পশ্চিম মেদিনীপুরের চাঁদরায় ঢুকে পড়া বাঘকে প্রথমে দেখা গিয়েছিল ক্যামেরা-ফাঁদে। পরে ফাঁদ পেতেও তাকে ধরা যায়নি। আরও পরে তার বেঘোরে মৃত্যু হয় মানুষেরই বল্লমে।

পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে পাতা ক্যামেরা-ফাঁদে ধরা পড়ল ‘বাঘের মাসি’ বাঘরোল বা মেছো বেড়াল। একটি নয়, দু’টি। তারা বেঁচে আছে। তবে বাঘরোলও বড়ই বিপন্ন।

লম্বায় সাধারণ বেড়ালের প্রায় তিন গুণ। গড় আয়ু ১২ থেকে ১৫ বছর। এক ঝলক দেখলে বাঘরোল বা মেছো বেড়ালকে ছোট বাঘ বলে ভুল করা অস্বাভাবিক নয়। বাঘ জাতীয় পশু। ‘বাঘের মাসি’ বাঘরোলকে ‘রাজ্য পশু’র তকমা দেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় তেমন সচেতনতা এখনও দেখা
যাচ্ছে না।

বাঘরোলকে নিয়ে বিশেষ কোনও সমীক্ষাও হয়নি। কিছু দিন আগে হাওড়া জেলায় বাঘরোল নিয়ে কাজ করেছিলেন এক গবেষক। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে কোনও সমীক্ষা হয়নি। অথচ প্রাণীটি বিপন্ন শ্রেণির। সেটা মাথায় রেখেই কয়েক মাস আগে চারটি সংগঠন রাজ্য জুড়ে বাঘরোল সমীক্ষার কাজ শুরু করে। কিছু দিন আগে তাদের ক্যামেরা-ফাঁদে ধরা পড়েছে অন্তত দু’টি বাঘরোল।

পশ্চিমবঙ্গ বায়ো ডাইভার্সিটি বোর্ড বা জীববৈচিত্র পর্ষদ, জ়ুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা ভারতীয় প্রাণী সর্বেক্ষণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউজ নামক একটি সংগঠন যৌথ ভাবে এই সমীক্ষা চালাচ্ছে। প্রাথমিক ভাবে ছ’টি জেলায় ক্যামেরা-ফাঁদ পাতা হয়েছিল। মেদিনীপুরের রামনগর অঞ্চলে সেই ক্যামেরায় দেখা গিয়েছে দু’টি বাঘরোল। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মাথার স্ট্রাইপ দেখেই তাঁরা ওই দু’টি বাঘরোলকে আলাদা করতে পেরেছেন। তবে আরও বেশ কয়েকটি বাঘরোলের অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম নির্দেশক অধ্যাপক গৌতম সাহা বলেন, ‘‘স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহায্য ছাড়া এই ধরনের প্রকল্প চালানো সম্ভব নয়। কারণ, বাঘরোল জনবসতির কাছাকাছি থাকে। বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে না-পারলে ওই প্রাণী নিয়ে সমীক্ষা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়।’’ সেই জন্যই স্থানীয় কলেজের ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মেদিনীপুর মডেলেই এ বার কাজ শুরু হবে উত্তরবঙ্গে।

বাঘরোল থাকে মূলত জলাভূমির পাশে। বাদাবনে। সমস্যা হল, রাজ্য থেকে জলাভূমি ক্রমশই লোপাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাঘরোল ঢুকে পড়ছে জনবসতিতে। জীববৈচিত্র পর্ষদের চেয়ারম্যান অশোককান্তি সান্যাল এই নিয়ে খুবই চিন্তিত। তাঁর বক্তব্য, নিশাচর এই প্রাণীটি গোধূলি লগ্নে শিকারে বেরোয়। মাছ ছাড়াও ইঁদুর জাতীয় প্রাণী শিকার করে। শিকারের খোঁজে জনবসিতে ঢুকলেই মানুষ ভয় পেয়ে তাদের মেরে ফেলছে। এই প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি, সেই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।

গৌতমবাবু আশাবাদী। তাঁর দাবি, বিভিন্ন জেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা যাচ্ছে।