যে রাজনৈতিক অবস্থায় বুলগানিন ও ক্রুশ্চেভ খোলা গাড়িতে মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভ দিয়ে ধীর গতিতে চলেন, যখন ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ উচ্চারিত হয়, সেই প্রেক্ষাপটে বড় হয়ে ওঠার মননশীলতা এক আলাদা মাত্রা পায়। শশী দেশপাণ্ডের লিসন টু মি সেই পর্যায়ের একটি আত্মকথন। বইয়ের শুরুতে দেখা যায় আধুনিক নাগরিক জীবনে সাধারণ শহরের (বেঙ্গালুরু) পর বড় শহরের (মুম্বই) প্রভাব কতটা জোরাল হতে পারে— বৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন চেহারা এই দুই শহরের অবস্থানের রূপক, যা লেখিকাকে আত্মচরিত শুরু করতে সাহায্য করে।

সে অল্প বয়সে সবার প্রিয়পাত্রী— খানিকটা দয়ারও— কারণ সে স্বভাবতই স্বল্পবাক ও চিন্তাশীল, সহোদর বোনের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। শিক্ষার নতুন বৃত্তে স্কুল পেরিয়ে কলেজের গণ্ডিতে একমাত্র বই পড়াই শশীর প্রাণের কাছের, বই তার নিত্যসঙ্গী। অর্থনীতি পড়তে শুরু করলেও এই বিষয়ে তার তেমন ভালবাসা ছিল না। প্রথাগত বা পুঁথিগত বিদ্যা প্রথমে অর্থনীতি ও পরে আইনে ডিগ্রি, তবে শেষে তিনি পুরোপুরি লেখার জগতে প্রবেশ করেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদটি জুড়ে রয়েছে ধারওয়াড় শহরের উপস্থিতি— লেখকের জন্মসূত্রে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। ধারওয়াড়ের সৃষ্টির ভিন্নতা, তার কোল ঘেঁষে বড় হওয়া খ্যাতনামা লেখকের দলের (যেমন গিরিশ কারনাড) মধ্যে এখানকার সংস্কৃতি চর্চার বহমানতা। বাবা মা ভাই বোন-সহ বড় হওয়ার অভিজ্ঞতাকে নানা ভাবে দেখেছেন শশী। বাবার (জনপ্রিয় কন্নড় লেখক/ নাট্যকার শ্রীরঙ্গ) চাকরিতে ইস্তফা দেওয়া, তরুণী শশীর স্বর্ণপদক পাওয়া— এ সমস্তই একটি পরিবারবোধের অংশ, যেমন তাঁর ছোট ভাইটির অকাল মৃত্যু। পরিবারকে তার সব রকম টানাপড়েন নিয়ে নিজের লেখক জীবনে উপস্থিতি দেওয়া এ বইয়ের একটি প্রধান সম্পদ। গভীর পরিবারবোধ ও নিজের পড়াশুনোকে আরও উন্নত করার চেষ্টাটি নিরন্তর: একটি অংশে নয় বার বাড়ি (বাসস্থান) বদলের কথা আছে, তাতে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই ছিল। কিন্তু কোথাও এই ‘বাড়ি’র ধারণাটির যত্নের ত্রুটি ছিল না। বাড়িকে কেন্দ্র করে ধারওয়াড়ের আত্মিক উপস্থিতি, যা লেখিকা পরিণত বয়সে বুঝতে পারেন।

বিবাহ এবং বিবাহিত জীবন যে এক নয়, তা ক্রমশ প্রত্যক্ষ হল। মায়ের সঙ্গে (ভাইয়ের অকালমৃত্যুর দরুন) সম্পর্কের জটিলতা; বাবার মৃত্যুর মধ্যে একটি ভিন্নতর আক্ষেপ, যা তাঁর নাট্যব্যক্তিত্বেও ধ্বনিত, কন্যার সাহিত্যবোধকে তীক্ষ্ণ করে তোলে। ক্রমশ তাঁর স্বামী কমনওয়েল্‌থ ফেলোশিপ নিয়ে সপরিবার ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন। লন্ডনের আনাচকানাচ, সেখানকার জীবনযাত্রার দস্তুরমতো পরিশ্রম, টিভির আকর্ষণ, নানা রকম বই, নাটক ও সর্বোপরি স্বাধীন ভাবে রোজগার করবার একটা অদম্য ইচ্ছা শশীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বছর ঘোরার আগেই (আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ আসা সত্ত্বেও) দেশপাণ্ডে পরিবার মুম্বই ফেরত আসে এবং শশী সাংবাদিকতার পাঠক্রমে ভর্তি হন। অর্থাৎ বড় হওয়া একটি পরিক্রমা। এই পরিক্রমায় সব চাইতে অকিঞ্চিৎকর ও আপাত অদরকারি অভ্যাসগুলিই যে জীবনের দৌড়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে তা লেখক বার বার বলেছেন; নিজে যখন অসুস্থতার দরুন প্রায় এক বছর গৃহবন্দি ছিলেন তখনকার টাইপিং ক্লাসগুলি পরবর্তী জীবনে তাঁকে ডিগ্রির চাইতেও বেশি উপকার দিয়েছিল। নানা ছোট গল্প দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে উপন্যাস লেখার মধ্যে যে ধরনের ধাক্কা বা হোঁচট থাকে, নানা জটিলতা থাকে, তা এই আত্মকথনের অঙ্গ। যেমন তাঁর সুপরিচিত উপন্যাস দ্য ডার্ক হোল্ডস নো টেররস তৈরির পিছনে রয়েছে একটি ছোট গল্প— ‘আ লিবারেটেড উওম্যান’।

সৃজনী: শশী দেশপাণ্ডে। ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

গতানুগতিক ভুল ও ঠিকের সীমারেখা মেনেই ঠিক হয় লেখকের আত্মবোধ: তারই প্রকাশ বিশেষ একটি ভাষার মাধ্যমে হয়। সৃজনশীলতার আলাদা কোনও ভাষা হয় না। এই কথা লেখিকা বলেছেন যখন হিন্দি ভাষার লেখক এস এইচ বাৎস্যায়ন একটি সভায় বলেছিলেন, ভারতীয় সাহিত্য কেবলমাত্র ভারতীয় ভাষাতেই রচিত হবে। শশী দেশপাণ্ডে-সহ আরও অনেকে— যাঁরা ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের পথিকৃৎ, যেমন আর কে নারায়ণ, মুল্‌করাজ আনন্দ, রাজা রাও ছাড়াও খুশবন্ত সিংহ প্রমুখ— তাঁদের জন্য এ মন্তব্য যথেষ্ট নির্দয়। আইডব্লিউই (ইন্ডিয়ান রাইটিং ইন ইংলিশ)-এর তকমা শশীকে এনে দিয়েছে বহু শিরোপা (যেমন পদ্মশ্রী এবং সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার): বইতে তাঁর বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাস লক্ষিত হয়। এই প্রসঙ্গেই আসে তাঁর ইংরেজি সাহিত্যে গভীর, বিস্তারিত পড়াশুনো (জেন অস্টেনের প্রতি গভীর অনুরাগ) ও ইংরেজি ভাষায় সাবলীল ও অনায়াস দক্ষতা। বিদেশি প্রকাশনা লেখিকাকে সাফল্যমণ্ডিত করে— বহু জায়গায় আমন্ত্রিত হতে থাকেন। কেমব্রিজ এবং সুইডেনে, বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের বিদগ্ধ বক্তৃতা শোনবার পর তাঁর মনে হয় যে এখনও (বইয়ের সময়ের বিচারে, তখনও) আইডব্লিউই ঠিক জাতে ওঠেনি। কেবলমাত্র এক বার কোনও ভারতীয় সাহিত্যিকের প্রসঙ্গ আসে— তিনি সলমন রুশদি: প্রসঙ্গটি তোলেন সাহিত্যিক মার্গারেট ড্রাবেল, তাও রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হওয়ার বিষয়ে। বিভিন্ন বক্তৃতা দিতে যাওয়ায় তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা, চমৎকার রসবোধের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন লেখিকা— সুইডেনে ভার্জিনিয়া উল্‌ফের লেখার খেই ধরে আলোচনা হয় কেন মহিলারা পুরুষদের তুলনায় গরিব। আমস্টারডামে নিজের উপন্যাসের উপর বলতে গিয়েও প্রশ্ন শুনতে হয় কাশ্মীর সমস্যা, শিখ দাঙ্গা অথবা পণের জন্য মৃত্যু নিয়ে! কিন্তু এই ধরনের অগুনতি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে পরিশীলিত হতে থাকে সাহিত্যিকের মনন। বুঝতে পারা যায় যে আজকের এই আধুনিকোত্তর সময়ে, (লেখকের জন্যেও) গল্পের গ্রন্থনে, শুধুমাত্র চেনা অর্থের সীমানা পেরিয়ে তবেই অন্যতর অর্থের ইশারা দেখা যায়। তাঁর উপন্যাস দ্যাট লং সাইলেন্স-এর প্রতিষ্ঠা যেন তাঁরই প্রাণপ্রতিষ্ঠা, লেখক হিসেবে। ভিরাগো প্রকাশিত এই উপন্যাসটির পরেই ইংল্যান্ডে যাওয়া, তাঁর সুখের অনুভূতিগুলির অন্যতম। বিভিন্ন নামী লেখকের সঙ্গে পরিচয়, বিবিসি-তে সাক্ষাৎকার, পুরনো বন্ধু মারিও ফুটোর সঙ্গে দেখা হওয়া, জার্মান প্রকাশক ভোল্‌ফ মার্স-এর সঙ্গে আলাপ, এ সবই তাঁকে এনে দেয় নাম ও যশ। ক্রমশ অনুবাদ সাহিত্যের মূল্যও বইতে এসে পড়ে। অনুবাদ না হলে সমগ্র পৃথিবীর কাছে তাঁর পরিচিতি তৈরি হবে না: গীতা কৃষ্ণনকুট্টি-সহ আরও বিখ্যাত অনুবাদের কথা আসে; জার্মান ভাষায় তাঁর উপন্যাস ডার্ক হোল্ডস নো টেররস অনুবাদ হওয়ার পর শশীর পরিচয় আরও ব্যাপৃত হয়। এক সময় গায়ত্রী স্পিভাকের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়ে যান, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে করেন মহাশ্বেতা দেবীকে স্পিভাক, অথবা ইউআর অনন্তমূর্তিকে রামানুজন কেমন করে তাঁদের ভাষার জোরে পৃথিবীর সাহিত্য-প্রাঙ্গণে স্থাপন করেছেন। 

লেখকজীবনের গভীরতম অনুভূতি একাধিক বার লিপিবদ্ধ করা দুরূহ কাজ। যেমন, ম্যাটার অব টাইম উপন্যাসে সুমি-র মৃত্যু। ঠিক যখন এই চরিত্রের সুচারু ভাবে বিকশিত হওয়ার সময়টি এল, তখনই তার মৃত্যু হল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচিয়ে না রাখতে পারার আক্ষেপ শশী স্বীকার করেছেন, অর্থাৎ উপন্যাস শুরু হওয়ার পর— গল্পে ও চরিত্রে গভীরতা এলে— লেখককেও চরিত্র ও পারিপার্শ্বিককে যথাসম্ভব স্বাধীনতা দিতে হয়। ফলত (রলাঁ বার্ত-কে মনে রেখে) উপন্যাসের সামগ্রিকতার উপর লেখকের পূর্ণ মানসিক অধিকার থাকে না। সুমি-র চরিত্রটির কথা বইতে লেখিকা স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, আরও চরিত্রের কথাও পাঠক জানতে পারেন, যেমন মুভিং অন উপন্যাসের জিজি। 

শশী দেশপাণ্ডের নারীবাদী সত্তা ও লেখক সত্তার মধ্যে বিরোধের চাইতে বোঝাপড়া অনেক বেশি। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস, দ্য বাইন্ডিং ভাইন এ সত্য প্রমাণিত করে। ১৯৭৩ সালে মুম্বই শহরের কেইএম হাসপাতালে কর্মরত নার্স অরুণা শানবাগের ধর্ষণ এই উপন্যাসের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত। লেখকও সপরিবার এই ঘটনার সাক্ষী। অত্যাচার ও ধর্ষণের ফলে ৪২ বছর ধরে হাসপাতালে প্রায় জড় পদার্থ হয়ে থাকার পর অরুণার মৃত্যু হয়। কিন্তু উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কল্পনা: তার বাঁচার ইচ্ছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সেই কারণে ধর্ষিত হওয়া প্রাণ পায় গল্পকার ঊর্মির ভিতর দিয়ে। পেঙ্গুইন (পরে) এই বইটি প্রকাশ করলেও ঠিক তেমন সাড়া মেলেনি। এই প্রসঙ্গে লেখিকার অকপট উক্তি: বইরাও, মানুষের মতো একটি কপাল নিয়ে পৃথিবীতে আসে, তাই প্রতিটি বই সমান ভাবে জনপ্রিয় হয় না। আলোচ্য উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম অধ্যায়ের বছরগুলিতে, যখন নারী মাত্রেই পুরুষকে ঘৃণা করে, এই ধারণা তৈরি হচ্ছিল। শশী কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে নারীবাদ ও মানবতাবাদের তফাত বুঝিয়ে দেন। 

বহু ধরনের হাহাকার নিয়েই তৈরি হয় লেখকের মন: এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তবু বইটিতে বিষণ্ণতার ভিড় নেই। নেই উদ্যোগের বর্ণনা। বরং নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার জয়যাত্রাই এই সুপাঠ্য বইটির পাথেয়। বইয়ের পরিসরে একাধিক বার শশী বলেছেন যে কয়েকটি কাজ (যেমন প্রবন্ধ, রম্যরচনা বা কবিতা লেখা) তাঁর জন্য নয়। উপন্যাসেই তিনি সব চাইতে সাবলীল। তাঁর নিজের কথায় বিচার করলে এই বইটির মূল্যায়নও ঠিক তাই হবে। আত্মকথনের সমস্ত ত্যাগস্বীকার, অকপটতা, সন্ধি, বিচ্ছেদ ও মনোনয়ন থাকা সত্ত্বেও অবহিত পাঠকের মনে তাঁর উপন্যাসগুলিই গাঁথা হয়ে থাকবে। কারণ (লেখিকার কথায়) প্রতিটি উপন্যাস একটি নতুন প্রাণের স্পন্দন: আর এই প্রাণ সৃষ্টি করেন যিনি, তিনি খ্যাতি ও সমালোচনা দু’টিরই ঊর্ধ্বে।