবসে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর মাথায় জাতীয় পতাকা তুলতে পারাটা আমার কাছে গর্বের।’’

উজ্জ্বলের জন্য গর্বিত মহম্মদবাজারের বিডিও অশিস মণ্ডল। কারণ তাঁর ব্লক থেকেই আফ্রিকা অভিযান শুরু করেছিলেন এই বাঙালি সাইকেল অভিযাত্রী। বিডিও বলেন, ‘‘বড় অদ্ভুত মানুষ উনি। একাই থাকেন, আর সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন।’’ বন্ধুর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত সিউড়ি অজয়পুর স্কুলের শিক্ষক সমুদ্র সেনগুপ্তও। তিনি বলেন, ‘‘উজ্জ্বল চিরকালই এ রকম। জেলা স্কুল থেকে দারুণ রেজাল্ট করেছিল। কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়তে গেল বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওর অভিযানে তখন থেকেই গাছ লাগানোর বার্তাটা জুড়ে গেল। একটি কীটনাশক বিক্রির সংস্থায় কাজ করত। কিন্তু অভিযানের অনুমতি পায়নি বলে চাকরিই ছেড়ে দিল!’’

আরও পড়ুন: জলে ৬১০০ কোটি, তবু মোদীর জমানায় দূষণ বেড়েছে গঙ্গায়!

উজ্জ্বল নিজের সাইকেলের নাম দিয়েছেন চেতক। গোটা ভারত দু’বছর ধরে এই সাইকেলেই চষে বেড়িয়েছেন। ১৭টি দেশ পাড়ি দিয়েছেন গাছ লাগানোর বার্তা নিয়ে। এ বারও সেই চেতককে সঙ্গী করেই জয় করলেন ‘চাঁদের পাহাড়’।