‘‘দাদা, আর ক’টা দিন, তারপর আর আপনাকে কেউ  বব বিশ্বাস বলে ডাকবে না দেখবেন। ‘জগ্গা জাসুস’ রিলিজ-এর পর আপনার নাম হয়ে যাবে বাগচী। সেই সরল হাসিটা হেসে কান্দিভালি স্টুডিয়ো আলো করে বললেন রাজ কপূরের নাতি।

রণবীর কপূর।

হ্যাঁ, গত দু’মাস আমি মুম্বইয়ে রণবীর-ক্যাটরিনার সঙ্গেই শ্যুটিং করছি। জমিয়ে চলছে ‘বরফি’র পর অনুরাগ বসুর পরের ছবি ‘জগ্গা জসুস’-এর শিডিউল। রণবীর ছাড়াও ছবিতে রয়েছে ক্যাটরিনা কাইফ, সৌরভ শুক্ল এবং সঙ্গে গল্ফ গ্রিনের আমি। আর ছবিতে  রণবীরের বাবার চরিত্রে আমি, যাকে ভালবেসে সবাই ‘বাগচী’ বলে ডাকে।

 

আই এম এ বিগ ফ্যান অব ইওরস!

গত দু’মাস এই অসাধারণ ইউনিটের সেটে কী দারুণ সময়টাই না কাটাচ্ছি। কখনও মুম্বই, কখনও কাসাব্লাঙ্কা, কখনও মরোক্কোর বিচে। এ যেন সত্যিই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

আরও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ঋষি কপূরের ছেলেকে এত কাছ থেকে দেখা। আমাদের কাছে রণবীর মানে শুধু রণবীর নয়। রণবীর কপূর মানে আর কে ফিল্মস। রণবীর মানে আশি বছরের হিন্দি সিনেমার ইতিহাস। রণবীর মানে পৃথ্বীরাজ কপূর, রাজ কপূর, শাম্মি, শশী ছুঁয়ে ঋষি -নীতু।

এ রকম ফ্যামিলি ট্রি থাকা সত্ত্বেও রণবীরকে দেখে একবারের জন্যও আপনার দাম্ভিক, অ্যারোগেন্ট মনে হবে না। এ যেন আমার আপনার পাশের বাড়ির ছেলে।

সেদিন আমার প্রথম দিনের শ্যুটিং। ছবিতে যে ছোট রণবীর, সেই সরবজিৎ-এর সঙ্গে অভিনয় করছি। হসপিটালের সেট। আমি একটু বেরিয়েছিলাম, সেটে ফিরে এসে দেখি, হসপিটালের খাটে বসে রণবীর। আমি ওকে দেখে, একটু ইস্ততত করছি, বুঝতে পারছি না, ঢুকব কি ঢুকব না।

এমন সময় আমাকে দেখে নিজেই প্রায় দৌড়ে এসে বলল, ‘‘দাদা সো গ্ল্যাড টু মিট ইউ, আই অ্যাম আ বিগ ফ্যান অফ ইওরস। কেয়া অ্যাকটিং কিয়া থা আপনে ‘কহানি’ মে’’।

সেদিন কথা বলেই বুঝেছিলাম রণবীর একেবারে অন্যরকম। ছোটবেলা থেকে অনেক অভিনেতাকেই খুব কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু রণবীরের আন্তরিকতাটা জাস্ট অন্য লেভেলের।

কুশল বিনিময়ের পর আমি আর ‘ছোট জগ্গা’ কেমন অভিনয় করছি সেটা পুরোটা বসে বসে দেখল। অন্যের সিন এতক্ষণ ধরে দেখবে ওর মতো একজন সুপারস্টার, আমি কল্পনাতেও ভাবিনি। কিন্তু রণবীর অন্য ধাতুতে গড়া।

 ‘বাপ কা বেটা’: শ্যুটিংয়ের ফাঁকে রণবীর-শাশ্বত

 

দাদা ইধার বৈঠো, ইয়ে দেখো ইন্টিরিয়রস

তার পর থেকেই রণবীরের সঙ্গে আমার একটা দারুণ কেমিস্ট্রি তৈরি হয়ে গেছে। সেট-এ আসলেই আমার, রণবীর আর অনুরাগের প্রচুর আ়ড্ডা হয়। এই অনুরাগও অন্যরকম মানুষ এবং পরিচালক। অসম্ভব সিম্পল, কোনও দিন কাউকে বুঝতে দেয় না ও কত বড় পরিচালক। এ ছাড়া অনুরাগের একটা বৈশিষ্ট্য আছে।

পুরো ফিল্মের শ্যুটিংটা অনুরাগ করে স্ক্রিপ্ট ছাড়া। এ যে কী অদ্ভুত একটা ব্যাপার সেটা শুধু অভিনেতারাই বুঝবে। এসে শুধু বলে ‘‘অপুদা এটা হচ্ছে সেই সিনটা, তুমি এ দিক থেকে ঢুকবে। এইটা ডায়ালগ...,’’ ব্যস! এর বাইরে আর  কিছু বলে না। রণবীর বলছিল, পুরো ‘বরফি’ ছবিটাই নাকি এ ভাবে শ্যুটিং করেছেন অনুরাগ।

‘‘আমি আর প্রিয়ঙ্কা কিছুতেই বুঝতে পারতাম না, কী সিন হচ্ছে, কেন হচ্ছে? পুরো ফিল্মটা শুধু অনুরাগের মাথায় ছিল। কিন্তু ট্রায়ালে ছবিটা দেখে আমরা প্রায় ছিটকে গিয়েছিলাম। আমি আর প্রিয়ঙ্কা নিজেদের মধ্যে বলেছিলাম,  ‘‘আরে ইয়ে তো আচ্ছা পিকচার বানা লেতা হ্যায়,’’ বলে সে কী হাসি রণবীরের।

এরকম আড্ডা আমাদের প্রায় রোজই হয়। সেদিন দেখি সেটে এসে আমাকে ডাকছে রণবীর।  ‘‘দাদা, ইধার আও না প্লিজ, জলদি’’।  আমি গিয়ে দেখি, নতুন একটা রেঞ্জ রোভার নিয়ে সে দিন সেটে এসেছে রণবীর।  জাস্ট ডেলিভারি পেয়েছে গাড়িটার। আমাকে বাচ্চা ছেলের মতো পুরো গাড়িটা দেখাল। ‘‘দাদা ইয়ে দেখো ইন্টিরিয়রস, দাদা ইধার বৈঠো’’।

সে দিনই বুঝেছিলাম রণবীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত সারল্য আছে। আমার মনে হয়েছে এই সারল্যটাই ওকে এত ভাল অভিনেতা করে তুলেছে।  এত সরল যে মানুষটা, তার লাইফস্টাইল কিন্তু জাস্ট অন্য লেভেলের। এই আমাকে গাড়ির ইন্টিরিয়র দেখাল, তার পরেই বলল ‘‘দাদা সি ইউ, মিলতে হ্যায়, দো দিন বাদ।’’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম,  কোথায় যাচ্ছ?

বলল, দাদা, বার্সেলোনা যাচ্ছি, একটু লা লিগার ম্যাচ দেখতে।

এই হচ্ছে সুপারস্টারের লাইফ স্টাইল।

শাশ্বতদা, একটু রণবীরকে বাইরে আসতে বলো না এর পরেও দার্জিলিংয়ের শিডিউলের সময় উইন্ডামেয়ারের উপরের বারান্দায় একদিন দারুণ আড্ডা জমেছিল করিনা-করিশ্মার খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে।

জিজ্ঞেস করেছিল, বব বিশ্বাসের মতো চরিত্র করার পর আমি চার বছর কেন অপেক্ষা করলাম পরের হিন্দি ছবির জন্য? আমি ওকে বলি, আমি এমন ছবির জন্যই অপেক্ষা করতে চেয়েছি যেটা নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা কৌতূহল থাকবে। খুব মন দিয়ে রণবীর শুনেছিল সে দিন কথাগুলো।

উইন্ডামেয়ারের ছাদ ছাড়াও গ্লেনারিজ-এর নীচটা একদিন বুক করে  আমরা খুব পার্টি করেছিলাম। কিন্তু রণবীর কপূরকে কি কেউ শান্তিতে পার্টি করতে দেবে? খবর ছড়াতেই দেখলাম, কাতারে কাতারে  ট্যুরিস্ট গ্লেনারিজের বাইরে। দেখি আমাকেও চিনতে পেরেছে তারা।  অনেকেই দেখলাম বলছে, ‘‘শাশ্বতদা, একটু রণবীরকে বাইরে আসতে বলো না।’’ রণবীর আর আমি তখন একে অপরকে দেখে মিটিমিটি হাসছি।

এর পর মরোক্কোতে শ্যুটিং করতে গেলাম রণবীর আর ক্যাটরিনার সঙ্গে।  সেটে রণবীর আর ক্যাটরিনার খুনসুটিও দেখলাম বেশ কয়েকবার।

 

দাদা, আপকে সেট মে ক্রিস্টোফার নোলান আ গয়া  হ্যয়

সে দিন এমন একটা জায়গায় শ্যুটিং হচ্ছে যেখানে চেয়ার বেশি নেই। আমি এক জায়গায় বসেছি। হঠাৎ দেখি ক্যাটরিনা একটা প্যাকেট নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমার পেছনে। আমি ওকে বললাম, তুমি এখানে বসো। আমি একটু ঘুরে আসি। ক্যাটরিনা  বলল, ‘‘না, না, ইট ইজ অল রাইট, দাঁড়ালেও ক্যালরি বার্ন হয়।’’

এমন কথাবার্তা চলছে। একটু পরে আমিও অন্য দিকে পায়চারি করছি। দূর থেকে দেখলাম বেচারি ক্যাটরিনা আর না পেরে আমার চেয়ারেই বসে পড়েছে। শট শুরু হবে, এমন সময় আমি ক্যাটরিনার দিকে এগোচ্ছি, অন্য দিক থেকে দেখি  রণবীর আসছে।  এসেই ক্যাটরিনাকে বলল, ‘‘দাদা (অনুরাগ)  ডাকছে, এখনই যাও সেটে। লাইট চলে যাচ্ছে।’’ ক্যাটরিনা তা শুনে যেই না চেয়ার থেকে উঠেছে, দেখি রণবীর  মিউজিকাল চেয়ারের মতো বসে পড়ল। পুরো সেট তখন ক্যাটরিনাকে দেখে হাসছে।
অনুরাগ মোটেই ডাকেনি ক্যাটরিনাকে। জাস্ট বসবে বলে বদমায়েশিটা
করল রণবীর। আর একদিন ক্যাটরিনা আর রণবীরের সিন চলছে। ট্রেনের দৃশ্য।  ট্রেন থেকে রণবীরকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে ক্যাটরিনা। দেখি অনেকক্ষণ ধরে রণবীর বোঝাচ্ছে ক্যাটরিনাকে, ঠেলার সময় নায়িকার হাতের মুভমেন্টটা কী হওয়া উচিত।  অনেকক্ষণ রণবীরের কথা শুনছিল ক্যাটরিনা। তারপর হঠাৎ দেখি অনুরাগের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলেছে। আর চেঁচাচ্ছে, ‘‘দাদা, প্লিজ হেল্প। আপকে সেট মে ক্রিস্টোফার নোলান আ গয়া হ্যয়।’’

পুরো সেট তখন রণবীরকে দেখে হাসছে। এই হল ওদের কেমিস্ট্রি।

 

দেখি অনুরাগের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলেছে আর চেঁচাচ্ছে, ‘‘দাদা, প্লিজ হেল্প। আপকে সেট মে ক্রিস্টোফার নোলান আ গয়া হ্যয়।’’

দিস ইজ রণবীর কপূর

প্রায় দু’মাসের শিডিউল। প্রচুর আউটডোর। দিনের শেষে রোজই আমাদের দারুণ আড্ডা হয়। সেখানে এমন কিছু কথা রণবীরের সঙ্গে নিশ্চয়ই হয়েছে যেগুলো ব্যক্তিগত। কোনও দিনই কাউকে সেটা বলতে চাই না। এর মধ্যে, রণবীরের আর এক দুষ্টুমির কথা আপনাদের বলি।

আমি ওকে আগেই বলে রেখেছিলাম, আমার বউ ওর কত বড় ফ্যান। এর মধ্যে একদিন মহুয়া (আমার স্ত্রী) ফোন করছে, আমি কথা বলতে বলতে হঠাৎ রণবীরের কাছে ফোনটা নিয়ে গিয়ে মহুয়াকে বলি, এই নাও তোমার এক বন্ধু তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

ফোনটা ধরার আগে রণবীর শুধু ফিসফিস করে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘হোয়াট’স হার নেম?’’

আমি নাম বললাম। একদম কোনও ব্রেক ছাড়া ফ্লুয়েন্টলি বলা শুরু করল, ‘‘হাই মহুয়া। হাউ হ্যাভ ইউ বিন?’’

পরে শুনেছিলাম, মহুয়া নাকি ভেবেছিল ওর মুম্বইয়ের কোনও বন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। এমন দু’-একজনের নামও গেস করে ও রণবীরকে বলে। অনেকক্ষণ ইয়ার্কির পর রণবীর দেখি বলছে, ‘‘নো মহুয়া, অ্যাকচুয়ালি দিস ইজ রণবীর দিস সাইড।’’ এর পর শুধু ও পার থেকে একটা বিকট চেঁচানি শুনলাম।

এই সব নিয়েই এখন আমার সংসার। আর কিছু দিনের শ্যুটিং বাকি। তার আগে ওকে যত দেখছি, তত মুগ্ধ হচ্ছি। আফটার অল ‘আমার ছেলে’। রণবীর কপূর।