প্রেমের অভিধানে মেনে নেওয়া যেমন থাকে, তেমনই থাকে কিছু বিদ্রোহও। তা বাংলা সিরিয়ালের মাপে নয়, তার নিক্তি প্রেমের অভিমান। তাই কিছু অভিমান প্রেমের নিজস্ব বিদ্রোহ। সংসারে তা ঘটে। ঘটে থাকে বৃহত্তর নাটদালানেও। তবে তা ঘটে চরিত্রেরা যদি সৎ হন। 

জর্জ বিশ্বাস সৎ প্রেমিক ছিলেন বলেই তাঁর তথাকথিত বিদ্রোহটিও সৎ অভিমান-সঞ্জাত। গান তাঁর প্রেম ছিল। প্রেম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্রেমের কারণেই রবীন্দ্রনাথের গানপথের পথিকদের প্রতিও ভালবাসা ছিল তাঁর অগাধ। তাঁদের কারও কারও কাছ থেকে আঘাত পাওয়ায় প্রেমের গায়ে অভিমানের ছায়া পড়েছিল। কিন্তু তাঁর মন মর্ষকামী। সৎ প্রেমিকের হয় যেমন! ‘তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো’! দেবব্রত বিশ্বাসও সিদ্ধান্ত নিলেন, সতীর্থদের সঙ্গে যুদ্ধে যাবেন না তিনি। অর্জুনও যা পারেননি, জর্জ বিশ্বাস পারলেন। যুদ্ধে গেলেন না। কার্যত নিজের গানকে ঘরবন্দি করে রাখলেন।

 

ধানের খেতে রৌদ্র-ছায়ায়

গাঁ-বাংলার ছবির মধ্যে জন্মেছিলেন। সারল্য তাই তাঁর চিরসখা। ১৯১১ সালে পৃথিবীর আলো দেখা সেই মানুষটি তাই যখন ‘আলো’ শব্দটি উচ্চারণ করতেন, যেন বিচ্ছুরণ ঘটত। তাঁর উচ্চারণ, তাঁর গায়কি, তাঁর ভারী কণ্ঠের ব্যক্তিত্ব প্রশ্নের মুখে যে পড়েছিল, তার কারণ বিচ্ছুরণ অনেকের চোখে সহ্য হয় না। বিশেষত, পণ্ডিতম্মন্যদের চোখে তো নয়ই। 

দেবব্রত বিশ্বাসের ঠাকুরদা কালীমোহন তাঁদের ইটনা গ্রাম থেকে বিতাড়িত হন ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায়। বিতাড়ন আর প্রত্যাখ্যানের সেই আঁচ পোহাতে হয়েছিল দেবব্রত বিশ্বাসকেও। শৈশবে ইটনা গ্রামের স্কুলে তাঁকে ‘ম্লেচ্ছ’ বলা হত। সেই ‘ম্লেচ্ছ’ পরিবারেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সুরের, গানের, রবীন্দ্রগানের। মায়ের কাছে শুনতেন-শিখতেন ব্রহ্মসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত। মহেন্দ্র রায়ের কাছে দেশের গান। শুরুর সেই ভিত তাঁকে লড়াই করার সঞ্চয় জুগিয়েছিল নিশ্চিত। 

ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় পড়তে এলেন। ১৯২৭ সাল। তার পিছনেও অন্য ইতিহাস। কলেজে সরস্বতী পুজোর অনুমতি দিলেন না সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ছাত্রেরা আন্দোলন শুরু করলেন। সে আন্দোলন সমর্থন পেল সুভাষচন্দ্র বসুর। আন্দোলনের বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথ। পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হল। সিটি কলেজ ছাড়ার ডাক দিলেন আন্দোলন সমর্থনকারী নেতারা। কলেজ প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। ছাত্রসংখ্যা কমে যাওয়ায় চাকরি গেল কিছু শিক্ষকের। তাঁদেরই একজনের নাম জীবনানন্দ দাশ। কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্র জোগাড় করতে একটা উপায় ভাবলেন। ব্রাহ্ম পরিবারগুলির কাছে আবেদন জানালেন তাঁদের কলেজে সন্তানদের পাঠাতে। পরিকল্পনা খানিকটা সাফল্যও পেল। সেই সূত্রেই দেবব্রত বিশ্বাস পড়তে এলেন সিটি কলেজে। 

এর পরের বছরই তাঁর রাজাধিরাজ দর্শন ঘটল। ঠিক এমনই মনে হয়েছিল জর্জের। তাঁর নাম জর্জ হয়ে গিয়েছিল ছোটবেলাতেই। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় যে গির্জার হাতে ছেলেকে সঁপে দিয়েছিলেন বাবা দেবেন্দ্রমোহন, সেখান থেকেই তাঁর নাম দেওয়া হয় জর্জ। কারণ, ইংল্যান্ডের রাজা তখন পঞ্চম জর্জ। ১৯২৮ সালে জর্জের যে রাজাধিরাজ দর্শন ঘটল, তিনি অন্য রাজা— সুরের রাজা, শব্দের রাজা, বাংলা কাব্যগীতির রাজা। রবীন্দ্রনাথ। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে ভাদ্রোৎসবে দেবব্রত বিশ্বাস প্রথম দেখলেন তাঁর দেবতাকে। রোগজীর্ণ রবীন্দ্রনাথ সে সভায় গানও গেয়েছিলেন। এ সৌভাগ্যকে কখনও ভোলেননি দেবব্রত। পরে আবারও সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন কবির। কিন্তু কার্যত দূর থেকে। সে আক্ষেপও ভোলেননি কখনও।   

 

তপোবনের সামরব

‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানে জর্জ বিশ্বাস ‘ভরা’ শব্দের উচ্চারণ কেমন করে করেন, তা নিয়ে বিশ্ববরেণ্য এক চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎকার ভিত্তিক আলোচনা করছিলেন বরেণ্য এক সঙ্গীত সমালোচক। খানিকটা রঙ্গরসের সঞ্চার হয় সেখানে, যখন তাঁরা দু’জনেই আবিষ্কার করে বসেন যে, জর্জ বিশ্বাস ‘ভরা’ শব্দটিকে ‘ভওরা’ উচ্চারণ করেন। শিল্পীর গলায় গানটির একাধিক ‘ভার্সন’ পাওয়া যায়। ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমলগান্ধার’ ছবির গানে কেউ কেউ ‘ভওরা’ খুঁজে পান। কিন্তু সেটা কি উচ্চারণ বিকৃতি? না কি বিশেষত্ব? ‘বিস্ময়ে’ উচ্চারণটিও কি বিকৃতি? না কি বিশেষত্ব? এ প্রশ্ন উঠবেই। গোটা গানটির প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে এই বিশেষত্ব রয়েছে। আর তা আছে বলেই বাঙালি জর্জ বিশ্বাসের ‘আকাশ ভরা’ ভুলতে পারে না। ‘ভরা’ই হোক বা ‘ভওরা’— ভুলতে পারে না। ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি’ গাইছেন যখন তিনি, তখন সত্যিই পা পড়ছে ঘাসের কোমলে। সে কোমলতা আরও হালকা হচ্ছে দ্বিতীয় বার ‘পা’ ফেলার মুহূর্তে। ফুলের গন্ধে যে ভাবে ‘চমক’ লাগছে, তা এর আগে শোনেনি বাঙালির কান! সেই ‘চমক’ও দ্বিতীয় বার আরও প্রাখর্যে চমকে দেয়! আর তার পরেই ‘আনন্দেরই দান’ যেন চরাচরের প্রসারতায় ছড়িয়ে পড়ে প্রগাঢ় শান্তি নিয়ে। শ্রোতা শুনতে পান শান্তির সেই অন্তহীন কোমল রসের আস্তরে গায়ক আলতো করে ‘কান’ পাতছেন। কণ্ঠের আয়নায় মুহূর্তে যেন ভেসে ওঠে এই গ্রহে আদিমানবের প্রথম বিস্ময়!

এই একই গানের বেসিক রেকর্ডে ধরা দেয় বীররস। যন্ত্রানুষঙ্গে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। যদিও অতি সাধারণ ঠেকার তবলা। গতি তুলনামূলক ভাবে দ্রুত এবং স্টাকাটো চলন। ‘ভরা’ শব্দের উচ্চারণে স্বরধ্বনি এখানে কম দীর্ঘ। এখানেই মনে হয়, ছবির প্রয়োজনে খানিক ধীর লয়ের ভার্সনে তাঁর ওই একই শব্দের উচ্চারণ ভেবেচিন্তেই করা। 

উচ্চারণ নিয়ে তাঁর মতো করে চিন্তাভাবনা আর ক’জন বাঙালি করেছেন, তা নিয়ে ভাবতে হয় বইকি! ‘সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে’ গাইতে গিয়ে ‘স্মরণবেদনার’ উচ্চারণে তাঁর ‘বে-দ-না’য় মুহূর্তে ম্যাজিক ঘটে যায়! কিংবা ওই অংশে— ‘এ কথা শিখানু যে আমার বীণারে’/গানেতে চিনালেম সে চির-চিনারে’! রবীন্দ্রগানে আপন ঐশ্বর্যে নিজেকে চিনিয়েছেন দেবব্রত। 

‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ গানে যে জর্জ বিশ্বাস, তিনি যেন ছবিরই চরিত্র। কান্নার মতো একটা গান। হারমোনিয়াম ধরে রেখেছে সেই কান্নাকে, একেবারে শেষে সরোদের আচমকা অনুপ্রবেশের সময়টুকু ছাড়া। সহশিল্পী গীতা ঘটকের সঙ্গে এ গানে এক আবিল করুণ রস। ‘ভাঙল’ শব্দ যেখানে ভাঙন প্রত্যক্ষ করায়, ঝড়ের ‘ড়’ যেখানে বাতাসগতির নির্ণায়ক হয়, বেড়ার ঘরের ছিটে আলো-আঁধারিতে যেখানে দু’টি চরিত্রের অসহায়তার মাথায় হাত রাখে সুর, তাকে গভীরতর কোনও বিপন্নতার অলঙ্কারে সাজায়, তারা অন্ধকারে পড়ে থাকে ‘সকল মানি’। আবার পরক্ষণেই সেই বিপন্নতা উপলব্ধির বিস্ময়ে অনূদিত হয়— ‘ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা, তাই কি জানি’! বুকে কাঁপন ধরায় বাংলা কাব্যগীতির সেই বাচিক অভিনয়! ‘ঘরভরা’ ‘শূন্যতা’র কাব্যালঙ্কার সার্থক হয়। গীতা ঘটকের ‘ঘর’ উচ্চারণ সেখানে বেশ-খানিকটা তথাকথিত ‘শান্তিনিকেতনী’ আর জর্জ বিশ্বাসের ‘ঘর’ উচ্চারণে যেন অন্য কিছু, অন্য পরিসর! যেন সে ঘর অমলের! সে ঘরে যেন প্রবেশ করছে দীর্ঘপ্রতীক্ষিত রাজার চিঠি! ‘সকালবেলায় চেয়ে দেখি/ দাঁড়িয়ে আছ তুমি এ কী’— যেন দেখা যায়, ঘর আর শূন্য নেই! দাঁড়িয়ে আছেন দুই ব্রাহ্মের বিশ্বাসব্রহ্ম!

 

রুদ্ধসঙ্গীত

উচ্চারণের মতোই দেবব্রত আপস করেননি নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করতে। সোজা কথা স্পষ্ট ভাবে বলতে সঙ্কোচ করেননি কখনও। ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান’ ছিল তাঁর প্রথম রেকর্ড। ১৯৩৮ সালে, গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে, কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈত ভাবে। পরের রেকর্ড ১৯৬১ সালে। হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি থেকে। দু’টি রবীন্দ্রসঙ্গীত— ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ আর ‘যেতে যেতে একলা পথে’। বাঙালি নড়ে বসল। যদিও তত দিনে ভারী কণ্ঠের বাতাস বইয়ে দিয়েছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও একই পথের পথিক। তবু দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় নতুন কিছু পাওয়া গেল। পাওয়া গেল গানের অভিনয়। এই শব্দবন্ধে আপত্তি থাকতে পারে অনেকের। কিন্তু আপত্তির কোনও কারণ নেই। সুরারোপিত শব্দগুচ্ছের কাঠামো যদি গান হয়, তবে তার প্রায়োগিক বয়ানে অভিনয় থাকবেই। এ অভিনয় মঞ্চের নয়, পর্দার নয় অবশ্যই। এ অভিনয় সুরশব্দের অর্থকে ভাবে পরিস্ফুট করা। দেবব্রত গাইছেন রবীন্দ্রনাথের গান, যা কাব্যগীতি। তাতে সফল সব কণ্ঠেই কোনও না কোনও ভাবে প্রকাশ পেয়েছে ভাব। তবে, প্রত্যেকের বয়ান আলাদা। পঙ্কজকুমারের অভিনয়ের সঙ্গে দেবব্রতের অভিনয়েরও তাই কোনও মিল নেই। পঙ্কজের ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ যদি ট্রেমেলোর ঝটিকা-আবহ তৈরি করে, তো দেবব্রতর ‘যেতে যেতে একলা পথে’তে সে ঝড়ের পুঞ্জীভূত গতি পাওয়া যায়। দেবব্রত বিশ্বাসের গানে তাই নিবিড় ভাবে কান পাতল বাঙালি।

সব কিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু অন্য মেঘ ঘনাল ১৯৬৪ সালে। এ যাবৎ কিছু না বললেও এ বার দু’টি গানে আপত্তি তুলল বিশ্বভারতী মিউজ়িক বোর্ড। মিউজ়িক কোম্পানির কাছে চিঠি এল। ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ আর ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’। আরও কিছু কারণের পাশাপাশি বলা হল, ওই দু’টি গানের পরিবেশনায় নাকি অতিনাটকীয়তা রয়েছে। বোর্ডের সঙ্গে কথা বলেন দেবব্রত। জানান, বোর্ডের এই ভাবনার সঙ্গে তিনি সহমত নন। কিছু চড়াই-উতরাইয়ের পরে গান দু’টি অনুমোদন পেলেও তাঁর পথে পাথরের সংখ্যা বাড়তে থাকল। বারেবারে আপত্তি আসতে থাকল বিশ্বভারতী থেকে তাঁর গান নিয়ে। ১৯৬৯ সালে আরও দু’টি গানকে বাতিল করল বিশ্বভারতী মিউজ়িক বোর্ড। ‘পুষ্প দিয়ে মারো যারে’ আর ‘তোমার শেষের গানের’। স্বরলিপি না মানা আর অতিরিক্ত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহারের অভিযোগ। রবীন্দ্রনাথের গানে কী কী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে, তার একটা তালিকাও তৈরি করেছিল মিউজ়িক বোর্ড। দু’বারই বোর্ডকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন দেবব্রত। মিউজ়িক কোম্পানির অনুরোধে একাধিক চিঠিও লিখেছেন। সেখানে নিজের যুক্তির কথা বলেছেন। বোর্ডের নির্দেশিকার সঙ্গে বিরুদ্ধমত পোষণ করেই সেই সব চিঠি। তিনি তাঁর যুক্তি সাজালেন ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীত বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখালিখির উল্লেখ করেই। ক্রমশ চাপান-উতোরে বিষণ্ণ হলেন। অপমানিতও বোধ করলেন। এর পরে বন্ধ করে দেন রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করা। বাইরের অনুষ্ঠানও ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেন। এই যবনিকা যখন টানছেন তিনি, তখন সে সময়ের বহু নামী শিল্পীর চেয়ে তাঁর বার্ষিক রয়্যালটির পরিমাণ বেশ কয়েকগুণ বেশি!

নিষিদ্ধ করার বিষয়টি খানিকটা হালের নোটবন্দির মতোই! একে তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরিত করার সঙ্গে তুলনা করাও কঠিন! কারণ, তুঘলকের তবু একটা চিন্তাভাবনা ছিল বিষয়টার পিছনে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে বেঁধে দেওয়া কয়েকটা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গেই গাইতে হবে কেন? কোথাও লিখে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ? ইউরোপীয় বাজনায় রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল? তাঁর গানের সঙ্গে তাঁর জ্যোতিদাদা পিয়ানোয় বসতেন না? ইন্দিরা দেবী তো পিয়ানো বাজিয়েই রবীন্দ্রনাথের একাধিক গান শিখিয়েছিলেন, গাইয়েছিলেন দেবব্রতকে! ছন্দে যদি স্পন্দ সম্মান পায়, তবে গ্রেসনোটের অ্যাডভান্টেজ নেওয়া অপরাধ হবে কেন? রবীন্দ্রনাথ তো বলেছিলেন, কণ্ঠ গায়কের, গায়কের কণ্ঠে গায়ক তো গোচর হবেই! এ সব প্রতর্ক জীবনভর ভাবিয়েছিল তাঁকে। সে কথা লিখে গিয়েছেন, বলেওছেন নানা জায়গায়। কারণ তিনি সঙ্গীত বিষয়ে রবীন্দ্রভাবনা কী, তার গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। 

 

পুণ্যকাহিনি

কাব্যগীতি অভিব্যক্তিকে বাদ দেবে কী করে? তাই এটাই স্বাভাবিক যে, দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে বাঙালি ‘জ্যোৎস্না’ উচ্চারণ করার পাঠ নেবে! গানে ‘মা’ শব্দের অভিব্যক্তি কেমন, তা বোঝা যায় ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ গানটিতে। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় হাজির দেবব্রত। রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা তৈরি। কিন্তু গাইতে নারাজ ঋত্বিকের জর্জদা। বলছেন, গলা খারাপ।  স্টুডিয়োয় এসেছেন ছাত্র সুশীল মল্লিককে নিয়ে। ঋত্বিককে জানালেন, সুশীলই গাইবেন। নাছোড় ঋত্বিক। শেষে দেবব্রত রাজি হলেন। তবে সুশীলকে সঙ্গে নিয়ে গাইবেন, এই শর্তেই। 

একটু খেয়াল করলে গানটিতে দেবব্রত আর সুশীলের গলা আলাদা করা যায়। গান শুরু করছেন দেবব্রত— ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’। ‘এরা তোমায়’ থেকে ধরছেন সুশীল। দেবব্রত ফিরছেন ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’তে। গাইছেন ‘তুমি তো দিতেছ মা’। সুশীল ফিরছেন ‘জ্ঞান ধর্ম কত’তে। ফের স্থায়ীর পঙ্‌ক্তি ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ দেবব্রতর। একই ভাবে ‘মনের বেদনা রাখো মা মনে’ দেবব্রতর। পরে ‘মুখ লুকাও মা ধূলিশয়নে’ সুশীলের। ‘শূন্যপানে চেয়ে’ দেবব্রতর। ‘দুঃখ জানায়ে’ সুশীলের। ফের ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ দেবব্রত বিশ্বাসের। গোটা গানে যতবার ‘মা’ শব্দটি এসেছে, তার মধ্যে একটি ছাড়া সব ক’টি দেবব্রতর কণ্ঠে। অসামান্য গায়কি সুশীলের। কিন্তু ‘মা’ শব্দের অভিব্যক্তি যে দেবব্রতর উচ্চারণে আলাদা ভাবে ‘কিছু’, তা স্পষ্ট। একই রকম ‘মা’ উচ্চারণ মেলে ‘মা, আমি তোর কী করেছি’ গানেও।

 

পথের দাবি

কিছু বিশেষ সময়ের বিশেষ দাবি থাকে। সেই দাবির মাধ্যাকর্ষণে বাঁধা থাকে চারপাশ। অন্তত সারস্বত ক্ষেত্রে। দেবব্রত বিশ্বাস যে সময়ে গান নিয়ে ভাবছেন, রবিশঙ্করের ভাষা ধার করে বলা যায়, ভালবাসছিলেন গান গাইতে— সেই সময়টা তার নিজস্বতায় ব্যতিক্রমীই ছিল। সাহিত্য, চিত্রকলার ভাষা বদলাচ্ছিল। নতুন আকার নিচ্ছিল সঙ্গীতও। মোটের উপরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে চাইছিল শিল্প। গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে জর্জ বিশ্বাসের পরিচয় এই সূত্রেই। গণনাট্য সঙ্ঘ নিজেকে শোনাতে চাইছিল। এবং তাতে সফলও হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সে সাফল্য ক্রমশ ক্ষীণ হয়েছিল একটিই কারণে। বামপন্থী সেই সংস্কৃতি শোনাতে চেয়েছিল যতটা, ততটা শুনতে চায়নি। সফল হয়েছিলেন দেবব্রত। তিনি ব্যতিক্রমী, কারণ তিনি শুনতেও চেয়েছিলেন জীবনভর। এই চর্চাই তাঁর গায়কির ভাষা। ‘দেশ ভেঙেছে তাই বলে কি জাত-বাঙালি ভাঙবে রে’ — শৈলেন রায়ের লেখা এবং কমল দাশগুপ্তের সুরের এই গানে দেবব্রতর গায়কি তাই ভাবায়। তবলার ডাঁয়ার গালা আর বাঁয়া এ গানে পাড়ার ফাংশনের মতো বাজে। তার সঙ্গে সাবলীল চলনের দেবব্রত। এই সাধারণত্বই গানটির অসাধারণত্ব। লোকবাংলার সুর যত বার গেয়েছেন তিনি, তত বারই মাটির গন্ধ পাওয়া গিয়েছে স্পষ্ট ভাবে।

বামপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী দেবব্রত ব্যথিত হয়েছেন দেশভাগে। এই তাঁকেই মাঠেঘাটে দেখা গিয়েছে গান গাইতে। হ্যাঁ, রাজনৈতিক গানই। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের গানকে গণসঙ্গীত বলেই ভাবতেন তিনি। সে গানের উপচার নিয়েই তিনি পৌঁছে যেতেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাঁর সেই একই ভূমিকা। 

বর্ণময় জীবন! কখনও তাঁর ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে গোপনে আশ্রয় নিচ্ছেন কলিম শরাফি। কখনও কাইফি আজমিকে ধুতি-পৈতের ছদ্মবেশে সাজিয়ে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাচ্ছেন তিনি। কখনও তাঁর ছোট্ট ঘরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় রত ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রেরা। তিনি বিতর্কিত। কিন্তু বাইরে জাহির করার জন্য নয় সেই ভূমিকা। শিল্পী সংসদের অনুষ্ঠানে তাঁকে গান গাওয়ার অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন উত্তমকুমার। বহু কষ্টে রাজি করানো গেল। কিন্তু শর্ত— অনুষ্ঠানের প্রচারে বা বিজ্ঞাপনে তাঁর নাম লেখা যাবে না। সেই মতোই অনুষ্ঠানে দেবব্রতর নাম না করে উত্তমকুমারের ঘোষণাটি ছিল— এ বার গান শোনাবেন এক বিতর্কিত শিল্পী!

হারমোনিয়াম, চিঠির ফাইল, পানের সাজ, জাঁতি, দিলীপের জর্দা নিয়ে বসে থাকা ছোট ঘরের বাসিন্দাটিকে কলকাতার রাস্তায় দেখা যেত মোটরবাইকে। রাত হয়ে গেলে গান শিখতে আসা ছাত্রীদের মোটরবাইকেই বাড়ি পৌঁছে দিতেন। তাঁর বাইকে দেখা যেত তাঁর এক প্রিয়জনকেও। প্রেসিডেন্সি কলেজের পড়ুয়া মঞ্জুশ্রী চাকী। 

পরিচয় ‘নৃত্যের তালে তালে’। গেয়েছিলেন জর্জ। এলিট প্রেক্ষাগৃহে। ১৯৫২। নেচেছিলেন মঞ্জুশ্রী। তার পরে সখ্যের গাঢ়তাপ্রাপ্তি। জল্পনার উড়ান। একসঙ্গে একের পর এক অনুষ্ঠান। পরে তাঁর গানজীবন অশান্ত হয়ে উঠলেও, বন্ধু প্রবাসী হলেও, অসুখ তাঁকে ক্লান্ত করে দিলেও যোগাযোগ অটুট ছিল দু’জনের। বন্ধুকে কোনও দিন ভুলতেন না তিনি। 

 

অন্য বিপন্নতা

সুন্দর অর্থে ব্যতিক্রমী গায়কি নানা সময়ে নানা ধরনের বিপন্নতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় শ্রোতাকে। তখন তাঁর পক্ষে হয় তর্কহীন ভাবে মোহিত হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অথবা গুলিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়। নয়তো যুক্তিহীন ভাবে যুক্তির গোয়েন্দা হতে হয়। এ সত্যিই এক বিপন্নতা। শিল্প এই বিপন্নতা আনে। গায়কির সূত্রেই সঙ্গীত আনে অনেকটাই। ‘তার ছিঁড়ে গেছে কবে একদিন কোন হাহারবে’র জর্জ বিশ্বাস শুনে শ্রোতার কী অবস্থা হয়, তা কি দেবব্রত বিশ্বাস জানতেন! জানতেন কি, তিনি শ্রোতাকে দ্রাব্য করে খুন করেন! 

জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর শ্রীকণ্ঠে ‘বিমল আনন্দে জাগো’ শুনে যেমন বিপন্ন হতে হয়! উস্তাদি চলনের সে গানকে যেমন কিছুতেই মাধুর্যবঞ্চিত বলে প্রত্যয় হয় না, তেমনই তাকে রবীন্দ্রনাথের গান বলে মেনে নেওয়াও সুকঠিন হয়। আর এ সবের মাঝে সে গানে ভোর হয়, আলো ফোটে, আনন্দ জাগে। দেবব্রত যখন ‘এসেছিলে তবু আস নাই’ গাইছেন, তখন সেখানে যেন জল পড়িতেছে, পাতা নড়িতেছে! ‘পাতায় পাতায়’ ‘বিন্দু বিন্দু’ জলের ঝরে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে! যায়! কিন্তু প্রায় সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে, অনেক পরের একাধিক জনপ্রিয় শিল্পীর গাওয়া একই গানে হাজার প্রয়াসেও তা হয়নি! নানান মুদ্রাভঙ্গির পরেও জলপতনের আবেশ আসেনি! ‘অতিনাটকীয়তা’ শব্দটি হয়তো সে সব জায়গাতেই প্রযোজ্য, দেবব্রতর ক্ষেত্রে নয়। আজ এত বছর পরেও বাঙালির কান দেবব্রতে লীন! কত আসা, কত যাওয়া! দেবব্রত রয়েই গেলেন! 

বিপন্নই করেন দেবব্রত বিশ্বাস। বিপন্ন করতে করতে শ্রোতার অজান্তেই তাকে ভাসিয়ে তোলেন চেতন-অবচেতনের নির্জন এক দ্বীপভূমিতে। পরাবাস্তব সে নির্জনতায় সঙ্গে থাকেন নির্জন রবীন্দ্রনাথ।