ঠিক পাঁচ বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে এমনই একটা চমক তৈরি হয়েছিল। ২০১৯-এ তার পুনরাবৃত্তি ঘটল। তবে এ বার জোড়া চমক। দেবের পরে টলিউড থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লোকসভা নির্বাচন লড়বেন নুসরত জাহান এবং মিমি চক্রবর্তী। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি থেকে রাজনীতিতে আসার তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু কেরিয়ারে জোয়ার থাকতে থাকতে রাজনীতির মূলস্রোতে আসার উদাহরণ বলতে একমাত্র দেব। এ বার নুসরত-মিমিও সেই তালিকায় শামিল। 

এঁদের রাজনীতিতে আসার প্রভাব কতটা পড়বে টলিউডে? দু’জনের নিজস্ব সমীকরণই বা কেমন? এমনই নানা প্রশ্ন এখন উঠে আসছে...

কতটা বন্ধু!

দু’জনেই একে অপরকে ‘বোনু’ বলে ডেকে থাকেন। সামনাসামনি তাঁদের হৃদ্যতা অবাক করে! মিমি এবং নুসরত ভুলেও প্রকাশ্যে একে অপরকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন না। বাস্তবে অবশ্য তাঁদের সম্পর্ক এতটা মধুর নয় বলেই শোনা যায়। নুসরতের অনেক আগেই এসভিএফ-এর গুডবুকে চলে এসেছিলেন মিমি। কিন্তু নুসরতের আগমন পালাবদল ঘটায়। শোনা যায়, এসভিএফ কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতার সঙ্গে সম্পর্কের জেরে নুসরত তাঁর প্রতিপত্তি খাটাতেন। মিমি তখন পিছনের সারিতে। সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে। একটা সময়ে নুসরতের সঙ্গে শ্রীকান্তের তিক্ততা চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছয় এবং এসভিএফ থেকে অভিনেত্রীর প্রস্থান ঘটে। মিমি আবার নিজের জায়গা ফিরে পান। 

কিন্তু এত কিছুর মাঝেও মিমি-নুসরত নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখে গিয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব প্রদর্শনও চলছিল। একটি ছবি থেকে রাতারাতি নুসরতকে বাদ দিয়ে মিমিকে নিয়ে আসা হয়। সেই ছবি ‘মন জানে না’ কিছু দিন পরেই মুক্তি পাবে। মিমি ছবিটি করার আগে নুসরতকে ফোন করে তাঁর আপত্তি আছে কি না জিজ্ঞেস করেন। নিছকই সৌজন্য, কিন্তু এতে বোঝা যায় মিমির ব্যালান্সিং ক্ষমতা। 

এ বার ভোটের ময়দানে মুখ্যমন্ত্রী দু’জনকে দাঁড় করিয়ে তাঁর ব্যালান্সিং অ্যাক্টেরও পরিচয় দিলেন বলে ইন্ডাস্ট্রির গুঞ্জন।

কতটা বদলাবে ইন্ডাস্ট্রির সমীকরণ?

আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতির সঙ্গে ফিল্ম কেরিয়ারের বিরোধ না থাকলেও ইতিহাস অন্য কথা বলছে। অমিতাভ বচ্চন পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হয়েছিলেন। যে কারণে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন। সাংসদ হওয়ার পরে দেব প্রযোজনা সংস্থা খুলেছেন। অনেক ছবি করছেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তাঁর কোনও ছবি কি সুপারহিট হয়েছে? দেবের রাজনীতিতে আসা এবং বাংলা কমার্শিয়াল ছবির ভরাডুবি প্রায় এক সঙ্গেই। হয়তো এটা সমাপতন।  

কিন্তু বলা বাহুল্য, নুসরত-মিমি রাজনীতিতে এলে বাণিজ্যিক ছবির নায়িকার ক্ষেত্রে হয়তো সাময়িক একটা শূন্যস্থান তৈরি হতে পারে। কেরিয়ারের প্রশ্নে নুসরত যদিও এই মুহূর্তে ব্যাকফুটে। প্রযোজনা সংস্থা এসভিএফ-এর সঙ্গে দূরত্ব তাঁকে সমস্যায় ফেলেছে। সেই তুলনায় মিমি শক্ত জমির উপরে দাঁড়িয়ে। আরবান ছবিতেও তাঁকে দেখা যায়, হাতে ছবিও অনেক। এই দুই নায়িকার ফোকাস যদি এখন রাজনীতি হয়, তা হলে সেই জায়গায় অন্য মুখের উপর ভরসা করতে হবে প্রযোজকদের। আরবান ছবির ক্ষেত্রে অনেক মুখ থাকলেও, মূল সমস্যা কমার্শিয়াল ছবি নিয়ে। শ্রাবন্তী, শুভশ্রী কেরিয়ারের দৌড়ে এখন নতুন করে প্রথম স্থান দখল করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন যাঁরা এসেছেন তাঁরা এখনও সে ভাবে কোনও জায়গা তৈরি করতে পারেননি। নতুন মুখ তুলে আনতে না পারলে এ সমস্যা মেটার নয়। 

দেবের কাছে প্রশ্ন রাখা হয় ইন্ডাস্ট্রির সমীকরণ প্রসঙ্গে। ‘‘দেখুন, কারও জন্য কারও কাজ থেমে থাকে না। ওরা রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে মানে কাজ করবে না, তা তো নয়। গত পাঁচ বছর ধরে আমি তো ছবিও করছি। আর বয়সটাও খুব ইম্পর্ট্যান্ট। সবটাই ওরা ব্যালান্স করতে পারবে,’’ জবাব সাংসদ-অভিনেতা দেবের।

ইউএসপি কী?

নুসরত নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন, এমন কথা প্রায় এক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছিল। তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুবই প্রিয় পাত্রী। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত দেরি করায়, সে জায়গায় ব্যাকস্টেজে থালিগার্ল হিসেবে নুসরতের নাম বিবেচনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও শেষ মুহূর্তে ঋতুপর্ণা পৌঁছে যান। দিদির ঘনিষ্ঠ বৃত্তে অবশ্য মিমিও রয়েছেন। দিদির বাড়ির অনুষ্ঠানে দীর্ঘক্ষণ হাজির থাকেন। তবে সরাসরি লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণায় অবাক হয়েছেন অনেকেই। অরিন্দম শীল যেমন বললেন, তিনি কিছু জানতেন না এ ব্যাপারে। তবে অভিনেত্রীকে তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এক অভিনেতা যেমন বললেন, ‘‘মিমিকে রাজনীতি নিয়ে কোনও দিন আলোচনা করতে শুনিনি। তবে নুসরত অনেক বেশি ওয়াকিবহাল।’’ ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সাংসদ দেব কি জানতেন মিমি-নুসরত ভোটে দাঁড়াচ্ছেন? ‘‘আমি নিজের খবরটাই জানতাম না, ওদেরটা জানব কী ভাবে?’’ হাসতে হাসতে বললেন দেব।

মিমি নিজে কী বলছেন? ‘‘এটা অপ্রত্যাশিত! তবে দিদি যখন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, চেষ্টা করব সেটা পালনের। আমি এখন থেকেই তৈরি।’’ আর কেরিয়ারের কী হবে? ‘‘সারা জীবন মাল্টিটাস্কিং করে এসেছি। দুটো দিক সামলাতে অসুবিধে হবে না।’’ নুসরত ফোনে নেত্রীর মতোই বললেন, ‘‘আমিও হকচকিয়ে গিয়েছি। মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। তবে মানুষের পাশে থাকতে চাই, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’’  যাঁরা মিমিকে চেনেন তাঁরা জানেন, জনসংযোগ, ব্যবহার এবং পেশাদারিত্বের প্রশ্নে অভিনেত্রী অনেক নম্বর পাবেন। নুসরতও খুব অল্প সময়ে কাউকে আপন করে নিতে পারেন। 

এ বার এঁরা নিজেদের ইউএসপি ভোটের ময়দানে কী ভাবে কাজে লাগান, সেটাই দেখার।