গরমকাল হাজির। তার মানে লো-কাট কিংবা স্লিভলেস ড্রেস, ব্যাকলেস গাউন বা কায়দার ব্লাউজ়ের সদ্ব্যবহারের এই তো সুযোগ। কালবৈশাখীর জন্যও তৈরি থাকতে হবে। কাদা-জল এড়াতে কাপরি বা মিড লেংথ স্কার্টও আলমারি থেকে বেরোবে। এসব পোশাকে সাজতে চাইলে ত্বকের বিশেষ যত্ন নিতেই হবে। শুধু মুখে ফেশিয়াল করলেই চলবে না, গোটা শরীরেরও ফেশিয়াল করতে হবে। সহজ ভাবে বললে সেটাই বডি পলিশিং। আর এ সব পোশাক না পরলেই বা কী? শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নিভাঁজ, নিটোল, উজ্জ্বল, মোলায়েম হোক— কে না চান? তার জন্য ফেশিয়াল, পেডিকিয়োর, ম্যানিকিয়োরের পাশাপাশি বডি পলিশিং-এর রুটিনটিও  জরুরি।

 

বডি পলিশিং কী করে?

প্রত্যেক দিন ধুলো ত্বকের জৌলুস কাড়ে। রোদ তাকে ঝলসে দেয়। দূষণ আর রোগজীবাণু চামড়ায় কুৎসিত ছোপ ফেলে। সঙ্গে আছে টেনশন। সব মিলিয়ে ত্বক ক্লান্ত, ম্লান হয়। বয়স্ক দেখায়। বডি পলিশিং-এর এক্সফোলিয়েশন-এ মৃত কোষ উঠে গিয়ে তেল-ময়লা বার হয়ে যায়। ক্লেনজ়িং এফেক্টে এই সব মালিন্য দূর হয়ে ফিরে আসে ত্বকের দ্যুতি। মাসাজ করার ফলে পেশি সুডৌল হয়ে ওঠে। গঠন সুন্দর হয়। অনেকেরই সমস্যা, শরীরের এক এক অংশের রং এক এক রকম। মেকআপ করে ইভ্ন টোন পাওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হল বডি পলিশিং। ঘাড়ের ছোপ, কনুইয়ের দাগ, আঙুলের ভাঁজের বা নখের কাছের কালচে অংশগুলি সমান ভাবে পরিষ্কার করে।

 

সালঁতে করাতে গেলে

পার্লার, হোটেল-রিসর্টে বডি পলিশিং বিশেষজ্ঞ থাকেন। তাঁর সঙ্গে ত্বকের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে নিন। নইলে অ্যালার্জি হতে পারে। শুষ্ক ত্বকে ব্রাউন সুগার বেস্‌ড পলিশিং, তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক লবণ বা টি ট্রি অয়েল ব্যবহার করা হয়। সাধারণ ত্বকে কফি বীজের প্যাক মাখানো হয়। 

সালঁতে সাধারণত প্রাকৃতিক উপাদান যেমন ফ্রুট অ্যাসিড, অ্যাভোকাডো, বেদানার দানার তেল ইত্যাদি ব্যবহার হয়। প্রথমে সারা শরীরে স্ক্রাবার ঘষে পলিশ করা হয়। এতে রক্ত সঞ্চালন, কোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে। স্টিম দিলে রোমকূপের মুখ খুলে যায়। পরে এসেনশিয়াল অয়েল মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে, বাড়তি তেল আলতো করে মুছে নেওয়া হয়। এর পরে মাড, সি উইড বা চকলেটের পরত মাখিয়ে (ফেশিয়াল মাস্কের মতো) রাখা হয়। শেষে গোলাপের নির্যাস, মজানো আঙুরের রস ও দুধ মেশানো জলে স্নান করিয়ে ক্রিম মাখিয়ে দেওয়া হয়। তফাত বোঝা যায় আয়নার সামনে দাঁড়ালেই। 

 

বাড়িতে বডি পলিশিং 

বডি পলিশিং তো আসলে ত্বকের ঘষামাজা। পিউমিস স্টোন, খাঁটি নারকেল তেল বা জলপাইয়ের তেল থাকলে বাড়িতেই নিজের সময় অনুযায়ী এই ত্বকচর্চা করে ফেলতে পারেন। তবে, প্রথমেই একটা বডি স্ক্রাব বানিয়ে ফেলুন।

শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে: এক কাপ ব্রাউন সুগার, আধ কাপ হোহোবা অয়েলে ভিটামিন ই ক্যাপসুল (৪/৫ ভাগ) মিশিয়ে পাতলা লেই বানিয়ে ফেলুন। 

অতি শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে: আগের মিশ্রণে বেকিং সোডা, অ্যালো ভেরা জেল, বাদাম তেল মেশান। লেই যেন থকথকে হয়।

তৈলাক্ত ত্বকের জন্য: আধ কাপ চিনি, ৪-৫টা স্ট্রবেরি থেঁতো, ২টি জামরুল বাটার সঙ্গে দু’চামচ মধু।

সাধারণ ত্বকের জন্য: দই, মধু, চিনি, টম্যাটো, গোটা কাঁচা হলুদ ও বেসন মিশিয়ে স্ক্রাব তৈরি করুন। 

প্রতিটি স্ক্রাবে কমলালেবুর খোসার গুঁড়ো মেশালে ত্বকের দীপ্তি বাড়বে। ত্বক বেশি সংবেদনশীল না হলে পাতিলেবুর রস মেশাবেন।

স্নানঘরে গরম জলের শাওয়ার খুলে ঘরটা বাষ্পে ভরিয়ে নিন। এতে ত্বকের রোমকূপ খুলবে। এ বার জবজবে করে নারকেল ও জলপাই তেল মাখুন। ১০-১৫ মিনিট ধরে ওই তেল দেহে মালিশ করে মিলিয়ে দিন। সারা শরীরে স্ক্রাবটি মেখে বৃত্তাকারে আঙুল চালিয়ে ঘষে নিন। স্নান করার সময়ে পিঠে শোল্ডার লুফা ব্যবহার করবেন। শেষে পুরু বডি লোশন লাগান। সপ্তাহে দু’বার এ ভাবে যত্ন নিলে আপনার ত্বকের জেল্লা নিশ্চিত।  

সাবধানতা ও পরামর্শ
 

পার্লারের বডি পলিশিংয়ের মেয়াদ প্রায় চল্লিশ দিন। পলিশিংয়ের কতক্ষণ বাদে সাবান দিতে পারবেন, কতখানি ঘুম প্রয়োজন, কড়া প্রসাধনী ব্যবহার চলবে কি না জেনে নেবেন। নইলে, স্পা-এর প্রভাব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
স্পা-এর শোভা বেশি দিন ধরে রাখতে ঈষদুষ্ণ অলিভ অয়েলে নিয়মিত ত্বক মালিশ করুন।
 বডি স্পা পার্লারে করুন বা বাড়িতে, অন্তত দু’দিন আগে ওয়্যাক্সিং করে রাখতে হবে।
 এই প্রক্রিয়া চলাকালীন কখনও তোয়ালে দিয়ে রগড়াবেন না। তা হলেই র‌্যাশ বার হবে। তেল, ক্রিম বা জলের কণা সাবধানে নরম পরিষ্কার কাপড়ে থুপে থুপে শুষে নিন।
কনুই, হাঁটু বা গোড়ালি অনেক সময়ে বেশি খসখসে বা মলিন থাকে। ওই অংশে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে পিউমিস স্টোন দিয়ে ঘষুন।
 নাক ও কপাল ছাড়াও শরীরে অনেক অংশে বেশি তৈলগ্রন্থি থাকে। সেখানে অবাঞ্ছিত ব্রণ হলে যেতে চায় না। তার জন্য স্কিন বাম পাওয়া যায়। এতে পিগমেন্টেশনের থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
বিয়ের আগে গোল্ড বডি পলিশিং করাতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের ঠিক এক সপ্তাহ আগে পার্লারে কথা বলে রাখবেন। 

দোল স্পেশ্যাল বডি পলিশিং 

অনেকেই রং খেলার পরের ক’দিন গায়ে রঙের ছোপ রাখতে ভালবাসেন। এ দিকে রং খেলার দু’-এক দিন পরে অনুষ্ঠান থাকলে মেকআপ করতে গেলেই চোখে জল। রং যতই নিরাপদ হোক, ত্বকের মসৃণতা ও চেকনাইয়ে কিছুটা প্রভাব ফেলবেই। তাই দোলের চার-পাঁচ দিন পরে বডি পলিশিংয়ের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বাড়িতে বাটারমিল্ক দিয়ে অঙ্গমার্জনেও ফল পাবেন। প্রসঙ্গত, বডি পলিশিং সমুদ্রের ট্যান তুলতেও ওস্তাদ। 

আধুনিক বডি পলিশিংয়ে চামড়া টানটান হয়, বাড়তি মেদও ঝরে। সন্তান জন্মের স্ট্রেচ মার্কস অনেকটাই গায়েব করে ফেলা যায়। আসলে বডি পলিশিং তো অনেকখানি নিজেকে প্যাম্পারিং। আরাম পেয়ে মনটাও পালিশ হয়ে ঝকঝকে, ফুরফুরে হয়ে যায়। সারাক্ষণ পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে চেহারা নিয়ে ঘুরলে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে কয়েক গুণ। বডি পলিশিংয়ের পরিচর্যায় নিজের অন্দর-বাহির উজ্জ্বল করে তুলুন, আপনার চারপাশেও ঠিকরে বেরোবে সেই নতুন আলো। 

চিরশ্রী মজুমদার

মডেল: নয়নিকা; মেকআপ: অনিরুদ্ধ চাকলাদার; ছবি: দেবর্ষি সরকার; লোকেশন: বি বনি 

(কসবা নিউ মার্কেট)