বাঁচানোর আর্তি জানিয়ে দাদাকে ফোন করেছিলেন যুবক। মঙ্গলবার সারা রাত এলাকা তোলপাড় করেও হদিস মেলেনি। বুধবার সকালে পুরুলিয়ার বলরামপুরের সুপুরডি গ্রামের বিজেপি যুব মোর্চার সেই কর্মী ত্রিলোচন মাহাতোর (২১) গলায় ফাঁস দেওয়া দেহ মিলল বাড়ির কিছুটা দূরে। টি-শার্টে লেখা— ‘এ বার বোঝ ১৮ বছর বয়সে বিজেপি করা’!

পঞ্চায়েত ভোটে বলরামপুর থেকে কার্যত ধুয়েমুছে গিয়েছে তৃণমূল। ভাল ফল করেছে বিজেপি। ঘটনাচক্রে, কাল শুক্রবার পুরুলিয়ায় আসছেন যুব তৃণমূল সভাপতি তথা দলের জেলা পর্যবেক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগেই এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকার রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়ে গিয়েছে। বিজেপির জেলা সভাপতি বিদ্যাসাগর চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘অভিষেক পুরুলিয়াকে বিরোধী-শূন্য করার ডাক দেওয়ার পরেই আমাদের এক যুব কর্মী খুন হয়ে গেলেন! ত্রিলোচনকে খুন করেছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই।’’ বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ টুইট করেন, ‘‘সরকারের মদতপ্রাপ্ত দুষ্কৃতীদের থেকে ওঁর মতাদর্শ আলাদা ছিল বলেই ওঁকে গাছ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল জমানা বাম আমলের সন্ত্রাসকে ছাপিয়ে গিয়েছে।’’ তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বিজেপি সভাপতির ওই মন্তব্যকে ‘অভাবনীয়, হাস্যকর এবং উস্কানিমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর পাল্টা বক্তব্য, ‘‘উনি সন্ত্রাস দেখেননি। না জেনে কথা বলছেন।’’ আজ বৃহস্পতিবার বলরামপুরে ১২ ঘণ্টার বন্‌ধ ডেকেছে বিজেপি।

জেলা পরিষদের বিদায়ী সভাধিপতি তৃণমূলের সৃষ্টিধর মাহাতোর দাবি, ‘‘ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। প্রয়োজনে সিআইডি তদন্ত হোক।’’ বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিংহ পাল্টা সিবিআই তদন্ত দাবি করেছেন। পুলিশ সুপার জয় বিশ্বাস বলেন, ‘‘প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে, ব্যক্তিগত আক্রোশে খুন হতে পারেন।’’

হুমকি চিরকুটেও। —নিজস্ব চিত্র।

ত্রিলোচন এ বার বিজেপির হয়ে ভোটে কাজ করেন। সুপুরডি সংসদ তো বটেই, স্থানীয় তেঁতলো-সহ সাতটি পঞ্চায়েত দখল করে বিজেপি। বলরামপুর পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের দু’টি আসনও হাতছাড়া হয় তৃণমূলের। পর্যুদস্ত হন সৃষ্টিধরবাবুও। 

নিহতের বাবা হাড়িরাম মাহাতো অভিযোগপত্রে জানান, ভোটের দিন গ্রামের কয়েক জনের সঙ্গে তাঁর ছেলের ঝগড়া হয়। তিনি সেই ছ’জনের নামে খুনের
অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তেরা পলাতক। নিহতের মা পানো মাহাতোর দাবি, ‘‘ভোটের ফল বেরোনোর পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় তৃণমূলের ছেলেরা। কিন্তু, ছেলেটাকে মেরে ফেলবে ভাবিনি।’’

বলরামপুর কলেজের ইতিহাস অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ত্রিলোচন মঙ্গলবার বিকেলে সাইকেল নিয়ে বেরোন। তাঁর মেজদা শিবনাথ মাহাতো বলেন, ‘‘সন্ধ্যায় ভাই না ফেরায় টানা ফোন করে যাই। কিন্তু ধরেনি। রাত পৌনে ৯টা নাগাদ ভাই ফোনে বলে, ‘ওরা আমাকে মোটরবাইকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ বাঁধা। মনে হয় মেরে ফেলবে। আমাকে বাঁচা’। ফোন কেটে যায়।’’

আরও পড়ুন: বিজেপি করাই কি ছেলের অপরাধ? যাঁকে সামনে পাচ্ছেন,প্রশ্ন করছেন নিহতের বাবা

পুলিশ ত্রিলোচনের ফোনের লোকেশন চিহ্নিত করে গ্রামবাসীকে নিয়ে বুধবার ভোর পর্যন্ত তল্লাশি চালায়। সকালে গ্রামের কাছে খুঁদিগোড়ায় রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে ত্রিলোচনের সাইকেল মেলে। কিছু দূরে জঙ্গলে গাছ থেকে ত্রিলোচনের গলায় ফাঁস দেওয়া দেহ নজরে আসে। টি-শার্টের মতোই তাঁর পায়ের তলায় কাগজে লেখা, ‘১৮ বছর বয়সেই বিজেপির রাজনীতি এ বার তোর প্রাণনীতি হল। তোকে ভোট থেকেই এই কাজটা করার চেষ্টা করি। পারিনি। আজকে তোর প্রাণ শেষ।’