ফেবু খুললেই ষাঁড়াষাঁড়ি বানের মতো কবিতা আছড়ে পড়ছে!

দুর্মুখরা বলছে, বাংলা কাব্য সাহিত্যের খরা কাটাতে কবিতাদেবী ফেবুতে বাণ মেরেছেন।

সোনামুখীরা বলছে বাংলা কবিতায় সুনামি এসেছে। কী আছাড়িপিছাড়ি কাব্যযন্ত্রণা! না প্রসবিলে, না প্রকাশিলে কী প্রবল গর্ভযন্ত্রণা!

ফেবুতে সকলেই কবি।

কেউ কেউ নয়।

সমবেত কাব্যিক কেঁউ কেঁউ-এ ফেবুপাড়া সরগরম।

ফেসবুকে কবিতার ঢেউয়ে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব, ডেস্কটপের স্ক্রিন আর্দ্র হয়ে আছে।

অনেকেই নামের আগে ‘কবি’ জুড়ে দিচ্ছেন। স্বনির্বাচিত শিরোপা। জাস্ট ঘোষণা করে দিলেই হল আজ থেকে আমি কবি। ব্যস্। প্রোফাইল নেম ‘কবি কস্তুরী খাসনবিশ’। কস্তুরী-কবির কভারফটোতে চিড়িয়াখানায় তোলা একটা ঘাড়-বাঁকানো চিতল হরিণের ছবি।

ওই কভারফটো থেকেই না কি কস্তুরী মৃগনাভির মতো কবিতা সুবাস ছড়াচ্ছেন। এই মর্মে ৩২৬টি লাইক। ১২৩টি কমেন্ট।

এত লাইক আর এত কমেন্ট যখন কস্তুরী কবি হতে বাধ্য। এবং কস্তুরী নামী কবি।

কিংবা, ‘কবি জীবনলাল পাখিরা’। এঁর কবিতায় পাখির ছড়াছড়ি। ম্যাকাও থেকে ছাতার। মেছো বক থেকে গু-শালিক, সব পাখিই কানাইলাল পাখিরার কাছে ফেরে।

পাখিই এই কবির অনুপ্রেরণা।

গুগল-এর বিভিন্ন পাখির ছবির ওয়ালপেপারের ওপর নীচে পাশের ফাঁকা জায়গায় ইনি বেশ কায়দা করে কাব্য রচনা করেন।

ফটোশপে কবির হাতযশ আছে। দিনে দুই থেকে তিনটি কবিতা-ক্যালেন্ডার পোস্ট করেন।

লাইক ভাগ্য মন্দ নয়।

এই ফেবুকবির একটা পোস্ট মডার্ন কবিতা ‘মর্মবেদনা রং যদি হয় ম্যাকাও/হে মহাজীবন এ দিক পানে তাকাও/শূন্যতা যদি বন্ধুনি হয় কবোষ্ণ পাতার/চুপ কেন চেঁচাও হে ধূসর ছাতার’-এ। ২৮৭টা লাইক পড়েছিল।

জীবনলালের মতো ফেবুকবি আছেন যাঁরা কবিতা ছাড়া থাকতে পারেন না। খেতে পারেন না। ইয়েও করতে পারেন না। অবশিষ্ট জাগতিক কাজকর্ম কিছু করতে এবং কবিদের পৃথিবী ঘূর্ণায়মান রাখতে হলে ফেবুকবিদের দিন প্রতি চার-পাঁচটি পোস্ট করতেই হল।

অন্যথায় গা বমি বমি, শিথিলতা, চোয়া ঢেঁকুর সব কত্ত কী হয়! এবং বাকি কাজ মাটি। পৃথিবীকে সচল রাখতে গেলে লিখতেই হয়।

ফেবুতে নজর রাখলে চোখে পড়বে কবিতা নিয়ে হরেক কিসিমের খিল্লি খলবল করছে। কবিতা নিয়ে একশত আট প্রকারের গ্রুপ। কবিতার পেজ। ‘কবিতার আমি-তুমি’, ‘রাতজাগা কবিতা’, ‘ভোরের কবিতা’, ‘প্রেম-প্রলাপ ও প্রিয় পাশবালিশ’, ‘বোবা কবিতা’, ‘কবিতা কারে কয়’-এর মতো অষ্টোত্তর শতনামের গ্রুপের আ্যাডমিনরা কিংমেকারসুলভ আত্মপ্রসাদ পেয়ে থাকেন। বলা নেই, কওয়া নেই। ঘাড় ধরে এনে গ্রুপে জুতে দেবে। গ্রুপে বা পেজে কবিমেকাপ কৃত আপনার নির্ধারণ করবে আপনি কবি, না কবি না।

যাঁরা ফেবুকবি এবং লিঙ্গ পরিচয়ে মহিলা তাঁদের কে যেন বুঝিয়েছে, কবিতা লিখতে গেলে চওড়া পাড়ের খুনখারাপি রঙের শাড়ি, মাটির গয়না এবং আটার রুটির মতো বড় টিপ পরতেই হয়। শক্তির ‘ছবি আঁকে ছিঁড়ে ফ্যালে’-র স্টাইলে অনেকে আবার টিপ পরে মুছে ফেলেন। এতে নাকি ওঁর কবিতার বিমূর্ততা খোলতাই হয়।

তার পর ছাদের টবের পাশে বসে, ঘরের পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে, কম্পিউটার টেবিলে আধশোওয়া হয়ে ঈশান কোণে তাকিয়ে ছবি তুলে পোস্ট করতে হয়। সঙ্গে ক্যাপশন, ‘যখন কবিতা আসছিল মনে’, ‘কাব্যচর্চার উদাস ঘন মুহূর্তে’, ‘কবিতা তোমার সঙ্গে আমার একান্ত যাপন/ইউজ অ্যান্ড থ্রো পেন জানে তুমি কতটা আপন’।

কখনও বা গানে আলতো ডটপেন চেপে ধরে ফেবুকবিদের একান্ত আপন কবিতা যাপনের ছবি অলটাইম হিট। লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। এই বন্যা প্রবণতা মাথায় রেখেই কি না কে জানে, সে দিন এক ফেবুকবি পোস্ট করেছিলেন, ‘এসো কমেন্ট এসো লাইক রাশি রাশি/নিসর্গের বিবমিষায় কবিতা আজ বানভাসি।’

বইমেলায় শঙ্খ ঘোষের পাশে, এক রবিবারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটে লিটলম্যাগ দিতে, জয় যখন ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ অটোগ্রাফ দিলেন, শান্তপুরে শ্রীজাত ও আমি— ইত্যাকার ছবিতে ফেবুকবিদের প্রোফাইল ভরে ওঠে।

শঙ্খ-সুনীল-জয়-শ্রীজাতর সঙ্গে যে ফ্রেম তৈরি হয়, তার কিনারে কেউকেটা হয়ে ওঠার কেউটে ফোঁস করে ওঠে।

ফেবুকবিও ইনস্ট্যান্ট খাতির চলমান সিঁড়িতে পা রাখেন। এর পর কিঞ্চিৎ প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে জাস্ট কদম কদম বঢ়ায়ে যা। ধাপে ধাপে গাঁটের কড়ি খরচ করে ‘ঝুলবারান্দারফুল’ কিংবা ‘অমলতাসের অপমান ও অগস্ত্যযাত্রা’ শিরোনামে কাব্যগ্রন্থ।

লিটল ম্যাগাজিনের জার্সি ত্যাজিয়া সম্প্রতি হওয়া প্রকাশকদের হাত ধরে খ্যাতির খুন্তি নাড়াচাড়া। ফেবু-কড়াইতে ‘আমাকে দেখুন’ শীর্ষক ছ্যাঁকছোঁক শব্দ। প্রতিষ্ঠানকে তেড়ে গাল দেওয়া এবং শেষমেশ প্রতিষ্ঠান হতে চাওয়া লিটলম্যাগরা কবি বানানোর এক-সে-এক মেডইজি বের করছে। ‘আসিতেছে আসিতেছে’ শোরগোল ফেলে ফেবুতে কবির ছবি সহ বিমূর্ত-কলার কালার কভারপেজ। প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থের কোথায় একটা যেন উদ্বোধন হবে। একজন পরিচিত কবি উদ্বোধন করবেন। দু’জন প্রায় পরিচিত কবি সম্মাননা পাবেন। এঁদের মধ্যে একজন আবার নামী দৈনিকের পুস্তক সমালোচনা বিভাগে কর্মরত। কবির সেটিং হয়ে গেছে। কবিতা পড়বেন তেতাল্লিশ জন তরুণ কবি। সঙ্গে গান আর আড্ডা। সব খরচ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে ধরা আছে। প্রি-উদ্বোধন আর পোস্ট-উদ্বোধন, দুগনা খ্যাতির খপ্পরে পড়ে ফেবুতে কত হয়ে গেল চুপি চুপি ঢিঙ্কাচিকা!

অনেক ফেবুকবি আাবার খাসা স্মার্টফোনে কবিতাপাঠ রেকর্ড করে ইউটিউবে আপলোড করে দিচ্ছেন। ইউটিউব-এ লিঙ্ক ফেবুতে পেস্ট করে প্রায় গলা জড়িয়ে আব্দার করছেন আমার ‘গভীর রাতের ঘুম ভাঙা কবিতা’ শুনুন, পড়ুন আর লাইক দিন।

অনেকে ইনবক্সে এসে দিনে এক গন্ডা কবিতা গুঁজে দিয়ে দাঁত-বার করা স্মাইলি দিয়ে বলছেন, ‘চাট্টি চান-না-করা কবিতা দিলাম, আমি চান করে আসি। মতামত ইনবক্সে নয় ফেবু পেজে দেবেন।’

ইগনোর করলে হুমকি দিচ্ছেন, বাংলা কবিতাকে সম্মান করতে জানেন না, পাষণ্ড আনকলর্চড অ-বাঙালি কোথাকার!

ফেবুকবিরা আপন আপন প্রতিভা প্রকাশে যাকে, তাকে নামী কবিকে কবিতা ট্যাগ করে থাকেন। ফেবুর অলটাইম হিট এভার-অ্যাংগ্রি প্রতিবাদী লব্জ হল: ‘আমাকে কবিতা ট্যাগ করলে কবি আপনাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হব।’ চোর না শোনে ধর্মের কথা ফেবুকবির কলজেয় কবিতার ব্যথা। এই ব্যথাহর জালিম লোশন একমাত্র ফেবুতেই মেলে।

পুজোর আগে আর স্বচ্ছ ভারত অভিযানের শুরুয়াত পর্বে চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক পরিচিত তাঁর ফেবু প্রোফাইল ঝাড়াইবাছাই করছিলেন। সাড়ে চার হাজার ফেবুফ্রেন্ডের মধ্যে দু’দফায় ছয়শো অষ্টআশি জনকে আনফ্রেন্ড করার পর সেই পরিচিত একটু হাল্কা বোধ করছিলেন, ইনহেলারও নিতে হচ্ছিল না।

ঠিক সেই সময় হঠাৎই ওই পরিচিতর টাইমলাইনে আর মেসেজ বক্সে বিষাক্ত বিদ্রুপ আর বিদ্বেষ মাখা ছন্দ মেলানো ও গদ্য কবিতায় জোয়ার খেলতে লাগল। একটা এগজাম্পল: ‘বুঝবে না সে কি বুঝবে/কবির ভাবনার মর্মবেদনা/আপনাকে খেয়ে ফেলবে হাহাকারের হালুম/ছিঃ! আপনাকে এই বলে দিয়ে গেলুম!!’

পরিচিত ব্যাপক ডিজিটাল-ডিলেমার তাড়সে ফেবুতে যোগাযোগ করতেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘কাদের আনফ্রেন্ড করেছেন মশাই?’’

কাঁদো কাঁদো হয়ে জানিয়েছিলেন, ‘‘ঝাড়াই মালদের মধ্যে ছয়শো জনই বাঙালি ফেবুকবি ছিলেন। অষ্টআশি জন নন-কবি।’’

‘‘কাজটা ভাল করেননি, পাপ করেছেন, ওঁরা তো ফেবুকে কবিতাই লিখছিলেন, টেররিস্ট তো নন।’’

এ সব বলাতে পরিচিত প্রাথমিক ভাবে ঝিমিয়ে যান। পরে টেনশনে হৃত হ্যাঙ্কারচিপ হাতে তুলে কপাল আর ঘাড়ের ঘাম মুছে ধাতস্থ হয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ্যাতো গাদা গাদা কবি থাকাটা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।’’

‘‘কেন মশাই, ফেবুকবিরা আপনাকে কি ইয়ে করেছে? কবি না হয়ে সমসংখ্যক চিটফান্ডের মালিক বা গাঁটকাটা হলে কি খুশি হতেন?’’

‘‘ফেবুতে হররোজ এ্যাতো এ্যাতো কোব্তে আর কবি, তেত্রিশ দিন পর কোন কবির কোন লাইনটা মনে থাকে শুনি, অ্যাঁ?’’

নিন্দুকরা বলেন, টেলিভিশনের সব জোক যেমন ‘অসমশা...’, সব নাচ গানের সমস্ত প্রতিযোগীর ‘পারফরমেন্স যেমন ‘ফ্যান্টাবুলাস, ফ্যান্টাস্টিক’, ফেবুকবিদের সমস্ত রচনাই তেমন অসাধারণ-অনবদ্য-অতুলনীয়।

এত আগমার্কা কবিতার আয়ু জোনাকির আয়ুর চেয়ে বেশি হয় না কেন?

এ সব প্রশ্নের মাঝেই আবিষ্কৃত হয়, পুর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা কে যেন নিজের নামে চালিয়ে শ’খানেক লাইক আর কমেন্ট বাগিয়ে নিয়েছে, এর কবিতা শুধু শিরোনাম বদলে ও হাতিয়ে নিয়েছে, এ আবার ভার্চুয়াল আস্তিন গোটাচ্ছে।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিনে এক জনের ইনবক্সে আর এক ফেবুকবি সাশ্রু লিখে ভাসিয়েছে: এই শীতের শুরুতে শক্তির ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ লাইনগুলো বড় বেশি করে মনে পড়ছে।’

কবিদের সদ্ভাব সর্বজনবিদিত। কবিরা কদাপি হিংসুটে বা পরশ্রীকাতর নন, এটা দিনের আলোর মতো অল ক্লিয়ার।

ক কবি এলিট পুরস্কার পেলে, সরকারি অতিথি হয়ে বিদেশে কবিতা পড়তে গেলে, কিংবা তাঁর মহিলা অনুরাগীর সংখ্যা বেশি হলে, খ, গ, ঘ, ঙ এবং ণ কবিরা তঁকে একটুও হিংসে করেন না, এটা সকলেই জানেন।

কবিদের এই পারস্পরিক প্রেমে আর ভ্রাতৃত্বূবোধ ফেবুতে জ্বলজ্বল করে, কোন ফেবুকবি কোন ফেবুকবিকে এসএমএস বা চ্যাটে চমকেছেন, কে কার পিছনে ছিঁচকে চোর বা ফেউ লাগিয়েছেন, কোন ফেবুকবি ফেলো কবিকে ফেলে পিটিয়ে কাব্য সন্ত্রাস কায়েম করতে চাইছেন, কবিতা নিয়ে এ সব ফেবুফাজলামো নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ও সবে কান-চোখ না দেওয়াই সমীচীন।

যেটা উল্লেখ্য, তা হল ফেবুকবিরা পারস্পরিক চ্যাটাচ্যাটিতে ভীষণ দড়। তোল্লা দিতে কবিতার ব্লগে, ওয়েবজিনে কোথারার কোন ফেবুকবির দ্য থিঙ্কার মার্কা ছবি নিয়ে পরিচিতিতে লেখা হচ্ছে, ইনি বর্তমান বাংলা কবিতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ফেবুকবি সেই লেখার স্ক্রিনটা নিয়ে ফটোশপে গিয়ে কনট্র্যাস্ট আর ব্রাইটনেস বাড়িয়ে তাঁর প্রোফাইল তথা প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে নিচ্ছেন। সপ্তাহের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঔজ্জ্বল্য কমতে না কমতেই কোথা থেকে যেন বাংলা কবিতার আঙিনায় শূন্য দশকের আর এক অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিমান ও শক্তিমান ফেবুকবি জন্মাচ্ছেন। ফেবুকবিদের জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনও বালাই নেই।

বালাই ষাট। অই দেখুন, ফেবুতে চোখ রাখুন, এক বাঙালি কবি জাস্ট এই মাত্র অত্যাধুনিক, মারকাটারি সাহসী কবিতাটি প্রসবিলেন। টাটকা থাকতে থাকতেই পড়ে ধন্য হউন— ‘কবিতার কুঁড়ি ফোটে জোছনার ঘরে/কথাভ্রূণ উড়ে যায় পরিযায়ী ঝড়ে/ হৃদয় নিঙড়ে নেয় এঁটো শালপাতা/ ছাদে মেলা কাশফুল আর ম্যাগি হাতা/ভ্রূণ পায় ডাস্টবিন/শব্দ পায় কবি/কথা দে, তুই শুধু আমারই হবি।’

আহা! আহা! আহা!

লাইক দিন! লাইক দিন!

অলংকরণ: দেবাশীষ দেব