সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কলকাতার কড়চা

karcha main

Advertisement

ছবির প্রেরণা কবির গান

নিজের রচনার অলংকরণ সাধারণত চাইতেন না রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু ছবির সঙ্গে লেখার একটা সংলাপ তৈরি করতে চেয়েছেন অনেক বার৷ সে ভাবেই তাঁর গানের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি ছবি৷ এ সব ছবি কিছু ক্ষেত্রে গানের উৎস, কিছু ক্ষেত্রে যে ঘটনা থেকে গানের জন্ম সেই ঘটনারই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র চিত্রভাষ্য৷ আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে অন্য কোনও রচনায় স্মৃতিসূত্রে এসেছে গান৷ সেই রচনার অলংকরণ করতে গিয়ে শিল্পী বেছে নিয়েছেন গানটি৷ এই ধরনের গানের ছবির সবচেয়ে স্মরণীয় উদাহরণ সম্ভবত জীবনস্মৃতি-র প্রথম সংস্করণে ‘হেলাফেলা সারাবেলা’ গানটির সঙ্গে মুদ্রিত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিটি৷ রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি ছবি ও রবীন্দ্রভবন সংগ্রহালয় থেকে সংশ্লিষ্ট গানটির পাণ্ডুলিপির উপস্থাপনে এক অভিনব বই এ বার বইমেলায়৷ রবীন্দ্রনাথের গানের ছবি (প্রতিক্ষণ) বইটিতে রবীন্দ্রনাথের নিজের আঁকা ছবির ঘরানার সঙ্গে তাঁর এই সব গানের ছবির কী বিপুল ফারাক সেটাই দেখিয়েছেন আশিস পাঠক৷ রবীন্দ্রনাথের জীবনকালে প্রকাশিত ছবিগুলিই জায়গা পেয়েছে এ বইয়ে৷ ছবিগুলি এবং প্রাসঙ্গিক গানগুলির নেপথ্য কাহিনি বা প্রকাশোত্তর কাহিনিও সবিস্তারে আছে এ বইয়ে৷ আছে বহু দুষ্প্রাপ্য ছবিও৷ যেমন গীতাঞ্জলি অ্যান্ড ফ্রুট-গ্যাদারিং-এর জন্য গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা অথচ বইয়ে ব্যবহৃত না হওয়া দুটি, গগনেন্দ্রনাথেরই আঁকা ‘একলা বসে হের তোমার ছবি’ গানটির ছবি৷ অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, সুরেন্দ্রনাথ কর, অসিতকুমার হালদার, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মতো সুপরিচিত শিল্পীর ছবির পাশাপাশি ‘এরে ভিখারি সাজায়ে’, ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে’, ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে’, ইত্যাদি গানের সঙ্গে নবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, খগেন রায়, সমরেন্দ্রনাথ গুপ্তর মতো তুলনায় স্বল্প-পরিচিত বা কম দেখা শিল্পীদের আঁকা রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছবিও পত্রপত্রিকার পাতা থেকে তুলে আনা হয়েছে এ বইয়ে৷ শিল্পীদের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি দুর্লভ প্রতিকৃতি৷ সঙ্গের ছবিতে বাঁ দিকে বইটির প্রচ্ছদ, আর ডান দিকে সত্যেন্দ্রনাথ বিশীর অলংকরণ, ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল-ধারা’ গানের সঙ্গে।  

 

বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ

হোম ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি আর কেমব্রিজ ম্যানুয়ালস অফ সায়েন্স অ্যান্ড লিটারেচার-এর আদর্শে ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’ গ্রন্থমালার পরিকল্পনা ১৯১৭ সালে৷ ২৬ বছর পরে প্রথম বই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের স্বরূপ৷ ১৯৮১ পর্যন্ত ১৩৫টি বই প্রকাশিত৷ এ বার তার পুনঃপ্রকাশের আয়োজন বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন খণ্ডে নতুন ভূমিকা-সহ, জানিয়েছেন গ্রন্থনবিভাগের পরিচালক রামকুমার মুখোপাধ্যায়৷ প্রথম তিনটি সংকলন ভারত-সংস্কৃতি, গণিতবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি৷ রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী-কৃত মূল প্রচ্ছদপটটিই ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিটি সংকলনে, থাকছে গ্রন্থ-পরিচয়ও৷

 

 

শিল্পী-স্মরণ

গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে পত্রপত্রিকায় সচিত্রকরণ, বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন যে সব শিল্পী, তাঁদের ক’জনের কথা আমরা মনে রেখেছি? জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাস রচনাবলিতে স্থায়ী জায়গা পায়, হারিয়ে যায় তার মূল অলংকরণ। সুবোধ দাশগুপ্ত এই পর্বেরই এক স্বশিক্ষিত শিল্পী, যিনি চলতি ধারার বাইরে গিয়ে ‘সবসময়েই চেষ্টা করতেন নতুন ভাবে কিছু করার’, লিখেছেন কৃষ্ণেন্দু চাকী, সুবোধ দাশগুপ্ত/ অলঙ্করণ ইত্যাদি (সম্পা: সন্দীপ দাশগুপ্ত, লালমাটি) বইয়ের ভূমিকায়। শিল্পীর ‘আত্মদর্শন’-এ বই শুরু, লেখক শিল্পী বন্ধু গুণগ্রাহীরা তুলে ধরেছেন তাঁর কাজের বিচিত্র দিক, আছে নিজের লেখা। তবে সবথেকে বেশি আছে তাঁর অলংকরণ আর প্রচ্ছদের নমুনা, বড় যত্নে সাজানো। এই শিল্পীদের নিয়ে এমন বই আরও হোক।

 

 

সাক্ষাৎকার

সত্যজিৎ রায়কে যে সারা জীবন ধরে অজস্র সাক্ষাৎকার দিয়ে যেতে হবে এটা নিতান্তই স্বাভাবিক। নিছক সাদামাটা পুনরাবৃত্ত প্রশ্নোত্তরের বাইরেও অনেক কথোপকথনেই উঠে এসেছে বাংলার শিল্পসংস্কৃতি ও তাঁর নিজের কাজ নিয়ে নানা গভীর উচ্চারণ। এ সবই ছড়িয়ে আছে নানা পত্রপত্রিকায়। সোমনাথ রায় সম্পাদিত ‘এখন সত্যজিৎ’ ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৫টি সাক্ষাৎকারের হদিশ পেয়েছে, এ বারের ‘সাক্ষাৎকার সংখ্যা’য় ছাপা হয়েছে ২০টি। শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সত্যজিতের কথাবার্তাটি এ সংখ্যার প্রবেশক, তার পর চলচ্চিত্র, ম্যাজিক, রবীন্দ্রসংগীত, সন্দেশ, শিল্পকলা এমন বহু বিষয়ে সত্যজিতের চিন্তা সংখ্যাটিতে ধরা রইল।

 

আন্দামান

সিপাহি বিদ্রোহের ২০০ জন বন্দিকে ১৮৫৮-য় নিয়ে যাওয়া হয় আন্দামানে। সেই শুরু। আর ১৯০৯-এ আন্দামান সেলুলার জেলে প্রথম ঠাঁই হল রাজনৈতিক বন্দিদের পাঁচ জনের একটি দলের (মানিকতলা বোমার মামলা)। ১৯০৯-’৩৮ পর্বে আন্দামানে শাস্তি ভোগ করেছেন এমন বন্দিদের ঠিকুজি খুঁজেছেন ‘আন্দামান নির্বাসিত বন্দি মৈত্রী চক্র’-এর সভাপতি অনুপ দাশগুপ্ত, বিপ্লবী সুশীল দাশগুপ্তের পুত্র। তাঁর হিসাবে এমন ৫৯৬ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর মধ্যে বাংলারই ছিলেন ৪০৬ জন, আর পঞ্জাবের ১০১! জেলের ইতিহাসের সঙ্গে বন্দিদের পরিচয় এবং অধিকাংশের ছবি দিয়ে সেলুলার জেলে নির্বাসিত বিপ্লবীদের কথা প্রকাশ পেল (সংকলন, সম্পাদনা: অনুপ দাশগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ)। গুরুত্বপূর্ণ যে সব মামলায় এঁদের শাস্তি হয়, আছে তারও দীর্ঘ বিবরণ। নিঃসন্দেহে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ আকর হয়ে থাকবে বইটি।

 

 

বই পড়া

উনিশ শতকের সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে যতটা চর্চা এগিয়েছে, ততটা কি বিংশ শতাব্দীর বেলাতেও খাটে? বোধহয় না। সে জন্যেই ফেলে-আসা শতকের বাংলা বই নিয়ে বিদ্যাচর্চার অভিপ্রায় থেকে বেরল কোরক-এর (সম্পা: তাপস ভৌমিক) বইমেলা সংখ্যা: ‘বাংলা বই ও বই পড়া’। এটিকে ‘বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার প্রস্তুতি বা উপাদান’ মনে করেন সম্পাদক। তিন পর্বে বিভক্ত সংখ্যাটির প্রথম পর্বে উনিশ-বিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মনন ও জ্ঞানচর্চা। দ্বিতীয় পর্বে একালের বিশিষ্ট মানুষজনের ভাললাগা বই নিয়ে নিবন্ধ। শেষ পর্বে কয়েক জন অবাঙালি ব্যক্তিত্বের প্রিয় বাংলা বই ও তাঁদের বাংলা সাহিত্যচর্চার কথা।

 

স্বপনকুমার

‘দীপক চ্যাটার্জ্জীর একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযান আমাদের বেঁচে থাকার রসদ, ছেলেবেলাকার দুঃসাহসের দস্তাবেজ।’ মনে করেন অভি চক্রবর্তী, অশোকনগর নাট্যমুখ-এর কর্ণধার। তাঁর সঙ্গে আঁতাত কৌশিক মজুমদারের, যিনি মনে করেন ‘ফেলুদা-ব্যোমকেশের এই মহারণে আবার দীপক চ্যাটার্জ্জী হেরে যাচ্ছেন। প্রাণ হাতে নিয়ে, লোহার পাইপ বেয়ে উঠে এই দীপকই তো একদিন কলকাতা শহরকে রক্ষা করত... ভয়ঙ্কর ভিলেনদের হাত থেকে।’ এ দু’জনের যোগসাজশে বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে মঞ্চ দাপাতে আসছে দীপক। তার ভূমিকায় পুণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র সমদর্শী দত্ত। প্রযোজনার প্রাক্‌পর্বে অভি যেমন ঋণী কৌশিকের কাছে, তেমনই প্রাণিত হয়েছেন ব্রাত্য বসুর থেকে। স্বপনকুমার-দীপক চ্যাটার্জ্জীকে নিয়ে একটি গবেষণা পুস্তিকা (লালমাটি) বেরল বইমেলায়, মঞ্চায়নের আগাম ঘোষণা সম্বল করে। ‘আসন্ন গরমের ছুটিতে প্রথম অভিনয়, কারণ ছোটবেলায় ওই ছুটিটাতেই তো স্বপনকুমার গোগ্রাসে গিলতাম।’ অভির সংযোজন।

 

আঁতের কথা

অতঃপর অন্তঃপুরে-তে তিনি আশ্চর্য করেছিলেন। এ বার পুবালি পিঞ্জিরা-য় (গাঙচিল) আবিষ্ট করলেন সামরান হুদা। এ বই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এক মেয়ের চোখে ঘর-গেরস্থালি আর পাড়াপ্রতিবেশীর কথা। নিছক স্মৃতিকথন নয়, দূর থেকে দেখা কিছু পিছুটানের জাফরি সাজিয়ে সাজিয়ে আলোআঁধারি ঝরোখা বানিয়ে তুলেছেন সামরান, যেখানে প্রত্যহের যাপনে মিশে রয়েছে লোকজ সংস্কৃতির আদিগন্ত। এই কথকতায় সার্থক সংগত দিয়েছেন পিয়ালী সাধুখাঁ, তাঁর অজস্র লিনোকাটে সেজে উঠেছে পটভূমি। সঙ্গে প্রচ্ছদ।

 

 

আলোচনা

গত বছরের শেষের দিকে বিশ্বের নজর ছিল প্যারিসের ওপর। পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কী আলোচনা হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কী ভূমিকা ছিল, আগামী দিনে ভারতের মতো ফাস্ট গ্রোইং ইকনমি-র কী ভূমিকা থাকবে— এমন সব বিষয়ে আলোচনার আয়োজন ছিল মডার্ন হাই স্কুল ফর গার্লস-এ। প্রধান বক্তা ছিলেন কলকাতার মার্কিন কনসাল-জেনারেল ক্রেগ হল। উপস্থিত ছিল বিভিন্ন স্কুলের প্রায় দুশো ছাত্রছাত্রী। আলোচনায় উঠে এল কলকাতার দূষণমাত্রার কথা। ক্রেগ বললেন তাঁর দেশের এমন নদীর কথাও, যাতে দূষণের কারণে আগুন ধরে যেত। পরিবেশ বাঁচানোর ক্ষেত্রে কত বড় ভূমিকা থাকবে আগামী প্রজন্মের, বললেন সেই নিয়েও। শুরুতে ছিল ছাত্রীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথের ‘আলো আমার আলো’ গানে গলা মেলালেন কনসাল-জেনারেলের স্ত্রী মিরইউং হল-ও। 

 

শতবর্ষে

‘তাঁর রচিত গল্পে উপন্যাসে মেয়েদের প্রতি যে সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে সেটাই আসল। বাস্তবিক এ দেশের হতভাগিনী মেয়েদের প্রতি তাঁর মহানুভব সহানুভূতি ছিল।’ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পর্কে। লিখেছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও: ‘এই রকমের একটা বিশ্বাস খুব সংগোপনে তিনি লালন করতেন যে, যা স্বাভাবিক, তা-ই সত্য। সেই সত্যের বাইরে তিনি কখনও পা বাড়াননি।’ বেশ কিছু জরুরি লেখা, যা থেকে পাঠক চিনে নিতে পারবেন ‘লেখক’ ও ‘মানুষ’ নরেন্দ্রনাথকে। জন্মশতবর্ষে অভিজিৎ মিত্রের সম্পাদনায় পদক্ষেপ বের করল তাঁর ‘জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা’। অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত বেশ কিছু রচনাও আছে তাঁর। পিতার আখ্যান রচনার ধরন নিয়ে স্বয়ং সম্পাদকেরও দীর্ঘ রচনা— ‘নরেন্দ্রনাথ মিত্র: পরম্পরা’।

 

অভিনব

কপিলদেব, বিজয় মাল্য, জগজিৎ সিংহ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, ডেরেক ও’ব্রায়েন, অভিষেক বচ্চন— বিভিন্ন জগতের বহু তাবড়ই তাঁর ক্লায়েন্ট। ভারতীয় পুরুষ পোশাকের পরিচিত ধ্যানধারণাকে তিনি তছনছ করে দিয়েছেন। শর্বরী দত্ত সুপরিচিত ফ্যাশন ডিজাইনার। অভিনবত্বের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ। তাঁর হাতে যখন থাকে পেনসিল, তখন পোশাকপরিচ্ছদ হয়ে যায় ক্যানভাস। কল্পনায় তৈরি নকশা ও ছবি ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে ওঠে কাপড়ে। শর্বরীর মতে, ভারতে প্রাক-ব্রিটিশ যুগে পুরুষরা রীতিমতো শৌখিন ছিলেন। কারুকাজ করা পোশাক ও অলংকার তাঁদের বেশভূষার অঙ্গ ছিল। ব্রিটিশ আমলে শার্ট প্যান্ট সুট টাই চালু হওয়ার পর আগের ধারণা বদলে গেল। তবে তিনি মনে করেন, ঐতিহ্যময় পোশাকে (যেমন কুর্তা, ধুতি, পাঞ্জাবি বা শেরওয়ানিতে) ভারতীয় পুরুষকে কিছু কম ভাল দেখায় না। তাঁর নকশার মধ্যে যেমন এক দিকে পাওয়া যায় দেশি কল্কা, ফুল, লতাপাতা বা পৌরাণিক কাহিনির চিত্ররূপ, তেমনই অপর দিকে গ্রিস, মিশর, রোম ও মেক্সিকোর শিল্পনিদর্শন। কবি অজিত দত্তের কন্যা শর্বরী নাচ ও গানে পারদর্শী, ছবি আঁকাতেও সিদ্ধহস্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে মাস্টার্স। ১৯৯১-এ তাঁর প্রথম প্রদর্শনী। এ বছর তাঁর কর্মজীবন ২৫-এ পা দিল। আর সেই সঙ্গে প্রকাশিত হল শর্বরী দত্ত/ দ্য ডিজাইন ডিভা (বৈশালী চট্টোপাধ্যায় দত্ত, সম্পাদনা সুচরিতা ঘোষ, নিয়োগী বুকস)। অক্সফোর্ড বুক স্টোরে বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। শর্বরীর পোশাককে যাঁরা আপন করে নিয়েছেন, বিখ্যাত সেই মানুষেরা মুখ খুলেছেন এই বইয়ে। সঙ্গে রয়েছে তাঁর উত্থান, কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনও। পাতায় পাতায় তাঁর পরিকল্পিত পোশাকে মডেলদের ছবি এবং চমৎকার ছাপা। সঙ্গের ছবি বই থেকে।

 

 

পথিকৃৎ

‘এই আলালী ভাষার সৃষ্টি হইতে বঙ্গসাহিত্যের গতি ফিরিয়া গেল।’ মন্তব্য শিবনাথ শাস্ত্রীর। কিন্তু শুধু কি বাংলা চলিত ভাষা, বাংলা উপন্যাস বা ছোটগল্পের পথিকৃৎ হিসাবেই প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩) স্মরণীয়? ডিরোজিয়ো-র ছাত্র প্যারীচাঁদ যে মেয়েদের জন্য ‘মাসিক পত্রিকা’-র প্রকাশক, বহু বিদ্বৎসভায় সক্রিয় ভূমিকায়, পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক, নিজস্ব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, আইনসভার সদস্য, কৃষিবিদ্যার চর্চায় অগ্রগণ্য, শেষ পর্বে অধ্যাত্মজিজ্ঞাসু, তার কতটুকু সম্বন্ধে এই দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে আমরা সচেতন? সংবর্তক (সম্পা: প্রসূন ধর) ৯০০ পৃষ্ঠার প্যারীচাঁদ মিত্র সংখ্যায় এই কাজটিই করতে চেয়েছে। বিভিন্ন দিকে আলো ফেলার সঙ্গে ‘ফিরে পড়া’ অংশে আছে পুরনো লেখা, আর পুনর্মুদ্রিত হয়েছে প্যারীচাঁদের নির্বাচিত ইংরেজি ও বাংলা রচনা। মুদ্রিত হয়েছে প্যারীচাঁদের একটি দুর্লভ ছবি, তবে ‘হিন্দু কলেজ’ পরিচয়ে মুদ্রিত ছবিটি আসলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধুনালুপ্ত সেনেট হল-এর। 

 

নাট্যশাস্ত্র

ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’। সে তো ভারি কঠিন বিষয়, পড়ে বোঝাও শক্ত, আর সে কবেকার কথা, এখন যারা নাটক শিখতে চায় তাদের কতটুকুই বা কাজে লাগবে! ব্যাপারটা যে আদৌ তেমন নয়, তা দেখা গেল দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ভরতের নাট্যশাস্ত্র/ একটি সহজ পাঠ (শিশু কিশোর আকাদেমি) বইতে। কাজে তো অবশ্যই লাগবে, মুখবন্ধে লিখেছেন শাঁওলী মিত্র, ‘এই শাস্ত্রের একরকম ধারণা যদি নতুন শিক্ষার্থীদের মনে আঁকা থাকে তাহলে তা নতুন নতুন পথের আবিষ্কারের প্রেরণা জোগাবে।’ আর তিন দশকের নাট্যকর্মী দেবেশ কঠিন শাস্ত্রকে সত্যিই সহজ করেছেন, আধুনিক উদাহরণ দিয়ে চমৎকার সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন অতীত-বর্তমানের।    

 

 

অতীন্দ্রিয়

‘তোমারই ঝরনার থেকে জলপান করছিলাম আমি/ আর সেই জলের বিদ্যুৎ/ মুহূর্তে গ্রাস করল আমায়—’, কিংবা, ‘আয়নার দিকে পাথর ছুঁড়তে চাও/ আমিই সেই আয়না আর এই নাও পাথর’— আটশো বছর আগের এই দিব্যোন্মাদ প্রেমের উচ্চারণ জালালউদ্দিন রুমির কণ্ঠে। ৩৭ বছরের জ্ঞানচর্চার জীবন থেকে হঠাৎই সামসউদ্দিন তাব্রিজি-র সাহচর্যে অতীন্দ্রিয় প্রেমের জগতে বিলীন হয়ে যান রুমি, চৌষট্টি হাজার পংক্তির ‘মসনবি’ ও ‘দিওয়ান’-এ ধরা আছে তাঁর সৃষ্টি। তারই অল্প কিছু বেছে নিয়ে ইংরেজি থেকে সহজ ভাষান্তর করেছেন কবি সুদীপ বসু (রুমির প্রেমের কবিতা, ধানসিড়ি)। অন্য দিকে, সাধকদের সুফি সুরের আনন্দে ফের মাততে চলেছে কলকাতা। দেশবিদেশের নানা প্রান্তের গায়ক-রসিকের সমাগম দেখবে শীত শেষের শহর। একই মঞ্চে শোনা যাবে ব্রাজিল, পর্তুগালের সঙ্গীতশিল্পী থেকে গ্রামবাংলার বাউল-ফকিরদের গান। ৫-৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি সন্ধ্যায় ৬টা থেকে সুফি সূত্রের বসছে আসর রবীন্দ্র সদন প্রাঙ্গণে। দিনভর চলবে গান নিয়ে কর্মশালাও।

 

বিলের গল্প

ছোট্ট ছেলে জয়। রোজ ঘুম থেকে দেরিতে ওঠে, পড়া মনে রাখতে হিমশিম খায়। বন্ধু জুন-এর বাড়িতে আছেন গুরুজি, তিনি শোনান ‘বিলে’ নামের একটা ছেলের গল্প। সেও খুব দুরন্ত, গুরুমশায় পড়ানোর সময় চোখ বন্ধ করে থাকে যেন ঘুমোচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন করলেই চটপট নির্ভুল উত্তর। স্বামী বিবেকানন্দের ছেলেবেলার বিলেকেই নায়ক করে আজকের শিশুদের জন্য সুকঙ্কণ রায় ও তাঁর বন্ধুরা লিখেছেন কমিক্স ‘বিলে এক বিস্ময় বালক’। লক্ষ্য, বিলের জীবনের নানান গল্পের মধ্য দিয়ে শিশুমনে মানুষ গড়ার শিক্ষা চারিয়ে দেওয়া। আপাতত লেখা হয়েছে বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই, সঙ্গে আছে একটি ‘অ্যাক্টিভিটি বুক’ও। বিলেকে নিয়েই সুকঙ্কণের বানানো অ্যানিমেশন ছবি ‘সাউন্ড অব জয়’ সম্প্রতি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছে। কয়েক বন্ধু মিলে বানিয়েছেন ওয়েবসাইট ‘সাউন্ডঅবজয় ডট ওআরজি’, সেখানেও মিলবে এই কমিক্স আর ছবির খোঁজ, মা-বাবাদের জন্য পেরেন্টিং টিপ্‌সও।

 

চেতনা

‘যত গাছপালা, যত জীব পশুপাখি—/ এসো, সবাইকে যত্নে বাঁচিয়ে রাখি।/ এরা যদি বাঁচে, তবেই আমরা বাঁচি।/ প্রকৃতি, মানুষ— থাকুক না কাছাকাছি।’ চণ্ডী লাহিড়ীর মনের খুশিতে আঁকা ২৯টি ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ছড়া লিখেছেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুরোধে। পরিবেশ চেতনা গড়ে তুলতে তাঁরা কার্টুন ও ছড়াকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলে মুখবন্ধে জানিয়েছেন পর্ষদ-সভাপতি কল্যাণ রুদ্র। সুন্দর বইটি বিভিন্ন স্কুলের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

 

বিস্মৃত শিল্পী

শতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর। বহুমুখী ধারায় অত্যন্ত কৃতী এই শিল্পীর কথা আমরা ভুলতে বসেছি। ভূনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯০৯-১৯৯৬) আর্ট কলেজে পড়েছেন মুকুল দে-র পর্বে। শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুর সান্নিধ্যে শিখেছেন অনেক। গুরুপ্রসন্ন বৃত্তি নিয়ে লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে শিল্পশিক্ষা তাঁকে আরও পরিণত করে। তৈলচিত্র, পেনসিল স্কেচ, জলরঙ-তেলরঙ-চক চারকোলে ছবি আঁকা ছাড়াও ভাস্কর্য চর্চাতেও ছিলেন সমান দক্ষ। শুধু পেনসিলেই তিনি হাজারের বেশি বিশিষ্টজনের প্রতিকৃতি এঁকেছেন। সামনে বসে আঁকা এর অনেক ছবিই তাঁদের স্বাক্ষরিত। এমন অনেক ছবি আর জীবনতথ্য নিয়ে দেবরঞ্জন চক্রবর্তীর ভাস্কর চিত্রকর ভূনাথ মুখোপাধ্যায় (পারুল) প্রয়োজনীয় কাজ। দেবরঞ্জনবাবু তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও করেছেন।

 

 

কিঞ্জল

‘বাচ্চাদের বইতে দেবাশীষ দেব না থাকলে মানায় না।’ লিখেছেন নবনীতা দেবসেন। স্বয়ং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় মুখ খুলেছেন তাঁর ছোটদের লেখার সঙ্গে দেবাশীষ দেবের ছবির তিন দশকের যুগলবন্দি নিয়ে। চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কিঞ্জল’ পত্রিকার এ বারের সংখ্যা শিল্পী দেবাশীষ দেবকে নিয়েই। শিল্পীর নিজের বয়ানে ফুটে উঠেছে তাঁর অর্ধশতকের চিত্রচর্চার বর্ণময় আখ্যান, তার নানা পর্ব। খোলামেলা কথা বলতে ভালবাসেন দেবাশীষ, সূচনা পর্বে তাঁর উপর পূর্বসূরিদের প্রভাবের কথাও তাই নির্দ্বিধায় বলেন। ৩৬ বছর যুক্ত ছিলেন সংবাদপত্রে, কার্টুনধর্মী ইলাস্ট্রেশনে বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন দেশবিদেশে। লিখেছেন তথ্য-বিশ্লেষণে ঠাসা বই রং তুলির সত্যজিৎ (সিগনেট)। পূর্বসূরি শিল্পীদের নিয়েও লিখেছেন তিনি। তাঁর আঁকা ছবি, তাঁকে নিয়ে অনেক লেখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ‘কিঞ্জল’।

নব্বই ছুঁয়ে

লেখালেখিকে আমি খেলা-খেলা ভাবেই নিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে, জীবনটাকেই আমি খেলা-খেলা ভাবে নিয়েছিলাম। কিন্তু জীবনের খেলায় যা-ই হোক, শিল্পের খেলায় আমি ফাঁকি দিইনি।’ মণীন্দ্র গুপ্তের এক দীর্ঘ রচনায় কথাগুলি আছে (‘আকাশপথের রুটম্যাপ’)। এটি সহ আরও বিচিত্র স্বাদের রচনা নিয়ে বইমেলায় বেরল তাঁর গদ্যসংগ্রহ-২ (অবভাস)। তাঁর দুঃসাহসী সংস্কারহীন চিন্তাপ্রবাহের গদ্য ছুঁয়ে থাকে প্রাচীন থেকে আধুনিক পেরিয়ে অনন্ত। এই আশ্চর্য গদ্যের লেখক এখন নব্বই ছুঁয়েছেন, ১৯২৬-এ জন্ম বরিশালের গইলা গ্রামে, বাল্য কেটেছে সেখানেই। স্কুলজীবন শিলচরে, কলেজপর্ব কলকাতায়। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে লাহৌর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কয়েক বছর। যুদ্ধশেষে কলকাতায় ফিরে যন্ত্র-নকশার শিক্ষক। চিত্রকর, কবি, গদ্যশিল্পী, সম্পাদক, সংকলক। আমরা তিনজনে (গ্রীষ্ম ১৩৫৬) প্রথম বই, যেখানে তাঁর কবিতা গ্রন্থিত হয় অন্য দুই কবির সঙ্গে। প্রথম একক কবিতার বই নীল পাথরের আকাশ (’৬৯)। প্রথম প্রবন্ধ সংকলন চাঁদের ওপিঠে (’৯১)। প্রথম উপন্যাস প্রেম, মৃত্যু কি নক্ষত্র (২০০৫)। কবিতাপত্র পরমা-র (১৯৬৯-’৮১) সম্পাদক। তিন খণ্ডে সংকলিত করেছেন আবহমান বাংলা কবিতা। জীবনের সাড়ে আট দশক পার করে শ্রমসিক্ত ঋজু গদ্যে এ-দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে নিয়ে লেখেন রং কাঁকর রামকিঙ্কর। আর ’৮১-তে কর্মসূত্রে বীরভূমে তিলপাড়া ব্যারেজের কাছে ডেরা বাঁধার সময় লিখতে শুরু করেন সেই অভাবনীয় আত্মস্মৃতি অক্ষয় মালবেরি (তিন খণ্ডে সমাপ্তি ২০০৪-এ)— স্মৃতিকথকতার চিত্রময় চলনে যেখানে বইতে থাকে ঘনগহন অন্য বাস্তবের স্রোত, জীবনের অকিঞ্চিৎকর বিন্যাসের সৌন্দর্য। টুং টাং শব্দ নিঃশব্দ-এর (২০০৫) জন্যে রবীন্দ্র পুরস্কার আর বনে আজ কনচের্টো-র (২০০৯) জন্যে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। আজ তাঁর মনে হয় ‘বাল্যকাল মধুর, যৌবন সুন্দর, প্রৌঢ়ত্ব হেমন্তের মতো হেঁয়ালির আর ব্যথা পাওয়ার। কিন্তু বার্ধক্য আবার জাদুকরের মতো স্নিগ্ধ এবং সকৌতুক।’

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন