পরিচিতি: রাজকুমার (৪০)

কী করেন: বেসরকারি সংস্থার কর্মী। বাবা, মা থাকেন জেলা শহরে। স্ত্রী, মেয়েকে নিয়ে থাকেন কলকাতার ফ্ল্যাটে 

লক্ষ্য: ৫৫ বছরে অবসর। মেয়ের উচ্চশিক্ষা ও বিয়ের জন্য সঞ্চয়। দু’বছরে একবার বিদেশে ঘুরতে যাওয়া

 

বেশি আয় হলেই যে আর্থিক পরিকল্পনা ভাল হবে, তা নয়। এর অন্যতম প্রমাণ রাজকুমারের প্রোফাইল। আর তাই তাঁর প্রোফাইলকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা। মনে হতেই পারে শুরুতেই কেন তাঁর পরিকল্পনাকে খারাপ বলছি? কারণ, কিছু জিনিসে কঠোর না হয়ে উপায় নেই। ডাক্তার যদি মনে করেন, রোগীকে বাঁচাতে অপারেশন করতেই হবে, তা হলে কি তিনি শুধু ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেবেন? তাই প্রথমেই প্রোফাইলের অসুবিধাগুলি নিয়ে কথা না বললে, সমাধানও বলা যাবে না। কী ভাবে সেটা করা যায়, চলুন দেখি।

 

সমস্যা ১

রাজকুমারের টার্ম পলিসির সাম অ্যাশিয়োর্ড ২৫ লক্ষ টাকা। আর এনডাওমেন্ট পলিসি ১৮ লক্ষের। তাঁর উপর নির্ভর করেন স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা। রয়েছে গৃহঋণ। শুধু বেড়ানো বা বিনোদনের পিছনেই খরচের যা বহর, তাতে বলা যায় জীবনযাত্রার মান বেশ উঁচু। তাই হঠাৎ করে তাঁর কিছু হলে, বাকিদের কী হবে, বোঝা যাচ্ছে সে কথাটা তলিয়ে ভাবেননি তিনি। একটা কারণ হতে পারে যে, অফিসের আরও ৮০ লক্ষের টার্ম পলিসি রয়েছে। কিন্তু ৫৫ বছরে চাকরি ছাড়লে সেই বিমা থাকবে না। তখন কী করবেন?

সমাধান

নিজের জন্য কমপক্ষে ১ কোটির বিমা কিনতে হবে। এখন ব্যক্তিগত যা বিমা রয়েছে, তার বাইরে বাকি টাকার টার্ম পলিসি করুন। মনে রাখবেন, ৫৫ বছরে অবসর নেওয়ার পরেও অনেকটা সময় পড়ে থাকবে, যখন সেই অর্থে রোজগার থাকবে না। অথচ মেয়ের উচ্চশিক্ষা, বিয়ের মতো বড় খরচ বইতে হবে। সেই সময়ে আরও বেশি করে বিমার সুরক্ষা লাগবে।

 

সমস্যা ২

জীবন বিমার মতোই স্বাস্থ্য বিমাও পর্যাপ্ত নয়। আজকাল ছোট অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলেই ১-১.৫ লক্ষ টাকা বেরিয়ে যায়। এ বার ভাবুন, আগামী দিনে সেই অঙ্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। অথচ তাঁর ফ্যামিলি ফ্লোটার বিমা ৩ লক্ষ টাকার। অফিসের আরও ৫ লক্ষের বিমা রয়েছে। কিন্তু আবার সেই ৫৫ বছরে অবসরের কথা উঠে আসবে। তিনি চাকরিই ছেড়ে দিলে সেই বিমার সুবিধাও আর থাকবে না। অথচ যত বয়স বাড়বে চিকিৎসা খরচও বাড়বে।

বাবা-মায়ের ৪ লক্ষের বিমা রয়েছে ঠিকই। কিন্তু তা-ও যথেষ্ট নয়।

সমাধান

এখনই নিজেদের বিমার অঙ্ক বাড়ান। যত দেরি করবেন, তত বেশি প্রিমিয়াম লাগবে। চেষ্টা করুন বাবা-মায়ের বিমাও বাড়াতে। তাঁদের বয়সের জন্য খরচ বেশি হবে। কিন্তু শরীরটা আগে। সেখানে আপস করলে চলবে না।

সমস্যা ৩

অন্যান্য বাবা-মায়ের মতো রাজকুমারেরও সন্তানের জন্য অনেক স্বপ্ন রয়েছে। কিন্তু এ জন্য কোনও পরিকল্পনা নেই। যেমন—

• শুনতে অবিশ্বাস্য ঠিকই। বেসরকারি কলেজে চার বছরের ভাল কোর্সে এখন খরচ প্রায় ২০ লক্ষ টাকা (হোস্টেল ধরে)। ১০ বছর পরে তা দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ লক্ষ (৭% মূল্যবৃদ্ধি ধরে)। 

• স্নাতকোত্তর স্তরে এমবিএ-র মতো পাঠ্যক্রমের এখন খরচ প্রায় ১৫ লক্ষ। একই মূল্যবৃদ্ধি ধরলে তা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকায়।

• জাঁকজমক করে বিয়ের জন্য এখন যদি ২০ লক্ষ টাকা লাগে, মেয়ের ২৫ বছর বয়সে সেই খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকায়। অঙ্কটা বাড়াবাড়ি রকমের বেশি মনে হলেও, সেটাই সত্যি।

এটা ঠিক যে, মূল্যবৃদ্ধি টানা হয়তো ৭% থাকবে না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে গড়ে তার হার এ রকমই হবে ধরে নেওয়া যায়। সেই কথা মাথায় রেখে সঞ্চয় করলে পরে বাড়তি টাকা জমলে অন্য কাজে লাগানো যাবে। উল্টোটা হলে বিপদ। অথচ দেখা যাচ্ছে রাজকুমারের কোনও লগ্নিই এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারবে না।

সমাধান

তাঁর বেশিরভাগ লগ্নিই ঋণপত্র নির্ভর। ১০,০০০ টাকার এসআইপি যথেষ্ট নয়। তাই এসআইপি বাড়ান। তবে এলোমেলো ভাবে নয়। প্রতিটা লক্ষ্যের জন্য কত লাগতে পারে বলেছি। সেই অনুসারে লগ্নি করতে হবে তাঁকে।

এ বছরের শেষে তাঁর ঋণের কিস্তি শেষ হবে। সেই ৩১,০০০ টাকা অন্তত তিন ভাগে ভাগ করে আলাদা আলাদা লক্ষ্যের জন্য এসআইপি করতে হবে। মনে রাখতে হবে এক লক্ষ্যের জন্য রাখা টাকা অন্য কারণে যেন খরচ না হয়। মেয়ের পড়াশোনার পরে লগ্নি চালাতে হবে বিয়ের জন্য।

 

সমস্যা ৪

এখনই রাজকুমারের মাসে খরচ হয় প্রায় ৮০,০০০ টাকা। হঠাৎ প্রয়োজনে আরও ১০,০০০ টাকা লাগলে তা দাঁড়াবে ৯০ হাজারে। তিনি ৫৫ বছরে অবসর নিতে চান। তার পরেও এই জীবনযাত্রা চালাতে চাইলে ৭% মূল্যবৃদ্ধি ধরে সেই খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২.৪৮ লক্ষ টাকায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ। ৬% সুদের নিশ্চিত আয়ের প্রকল্পে লগ্নি করে বছরে সেই টাকা পেতে হলে তহবিল হতে হবে ৫ কোটির। অবসরের পরেও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জুঝতে হবে। ফলে তহবিল হতে হবে আরও বেশি। তাঁর লগ্নি পরিকল্পনা দিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছোনো যাবে না।

সমাধান

সব খরচের পরেও মাসে রাজকুমারের হাতে প্রায় ৭৫,০০০ টাকা থাকে। সেই টাকা তাঁকে লগ্নি করতে হবে অবসরের জন্য। আমি বলব—

• পিপিএফ যেমন চলছে চলুক।

• চলুক পিএফ এবং ভিপিএফ-ও।

• সংস্থার শেয়ার থাকুক।

• বন্ডের মতো ঋণপত্র নির্ভর প্রকল্পগুলি চলুক।

• ৭৫,০০০ টাকা লার্জ ক্যাপ, মিড ক্যাপ ও স্মল ক্যাপ ফান্ডে লগ্নি করুন। তাঁর বয়স এখন ৪০ বছর। ফলে খুব ভেবে ফান্ড বাছতে হবে।

• অবসরের কাছাকাছি এলে লগ্নি সরাতে হবে ডেট ফান্ডে।

• তাঁর ঋণপত্র নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেশি। এখন তহবিল বাড়াতে ইকুইটি ফান্ডে ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই।

• জেলা শহরে রাজকুমারের বাবা-মা থাকেন। সেই বাড়ি তিনি বিক্রি করতে পারবেন না। তাই তার বাজারদর তাঁর সম্পদের মধ্যে ধরা এখন ঠিক নয়। স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে যে বাড়িতে থাকেন, সেটাও তাঁর লগ্নি নয়। ফলে তারও বাজারদর সম্পদ হতে পারে না। যে ফ্ল্যাট কিনেছেন, সে জন্য ৩১,০০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। তাই তাকেও লগ্নি বলা চলে না। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে টাকার উপরে ভরসা করছেন, তার অনেকটাই বাদ চলে যাচ্ছে। তাই বলব, দু’টি ফ্ল্যাটের মধ্যে একটি বিক্রি করুন। চাইলে নতুন ফ্ল্যাট রেখে পুরনোটি বিক্রি করতে পারেন। সেই টাকা লগ্নি করতে তহবিল বাড়াতে হবে।

 

সমস্যা ৫

দু’বছরে বিদেশে বেড়াতে যেতে চান রাজকুমার। কিন্তু সে জন্য আলাদা করে তহবিল গড়ার চেষ্টা চোখে পড়ল না। না রেকারিং করছেন, না লিকুইড ফান্ডে টাকা রাখছেন। অথচ মাসে ১৬,০০০ টাকা বিনোদনেই খরচ করেন।

সমাধান

লাইফস্টাইল বজায় রাখতে গিয়ে পকেট জলাঞ্জলি দেওয়া কাজের কথা নয়। তাই বিনোদনের পিছনে যে টাকা মাসে খরচ করেন, সেই টাকা থেকে যদি কিছু বাঁচানো যায়, তা হলেই বেড়াতে যাওয়ার তহবিল তৈরি হয়ে যায়। প্রতি বছরই ২ লক্ষ টাকা বিনোদনে খরচ না করে, ভাবুন তো দু’বছরে ৪ লক্ষ টাকায় কোন কোন দেশে ঘুরতে পারবেন!

এটা ঠিক যে ছেলেমেয়ের বন্ধুদের জন্মদিন, পরিবারের অনুষ্ঠান, বিয়েতে খরচ করতেই হয়। তা বাদ দিতে বলছি না। কিন্তু তার বাইরে মাস গেলে খরচ কমানো যাবে বলেই আমার ধারণা।

 

শেষপাত

আর্থিক পরিকল্পনা বলুন বা অন্য কিছু, নিজের সম্পর্কে খারাপ কথা শুনতে কারওই ভাল লাগে না। কিন্তু ভাবুন তো, বাবা-মা বাচ্চাদের কেন বকেন? যাতে তারা ভবিষ্যতে একই ভুল না করে। সেই জন্যই এত কঠোর হয়ে বলা। আশা করব রাজকুমারও ভুল শুধরে নিতে পারবেন। শুভেচ্ছা রইল।

 

(অনুরোধ মেনে নাম পরিবর্তিত)

লেখক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

(মতামত ব্যক্তিগত)

ছবি প্রতীকী