সারা দেশ জুড়ে সে এক টানটান উত্তেজনার সময়, দেশনেতারা দ্বিধান্বিত, দেশবাসী বিভ্রান্ত। ৪ সেপ্টেম্বর ১৯২১, দলীয় কাজে গাঁধীজি কলকাতায় পৌঁছলেন, ৬ তারিখ মঙ্গলবার জোড়াসাঁকোয় এলেন রবীন্দ্রনাথকে অসহযোগ আন্দোলনের আদর্শ ব্যাখ্যা করে তাঁর সমর্থনের প্রত্যাশায়। বন্ধ ঘরে প্রায় চার ঘণ্টার আলোচনায় একমাত্র তাঁদের সেতু অ্যান্ড্রুজ় সাহেব ছাড়া চতুর্থ কেউ ছিলেন না। ‘‘উভয়ের আলোচনা যখন চলছে, তখন গান্ধিজির অহিংস অসহযোগী অনুগামীরা জোড়াসাঁকোর প্রাঙ্গণে বিলিতি বস্ত্রের বহ্ন্যুৎসব করছিলেন পৈশাচিক উল্লাসধ্বনির সঙ্গে।’’ (রবিজীবনী অষ্টম খণ্ড, প্রশান্তকুমার পাল; পৃ ১৪৩) রবীন্দ্রনাথ আর গাঁধী— নিভৃতে এ দোঁহার মিলন তো আর নিত্য হয় না— কিছুটাও যদি দেখা যায়, অবন ঠাকুর চুপচাপ দরজার চাবির ফুটো দিয়ে এক লহমায় দেখে নিলেন ভিতরকার ছবিটি, ঘরের মেঝেতে রবীন্দ্রনাথ আর গাঁধীজি মুখোমুখি, গাঁধীজির পিছনে অ্যান্ড্রুজ়। কথা ছিল এ আলোচনা গোপন থাকবে। কিন্তু তার ফল ভাল হয়নি, নানা কল্পিত খবরের স্রোতে বিরক্ত হয়ে গাঁধীজি পরে সংবাদমাধ্যমগুলির জন্য একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য হন।

লব্ধপ্রতিষ্ঠ রবীন্দ্র-গবেষক উমা দাশগুপ্ত সম্পাদিত আলোচ্য বইটির উপজীব্য এই ত্রয়ী, তার পদচারণ ভারতের আধুনিক ইতিহাসের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে। শুধু ভারতের ইতিহাসে তাঁদের শাশ্বত অবস্থানের কথা বলব কেন, এঁরা সমগ্র মানবসভ্যতার চিরকালের ইতিহাসে চিরজাগ্রত তিনটি প্রাণ, যাঁরা কোনও দিন অতীতের গর্ভে লীন হয়ে যাবেন না। চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ় বাইরের দৃষ্টিতে এক শ্বেতাঙ্গ ধর্মযাজক, জাতিতে ব্রিটিশ, অবশ্য ধর্মযাজকের ভূমিকা তিনি ছেড়েছিলেন ১৯১৪ সালেই। তবে ধর্মই তাঁর হাতের কুঠার। তিনি ‘দীনবন্ধু’, শ্বেতাঙ্গশাসিত উপনিবেশগুলিতে নিত্য অত্যাচারিত দুঃখীজনের বন্ধনমোচন যাঁর জীবনের ব্রত; দ্বিতীয় জন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্ববরেণ্য কবি, তাঁর বহুকৌণিক পরিচয় নিয়ে বাগবিস্তার অবান্তর;  তৃতীয় জন, মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, যাঁকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ‘হাফ-নেকেড ফকির’ আখ্যা দিলেও বিশ্বের কাছে তিনি ‘মহাত্মা’।

এক আদর্শকে সামনে নিয়ে বৃহৎ লক্ষ্যের অভিমুখে এঁরা চলেছিলেন। এই গ্রন্থের পটভূমি রচিত হয়েছে তাঁদের চিঠিপত্র আদানপ্রদানের  বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র জুড়ে, যা মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তারই সন্ধানে ব্যাপৃত হয়েছেন সম্পাদক। প্রসঙ্গক্রমে তাঁদের রচনা, অন্যকে লেখা চিঠির ব্যবহারও হয়েছে। সুদীর্ঘ ভূমিকায় তেরোটি এবং উত্তর ভাগে চোদ্দোটি বিভাগে গ্রন্থের বিষয়বস্তুর বিভিন্ন দিকে আলো ফেলা হয়েছে। ভূমিকায় আলোচিত নানা প্রসঙ্গ ও ইতিহাসের তথ্যগুলি মনকে স্পর্শ করে। গোড়ার দিকেই সম্পাদক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ১৯০৫ সালের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার থিয়জ়ফিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে গাঁধীজির চারটি বক্তৃতার প্রসঙ্গে। দক্ষিণ আফ্রিকাবাসী ভারতীয়দের সচেতন করতে চেয়েছিলেন গাঁধীজি, সেখানে ভারতীয়দের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞার প্রসঙ্গ দিয়েই বক্তব্য শুরু করেছিলেন। একে একে ‘দ্য হিন্দুজ়’, ‘দ্য প্রফেট মহম্মদ’, ‘দ্য প্রফেট জিসাস ক্রাইস্ট’ ও ‘টেনেটস অব হিন্দুইজ়ম’ বিষয়ে বলেছিলেন, আর শেষ করেছিলেন সব ধর্মের মূল বাণী মানবসমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বন্ধনের কথা দিয়ে। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে গোপালকৃষ্ণ গোখলের অনুরোধে উইলিয়ম উইনস্ট্যানলি পিয়র্সন-সহ অ্যান্ড্রুজ় দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছিলেন গাঁধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অংশভাক হতে। ভারতীয় সভ্যতা যে বহু শতাব্দীব্যাপী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারকবাহক সে সম্পর্কে স্থানীয় শ্বেতাঙ্গদের সামান্যতম ধারণাও ছিল না। তাঁরা ভারতীয় অধিবাসীদের একটি মাত্র অভিধায় চিহ্নিত করতেন— ‘কুলি’। ‘দীনবন্ধু’ এই ভ্রমাত্মক ধারণাগুলিকে অপসৃত করে নতুন আলোয় প্রকৃত ভারতের চিত্রকে তুলে ধরলেন তাঁর  বক্তৃতায়। তাঁর বক্তব্যের প্রায় সবটুকুই তিনি আহরণ করেছিলেন রবীন্দ্রভাবনা থেকে। সেই সভার সিংহভাগ শ্রোতাই ছিলেন স্থানীয় আইনসভার সদস্য এবং বিশিষ্ট শ্বেতাঙ্গরা। সভাশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার ভূতপূর্ব প্রধান জন মেরিম্যান বললেন, ‘ভারতের উচ্চ ভাবনার’ কথা সমস্ত দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর জানা দরকার, অ্যান্ড্রুজ়কে ধন্যবাদ জানালেন ‘টেগোর’-এর বিষয়ে তাঁদের অবহিত করার জন্য। উল্লেখযোগ্য শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন লর্ড গ্ল্যাডস্টোন, তিনি জানালেন, ‘‘ভারত ‘কুলি’র দেশ নয়, ‘উচ্চ আদর্শ-চিন্তার’ ভূমি।’’ তার মানে এই নয় যে সমস্যা সব মিটে গেল। তবু শত বাধার মধ্যেও যেন পথ দেখা যেতে লাগল। আলোচ্য গ্রন্থের উপক্রমণিকা ও উত্তর ভাগের অধ্যায়গুলিতে এমন কত শত মর্মস্পর্শী উপাদান ছড়িয়ে আছে। 

ফ্রেন্ডশিপস অব ‘লার্জনেস অ্যান্ড ফ্রিডম’/ অ্যান্ড্রুজ়, টেগোর অ্যান্ড গাঁধী/ অ্যান এপিস্টোলারি অ্যাকাউন্ট ১৯১২-১৯৪০
সম্পাদক: উমা দাশগুপ্ত
১৪৯৫.০০, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস

গ্রন্থটি এক অভিনব অপ্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিজাত। ভূমিকার পরে পত্র নির্বাচনের সঙ্গে ইতিহাসের বিবিধ বিশিষ্ট সময় থেকে সময়ান্তরে বিচরণ করেছেন সম্পাদক। আলোচ্য ত্রয়ীর ভাবনা, তাঁদের কাজ, তাঁদের অনুভবকে সেই প্রেক্ষাপটে অবিরত দেখছেন ও তার বিবরণ পৌঁছে দিচ্ছেন পাঠকের দরবারে। আজকে আমাদের কাছে যা ইতিহাস, অ্যান্ড্রুজ় রবীন্দ্রনাথ গাঁধীর কালে তা ছিল বর্তমান। এই তিন জনের চিঠিপত্রের মাধ্যমে বইটি সেই ইতিহাসের পাতাগুলিকে মেলে ধরেছে আমাদের সামনে। সমকালের স্রোতে তাঁদের জীবন নিরাসক্ত ভাবে প্রবাহিত হয়নি, চিন্তায় কর্মে সেই কালের  প্রতিফলন ঘটেছে প্রতিক্ষণে, আপন আপন  প্রতিক্রিয়া-অনুভব কোথাও কোথাও অকপটে ব্যক্ত করেছেন পত্রের মাধ্যমে, রচনায়। 

ত্রয়ী: জোড়াসাঁকোয় দীনবন্ধু অ্যান্ডরুজ়, মহাত্মা গাঁধী ও রবীন্দ্রনাথ। শিল্পী: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পেন্টিংস অব অবনীন্দ্রনাথ টেগোর (সম্পা: আর শিবকুমার, প্রতিক্ষণ) বই থেকে

আলোচনার প্রথমেই পাই তাঁদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পর্ব এবং জীবনের পথরেখা, ঘাত-প্রতিঘাত। তবে সর্বত্র যে ত্রয়ীর মনোভাব পাশাপাশি স্থান পেয়েছে এমন বলা যাবে না। উত্তর পর্বের প্রথমেই ১৯১২-১৪ সালের পত্রবিনিময়গুচ্ছ অ্যান্ড্রুজ়-রবীন্দ্রনাথের, অ্যান্ড্রুজ়-গাঁধীর এবং অ্যান্ড্রুজ়ের চিঠি গোখলেকে। দ্বিতীয় ভাগের শিরোনাম ‘দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতের সম্মান’। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের কোণঠাসা করবার সরকারি সিদ্ধান্তগুলির প্রতিবাদ গাঁধীজিকে অসহযোগ আন্দোলনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল। ডারবান পৌঁছে চার্লিও তাঁর প্রিয় মোহনের সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করলেন। এমনি করেই একে একে বিভাগগুলি এগিয়েছে। 

এই তিন ব্যক্তিত্বের সখ্যের ভিত্তিটি যেমন দৃঢ়, যার কথা ঘুরে ফিরেই আসে, পাশাপাশি এঁদের মতামত, জীবনদর্শনের পার্থক্যও কিছু কম নয়। সে ক্ষেত্রে গাঁধীজিকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করতে হয়। বহু তথ্যের উদ্ঘাটন এই গ্রন্থে। কোথাও কোথাও অতি পরিচিত প্রসঙ্গ স্থান জুড়েছে। হোঁচট খেতে হল ৩০ জুন প্রসঙ্গে (পৃ xxiii)। ‘‘7 Jul [রবি ২৩ আষাঢ়] সন্ধ্যায় রোটেনস্টাইনের গৃহে আরও বড়ো একটি কবিতা-পাঠের আসর বসল। রবীন্দ্রজীবনীকার কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই আসরের তারিখটি 30 Jun [রবি ১৬ আষাঢ়] বলে উল্লেখ করেছিলেন [পরে তিনি তারিখটি সংশোধন করেছেন], ফলে বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থেও এইটিই সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যার তারিখ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে—’’ (রবিজীবনী ষষ্ঠ খণ্ড, প্রশান্তকুমার পাল; পৃ ৩১৫)। সেই ভুল তারিখটি এই গ্রন্থেও স্থান পাবে এটা অভাবিত ছিল। আসল তারিখটি জানা যায় রবীন্দ্রনাথকে লেখা মে সিনক্লেয়ারের ৮ জুলাই ১৯১২-র চিঠি থেকে, যে চিঠি রথীন্দ্রনাথের অন দি এজেস অব টাইম গ্রন্থে উদ্ধৃত। পূর্ব দিনের কবিতা পাঠের সভায় অন্যতম শ্রোতা ছিলেন মে সিনক্লেয়ার। ছিলেন অ্যান্ড্রুজ়, আর্নেস্ট রিজ় এবং আরও অনেকে। 

সম্পাদকের আর এক ভ্রান্তি দক্ষিণ আফ্রিকার (১৯১৪ জানুয়ারি) আগেই অ্যান্ড্রুজ়-পিয়র্সনের ফিজি গমনের কথা লেখা (পৃ xxx)। অ্যান্ড্রুজ় একক প্রচেষ্টায় ফিজি-নিউজ়িল্যান্ড ইত্যাদি উপনিবেশে দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে হতভাগ্য চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের দাসত্বমুক্ত করেছিলেন। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পিয়র্সনকে সঙ্গী করে এই উদ্দেশ্যে প্রথম বার যাত্রা করেন। 

উত্তর ভাগে এই তিন জন ও তাঁদের চারপাশের ঘটনাকে যেমন করে সম্পাদক দেখতে চেয়েছেন, তাঁর গবেষণার প্রতি সম্মান রেখেও বলি কখনও কখনও খণ্ডিত ইতিহাস ও চিঠিপত্রের খণ্ডিতাংশ কিছুটা হতাশ করে। আবার অস্পৃশ্যতা প্রসঙ্গে তিনি যে ভাবে এই তিন জনের ভাবনার কিছুটা ঐক্যের প্রসঙ্গ আলোচনা করেন, বেশ ভাল লাগে। 

সব্যসাচী ভট্টাচার্য সঙ্কলিত ও সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথ-গাঁধীজি পত্রাবলির সটীক সংস্করণ দ্য মহাত্মা অ্যান্ড দ্য পোয়েট (এনবিটি) আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-অ্যান্ড্রুজ়, গাঁধী-অ্যান্ড্রুজ় পত্রাবলি আজও অধরা! তন্দ্রাচ্ছন্ন বিশ্বভারতীর কথা আর কী বলব! 

সৈয়দ মুজতবা আলির কলমের স্পর্শ দিয়ে লেখা শেষ করি। ১৯৪২-এ যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে বিশ্ব টলছে, মুম্বইয়ের জুহু বিচে গাঁধীজি সাংবাদিকদের ডাকলেন। বৈঠক শুরু হল একের পর এক রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে, গানের শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে, ‘‘হঠাৎ মহাত্মাজী দু হাত তুলে প্রশ্ন ধারা নিরুদ্ধ করে বললেন, ‘আমি বেনে। বেনে কাউকে কোনো জিনিস মুফতে দেয় না... রবীন্দ্র-সঙ্গীত তো শুনলে। এবার আমার কথা শোনো। পোয়েট গত হওয়ার পূর্বে (তখনো বোধ হয় এক বছর পূর্ণ হয় নি) আমাকে আদেশ করেন, আমাদের উভয়ের বন্ধু এ্যানডরুজের স্মৃতিরক্ষার্থে যা কর্তব্য তা যেন আমি আপন কাঁধে তুলে নি।... আজই আমি ‘এ্যানডরুজ মেমোরিয়াল ফাণ্ড’-এর জন্য অর্থ সঞ্চয় আরম্ভ করলুম। দাও।’’ সে দিনের আহ্বান ব্যর্থ হল না, সবাই সাড়া দিলেন, আবার এমন প্রশ্নও উঠল যে, স্বরাজ এলে তো এ সব হতে পারত। গাঁধী বললেন, ‘‘পরাধীন ভারতে যদি কবি জন্ম নেন, তবে তাঁর সখার স্মৃতিরক্ষার ভার পরাধীন ভারতের স্কন্ধেই।’’

(গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন)