কৃষ্ণেন্দু (৩১) • স্ত্রী (২৯)

কর্তার সরকারি চাকরি  • স্ত্রী বেসরকারি সংস্থায়  • সন্তানের পরিকল্পনা করছেন • চান ৫১ বছরের মধ্যে অবসরের তহবিল গড়তে

 

ইচ্ছা অনেক, কিন্তু কোন রাস্তায় এগোলে সেই স্বপ্নপূরণ হবে, তা নিয়ে বেশির ভাগ সময়েই ভেবে নাজেহাল হই আমরা। হাতে টাকা রয়েছে, কিন্তু কোন প্রকল্পে তা রাখলে রিটার্ন কী রকম পাব, তাতে কাজের কাজ আদৌ হবে কি না, এই সব নিয়েই চিন্তার অন্ত থাকে না। অথচ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অল্প অল্প করে যদি প্রথম থেকেই লগ্নি করা যায়, তা হলে যে তহবিল গড়ে তোলা শুধু সময়ের অপেক্ষা, কৃষ্ণেন্দুর প্রোফাইল দেখলেই তা বোঝা যায়।

 

সাজানো গোছানো লগ্নি

কৃষ্ণেন্দু ও তাঁর স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। আজকালকার যুগে সংসারে একাধিক ব্যক্তি রোজগার না-করলে অনেক সময়েই আর্থিক সমস্যা হয়। কৃষ্ণেন্দু সে দিক দিয়ে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত। দু’জনের বেতন মিলিয়ে মাসে ৫১ হাজার টাকা হাতে আসে। যা বেশ ভাল। এর সঙ্গেই চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বুদ্ধিমানের মতো বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা ঢেলেছেন তাঁরা। ঝুঁকি নিয়ে যেমন মিউচুয়াল ফান্ডে সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) পদ্ধতিতে বিনিয়োগ শুরু করেছেন, তেমনই জীবনের সুরক্ষার জন্য ভাল অঙ্কের টার্ম পলিসিও কিনেছেন। হাতে আছে বেশ খানিকটা নগদও। কৃষ্ণেন্দু ভুলে যাননি স্বাস্থ্যবিমার কথা। বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে। তাই তাঁদেরও রেখেছেন বিমার আওতায়।

 

 

এর পর তিনি নিজের জন্য কিছু পরিকল্পনা করেছেন। যেমন, আগামী দেড় বছরে এসি কেনা। দু’বছরে পরিবারে নতুন সদস্য আনার কথাও ভাবছেন। এর সঙ্গেই চান সচ্ছল অবসরের লক্ষ্যে ৫১ বছরের মধ্যে সঞ্চয় সেরে ফেলতে। যাতে তার পরে চাকরি এবং অবসর জীবন টাকার চিন্তা না-করে নিজের ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়িয়ে কাটাতে পারেন। এই সবই তাঁর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। প্রোফাইল দেখে মনে হল খুব বেশি বদলের প্রয়োজন নেই এতে। তবে কোন তহবিলের টাকা কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে কৃষ্ণেন্দুর মনে প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলিরই উত্তর দেব আজ।

 

সন্তানের জন্ম ও উচ্চশিক্ষা

স্থায়ী আমানতে ১.২০ লক্ষ টাকা রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া সেভিংস অ্যাকাউন্টেও রয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সেই অর্থ দিয়েই সন্তানের জন্মের সময়ে চিকিৎসা এবং অন্যান্য খরচ দিতে পারবেন তিনি।

দু’বছর পরে সন্তানের জন্মের পরিকল্পনা করছেন কৃষ্ণেন্দু। কিন্তু তার শিক্ষার জন্য এখন থেকেই সঞ্চয় করতে হবে তাঁকে। বর্তমানে যদি সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার খরচ ধরি ২০ লক্ষ টাকা, ২০ বছর পরে তা দাঁড়াবে প্রায় ৭০ লক্ষে (৭% মূল্যবৃদ্ধি ধরে)। প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা এসআইপি করেন তিনি। যার মধ্যে ৪,৫০০ টাকার এসআইপি এই লক্ষ্যের জন্য রাখলে অর্থের অসুবিধা হবে না।

 

গৃহঋণের কিস্তি

১৩ বছর পর ২০ লক্ষ টাকার গৃহঋণ শোধ করে দিতে চান তিনি। এ জন্য মাসে বাকি ৩,৫০০ টাকা ডাইভার্সিফায়েড ইকুইটি ফান্ডে এসআইপি-তে রাখতে হবে। ১৫% রিটার্ন ধরলে সেখান থেকে তিনি পাবেন প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা। এর সঙ্গে তাঁর মাসিক কিস্তি যোগ হলে সহজেই তিনি সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন।

 

৫১ বছরে অবসরের তহবিল

কৃষ্ণেন্দু ৫১ বছরের মধ্যেই নিজের অবসরের সঞ্চয় সেরে ফেলতে চান। তবে সেই কারণে সন্তানের জন্য সঞ্চয় এবং গৃহঋণের চিন্তা মেটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা চলবে না। বরং এখন থেকেই এ জন্য কোমর বেঁধে নামতে হবে। তাঁর এখন বয়স ৩১ বছর। অর্থাৎ হাতে ২০ বছর সময় রয়েছে অবসরের তহবিল গড়ার জন্য। তবে তার আগে দেখে নিতে হবে ওই সময়ে সংসারে খরচ কত হবে—

এ জন্য কৃষ্ণেন্দুর এখন ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সন্তানের জন্মের পরে আমি ধরে নিচ্ছি সেই খরচের পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা। এ বার ২০ বছর পরে (যখন তাঁর বয়স হবে ৫১ বছর) ৭% মূল্যবৃদ্ধি ধরলে সেই মাসিক খরচই বেড়ে হবে প্রায় ৭৭ হাজার টাকা।

ওই হারে প্রতি বছর তাঁর সংসার চালাতে প্রয়োজন হবে ৭৭,০০০x১২=৯,২৪,০০০ টাকা।

ওই টাকা যদি কোনও সুরক্ষিত প্রকল্পে লগ্নি করে কৃষ্ণেন্দু পেতে চান, তা হলে তাঁর তহবিল হতে হবে ১.৩২ কোটি টাকার। এখানে ধরে নিচ্ছি সুরক্ষিত প্রকল্পের সুদ ৭%। দেখে নিই এই লক্ষ্যের কতটা কাছে পৌঁছতে পারেন তিনি।

মাসে ৫ হাজার টাকা তিনি সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমা রাখেন। আমার মতে, সেই টাকা থেকে ৩,৫০০ টাকা ২০ বছরের জন্য ডাইভার্সিফায়েড ফান্ডে এসআইপি করুন। ১৫% রিটার্ন ধরে ওই সময়ে তা দাঁড়াবে প্রায় ৫৩ লক্ষ টাকা।

ঋণ শোধের পরে তাঁর হাতে সময় থাকবে ৭ বছর। তখন বয়সও দাঁড়াবে ৪৪ বছর। সেই সময়ে মাসিক কিস্তির ১৮ হাজার টাকা কোনও ব্যালান্সড ফান্ডে টাকা রাখতে হবে। কারণ এতে ঝুঁকির অঙ্ক তুলনায় কম। এখানে ১২ শতাংশ রিটার্ন ধরলে এই বিনিয়োগ থেকে কৃষ্ণেন্দুর হাতে আসবে প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা।

পিপিএফে লগ্নির পরিমাণ অবশ্যই বাড়াতে হবে তাঁকে। মাসে কমপক্ষে ৮,৫০০ টাকা এই খাতে রাখার পরামর্শ দেব। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ ও রিটার্ন করমুক্ত হওয়ার কারণে অবসরের তহবিলে মোটা টাকা জমা হবে। এটা একটা মস্ত সুবিধা।

সব শেষে রয়েছে কৃষ্ণেন্দু ও তাঁর স্ত্রীর এনপিএস-এ লগ্নিও। তা-ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে। ফলে সেই টাকাও ১.৩২ কোটির লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

 

 

অন্যান্য

স্বাস্থ্যবিমার অঙ্ক বাড়ানোর যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। বর্তমান বিমায় তাঁর বাবা-মাও রয়েছেন। ফলে প্রিমিয়াম বেশি। তবে তা নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। আমি বলব সন্তান জন্মের পর তাকেও বিমার আওতায় আনতে।

দেখে ভাল লাগল, বুদ্ধিমানের মতো ইতিমধ্যেই টার্ম পলিসি করেছেন কৃষ্ণেন্দু। শুধু বলব আগামী দিনে এর অঙ্ক আরও বাড়াতে।

দেড় বছরের মধ্যে এসি কেনার যে-পরিকল্পনা করছেন তিনি, সে জন্য স্থায়ী আমানত বা হাতে থাকা নগদ কাজে লাগাতে পারেন। বাকিটা অবশ্যই রাখতে হবে সন্তানের জন্মের খরচ হিসাবে।

লগ্নির ক্ষেত্রে এক দম ঠিক পথে এগোচ্ছেন কৃষ্ণেন্দু। পরিকল্পনাও অত্যন্ত সঠিক। আমি বরাবরই অবসরের অনেক আগে থেকেই তার জন্য সঞ্চয়ের কথা বলি। আশা করব তিনিও সেই লক্ষ্যে সফল হবেন।

 

(অনুরোধ মেনে নাম পরিবর্তিত)