• গৌতম চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ইতিহাসের সত্য ও জনজীবনের সত্য

pustak
পরম্পরা: হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে নিজস্ব আখড়ায় নাগা সন্ন্যাসীদের জমায়েত

Advertisement

ছায়াচরাচর/ মধুসূদন সরস্বতীর উপাখ্যানমঞ্জরী
সন্মাত্রানন্দ

৩৭৫.০০
ধানসিড়ি প্রকাশন

উপন্যাসটা ভাল না মন্দ, পরের প্রশ্ন। কিন্তু প্রথমেই যেটা বলার, সন্মাত্রানন্দ তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসে বাঙালির হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। মধুসূদন সরস্বতীকে নিয়ে এই প্রথম বাংলা ভাষায় গড়ে উঠল আখ্যায়িকা।

মধুসূদন ষোড়শ শতকে, আকবরের সমসাময়িক বিখ্যাত এক বাঙালি বৈদান্তিক সন্ন্যাসী। বৈদান্তিক মানে, শঙ্করাচার্যের অনুসারী। জগৎ ভ্রম, শুধু নিরাকার ব্রহ্মই সত্য এমনটা মনে করেন। শঙ্করাচার্যের গীতাভাষ্য অনুসরণ করে ‘গূঢ়ার্থদীপিকা’ টীকা লিখেছিলেন। সেটাই শেষ নয়। চাঁদের আলোয় দড়িকে সাপ বলে মনে হওয়ার মতো এই জগৎ কেন মিথ্যাভ্রম, তা নিয়ে ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’, ‘অদ্বৈতমঞ্জরী’, ‘সিদ্ধান্ততত্ত্ববিন্দু’ ইত্যাদি ২১টি গ্রন্থের জনক তিনি।

গ্রন্থরচয়িতা সন্ন্যাসী অতীতে অনেক ছিলেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। কিন্তু ফরিদপুরের কোটালিপাড়ার ছেলে কমলনয়ন নবদ্বীপে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা হয়নি, তখন মথুরানাথ তর্কবাগীশের টোলে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন। তারপর গুরুর আদেশে বারাণসীতে এসে রামতীর্থ নামে এক বৈদান্তিক পণ্ডিতের শিষ্য হওয়া। সে সময় বেদান্ত বনাম ন্যায়দর্শনে প্রবল দার্শনিক আকচাআকচি। নবদ্বীপের ছাত্র কমলনয়নের তখন লক্ষ্য একটাই। বেদান্তদর্শন হৃদয়ঙ্গম করে ন্যায়শাস্ত্রের মেধাবী তরবারিতে তাকে কুচি কুচি করে কাটা। ভারতীয় দর্শনের পরম্পরা এটাই। যাকে খণ্ডন করব, সেই পূর্বপক্ষকে আগে আত্মস্থ করা।

তিনি ভেবেছিলেন এক, হল আর এক। ন্যায়শাস্ত্রের পণ্ডিত মধুসূদন হয়ে গেলেন প্রগাঢ় অদ্বৈতবাদী। বারাণসীতে বিশ্বেশ্বর সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস নিলেন তিনি। নাম হল মধুসূদন সরস্বতী। বিদ্যাচর্চার এই ঐতিহ্যকে বাঙালি আজ ভুলে গিয়েছে। কিন্তু একদা এই বঙ্গে বলা হত, ‘‘বেত্তি পারং সরস্বত্যাঃ মধুসূদন সরস্বতী। মধুসূদনসরস্বত্যাঃ পারং বেত্তি সরস্বতী।।’’ মানে, মধুসূদন সরস্বতীর জ্ঞানের সীমা জানেন একমাত্র দেবী সরস্বতী। আর সরস্বতীর সীমা কতদূর,  তা জানেন শুধু মধুসূদন সরস্বতী।

এ হেন বিদ্বান এবং ব্রহ্মবাদী হয়েও তিনি কৃষ্ণভক্ত। যিনি যাবতীয় দ্বৈতবাদ জ্ঞানের তরবারিতে তছনছ করে দিচ্ছেন, তাঁরই মধ্যে এমন স্ববিরোধিতা?

এখানেই বাঙালিয়ানা। মধুসূদন নৈয়ায়িক এবং বৈদান্তিক, একই সঙ্গে ভক্ত। মধ্যযুগের বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রতিটি দিকই একাকার তাঁর জীবনে।

লোককথার পরম্পরায় মধুসূদন সরস্বতী আরও একটি  কারণে উল্লেখ্য। কুম্ভমেলার নাগা সাধু। তীর্থযাত্রী এবং সাধুসন্তরা তখন পথে বিধর্মী মুসলমান লুটেরাদের হাতে আক্রান্ত হতেন, মধুসূদন সম্রাট আকবরকে সমস্যাটি জানালেন। আকবর বললেন, ‘আপনারা, হিন্দু সন্ন্যাসীরাও তা হলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নিন।’ অতঃপর হিন্দুদের বাঁচাতে বারাণসীতে তৈরি হল অস্ত্রধারী নাগা সন্ন্যাসীর দল।

আলোচ্য বইটি উপন্যাস নয়, লেখকের ভাষায় উপাখ্যানমঞ্জরী। মানে, অনেক উপাখ্যানের সমাহার। উপন্যাস তো শুধু পশ্চিমের হাত-ফেরতা সাহিত্য প্রকরণ নয়, ‘কথাসরিৎসাগর’ থেকে ‘আরব্য রজনী’ সবেতেই আছে তার প্রাগভাব। সোজা কথায়, মধুসূদন সরস্বতীকে নিয়ে অনেক আখ্যান ও মিথ একই কাহিনীর কাঠামোয় বুনে দিয়েছেন লেখক। যেমন, এক জায়গায় এসেছে তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’। তুলসীদাস অওধি ভাষায় শ্রীরামের কথা লেখায় বারাণসীর সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা রেগে যান। মধুসূদন লৌকিক ভাষা ও তুলসীদাসের পক্ষে রায় দেন। উপন্যাসের খাতিরে লেখক এই উপাখ্যানটিই নিয়েছেন। কিন্তু বারাণসীতে আরও একটি উপাখ্যান চালু। সেই রাতে মন্দিরের এক তুলাদণ্ডের এক দিকে তুলসীর কাব্য রাখা হল, অন্য দিকে বাল্মীকি, কালিদাস প্রমুখ। সকালে দেখা গেল, বিশ্বনাথের সামনে অওধি ভাষাই বেশি ঝুঁকে আছে।

মিথ, উপাখ্যান তো অনেক। সন্মাত্রানন্দের এই উপন্যাসে মধুসূদন সরস্বতীর কাছে শাস্ত্রশিক্ষা করতে এসেছেন বৃন্দাবনের তরুণ শ্রীজীব গোস্বামী। সত্যি এসেছিলেন কি না, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু বৃন্দাবনের গোস্বামীদের মধ্যে শ্রীজীবের মেধাবী শাস্ত্রচর্চা আজও মিথ।

একই ভাবে বারাণসীতে যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে মধুসূদনের দেখা হয়েছে। প্রতাপাদিত্যের বাবা ও কাকা পাঠান দাউদ খাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু প্রতাপ দেশে হিন্দু শাসন ফিরিয়ে রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ‘‘দেশের লোক শান্তিতে থাকবে, তারা জানবে মাথার ওপর হিন্দু রাজা,’’ প্রতাপ সন্ন্যাসী মধুসূদনকে বোঝান। কমলনয়ন ভাবে, ‘‘ইঁহাকে বুঝানো মুশকিল। হিন্দু রাজ্যের পিপাসা ইঁহাকে খাইয়াছে।’’

উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে বারাণসীর ঘাট রক্তাক্ত। পড়ে আছে মুণ্ডহীন ধড়। সহসা কমলনয়নের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভবিষ্যতের ছবি। ‘‘হিন্দু মসজিদ ভাঙিয়া মন্দির গড়িবে। হিন্দুর মন্দিরে আট বৎসরের বালিকা-মুসলমান কন্যা দিনের পর দিন গণধর্ষিত হইতেছে। কাহারা যেন ‘জয় শ্রীরাম’ বলিয়া আস্ফালন করিতেছে। বাল্মীকির রাম নহে, তুলসীদাসের রামও নহে, ইহা অন্য এক রাম—রক্তপিপাসু, যুদ্ধলোলুপ রাম।’’ এই যে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সীমারেখা ভেঙে দেওয়া, সেখানেই উপন্যাসের অর্জন। অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ প্রকাশের পরই সাড়া জাগিয়েছিল। কিন্তু এই উপন্যাস তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক চেতনাঋদ্ধ।

পুরনো উপাখ্যান আধুনিক হয়ে উঠল এক জায়গায়। নাগা সন্ন্যাসীদের ঘটনার পর মধুসূদন দ্বিধাগ্রস্ত, ‘‘এ হিন্দু, এ মুসলমান, এ মিত্র... এই ভেদ কোথা হইতে আসিল? এই ভেদ দর্শনই তো মিথ্যা। তুমি নিজেকেই নানা রূপে, নানা ভেদে অভিব্যক্ত হইতে দেখিতেছ। ইহা তো মায়ার খেলামাত্র।’’ এই যে দ্বিধা, সংশয়—‘টু বি অর নট টু বি’ এখানেই তো আধুনিক মানুষ।

আখ্যায়িকার দুর্বলতা এক জায়গায়। সন্মাত্রানন্দ তাঁর আগের উপন্যাসের মতো এখানেও অনেক বিকল্প সম্ভাবনার কথা বলেন। মধুসূদন নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের দেখা পেলে হয়তো হতে পারত ভক্ত রাজীবলোচন। ছেলেবেলার মতো কবিতা লিখতে পারলে হয়তো তার নাম হত পদ্মাক্ষ। ন্যায় আর বেদান্তের যে তর্ক মস্তিষ্ককে অস্থির করে তুলছিল, তা হয়তো স্থির হয়ে যেত সুরের কাছে। এই যে সমান্তরাল বিশ্বের অনন্ত সম্ভাবনা, পড়তে ভাল লাগে। কিন্তু দুর্বলতা এসে গেল সমাপতন বা কো-ইনসিডেন্সে। সেখানে কমলনয়নের সঙ্গে রাজীব এবং পদ্মাক্ষের দেখা হয়, তারপর তারা ছিটকে যায় সময় এবং কালের নির্দিষ্ট গর্ভে।

আরও প্রশ্ন থাকে। সত্যিই কি বাঙালি মধুসূদন সরস্বতীর উৎসাহে নাগা সন্ন্যাসীদের জন্ম? এটি একটি আখড়ার গল্প, ব্রিটিশ আমলে সংগ্রহ করেছিলেন প্রাচ্যবিদ জে এন ফারকুহার। আখড়াগুলিতে এ রকম আরও অনেক উপাখ্যান আছে। একটি উপাখ্যানে ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের সামনে রাজস্থানের গলতায় শৈব গিরি ও বৈষ্ণব পুরী সাধুদের মারপিট। সেটাই প্রথম নাগা সন্ন্যাসীর উল্লেখ। আধুনিক কালে যদুনাথ সরকার থেকে ম্যাথু ক্লার্ক, উইলিয়াম পিঞ্চ প্রমুখ ইতিহাসবিদদের ধারণা অবশ্য অন্য। আকবরের ঢের পরে, মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ দিকে এই নাগা সন্ন্যাসীদের উদ্ভব। এঁরা আখড়ার হয়ে জমি দখল করতেন, তেজারতি ও অন্যান্য ব্যবসা করতেন। ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে আজ অওধ, কাল মরাঠা, পরশু ইংরেজদের হয়ে মারপিট করতেন। হিন্দু-মুসলমান ছুঁৎমার্গ ছিল না। টাকা, জমিজিরেত পেলেই হল! নাগা সন্ন্যাসীরা শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতেন না। কুম্ভমেলায় কারা শুল্ক আদায় করবে, তা নিয়ে অষ্টাদশ শতকের হরিদ্বারে শৈব বনাম বৈষ্ণবদের তুমুল মারপিটও বেধেছিল।

এটাই ইতিহাস। কিন্তু সাহিত্যের সত্য, ইতিহাসের সত্য আর জনজীবনের সত্য আলাদা। অনেক বিকল্প পৃথিবী, কোনটা বেছে নেবেন পাঠকের ইচ্ছা। এই আধো-অন্ধকার ছায়াচরাচরে ‘অপর’-এর সঙ্গে নিজের সহমর্মী সহিতত্ব খোঁজাটাই আসল, সেখানে এই উপন্যাস সফল।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন