এক সময় কথায় কথায় তাঁর মুখে শোনা যেত  রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ। অথচ কবি সম্পর্কে তাঁর অভিমানের বোধ হয় অন্ত ছিল না। বলতেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ হল মহাসমস্যার বিষয়।’’

 

পাশের বাড়িতেই থাকতেন কবি বিষ্ণু দে। যাতায়াত, সম্পর্ক ছিলই। নিজের কবিতার বই তাঁকে দিতে তিনি বইটি স্ত্রীর হাতে দেন,পায়ের দু’আঙুলের ফাঁকে গুঁজে। বয়োজ্যেষ্ঠ কবির আচরণে সে দিন কিছু বলেননি বটে, কিন্তু পরে স্মরণ করেছেন লেখাতে।

 

‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি নিয়ে বলতেন, বিদেশে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ দেশে ছবিটির কদর বলে যে-প্রচার, তা অনেকটাই বানানো।

 

তিনি মানেই স্পষ্টকথার ঝড়।

তিনি মানেই ঋজু হেঁটে চলা।

 

তিনি সমর সেন।

সমর সেনের সঙ্গে যখন আলাপ হয় তখন, এমার্জেন্সিতে, ওঁর ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকা দু’মাস হল বন্ধ হয়ে আছে।

আনন্দবাজার ঘরের নতুন ‘সানডে’ পত্রিকা বার হতে চলেছে। তাতে কিছু বিশিষ্ট জনের কলমে ‘নোটস’ বলে একটি মতামতের পাতা চালু করার কথা হয়েছে।

তার লেখক হিসেবে ভাবা হয়েছে সমর সেন, এম কৃষ্ণন, হামদি বে এবং অমিতা মলিককে।

সম্পাদক এম জে আকবর আমাকে নিয়ে এক সন্ধেয় রামের বোতল সঙ্গে করে ওঁর বাড়িতে হাজির হল।

গাড়িতে যেতে যেতে বলল, ‘‘টেলিফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা, ফ্রন্টিয়ার তো বন্ধ, তা আমাদের কাগজে একটা কলম লিখুন না।’ তাতে উনি আমাকে দারুণ লজ্জায় ফেলে দিয়ে আমাদের অফিসে চলে এলেন। বলতে বাধ্য হলাম, ‘আপনি কেন এলেন? আমরাই আপনার কাছে যেতাম।’’

প্রথম দিনের যাওয়াটা সেই যাওয়া।

আলাপ করতে করতে দিব্যি সেই মানুষটাই ঠিকরে রেরোচ্ছে যাঁকে তত দিন ওঁর ইংরেজি গদ্য আর বহুকাল আগে শেষ করে দেওয়া বাংলা কবিতা দিয়েই মনে মনে গড়ে নিয়েছিলাম। ঝাঁ চকচকে, আপসহীন, সরস এবং জগতের তাড়নায় কিছুটা হলেও দুঃখী মানুষ।

কী লিখবেন, না লিখবেন এই সব কথার প্রসঙ্গে হঠাৎই জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম, ‘‘দাদা, কবিতাটা ছেড়ে দিলেন কেন?’’

উনি রামের গেলাসটা ঠোঁটের কাছে ধরে রেখেই বললেন, ‘‘এ বার র‌্যাঁবোর উদাহরণটা তুলে আনবে তো?’’

বললাম, ‘‘না, আনব না।’’

সমরদা বললেন, ‘‘ঠিক। মোটে উনিশ বছরে যা করে ফেলেছে, তার তুলনা নেই। ও হয় না।’’

‘‘কিন্তু আপনি বন্ধ করলেন কেন?’’

‘‘এখন তো আড্ডা, এখানে এ ভাবেই বলি: ভেবেছিলাম ঢের হয়েছে। এ বার থাক। পরেও দু’চারটে যে লিখিনি তা নয়। কিন্তু ওই আর কি!’’

কবিতার কথায় এসে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। এবং সেই সূত্রে নীরদ সি-র ‘দুই রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটিও।

বললেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ, ওঁর ইংরেজি অনুবাদ, ভক্তকুল ইত্যাদি নিয়ে আমারও মতামত আছে। দেখি...।’’

আড্ডা এর পর নানা দিকে চলে গেল এবং রাত বাড়তে এক সময় শেষও হল।

যাবার সময় বললেন, ‘‘আমার মত-মন্তব্য নিয়ে তোমাদের আবার সমস্যা হবে না তো?’’

আকবর ওঁকে সত্বর আশ্বস্ত করল, ‘‘কোনও সমস্যাই নেই, দাদা।’’

সমস্যাটা হয়েছিল সমরদার। ওঁর লেখা বেরোবার পর চেক নিয়ে সমস্যা, পরের বার ওঁর বাড়ি যেতে প্রথম প্রশ্নই করলেন, ‘‘এ কী আকবর, একটা লেখার জন্য এত টাকা কেন?’’

আকবর বলল, ‘কেন, কত টাকা স্যার?’’

বিস্ময়ের ভাব মুখে এনে সমরদা বললেন, ‘‘পাঁ-চ শো!’’

আকবর বলল, ‘‘না, না, দাদা আমরা আপনাকে কিছু বেশি দিইনি। সব নোট-লিখিয়েই ওটা পাবেন।’’

সমরদা বললেন, ‘‘বাঁচালে! আমি কোনও স্পেশাল ট্রিটমেন্ট আশা করি না।’’

তার পর আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘বিশেষ করে আমার কাগজের ছেলেদের এখন যা দশা।’’

সমরদার কথাটা ফের মনে এসেছিল বছর দুই পর সমরদা’র ‘বাবুবৃত্তান্ত’ প্রকাশ পেতে।

যার শুরুতেই উনি বেশ সরস করেই ওঁর নির্লোভ অর্থনীতির অহমিকার কথাটা শুনিয়ে দিয়েছেন। সে-বৃত্তান্ত ওঁর মুখেই শুনুন...

‘‘একটু বড়ো হয়ে পড়াশুনোর দিকে আমার ঝোঁক ছিল বলে ঠাকুর্দা (দীনেশচন্দ্র সেন) আমাকে স্নেহ করতেন। তিরিশের দশকে অবশ্য আমার সাহিত্যচর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা উঠলে বলতেন, ‘তুই একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।’ আমাদের আলাপ-আলোচনা সরস ছিল। বিএ-তে ভালো করলে বিলেত পাঠাবার প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেওয়াতে বললেন যে অর্ধেক খরচ দেবেন, বাকিটা বিয়ে করে জোগাড় করতে। বললাম, ‘দাদু, পুরষাঙ্গ বাঁধা দিয়ে বিলেত যাব না।’ উত্তরে অট্টহাসি হেসেছিলেন।’’

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রথম দিনের সেই আলাপের কারণেই কিনা জানি না, জুন মাসে ‘সানডে’ শুরুর ক’দিন বাদেই (অগস্টে ২২শে শ্রাবণ মনে রেখেই কি?) সমরবাবু কবির ভক্তদলকে এক হাত নিলেন কলামে।

যার একটি বাক্য ভয়ঙ্কর ভাবে মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল নীরদ সি-র ‘দুই রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটির একটি এক্সপ্রেশন।

যেখানে বলা হচ্ছে যে, ভক্তদের ভক্তি এতই যে ‘ইভন ইফ দ্য পোয়েট ফার্টেড দে উড স্মেল দ্য সেন্ট অব রোজ’। অর্থাৎ, কবির বায়ু নিষ্ক্রমণেও তাঁরা গোলাপের গন্ধ পেতেন।

এই ধরনের সব উক্তি এবং অভিব্যক্তি সত্ত্বেও ওই কিছুকালের সম্পর্কেই টের পেয়েছিলাম যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অদ্ভুত একটা দূরত্ব ও সমীহের টানাপড়েনে থাকতে ভালবাসতেন তিনি। পরে ভেবেছি, ওঁর এই ভাললাগা-সরে থাকা কার সঙ্গেই বা না?

 

সে-সব গল্পে অবশ্যই যাব, কিন্তু আগে রবীন্দ্রনাথ।

সমরবাবুর বাবা অরুণচন্দ্র সেন ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক, তিনি ছিলেন আদি শান্তিনিকেতনের ছাত্র। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওঁর এবং ওঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ও পত্রালাপ ছিল।

‘‘কিন্তু শ্রীনিকেতনের কোনও ব্যাপার নিয়ে শুনেছি,’’ সমর সেন লিখছেন, ‘‘বাবার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের মতভেদ হওয়াতে রবীন্দ্রনাথ পুত্রের পক্ষ নেন, ফলে বাবা বিশেষ সম্পর্ক রাখেননি। শুনতাম, বিশ্বভারতীর আর একটা নাম বিশ্ব-বা-রথী, রবীন্দ্রনাথের অনেক চিঠিপত্র, স্বাক্ষরিত বই, দু-একটা পাণ্ডুলিপি মা’র মৃত্যুর পর বাবা একে-ওকে দিয়ে দেন।’’

খুবই স্টাইলিশ এবং প্রায় এক টেলিগ্র্যাফিক ক্ষিপ্রতায় লেখা স্মৃতিকথা ‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় খুব একটা বিশদ করেননি সমর সেন কবির প্রতি ওঁর পরিবারের অভিমান।

আর এর থেকেই কি কবির প্রসঙ্গে সমরের ওই দোটানার সূচনা? জানি না। তবে এটা ঠিক, কী কথায় কী লেখায়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটু রসিক চালে কথা বলার সুযোগ কখনও ছাড়েননি।

তার একটা নমুনা তুলে দিচ্ছি।

‘‘রবীন্দ্রনাথ একবার দুপুরের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন বিশ্বকোষ লেনে (সমরবাবুদের পারিবারিক নিবাস)। ঘরদোর সাফ করার ভার ছিল ছোটদের ওপর। সকাল থেকে বালতি-বালতি জল খরচ হয়। কবি এসে ষোড়শ ব্যঞ্জনের কয়েকটা স্পর্শ করলেন— তখনো মনে হয়েছিল আমরা বাঙালিরা কতো অপচয় করি। আহারের পর চীনফেরৎ কবিকে দীনেশচন্দ্র কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করেন—‘‘চীনেরা কি আরশোলা খায়?’ কবি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘Dineshbabu, you lack a sense of perspective.’ মন্তব্যটি ছোটকাকার কাছে শোনা।’’

সমরবাবু অল্প বয়স থেকেই মস্ত ধূমপায়ী, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলেই ওঁকে সিগারেট লুকোতে হত।

এই জ্বলন্ত সিগারেট সামলানোর বিবরণও উনি লিখতে গিয়ে সামলে নেননি। বলতে নেই, প্রায় এক শিশুর মতো মিষ্টি ক্ষোভ তিনি পোষণ করে গেছেন ছেলেবেলা থেকে।

লিখছেন: ‘‘ছোটবেলায় দু’একবার জোড়াসাঁকোয় গিয়েছি। তখন চেহারাটা গোলগাল ফর্সা ছিল বলে সবাই আমাকে আদর করতেন। কবি কখনও না।’’

এটুকুই। কবি কখনও না। এ কি কষ্ট, দুঃখ, রাগ?  নাকি... ভেবেও পাচ্ছি না আর কী হতে পারে। কারণ এর পরের বাক্যেই সমর সেন চলে যাচ্ছেন ঠাকুরবাড়িতে শেষ যাওয়ায়...

‘‘জোড়াসাঁকোয় শেষ বার যাই বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে। ছোট একটা ঘরে বসে ধূমপান করছি, অকস্মাৎ রবীন্দ্রনাথের নাটকীয় আবির্ভাব, সিগারেট নিয়ে মহামুস্কিলে পড়েছিলাম। শিশির ভাদুড়ীর ‘তপতী’ বুদ্ধদেববাবুর ভালো লাগেনি শুনে মৃদু হেসে রবীন্দ্রনাথ বললেন, বোধহয় শিশির সে দিন একটু ‘বিচলিত ছিল’।

শিশিরবাবুর ‘বিচলিত’ থাকার মানেটা কাউকে বোঝানোর দরকার নেই আশা করি, কিন্তু স্বভাবত সংযত কবির এই Risque humour, বিপজ্জনক রসিকতা সমর শেষ বয়স অবধি ভুলতে পারেননি।

কেবল রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে’র ধারালো রসিকতাই নয়, সমরবাবুর স্মৃতিরোমন্থনে রেহাই পায়নি ওঁর পরিবার-পরিজনের আলগা মজামিরিও। তেমন একটা নমুনা...

‘‘জ্যেঠা-কাকাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গুরুগম্ভীর ছিল না, হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি চলতো। বারবার ছেলের আশায় একটির পর একটি মেয়ে হবার ব্যাপার তোলাতে এক কাকা বলেন, ‘ওটা ভগবানের হাত।’ আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘ভগবানের হাত এতো ছোট?’’’

সমর সেন স্বীকারই করে নিয়েছেন যে, ‘‘রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মহাসমস্যার ব্যাপার।’’

কারণ তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তিরিশের দশকে ঘোরতর ভাবে ওঁর ভক্ত হচ্ছেন। এক দিকে ‘রাশিয়ার চিঠি’ ও পরে ‘সভ্যতার সঙ্কট’ বামপন্থীদের মধ্যে আলোড়ন তোলে। আধুনিকদের ‘শেষের কবিতা’ ও ‘চার অধ্যায়’ প্রবল ভাবে মাতায়। যদিও এই শেষের দুটির কোনওটিই সমরের পছন্দের নয়।

তিনি মজেছিলেন আরও পরে, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বলে যাওয়া ‘শেষ লেখা’-য়। বলেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতাগুলি অন্য জগতের লেখা।’’

‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় সমরবাবু রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ শেষও করেছেন হয়তো কিছুটা অভিমানেই।

কারণ? ওঁর মুখেই শুনুন....

‘‘অনেকে হয়তো জানেন না যে তিরিশের দশকের শেষাশেষি রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার একটি সংকলন বের করেন (জোর গুজব সজনীকান্ত দাসের সহযোগিতায় ও পরামর্শে)। তিন জন ‘আধুনিক’ কবি বইটিতে স্থান পায়নি— বিষ্ণু দে, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও আমি। শেষ পর্যন্ত সংকলনটির কী হয়? এ বিষয়ে বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ আলোকপাত করতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনে অশোক মিত্র (পরে আইসিএস) একটি তীব্র তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন সংকলনটির; অন্য দু-একটি পত্রপত্রিকায় বিরূপ মন্তব্য বেরোয়।’’

সমরবাবু শান্তিনিকেতনে কবির সঙ্গে শেষ দেখার যে-বিবরণটি দিয়েছেন তাতে কি অস্পষ্ট আভাস কেন তিনি সংকলনে বাদ? সেই সব সাক্ষাতে বুদ্ধদেব বসুর তো কবিকে দেখে শেষ বয়েসের টলস্টয়ের কথা মনে হয়েছিল, কিন্তু সমরবাবু লিখছেন:

‘‘কবির দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা আন্দাজ করে একটা দূরত্বে সিগারেট ফেলে দিয়ে প্রণাম সেরে বসতাম গাছতলার নিচে মোড়ায়।... কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর শুনলাম ‘রবিবাবু’ বলাতে এবং প্রায়ই তাঁকে বিরক্ত করাতে দুর্নাম হয়েছে। শান্তিনিকেতনের পরচর্চার আবহাওয়া দেখে বলতাম ব্রাহ্ম-পল্লীসমাজ (বুদ্ধদেববাবুর ‘সব পেয়েছির দেশে’ অন্য সুরে লেখা)।’’

একটু বেশি রবীন্দ্র-কথা এসে গেল? উপায় নেই, যেটুকু যা পেয়েছি সমরদা’কে (ফ্রন্টিয়ার শুরু হতে তিনি ফের তাতে মগ্ন হন) ঘুরে-ফিরে কথায় চলে আসতেন রবীন্দ্রনাথ।

‘নাও’ এবং ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর আমল থেকেই সমর সেন বেশ একটা কিংবদন্তি-কিংবদন্তি ভাবমূর্তি পেয়ে গিয়েছিলেন। এমার্জেন্সি আমলে যখন কাগজ বন্ধ,  অপিস-কাছারি নেই, উনি সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছিলেন ঋত্বিকের না-দেখা ছবিগুলো দেখে। দেখে ভাল লেগেছিল এবং আফশোস হয়েছিল বেচারি বেঁচে থাকতে ছবিগুলো দেখে মত প্রকাশ করা হয়নি ভেবে।

তবে যে-ভাষায় কথাগুলো বলেছিলেন, তা লক্ষ্যণীয়।—‘‘ঋত্বিকের বিষয়ে আমার বিবেক দংশন হয়। তাঁর জীবদ্দশায় যখন দেখা হত, মাঝে মাঝে, তখন তাঁর প্রতিভা সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম না, একটা নাক-উঁচু ভাব ছিল। গত বছর তিনি মারা যাবার পর তিন চারটি ছবি দেখে বিস্মিত বোধ করি। বেশ কয়েকজন শিল্পী প্রগতি ভাঙিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ঋত্বিক, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও, ভেজাল ছিলেন না।’’

এখন হিসেব করে দেখছি, সানডে-র সঙ্গে যোগাযোগ যখন, তখনই উনি ঋত্বিকের ছবিগুলো দেখেছেন। অথচ সে-কথা আলাপে উচ্চারণ করছেন না। শুধু একবার কথায় কথায় সত্যজিৎ প্রসঙ্গে বলছেন (যা পরে ‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় লিখেওছেন), বিদেশে খ্যাতির পরেই যে ‘পথের পাঁচালী’-র কদর বাড়ে দেশে সে-কথাটা অনেকটাই গ়ড়ে তোলা।

তাতে আমি বলেছিলাম, ‘‘‘দেশ’ পত্রিকায় পঙ্কজ দত্ত-র রিভিউটাই তো তার প্রমাণ।’’

তখন বললেন, ‘‘তোমরা জানো কিনা জানি না, ছবিটা দেখার পর আমরা কয়েকজন বন্ধু চাঁদা তুলে বিশপ লেফ্রয় রোডে আইসিএস অশোক মিত্রর বাড়িতে সত্যজিৎকে সংবর্ধনা জানাই।’’

এর পরেই আলোচনাটা অবলীলায় চলে যায় শিল্পকলায় অনুভূতি ও শৈলীর ভারসাম্যের কথায়। ক্রমে ওঁর প্রিয় কবি এলিয়ট-এ। পরে ওঁর লেখা পড়েই জেনেছিলাম, ‘‘‘শুদ্ধ’ কবি হিসেবে ইয়েটসকে খাতির করতেন সুধীনবাবু (দত্ত)। আমার বেশি অনুরাগ ছিল এলিয়টের প্রতি। ‘Poetry is not a turning loose of emotion’ কথাটি এখনও মনে পড়ে বাংলা কবিতা পড়লে।’’

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমর সেন (ছবির একদম বাঁ দিকে), বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, কামাক্ষী প্রসাদ, (সামনে) শিশু মীনাক্ষী

 

এলিয়টের কথায় অবধারিত ভাবে এসে পড়েছিল ওঁর প্রিয়, বয়োজ্যেষ্ঠ কবি এবং একটা সময়ে ওঁর প্রতিবেশী বিষ্ণু দে’র কথা। যাঁকে নিয়ে এত অপূর্ব সব অ্যানেকডোট রেখে গেছেন সমরদা, যা ওঁর ভাষায় না শুনিয়ে পারা যায় না। শুরু করছি...

‘‘বিষ্ণুবাবুর পাশের বাড়িতে থাকতাম বলে দু-একটা ঘটনা ঘটতো। আমার দ্বিতীয় কবিতার বই ওঁকে দিলাম। কিছু দূরে বসা ওঁর স্ত্রী দেখতে চাওয়াতে বিষ্ণুবাবু বইটা পায়ের দুটো আঙুলের মধ্যে গুঁজে ওঁকে এগিয়ে দিলেন। ওঁর স্ত্রী বিস্মিত হয়ে প্রতিবাদ করাতে বিষ্ণুবাবু বললেন, পা দুটো নানা ভাবে ব্যবহার করতে পারি বলেই আমরা বাঁদর হয়ে থাকিনি।...

বিষ্ণুবাবুর বুদ্ধি ও জিহ্বা প্রখর, অবশ্য বেশি কথা বলতেন না। একবার আমরা তিন বন্ধু (অশোক মিত্র—অর্থমন্ত্রী নন— চঞ্চল চট্টোপাধ্যায় ও আমি) ঠিক করলাম বিষ্ণুবাবুর স্নায়বিক বৈকল্য ঘটাতে হবে; তাতে যদি উনি কৈবল্য সন্ধান থেকে বিরত হন। প্রতিদিন বেলা দুটো নাগাদ ওঁর বাড়িতে গিয়ে রাত আটটার আগে উঠতাম না। কারণ পশ্চিমি ধ্রুপদী সঙ্গীত সম্বন্ধে আমাদের অত্যন্ত আগ্রহ এবং বিষ্ণুবাবুর লম্বা-চোঙা ইএমজি গ্রামাফোন ও রেকর্ড সংগ্রহ তো প্রায় বিশ্ববিখ্যাত।

প্রথম দিনসাতেক জলযোগ ও সিগারেট মনের মতো ছিল। তার পর জলযোগের পরিমাণ ক্রমশ কমে শুধু চায়ে দাঁড়ালো, সিগারেটে স্বাবলম্বী হতে হল। মাসখানেক পরে দেখলাম বিষ্ণুবাবু অবিচলিত, কিন্তু আমাদের তিনজনের মধ্যে তুচ্ছ কারণে খিটিমিটি লেগে যাচ্ছে, এ-ওকে দেখলে চটে উঠতাম। নিজেদের মধ্যে স্নায়বিক বৈকল্যের লক্ষণ দেখে রণে ভঙ্গ দিলাম।’’... একবার অবশ্য বিষ্ণুবাবু অল্প বিচলিত হয়েছিলেন। বিয়ে করে প্রথম ওঁর বাড়িতে গেলে আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন, কমবয়েসী মেয়ে বিয়ে করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য কী?

আমার স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘ও, আপনি সেই বিষ্ণুবাবু যিনি ঝড়ে জলে ছাতা মাথায় দিয়ে অন্যদের নিন্দে করতে বেরিয়ে পড়েন!’ বিষ্ণুবাবু আমার দিকে তাকালেন, আমি অন্য দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম।’’

সমরদা কিন্তু বিয়ের আগে এই বিষ্ণু দে’কেই দুটো চিঠিতে (৫.৪.৪১ এবং ২৮.৪.৪১) বউ ও বিয়ে নিয়ে বিশদে লিখেছিলেন।

প্রথমটিতে লিখেছেন—

‘‘...আপনি বোধহয় শুনেছেন যে দিল্লিতে বিয়ে করছি। বিয়ে এখানে ২৮ শে এপ্রিল তারিখে হবে। মেয়েটির নাম সুলেখা, বয়স কম, আমাদের সামনের বাড়িতেই থাকে। গত ডিসেম্বর মাসে আলাপ হয়েছিল, সম্পর্কে আত্মীয়া হয়। চেহারা ভালো নয়, তবে আমার বেড়ে লাগে।...’’

দ্বিতীয় চিঠিটা একেবারে বিয়ের দিনে লেখা। লিখেছেন, ‘‘... বিয়েটা খুব মজার হচ্ছে। বাড়ির পাশেই আমার ভাবী স্ত্রী থাকেন; বিয়ের সমস্ত অনুষ্ঠান ওদের বাড়ির মেয়েরা জোগাড় যন্তর করে সম্পন্ন করছেন।

এমন কি যে জামাকাপড় পরে বিয়ে করতে যাবো, সেটাও বাগিয়েছি, আমার হাতে মাত্র পাঁচ টাকা আছে। এর কাছে কাপড়, ওর কাছে রুমাল, রাধারমণ বাবুর কাছে টাকা, কোনোরকমে manage করেছি। বাবা শুনলাম মেয়েকে আশীর্বাদ করার সময় শ্বশুর মশায়ের কাছ থেকে গিনি নিয়ে সেটাই দিয়েছেন।’’

১৯৭৬-এ যখন সমরদার বাড়িতে যাচ্ছি, তখন ওঁর বয়স ঠিক ষাট। বৌদি বয়েসে বেশ ছোট এবং কালো ফ্রেমের চশমা ও সবুজ পাড় দেওয়া খয়েরি তাঁতের শাড়িতে প্লেটে কাটলেট সাজিয়ে দিতে এলেন যখন, তখন তিনি রীতিমতো একটা প্রেজেন্স। বিখ্যাত বরকে বেশি পান না করার চেতাবনি দিলেন।

আকবর আর আমাকে বললেন, ‘‘আপনাদের সানডে তো বেশ ভাল হচ্ছে। সে দিন তো উনি খুব মজা করছিলেন রবিঠাকুরকে নিয়ে শক্তির লেখাটা নিয়ে।’’

শক্তির (চট্টোপাধ্যায়) লেখা মানে যে-লেখায় কবি রবিঠাকুর নিয়ে বেশ মজা করে বলেছিলেন। হেডিং করা হয়েছিল ‘টেগোর? দ্য গড?’ তাতে দেদার চাঞ্চল্যও হয়েছিল সে-সময়।

সমরদার তো ভাল লাগারই কথা, কারণ শক্তিদার রচনার ধরনটা প্রায় ওঁর মতোই হয়েছিল। ওঁর স্বভাবভঙ্গিতে একটা ওয়ানলাইনারে বললেন, ‘‘দিব্যি তো এ-ঠাকুর ও-ঠাকুর মিলিয়ে দিল।’’

কথাটা শক্তিদাকে বলতে খুব হেসেছিলেন। একটু হাই-ও ছিলেন, পিরিতির ভাষায় বললেন, ‘‘তা আছেন কেমন বুড়ো? অনেক দিন দেখা হয়নি। দাঁড়াও, একদিন একটা রামের বোতল নিয়ে গিয়ে হামলা করব।’’

তার পর একটু থেমে, মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘সত্যি, মানুষটার জবাব নেই।’’

পরে গিয়েছিলেন কি না সেটা জানি না।

যাক, এ বার বিষ্ণুবাবু সম্পর্কে সমরদার এক চুম্বক বৃত্তান্ত দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাব।

বিষ্ণুবাবু একবার প্রয়োজন পড়ায় সমরবাবুর থেকে কুড়ি টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেবার নাম করেন না।

এক দিন বাড়ি ফিরে সমরবাবু দেখলেন যে বিষ্ণুবাবু ওঁর ঘরে একটা যামিনী রায়ের ছবি ঝুলিয়ে দিয়ে গেছেন। বেশ তো, যামিনী রায়ের ছবি। কিন্তু মাঝে মধ্যে ছবিটা ওঁকে ধারের টাকাটা মনে পড়িয়ে দেয় আর ভেতরটা খচখচ করে।

তখন সমরবাবু ছবিটাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেন। আর বিষ্ণুবাবু বাড়ি এলে ওটাকে ফের সোজা করে দেন।

বৃত্তান্তটা লিখছেন যখন সমরবাবু তখন কুড়ি টাকা শুধতে যে-যামিনী রায় ঝুলিয়েছিলেন বিষ্ণুবাবু, বাজারে তার দাম চড়েছে দুশো টাকা।

একটা জিনিস মনে আছে সমরদার বাড়ির আলাপের— উনি রাজনীতির কথার মধ্যে যেতে চাইতেন না। তার একটা কারণ অবশ্যই সে-সময়ের রাজনীতির কদর্য চেহারা।

দ্বিতীয় কারণ— সারাটা সময় ওই সব নিয়েই তো মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। তার অনুপ্রবেশে সন্ধের আলাপটা ভাঙচুর হবে।

তবে আরও পরে জেনেছি— সমরদার ছোট বোন কমলা রায়ের স্মৃতিচারণা থেকে— এক ছাদের নীচে নানা মতের রাজনীতির কোন্দল নিয়ে ছোট থেকে বড় হয়েছেন মানুষটা। কমলা লিখেছেন...

‘‘...আমাদের বাড়িতে তখন দু’রকম মতবাদ চলছে। নীচে বাবা তখন ভীষণ হিটলার ভক্ত, ওপরে স্ট্যালিন ভক্ত।... বাবা ভেবেই নিয়েছিলেন, ইংরেজ হারবে। ... বলতেন, ইংরেজি আর পড়তে হবে না, এখন থেকে জার্মান ভাষা পড়তে হবে।...’’

বিষ্ণু দে ও বুদ্ধদেব বসুকে কয়েকটি চিঠিতেও এই ‘মতান্তর’-এর সকৌতুক উল্লেখ করেছেন সমররবাবু।

বিষ্ণু দে’কে লিখছেন: ‘‘বাবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়? নিশ্চয়ই খুব উল্লসিত। সুভাষবাবু এলেন বলে।’’

২০.৯.৪১-এর এই চিঠির সুভাষবাবু হলেন নেতাজি। জার্মানরা জিতলে এই সুভাষবাবুই জার্মান বাহিনী নিয়ে ভারতে ফিরবেন বলে স্ট্যালিনবাদীদের ধারণা তখন। এই ধারণায় সমরবাবু যে খুব পীড়িত ছিলেন, তা বিষ্ণু দে’কে লেখা পরের চিঠিতে আরওই ঝলকে ওঠে।

চিঠির তারিখ ৫.১১.৪১, লিখছেন:

‘‘আমাদের বাড়িতে শুনলাম খুব খানাপিনা চলছে, জার্মানরা রুশ দেশকে প্রায় খেয়ে ফেলছে বলে। বেশি খেলে বমনের সম্ভাবনা বাড়ে, সে কথা পিতৃদেব বোধহয় ভুলে গিয়েছেন।’’

রুশ-জার্মান যুদ্ধে সেন পরিবারের সঙ্কট কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল তার এক চরম ছবি বুদ্ধদেব বসুকে লেখা সমরবাবুর ৭.২.৪২-এর চিঠিতে।...

‘‘...বাবা কেষ্ট এবং আমার সেজভাই-এর সঙ্গে বাক্যালাপ করেন না, (ওরা) হিটলার বিরুদ্ধ বলে...।’’

এখন ফিরে তাকালে মনে হয় এমার্জেন্সির ওই রুদ্ধসঙ্গীতের আবহেই সমরদা ওঁর জীবনবৃত্তান্ত লিখবেন বলে মনস্থির করেন।

নিশ্চিত জানি না, শুধু একটি ধারণা। ধারণা গড়ার স্ফুলিঙ্গ হঠাৎ একদিন বরিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে শোনানো ওঁর একটা চুটকি। পরে ‘বাবুবৃত্তান্ত’ প্রকাশ পেলে দেখা গেল সেখানেও গল্পটা আছে, এবং অনেকের মুখে মুখে ঘুরেছে তখন। তাতে মনে হয় বইয়ে ব্যবহৃত নানা অ্যানেকডোট ওঁর মগজে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন।

ওঁর লিখিত বয়ানে গল্পটা দিয়ে আজকের বৃত্তান্ত শেষ করতে হবে।

‘‘আমাদের বেহালার বাড়িতে রাধারামণবাবু (মিত্র) ও বঙ্কিমবাবু খুব সম্ভব ১৯৩২ নাগাদ আসেন। বঙ্কিমবাবু ছিলেন অত্যন্ত মন্থরগতি, দীর্ঘ ভারিক্কি চেহারা, কথাবার্তা বলতেন ধীরেসুস্থে, আত্মপ্রত্যয় ছিল প্রখর। বাগানে খাটা পায়খানায় গেলে ঘণ্টা দেড়েকের আগে বেরোতেন না, সঙ্গে যে বই নিয়ে যেতেন পরে প্রায়ই পাওয়া যেত না। আমরা বলতাম বিপ্লব আপনার জন্য পিছিয়ে যাবে, ক্রান্তি মুহূর্তে হয় পায়খানা কিংবা জর্দা পানের জন্য বসে থাকবেন।’’