যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ করছেন ঋত্বিক।
পরিচিত মহলে বলছেন, ‘‘ছবিতে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত থাকবে। এবং জর্জদাই গাইবেন।’’
ঘনিষ্ঠরা জিজ্ঞেস করেন, ‘‘কোন গান ঋত্বিকদা?’’
ঘটকবাবু তো নিজেই জানেন না, উত্তর দেবেন কী!
দিন এল রেকর্ডিংয়ের। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োর স্কোরিং থিয়েটারে জর্জ এলেন। মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি। সাদা পাজামা। কাঁধে ঝোলা, মুখে পান। বাঁ দিকে হেলানো মাথা। চশমার ফ্রেমের ভিতর, গহন চাহনিতে, অদ্ভুত এক মায়ারং-আলো খেলা করে যেন প্রতিক্ষণ।
ফ্লোরে ঢুকেই ঋত্বিকের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘‘দ্যাখ ভবা, আমরা ঠিক আইস্যা পড়ছি।’’
ঋত্বিক বললেন, ‘‘সব কিছু রেডি আছে জর্জদা। একবার শোনালেই, ফাইনাল টেক হবে।’’
বিধি বাম। হঠাৎ জর্জ বললেন, ‘‘আমি তো বাবা তোরে আগেই কইসি, গলা খারাপ। আমি গামু না!’’
সে কী! কে গাইবে এ গান?
বুঝি চৌচির স্বপ্ন-সংকল্প!

জর্জের গলার ওই বিস্তার, মন্দ্র সপ্তকে স্থিতি-গাম্ভীর্য? দিল খোলা মর্জি-গায়ন?

‘‘না। আমি তো তোরে আগেই কইসি। এ বার আমারে ছাইড়া দে। আমার ছাত্র সুশীল গাইব!’’

বার বার অনুরোধ ঋত্বিকের। জর্জ শুনছেন না কিছুতেই। শেষে, ঋত্বিকের প্রায় কাকুতি মিনতি—

‘‘প্লিজ জর্জদা, প্লিজ এটা করবেন না। এ গান, ছবির যে সিচুয়েশন, আপনি না গাইলে হবে না! প্লিজ!’’

জর্জ তবুও অনড়। মেঝের দিকে মাথা নিচু করে তাকিয়ে তাঁর নির্লিপ্ত ভঙ্গি।

সে দিন স্টুডিয়োতে ছিলেন তুষার তালুকদার। পরে যিনি পুলিশ কমিশনার হবেন। ‘উন্মুক্ত ব্রাত্যজন’ তথ্যচিত্রে তাঁর সে দিনের স্মৃতি—

‘‘ঋত্বিকদা কারও কাছে কাকুতি মিনতি করার লোক নন। বরং ওনার মর্জি মতো ব্যাপারটা না ঘটলে, ভীষণ রেগে গিয়ে এমন ভাবে রিঅ্যাক্ট করতেন, সেটা না বলা ভাল। কিন্তু, এই ব্যতিক্রম দেখলাম জর্জদার ক্ষেত্রে। এবং সেটা জর্জদার ক্ষেত্রেই সম্ভব। আলটিমেটলি একটা সমঝোতা হল যে, গানটা শুরু করবেন জর্জদা। ফলো করবেন সুশীল।’’

রেকর্ডিং হল। জর্জ গাইলেন। সঙ্গে তাঁর ছাত্র সুশীল মল্লিক। রবীন্দ্রনাথের পঁচিশ বছর বয়সে লেখা গান। কাফি রাগে। ‘কেন চেয়ে আছো গো মা’। ছবিতে অভিমানী জর্জের গায়ন আর এলোমেলো যাপনের ঋত্বিকের ক্লোজআপ ফ্রেম মিলেমিশে হল একাকার।

বাকিটা সেলুলয়েডের কিংবদন্তি।

শ্রাবণ মেঘের আড়ালে ঢাকছে জর্জের ‘কইলকাত্তা’। 

কালো হয়ে আসছে আকাশ। কালো?

মেঘ নামছে গঙ্গার জলের উপরে। গড়ের মাঠে। রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের নিভৃত গলিটার মাথায়।

এক সময় মেঘদূত মহল্লার হাওয়ার গায়ে ভেসে এল যেন ধৈবত বর্জিত রাগের বন্দিশ। ‘রিমি ঝিমি রিমি ঝিমি বুঁদন বরখে, তাসোই/ সোহাবন মন ভাবন শাবনকি ঋতু মোরে সজনুবাঁ’। মল্লারের খেয়ালে অনতিপর এল বৃষ্টি। ‘ঝিমুর ঝামর, আকাশ চেরা’ জলঝারিতে ভিজছে শহর।

মেঘমেদুর বাদলের দিন মানেই জর্জ বড় একটা ছাতা নিয়ে ভাগ্নিদের ডেকে বসবেন গলির মুখে।

রবিঠাকুরের বর্ষার গান যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়! ছাতার আড়ালে ভিজতে ভিজতে লিরিকের রেশ রেখে গেয়ে চলেন, ‘শ্রাবণ মেঘে আধেক দুয়ার খোলা’, ‘বহু যুগের ওপার হতে’, ‘আবার এসেছে আষাঢ়’। মেঘের পাখোয়াজ শুনতে শুনতে বিরতিবিহীন কোনও কোনও দিন বা শোনা যায়, ‘এ কী গভীর বাণী এল’, ‘নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জছায়ায়’ ‘আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া’।

সে সব কথা এখনও তাঁর স্বজনের স্মৃতির মণিকোঠায়।

১৭৪-ই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ঘরটিই ছিল জর্জ বিশ্বাসের সাম্রাজ্য।

ভেজানো কাঠের দরজা। ও পারে ছোট্ট গলি। গেট খুলে বারান্দা। ঘরের ভিতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছোপধরা পিকদান। অগোছালো বিছানায় ডাঁই করে রাখা গানের খাতা। ক্যাসেট, হটব্যাগ, মারফি রেডিয়ো। ছোট্ট টিভি। ইনহেলার। কাঠের সেল্ফ। সেল্ফে স্বরবিতান।

কাউকে হাত দিতে দিতেন না। সব হাতের কাছে রাখতেন। তার পর যখন অসুস্থ হলেন, ডাক্তারের কথায় ঘরের ভিতরে জানালার জাল কেটে ফেলা হল। সারাক্ষণ ইজিচেয়ারে। সেখানেই ঘুমোতেন। ঘুম? শ্বাসকষ্টের জন্য ঘুমোননি কত কাল!

সামনেই টুলের উপর রাখা হারমোনিয়ম।

 

•••••

 

এ ঘরেই গান শেখান জর্জ।

বাদল দিনের এক সকালে ছাত্র অর্ঘ্য সেন এলেন গানের ক্লাসে।

মুখে পান নিয়ে তখন মন্দ্র সপ্তকে সুর ভাঁজছেন জর্জ। একটু পরে ফের চুন নিলেন জিভে। তার পর হারমোনিয়মের বেলোতেই মুছে দিলেন চুনের হাত। কখনও লুঙ্গিতেও মুছতেন। শুরু করলেন গান। বাইরে তখন আকাশভাঙা শ্রাবণ। 

অর্ঘ্য কী শিখলেন প্রথম দিন? ‘কখন বাদল ছোঁয়া লেগে’।

একদিন জর্জকে সাহস করে প্রশ্ন করে বসলেন অর্ঘ্য, ‘‘জর্জদা, রেসের মাঠে যান কেন?’’

জর্জের জবাব, ‘‘তুমি বিয়া করো নাই কেন? তুমি যেমন বিয়া করো নাই, আমি তেমনই রেসের মাঠে যাই। এটা আমার চয়েস।’’

 

•••••

 

কখনও সখনও এই ঘরেই ঢুকে পড়েন গীতা ঘটক। জর্জ তখন অন্য ছাত্রছাত্রী চলে যেতে বলেন। গীতা সবটুকু দিয়ে গান, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’। এক সময় গলির প্রান্তে ছোট্ট বাড়িটায় সুরের সঙ্গ-সুধা-রেশ রেখে চলে যান গীতা।

জর্জ মজা করে তাঁর পরিচারকদের বলেন, ‘‘ম্যামসাহেবের সবই ভাল, শুধু গানটা পিছন ফিরা করলেই পারেন।’’

এ বাড়িতেই গান শিখতে আসেন আরতি, ইন্দ্রাণী, পূরবীরাও। রবিবার রবিবার ভাগ্নি পারমিতাও।

একদিনের কথা। গান শেখাতে শেখাতে বেশ রাত। সে দিন শ্রীলা সেন এসেছেন।

এত রাতে কোনও ছাত্রীকে একলা যেতে দিতেন না, মোটরবাইকে উঠিয়ে জর্জ চললেন তাঁকে বাড়ি ছাড়তে।

উড়ো হাওয়ার বাঁকে বললেন, ‘‘ভয় পাইবা না তো?’’

শ্রীলা বললেন, ‘‘উঁহু।’’

‘‘আমি জোরে চালামু।’’

জর্জের কথার ঝোঁকে যেন তেপান্তরের উড়ান। মজা লাগল শ্রীলার। একটু ভয়ও!

রাতের হাওয়ায় ঠিক শোনা যাচ্ছিল না। জর্জ ঘাড় ঘুরিয়ে বলছিলেন, ‘‘কী মনে হয় পক্ষীরাজে চড়স?’’

 

•••••

 

এক চিলতে এই ঘরের ইজিচেয়ারে শুয়ে, অভিমানী বাউল জর্জ কেবলই স্মৃতির অতলে হারিয়ে যান। মাঝে মাঝে সব অর্থহীন মনে হয়। গোপনে কান্নার গায়ে যেন রক্তের ছিটে রং দেখেন।

দিন দিন শ্বাসের টান যেন বাড়ছে। রাতভর জেগে কাটে জর্জের। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে মাথার নীচে হাত দুটো রাখলে ইদানীং একটু আরাম হয়। কেউ গেলে, মোড়া দেখিয়ে বসতে বলেন। কথা বলেন খুব আস্তে। চলে যাওয়ার কথা।

এই অবেলায় পৌঁছে, তাঁর উদাস মন উড়ে যায় কাঁটাতারের ও পারে কিশোরগঞ্জে, কলকাতার প্রথম জীবনে। মনে পড়ে অকালে চলে যাওয়া ভাগ্নে খোকনকে। দুই পরিচারক শ্রীকান্ত আর অনন্তর আড়ালে, নিভৃতে চোখের পাতা ভিজে যায়।

জানালা দিয়ে যেন দেখেন গগনতলে দেশের বাড়ির ছবি। কানে বাজে বাবা দেবেন্দ্রকিশোর, মা অবলার গলা। ‘খোকা, খোকা!’

স্মৃতির ছবিতে এলোমেলো হয়ে ভেসে ওঠে বাড়িটা। বাঁশ-বাতার গেট। গেটের পাশে বকুল গাছ। দুব্বো ঘাসের উঠোন পেরিয়ে টানা বারান্দা, টিনের চাল। সামনে বাগান। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে জর্জের হাত ধরে যে-বাগানে ভিজতে ছুটত বোন ললিতা। কখনও দিদি সান্ত্বনা।

কত স্মৃতি। কত গান। প্রিয়-মানুষের স্মৃতি-তোড়ের ভাসান।

এমন বাদলের দিনে, জর্জের গানে উতলা হয়ে ভিজে উঠতেন মঞ্জুশ্রীও। কলকাতা জানে।

দু’জনের দেখা হল সেই ’৫২ সালে। মঞ্জুশ্রী চাকী তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী। এলিট সিনেমা হলের অনুষ্ঠানে জর্জ প্রথম দেখলেন তাঁকে। জর্জ গাইলেন ‘নৃত্যের তালে তালে’। শাড়িটাকে একটু তুলে, গাছকোমর করে পরলেন মঞ্জুশ্রী। নাচলেন, নিয়ম ভাঙার নাচ। প্রথম আলাপে যেন, ‘আগুন ছড়াল শুকনো খড়ে’।

মঞ্জুশ্রীর যাতায়াত বাড়ল জর্জের বাড়িতে। খোকন রেগে যেত, কিন্তু মঞ্জুশ্রী এলে জর্জ যেন আশ্চর্য এক উন্মাদনা টের পান। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা শহরে একের পর এক অনুষ্ঠানে দেখা যেতে লাগল পাশাপাশি দুটো নাম। জর্জের গান আর মঞ্জুশ্রীর নৃত্য। একসঙ্গে নাম ঘোষণা হলেই, অফুরান করতালি। বাঁধ ভাঙা গান আর ঢেউয়ের নাচে একে একে কোরিওগ্রাফি হল, ‘ও চাঁদ তোমায় দোলা দেবে কে’, ‘ঝরঝর বারিধারা’।

বছর তিনেক বাদে জর্জ সমুদ্র কিনারে গেলেন মঞ্জুশ্রীর পরিবারের সঙ্গে। উঠলেন পুরীর স্বর্গদ্বারের একটি বাড়িতে।

 

•••••

 

জোর গুজব রটল কলকাতার পথের হাওয়ায়। মোটরবাইকে করে শহর চষে ফেলছেন মঞ্জুশ্রী-জর্জ। দু’জনকে নাকি দেখা যাচ্ছে অনুষ্ঠানের শেষে গঙ্গার ধারে, প্রেসিডেন্সি চত্বরে, জর্জের রাসবিহারীর ঘরে! অফিস পাড়া থেকে লেক কালীবাড়ি। তখন গসিপ আর গসিপ।

সে গসিপের ছায়া ঠিক যেন দেবব্রত বিশ্বাসের নিকটাত্মীয় বাসব দাশগুপ্তর উপন্যাস ‘জর্জ’-এও।

সেখানে ‘মধুশ্রী’ নামের ‘লম্বা, দোহারা চেহারা, ঈষৎ চাপা বর্ণ, আজানুলম্বিত বাহু, দীর্ঘ চুল, কথা বলা চোখ’-এর মেয়েটি পরপর কয়েক দিন জর্জের কাছে না এলে, তার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।— ‘‘ফোন করতে মন চায়, উপায় নেই ওর স্বামী নাকি আজকাল ঠারেঠোরে নানা কথা শোনায় ওকে। বলে কিসের এত রোজ রোজ একজনের বাড়ি যাওয়া? বাংলাদেশে আর কি কোনও গায়ক নেই? আসলে মধুশ্রীর নৃত্যভঙ্গি আর জর্জের গান এমন একটা আত্মিক বোধে যুক্ত হয় যে, সমস্ত শ্রোতা-দর্শকেরা ওদের যৌথ পরিবেশনায় প্রচণ্ড আনন্দ পায়।’’

বাইরের উড়ো কথা ঘরে এসে ঢোকে।

জর্জকে তাঁর দিদি-বোন-মা জিজ্ঞেস করেন মঞ্জুশ্রীর কথা।

জর্জ রসিকতা করে উড়িয়ে দেন। বলেন, ‘‘চিন্তার কোনও কারণ নাই।’’

বিয়ে হয়ে যায় মঞ্জুশ্রীর।

বিয়ের কিছু দিন পর বিদেশে চলে গেলেন। তার পরও...। যখনই কলকাতায় এসেছেন, দু’জনে অনুষ্ঠান করেছেন।

পরে, অনেক পরে মঞ্জুশ্রী নিজেও খুব কাছের জনদের বলেছিলেন সেই-সব রটনার দিন-রাত্রির কথা।

মেয়ে হওয়ার খবরে ’৬৩-র মার্চে জর্জ তাঁকে চিঠি লিখছেন, ‘‘তোমার মা হওয়ার খবর শ্রীকান্তের মুখে আমি পেয়েছিলাম। ... আমার সাড়াশব্দ নেই কারণ আমি নিজেই নেই— যদি দেশে ফেরো, আমায় চিনতে তোমার খুব অসুবিধে হবে— হয়তো পারবে না। বেলা আমার ফুরিয়েছে— তাই খেলাও শেষ।’’

দেশে ফিরে আমৃত্যু মঞ্জুশ্রী জর্জের গানকে আশ্রয় করে বেঁচে ছিলেন। মঞ্জুশ্রীর মেয়ে রঞ্জাবতীও প্রেমে পড়ে জর্জের গানের।

জর্জকে ভোলেনি রঞ্জাও!

 

•••••

 

নিয়ত ভাঙন-প্রত্যাখ্যান সরিয়ে, রবিঠাকুরের গানই ছিল জর্জের নিজস্ব নিখিল।  এই মানুষই কঠোর হয়ে যেতেন, মর্জির বিরুদ্ধে তাঁকে হাঁটতে বাধ্য করলে। সে সুরের সারিন্দা হোক বা, রাজনীতির পথ।

শরিক ছিলেন উত্তাল সময়ের। দু’বার ঘুরে এলেন লাল-চীন। ’৩৮ থেকে সেই সখ্য রইল ’৫৪ পর্যন্ত। কিন্তু কখনও পার্টির সভ্য হননি। মাঠে-বন্দরে গেয়ে বেড়াতেন গণসঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথের গানও গাইতেন লাল মঞ্চে বসে।

অশোক মিত্রের কথায়, জর্জ বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানে যে-আগুন, তাতে সাধারণের অধিকার আছে। অচলায়তনকে তিনি ভেঙে চূর্ণ করতে পারবেন। তাঁর রোখ চেপে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গান জর্জের গলায় হয়ে উঠল গণসঙ্গীত।

সে সময় কালিকা সিনেমা হলে ‘রক্তকরবী’ হল। পরিচালনা জর্জেরই।

বিশুপাগল চরিত্রে অভিনয় করলেন জ‎র্জ। ’৪৭-এর শেষের দিকে শ্রীরঙ্গমেও অভিনয় হল রক্তকরবী। সেখানেও জ‎র্জ ‘বিশু’। নেপথ্য থেকে রাজা-র ভূমিকাটি পড়লেন শম্ভু মিত্র। নন্দিনী- কণিকা মজুমদার, চন্দ্রা-তৃপ্তি মিত্র, সর্দার- কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। বহুরূপী যখন ‘ছেঁড়াতার’ করছে, জর্জ হলেন মহিম। সে-নাটকে উইংসের আড়ালে এস্রাজ বাজাতেন তুলসী লাহিড়ি। অভিনয় করতে করতে গান গাইতেন জর্জ।

 

•••••

 

ষাটের দশক থেকে জর্জ গণসঙ্গীত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন!

পার্টির ভাঙন কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি কোনও দিন। নির্ঘুম রাত জুড়ে যেন খানিকটা হতাশাও জমছিল তখন। ফ্রন্ট যে বার ভেঙে গেল, পার্টির দুঃসময়ে কষ্ট পেয়েছেন একা একা ঘরে বসে। বাসবের ‘জর্জ’ উপন্যাসে সেই সব দিনের কথা উঠে আসে অবিকল শব্দ-ছবিতে।

পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বসবেন বলে, একদিন সন্ধের তাসের আড্ডা বাতিল করে ঘরে ডাকলেন বিজন, ঋত্বিকদের।

‘‘সময় সন্ধে ছ’টা হলেও ঋত্বিক হাজির দুপুর তিনটেয়। তিন-চার কাপ চা হয়ে গেছে। অস্থির পায়চারি, মাথার চুল মুঠো করে ধরা। একবার এই মোড়াতে বসছে, পরক্ষণে ওইটায়।

‘স্থির হইয়া বস না।’ জর্জের কথায় কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই।

‘সবাই আসবে তো?’

জর্জ উত্তর দিল, ‘খবর পাইছে হক্কলে, আইবে কিনা কইতে পারি না।’ তীব্র বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে ঋত্বিক বলে, ‘সেইটাই প্রধান সমস্যা। বুঝলা, কেউ কারও মনের ভিতরটা জানে না।’’’

ঋত্বিক আর বেশিক্ষণ ঘরের ভিতর থাকতে পারেন না। অস্থির হয়ে কাঁধের ব্যাগ নিয়ে পার্কে চলে গেলেন। সন্ধে নামল।

বটুক আর বিজন ছাড়া কেউ এল না।

মিটিং বাতিল। ওরাও ফিরে গেল এক সময়।

জর্জকে অপেক্ষার আঁধার পেয়ে বসল যেন। এমন সময় দরজায় ঋত্বিক।

‘‘হাত দিয়ে কপাট ধরে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করছে সে। ‘মিটিং, মিটিং হইল না? ডিসিশান দাও, দুই বছর এপাশ-ওপাশ, ভালো লাগে না। ডিসিশান চাই...। কোন পক্ষে যাব, কোন দলে?’’

জর্জ এর কী উত্তর দেবেন, জানেন না। যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাচ্ছে তাঁর।

মাথা নামিয়ে ঋত্বিককে বাড়ি চলে যেতে বললেন। টাল খেতে খেতে ঋত্বিক চলে যাচ্ছেন। এখন ফের কোথায় যাবেন, কে জানে!

ছিয়াত্তরে ঋত্বিক চলে গেলেন।

এমন হুট করে তাঁর চলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারেননি জর্জ।

সে সময়ের একটি চিঠিতে লিখেওছেন, ‘‘ঋত্বিক ও বিজন তো আত্মহত্যা করল... এ বার বোধহয় আমার পালা।’’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঋত্বিকের শোকসভায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিল। তাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন জ‎র্জ।— ‘‘ক্যান যামু, হারামজাদাটা না বইল্যা কইয়া চইল্যা গ্যালো, যামু ক্যান আমি, আপনারা মাফ করেন আমারে!’’

 

•••••

 

মিত আলোর ঘর। জর্জ একমনে সুপুরি কাটছিলেন ছোট জাঁতিতে।

ঘরে-বাইরে সর্বক্ষণ মিঠাপাতির এই এক নেশা তাঁর। কখনও মোটর সাইকেলে গোটা কলকাতা দাপিয়ে ধর্মতলা থেকে গণেশ অ্যাভিনিউয়ের দিকে যেতে যেতে গলির মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। পান কেনেন। খুব করে দেখে, আদরে মুখে পোরেন চুন-খয়ের-জর্দার মিঠাপাতি। এ দৃশ্য রোজকার। প্রিয় পানের দোকান, বাসার কাছে রাসবিহারীর ফুটপাতের উপরও।

জাঁতিটা বিছানায় রেখে, সুপুরিগুলো ছোট্ট হামান দিস্তায় গুঁড়ো করে, পান সেজে দিলীপের জর্দা মিশিয়ে নেন।

ডিব্বা সরিয়ে রাখেন। অপূর্ব সে গন্ধ। ভুরভুর সারাটা ঘর।

ঘরে কেবল একজনেরই ছবি। জর্জের ‘দিদিমণি’র।

 

•••••

 

ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি কালোপাড়-সাদা শাড়িতে কলকাতার মঞ্চে গাইছে, ‘কোন খ্যাপা শ্রাবণ ছুটে এলো’।

জর্জ তাঁকে ‘দিদিমণি’ বলে ডাকতেন।

বিশ্বভারতীর ছাত্রী হয়েও, তার গানের মধ্যে ভিন্নতর আহ্বান। জর্জের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। একসঙ্গে গণসঙ্গীতের কত অনুষ্ঠানে যে গেয়েছেন! কোথাও কোথাও সকলে দেখতেন, নৃত্যনাট্য শেষ হল, সুচিত্রা কাঁদছেন জর্জের কাঁধে মাথা রেখে। কত বার!

এ দিকে বিশ্বভারতীর সঙ্গে জর্জের বিরোধ বাড়ল ’৬২-তে মিউজিক বোর্ড থেকে অনাদি দস্তিদার সরে যাওয়ার পর। ’৬৪-তে জর্জের ফের দুটি গান আটকে দিল বোর্ড। অনেকের সঙ্গে দায়িত্বে দিদিমণি।

একদিন, জর্জের ‘দিদিমণি’ এলেন তাঁর বাড়ি।

দেখলেন, লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে  মোড়ায় বসে ডিম-ফুলকপি রান্না করছেন জর্জ। বললেন, ‘‘এসেছিলে তবু আস নাই’ গানে ‘চঞ্চল চরণ গেল ঘাসে ঘাসে’র জায়গায় ‘চন্’ কথাটি স্বরলিপি মতো হয়নি।’’

জর্জ হাসলেন। হারমোনিয়ম টেনে শোনাতে বললেন। সুচিত্রা গাইলেন।

জর্জ বললেন, ‘‘‘চন্’ শব্দডা যে স্বরলিপি অনুসারে হইল না দিদিমণি।’’

চলে গেলেন সুচিত্রা। সে দিনের মতো বিরোধ মিটলেও দিদিমণির সঙ্গে সম্পর্কে কোথায় যেন দূরত্ব বাড়ার সেই হল শুরু।

রাসবিহারীর ঘরে

কিছু দিন পর শান্তিদেব ঘোষ অবশ্য জানালেন, জর্জই ঠিক।

১৯৬৯-এ ফের জর্জের দুটি গান আটকাল বোর্ড। আঘাত পেয়ে রেকর্ড বন্ধ করে দিলেন জর্জ!

কাতর হয়ে অভিমানে যখন থামলেন, তখন তিনি টপ ফর্মে। রেকর্ড বিক্রি বেড়েই চলেছে।

 

•••••

 

আবার আশ্রয় সেই একলা ঘর। সে সময় যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতি থেকে মেলে সেই সকাতর সময়ের ছবি। মাঝে মাঝেই একে-ওকে সামনে পেয়ে স্বরবিতান ধরিয়ে দিয়ে জর্জ বলছেন, ‘‘আমি গাইতাছি তুমি স্বরলিপির সঙ্গে মিলাইয়া বলো। বলো না, কোনখানে আমি ভুল করছি!’’

কেমন ছিল জর্জের সঙ্গে তাঁর দিদিমণির সম্পর্ক?

চোদ্দো বছরের বড়, তবু সুচিত্রার কাছে তিনি শুধুই ‘জর্জ’!

প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে যে বার ভর্তি হলেন রামকৃষ্ণ শিশুমঙ্গল হাসপাতালে— অবচেতন জর্জের মুখে কখনও শোনা যায়, ‘সুচিত্রা’, কখনও ‘দিদিমণি, দিদিমণি’! জ্ঞান ফিরে দেখতে চাইলেন দিদিমণিকেই। ছুটে এলেন সুচিত্রা। কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

সুচিত্রা যখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, জর্জ জ্বর নিয়ে একবার চিঠির প্রত্যুত্তরে লিখলেন সুচিত্রাকে।— ‘‘আজ আপনাকে একটা ভীষণ সত্যি কথা বলছি— কথা হল এই— অসুখের মধ্যে আপনার চিঠিটা ভীষণ ভালো লেগেছে। এবং এত ভীষণ ভালো লেগেছে যে অনেকবার পড়ে ফেলেছি।’’ একটু পরেই লিখছেন, ‘‘মোহরের খবর কি? তাকে আমার কথা বলবেন।’’

এই সুচিত্রাই তাঁর অনুলিখিত আত্মকথায় লিখছেন, ‘‘জর্জের গান বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড বাতিল করেছিল বলে যা এক সময় বহু জায়গায় প্রচারিত হয়েছে, তা ঠিক নয়। জর্জের কোনও গান বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড খারিজ করেনি।’’

জর্জ-ঘনিষ্ঠ, তাঁর ‘ওস্তাদ’ শিল্পী খালেদ চৌধুরী সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত ভাবে এক বার বলেছিলেন, জর্জের সঙ্গে অন্যদের রেকর্ড বিক্রির বিরাট অঙ্কের ফারাকটাই বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের লোকেরা মেনে নিতে পারেনি। তাদের ঈর্ষা ছিল। এও বলেছিলেন জর্জের পিছনে ‘‘সুবিনয় রায়, সুচিত্রা লেগেছিল, আবার লাগেনি।’’

উত্তাল সময়ে দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা খালেদকে জর্জ কি কিছু বলেছিলেন?

শেষ দিকে খালেদের সঙ্গে আলাপের গোড়ার কথাগুলো খুব মনে পড়ত জর্জের। গোয়াবাগানে আইপিটিএ-র সম্মেলনেই প্রথম আলাপ তাঁর সঙ্গে।

 

•••••

 

পার্টিতে যখন মতবিরোধ, সকলের মনে ধোঁয়াশা, সে সময়ের অনেকে তাঁর কাছে আশ্রয় নিয়েছেন।

’৪৬। কলকাতায় রায়ট। উত্তাল মহানগর। কালীঘাট ট্রাম ডিপোতে লাশের স্তূপ। শুনশান রাসবিহারী। বারুদের হাওয়া কেটে একটা লোক পড়িমড়ি করে ছুটতে ছুটতে গলি দিয়ে ঢুকে পড়ল জর্জের ঘরে।

ছোট্ট ঘরে তখন জর্জের সঙ্গে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রও বসে।

লোকটাকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন জর্জ— ‘‘শালা... বাইচা আছো।’’

‘লোকটা’ কলিম শরাফী। পরে বাংলাদেশের বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। ও পার থেকে গোপন আশ্রয় নিতে এসেছিলেন জর্জের ঘরে। পুলিশি-গ্রেফতারি এড়াতে সাত দিন সে-বাড়িতে খাটের তলায় লুকিয়ে ছিলেন কলিম।  

জর্জের ঘরে কয়েক দিনের জন্য আত্মগোপন করে ছিলেন আরও একজন। কাইফি আজমি।

দেশে তখন কমিউনিস্ট পা‎‎র্টি নিষিদ্ধ। কবি, শিল্পী, নাট্যকর্মীদের একটি গোপন সভায় যোগ দিতে কলকাতায় এসে উঠেছেন জর্জের ডেরায়। হঠাৎ একদিন পুলিশের ইনফরমার খবর দিল রেড হবে।

যে দিন রেড হল, সে দিনই কাইফিকে ধুতি আর পৈতে পরিয়ে ছদ্মবেশে রওনা করিয়ে দিলেন জর্জ। তত ক্ষণে বাড়ির চার ধারে থিকথিকে পুলিশ। এক সময় দরজা ঠেলে পুলিশ কর্তারা ঢুকেই পড়লেন বাড়িতে।

প্রায় অন্ধকার ঘরে জর্জ তখন হারমোনিয়ম বাজিয়ে রবিঠাকুরের গানে একাত্ম। —‘চির সখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।’

উল্টো দিকে মুগ্ধ শ্রোতা কলিম শরাফী!

 

•••••

 

সুরের আসমানে ভেসে থাকা জর্জের চিঠির ফাইল ছিল দেখার মতো। লেখা জুড়ে কৌতুক। পরিহাস। আবার বিরোধের কথা। সহজিয়া শব্দ-রেখায়। শব্দের পিঠে শব্দ সাজিয়ে খুব যত্ন করে একটা সময়ের পর থেকে নিয়মিত দিস্তের পর দিস্তে চিঠি লিখেছেন প্রিয়জনদের। স্বজন-ভক্তদের। চিঠি আসতও নিয়মিত। সব চিঠির উত্তর দিতেন। আর সব ক’টির কা‎র্বন-কপি করে রেখে দিতেন ফাইল-বন্দি করে।

কোনও চিঠি শুরু হত ‘কইলকাতা, ১৭৪-ই, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ’ দিয়ে। সে সব চিঠিই শোনাতেন তাঁর কাছে কেউ গেলে। নিজে কী উত্তর লিখেছেন, তাও শোনাতেন। চিঠির এক-এক ফাইলের নাম ছিল বিচিত্র। — ‘ভালবাসার অত্যাচার বা পাগলামি’, ‘টিন এজা‎র্স’, ‘কোলাকুলি ও গালাগালির ফাইল’ বা ‘সেন্টিমেন্টাল অ্যাডাল্টস’।

 

•••••

 

শেষ দিকের জর্জ যেন জেরবার। শরীরে, মনে। সবেতে।

রাসবিহারীর ভাড়াবাড়ি থেকে উঠে যাওয়ার তাগাদা। শরীর ভেঙে পড়েছে তখন। বার বার ইনহেলার নিয়ে আরাম হচ্ছে কতটুকুই বা! জ্বর আসছে কেবল। অসহায় হয়ে পড়লেন জর্জ। কিন্তু গান থেমে নেই।

কোনও কোনও গানে একই জায়গা গাইছেন বারবার। ‘ওহে চঞ্চল, বেলা না যেতে খেলা কেন তব যায় ঘুচে’। কলকাতার ভরা ময়দানে অগণিত মানুষ নির্বাক হয়ে তখনও শুনেছে তাঁর গান।

জর্জ তখন দাড়ি রাখছেন। গেরুয়া লুঙ্গি, ফতুয়া। হাতের লাঠিটি সর্বক্ষণের সঙ্গী। রোগজর্জর শরীর নিয়ে ইজিচেয়ারে শুয়ে বাইরের আকাশ দেখছেন। উত্তমকুমার এলেন শিল্পী-সংসদের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে।

জর্জ বললেন, ‘‘আপনে আইছেন ক্যান? আমারে তো পুলিশ ডাকতে হইব?’’ অনেক করে উত্তম রাজি করালেন।

জর্জ শর্ত দিলেন দুটি। বিজ্ঞাপনে ‘দেবব্রত বিশ্বাস’ লেখা যাবে না। লিখতে হবে ‘এক বিতর্কিত শিল্পী’। আর মঞ্চেও তাই ঘোষণা করতে হবে।

তাই হল।

উত্তমকুমার মাইকে বললেন, ‘‘এ বার গান শোনাবেন এক বিতর্কিত শিল্পী।’’ পর্দা উঠে গেল, জর্জ গান শুরু করলেন।

হারমোনিয়ম একটু বেলো করে মাথাটা ঈষৎ উঠল যেন। গান শুরু করার আগে সব আলো জ্বালিয়ে দিতে বললেন।

গাইলেন, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’। তাঁর একের পর এক বর্ষার গানে খুলে যাচ্ছে মেঘের ডানা-ভাঁজ। স্থায়ী থেকে অন্তরায় ছড়িয়ে পড়ছে মেঘমন্দ্র উচ্চারণের সম্মোহন। কোথাও ঘুরে ঘুরে একই লাইন গাইছেন। কখনও একটু সুরের রেশ টেনে, বেশি মাত্রা নিয়ে গাইছেন। যেন বৃষ্টি-হাওয়ার নেশা পাক খেয়ে ঘুরছে ময়নাপাড়ার মাঠে।

 

•••••

 

শেষের দিকে চোখেও কম দেখছিলেন জর্জ। অগস্টেই গোলাম মুরশিদকে চিঠিতে লিখলেন, ‘‘আমার তো ভবনদী পার হবার সময় হয়ে এসেছে... বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল আমার চোখে ছানি পড়তে শুরু হয়েছে। এখন স্পষ্ট দেখতে পাই না। আর কিছুদিন বাদে হয়তো অন্ধ হয়ে যাব।’’ মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কিংশুক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসদনে জর্জকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অনেক কষ্টে ‘কাকা’ জর্জকে রাজি করিয়েছিলেন তিনি। জর্জ গেয়েছিলেন, ‘এখন আমার সময় হল, যাবার দুয়ার খোল’।

কেই বা জানত সময়ের সেই কড়া নাড়া তখন তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন!

শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকামনা করে গিয়েছেন নিজের। শেষ চিঠি লিখলেন মৃত্যুর ১১ দিন আগে, অগস্টের ৭ তারিখ।

সিউড়ির সোনাতোড় পাড়ার অর্চনা বসুকে। জর্জ তাঁকে ‘মাসিমণি’ বলতেন। শ্বাসরোগের যন্ত্রণায় কাতর জর্জ লিখছেন, ‘‘ডাক্তারবাবু বলেছেন আমার হাঁপানি একেবারে সারানো যাবে না— হয়তো আক্রমণটা কিছু কমতে পারে। ... এই রকম অকর্মণ্য হ’য়ে থাকার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভাল— কিন্তু আত্মহত্যা করার সাহস আমার নেই!’

চলে যাওয়ার সাত দিন আগে ভাগ্নি পারমিতাকে বললেন, ‘‘শোন, আমি আর এক সপ্তাহ আছি। সকালে উঠে দেবদুলালের গলায় রেডিওতে শুনবি, কুখ্যাত গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস মারা গেছে!’’

 

•••••

 

কলকাতার ভোরের আকাশে সে দিনও মেঘ ছিল।

শোকমিছিলে কাঁদছে প্রিয় শহর।

মিছিল রবীন্দ্রসদনে।

পাটভাঙা গেরুয়া পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি। ফুলের আড়ালে ঘুমিয়ে জর্জ।

কিছু দিন আগে এখানেই শেষ সংবর্ধনা নিয়েছেন জর্জ। স্মৃতি থেকে যেন তাঁর গান ভেসে আসছে। ফিরে ফিরে গেয়ে চলেছেন জর্জ। ‘আজি পুবের হাওয়ায় হাওয়ায় হায় হায় হায় রে/ কাঁপন ভেসে চলে’।

মিছিল এ বার হরিশ মুখার্জি রোড ধরে ঘাটের কাছে। চোখের জলে ফুরল গান, ‘একদিন কোন্ হাহা রবে/ সুর হারায়ে গেল পলে পলে/ আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে’।

 

•••••

 

বাঁ দিকে হেলানো মাথা। হাতে লাঠি। একা, নিঃসঙ্গ জর্জ যেন হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন বাদল দিনের দিগন্তের ও পারে।

কান্নায় ভেঙে পড়ল কলকাতা। শোকসভায় কালো শাড়িতে দিদিমণি গাইলেন—

‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার।’

 

পারমিতা দাশগুপ্তর ছবি ও জর্জের ছবির অনুচিত্রণ: উত্তম মাহালি

ঋণ: জর্জ (বাসব দাশগুপ্ত), দেবব্রত বিশ্বাস- দূরে যাব যবে স’রে তখন চিনিবে মোরে, ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা (শ্যামল চক্রবর্তী)