তথ্যের অধিকার/ মুক্ত দুনিয়ার স্বপ্ন

সুগত সিংহ

৩০০.০০

আনন্দ পাবলিশার্স

বইয়ের ভূমিকায় একটা প্রশ্ন তুলেছেন লেখক সুগত সিংহ— তথ্যপ্রযুক্তির পরিসর সব মানুষের জন্য সমান ভাবে খোলা থাকবে, না কি তা বৃহৎ কর্পোরেট বা বৃহত্তর রাষ্ট্রের দখলে চলে যাবে, তা নিয়ে যে লড়াই দুনিয়া জুড়ে চলছে, তাতে রাজনৈতিক বামপন্থীদের ভূমিকা নেই কেন? এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হয়— বামপন্থী রাজনীতি প্রবল ভাবে আধিপত্যে বিশ্বাসী। একক মানুষের স্বাতন্ত্র্য তার সহ্য হয় না। সেই স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা দিতে পারে শুধুমাত্র বাজার। মুক্ত বাজার। তথ্যপ্রযুক্তির পরিসরটা নিয়ে যে লড়াই চলছে, সেটা বাজারের অভ্যন্তরীণ লড়াই। বড়, একচেটিয়া ক্ষমতার বিরুদ্ধে অনেক এককের লড়াই। রাজনৈতিক বামপন্থীরা এই লড়াইয়ের ময়দানে যদি থাকেনও, সম্ভবত এককের পক্ষে থাকবেন না।

একেবারে গোড়াতেই এমন রাজনৈতিক প্রশ্ন তুললাম কেন? কারণ, বইটি আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক। একটা বাজার ব্যবস্থারই গল্প, যেখানে উৎপাদক অনেক, উপভোক্তাও অগণন— প্রতিযোগিতার বাজারে ঠিক যেমনটা হয়। কোনও সেন্ট্রাল প্ল্যানার নেই, কখন কোন পরিষেবা কতখানি উৎপাদন করতে হবে, তা বলে দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। এমনকি, প্রত্যক্ষ চাহিদাও যে সব ক্ষেত্রে আছে, তা-ও নয়। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেই যেমন। ষাটের দশকের শেষ ভাগ থেকে যখন প্রথম চেষ্টা শুরু হল এক কম্পিউটার থেকে অন্য এলাকার অন্য কোনও কম্পিউটারে বিনা তারে তথ্য আদানপ্রদানের, সাধারণ মানুষের কাছে— আজ যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন অহোরাত্র, তাঁদের কাছে— এই পরিষেবার চাহিদা ছিল কি? না থাকাই স্বাভাবিক, কারণ এই রকম পরিষেবা যে থাকতে পারে, মানুষের কল্পনার পরিসরেই সেই কথাটি ছিল না। এমন একটি পরিষেবার বাজারে উৎপাদক হিসেবে ব্যক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। উপভোক্তা হিসেবেও। বাজারটি যাতে কোনও বিগ ব্রাদারের নজরদারির অধীন না হয়ে যায়, অথবা বড় কর্পোরেট তাকে নিজের ট্যাঁকে পুরে না নিতে পারে, এই বইয়ে সেই লড়াইয়েরই গল্প। সেই গল্পে রাজনীতি স্বভাবতই মুখ্য চরিত্র।

এই আখ্যানে রিচার্ড ম্যাথু স্টলম্যানের কথা আসবেই। ফ্রি সফট্ওয়্যারের রাজনীতি এই বইয়ের অনেকখানি অংশ জুড়ে আছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা স্টলম্যানের মতো সফটওয়্যার ডেভেলপারদের থেকে বিভিন্ন সফটওয়্যারের কোড নিত। তার ওপর কিছু খোদকারিও করত সংস্থাগুলি। কিন্তু, সেই পরিমার্জিত সফটওয়্যারের ওপর আর কোনও অধিকার থাকত না ডেভেলপারদের। সেগুলো তখন হয়ে যেত প্রপ্রাইটারি সফটওয়্যার, তা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করত সংস্থাগুলো। এই ব্যবসার পথের কাঁটা হিসেবে তৈরি হল ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন। তার কপিরাইটের শর্ত হল, সেই সংস্থার তৈরি করা সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারবে যে কেউ, ইচ্ছেমতো অদলবদলও করতে পারবে। কিন্তু, নতুন যে সফটওয়্যার তৈরি হবে, সেটার ওপরও অধিকার থাকবে যে কোনও লোকের। কাউকে সেই কোড জানাতে অস্বীকার করা যাবে না। কপিরাইটের উল্টো করে এর নাম দেওয়া হল কপিলেফট।

এই গল্প আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের। আদ্যন্ত রাজনৈতিক এই অবস্থানের দশ বছর পরের আর একটা ঘটনার কথা বলেছেন লেখক, যাতে বোঝা যায়, উল্টো দিকেও লড়াই কতখানি তীব্র। ২০০৩ সালে মিকি মাউস নামক চরিত্রটির কপিরাইটের মেয়াদ ফুরনোর কথা ছিল। তার কয়েক বছরের মধ্যেই কপিরাইট ফুরতো প্লুটো, গুফি, ডোনাল্ড ডাকের। এগুলো হাতছাড়া হলে কোটি কোটি ডলার লোকসান হত ওয়াল্ট ডিজ়নি কোম্পানির। ফলে, কী হইতে কী হইয়া গেল, মোহনের হাতে পিস্তল— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কপিরাইট আইন পাল্টে গেল রাতারাতি, মেয়াদ বেড়ে গেল মেধাস্বত্বের। ঠিক তার পরের দিন তৈরি হল ডিজিটাল মিলেনিয়াম কপিরাইট অ্যাক্ট— স্টলম্যান ঠাট্টা করে এর নাম দিয়েছিলেন ডমিনেশন বাই মিডিয়া কর্পোরেশন অ্যাক্ট। এই আইন অনুযায়ী কোনও কপিরাইটেড ডিজিটাল ফাইল স্রষ্টার অনুমতি ছাড়া কপি করা যাবে না। লড়াইয়ের চরিত্র স্পষ্ট— এক দিকে ব্যক্তি-স্রষ্টা চাইছেন ইন্টারনেটের দরজা-জানালা উন্মুক্ত করে রাখতে, যাতে যার যতটুকু প্রয়োজন নিয়ে যেতে পারে নিশ্চিন্তে; আর অন্য দিকে কর্পোরেট চাইছে প্রতিটি অণু-পরমাণুর জন্য তার প্রাপ্য বুঝে নিতে।

পাইরেসি এই যুদ্ধের আর একটা পথ। অবশ্য, এক আশ্চর্য পাইরেসির গল্প বলেছেন লেখক। কম্পিউটারের আদি যুগে মেশিন চালু করলেই ডেস্কটপে একগাদা আইকন ভেসে উঠত না। ফলে, প্রতিটি কাজের জন্য টাইপ করে নির্দিষ্ট কম্যান্ড দিতে হত। তার একটা অক্ষর ভুল হলেই কেঁচেগণ্ডূষ। সিলিকন ভ্যালির বড় মাপের সংস্থা জ়েরক্স কর্পোরেশনের কিছু কর্মী এর প্রতিকার খুঁজে পেয়েছিলেন। আইকন আর মাউসের সাহায্যে কী ভাবে কম্পিউটার চালানোর কাজটা সহজ হতে পারে, সেটা বের করে ফেলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাথা ভারী সংস্থায় যা হয়, সেটাই হল— এক পাশে পড়ে থাকল এই নতুন আবিষ্কার, সংস্থা মন দিল তার ফটোকপিয়ার তৈরির চিরাচরিত ব্যবসাতেই। সেই ফাঁক গলে ঢুকে পড়লেন স্টিভ জোবস— অ্যাপ্‌ল-এর প্রাণপুরুষ। জ়েরক্স কর্পোরেশনের অফিস দেখতে এসে তাঁর চোখে পড়ল এই নতুন গবেষণা, বুঝলেন এর সম্ভাবনা কতখানি। জ়েরক্স থেকে ভাঙিয়ে নিয়ে গেলেন মূল কর্মীকে। তার পর, চার বছর ধরে আপ্রাণ খেটে তৈরি করলেন ম্যাকিনটশ পার্সোনাল কম্পিউটার। কিন্তু জোবস-এর ওপর বাটপাড়ি করলেন আর এক জন। তাঁর নাম বিল গেটস। ম্যাকিনটশের জন্য কয়েকটা সফটওয়্যার বানানোর বরাত পেয়েছিলেন তিনি। সেই ফাঁকে দেখে নিয়েছিলেন এই নতুন ব্যবস্থা। আর, সেটা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি করে ফেললেন উইনডোজ়। নিঃসন্দেহে বেশ চটেছিলেন জোবস। আর, তাঁকে একটা জব্বর উত্তর দিয়েছিলেন বিল গেটস। বলেছিলেন, ‘‘আমাদের দু’জনেরই জ়েরক্স নামে এক ধনী পড়শি ছিল। দু’জনেই তার বাড়িতে চুরি করতে গিয়েছিলাম। তুমি টিভি চুরি করতে গিয়ে দেখলে, সেটা আমি আগেই মেরে দিয়েছি!’’

এ রকমই আরও অজস্র ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন সুগত সিংহ। তাঁর লেখার হাত চমৎকার, ফলে যা হতে পারত নিতান্ত নীরস কচকচি, সেই বিষয়গুলোই হয়ে উঠেছে রীতিমতো সুখপাঠ্য। উইকিপিডিয়ার জন্মরহস্যের কথা বলতে গিয়ে যেমন এনেছেন এমন এক জনের কথা, যাঁর মূল ব্যবসা ছিল অনলাইন পর্নোগ্রাফি। আবার, এই উইকিপিডিয়ার সূত্রেই উঠে এসেছে এই কথাটা যে দুনিয়ার হরেক প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষ কী ভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থে নিজেদের সময় দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে তৈরি করে চলেছেন এক সুবৃহৎ জ্ঞানভাণ্ডার। যেখানে নিজেদের বাঁধতে হয় সুশৃঙ্খল নিয়মানুবর্তিতায়, কারণ নজরদারি করার কেউ নেই। আবার, অন্য লেখায় সুগত সহজ কথায় বুঝিয়ে বলেছেন কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের ব্যাকরণ, একেবারে সাধারণ পাঠকের মতো করে। একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন— বাংলা ভাষায়  সম্ভবত এমন বই আর নেই। অন্তত, বাংলা প্রকাশনার মূল স্রোতে এই বিষয়ের ওপর এত রকম লেখার কোনও বই আগে চোখে পড়েনি।

একটাই অনুযোগ। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ার লড়াই যে শুধু ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠানের নয়, ব্যক্তি বনাম ব্যক্তিরও— হ্যাকিং থেকে সাইবার ফ্রড, ম্যালওয়্যার আক্রমণ থেকে ডার্ক নেট— এই প্রসঙ্গগুলো নিয়েও কিছু লেখা থাকতে পারত। দোষ লেখকের, তিনিই দাবি বাড়িয়ে দিয়েছেন।