এক শ্রেণির মানুষ রোগ-শোক-তাপ থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন সাকার ও নিরাকার শক্তির আরাধনা করেন। বহু নামে, বহু রূপে দেবদেবীর কল্পনা তারই ফল। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় একশো লোকদেবতার উৎস, তাৎপর্য, সমাজজীবনে প্রাসঙ্গিকতা, সংশ্লিষ্ট সংস্কার, মূর্তি ও পূজাচারের বিবর্তন, ভিন্ন প্রদেশের দেবদেবীর সঙ্গে মাহাত্ম্যগত সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা দেবব্রত নস্কর-এর বাংলার লোকদেবতা ও সমাজসংস্কৃতি (আনন্দ, ৩৫০.০০) গ্রন্থটিতে। বইয়ের তথ্য ক্ষেত্রসমীক্ষা ও সাক্ষাৎকার সূত্রে সংগৃহীত। 

‘‘না, এ-বই শিশুসাহিত্যের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। শিশুসাহিত্যসম্বন্ধীয় কিছু প্রবন্ধের সংগ্রহ।’’ শিশুসাহিত্যের সোনালি অধ্যায় (সাহিত্যলোক, ৩০০.০০) বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। লেখক শুধু শিশুসাহিত্যিকই নন, শিশুসাহিত্যের গবেষকও। অনুসন্ধিৎসায়, নিষ্ঠায় শিশুসাহিত্যের কত না অনালোকিত অধ্যায় আলোকিত করেছেন। স্মরণীয় নানা জনের কথা রয়েছে এ বইয়ে, সেই সঙ্গে তাঁদের সৃষ্টির বিচারবিশ্লেষণ, মূল্যায়নও।

‘‘নিসর্গের মধ্যে অনেক অনৈসর্গিক মুহূর্ত তৈরি করেছেন কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে।’’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে এমন বাক্যের পাশাপাশি রাজলক্ষ্মী দেবীর কবিতা নিয়ে কবিতা সিংহের মন্তব্য: ‘‘আপনার কবিতার নিরানব্বই ভাগ স্বীকৃতি থেকে মেয়ে বলেই আপনি প্রবঞ্চিত।’’ কবি-গল্পকার-ঔপন্যাসিকের সত্তা পেরিয়ে তাঁর গদ্যের অনন্য আস্বাদ সমরেন্দ্র দাস সম্পাদিত কবিতা সিংহ-র অগ্রন্থিত গদ্য-এ (সহজপাঠ, ৪৫০.০০)। সাহিত্য, দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতি, নারী-পুরুষ, আকাশবাণী, বিজ্ঞান, ঈশ্বর, কলকাতা... কত বিষয়, কী জীবন্ত তাঁর গদ্যে!

‘‘ভদ্রলোক বলতে যে আত্মগত ও অর্জিত গুণের অধিকারীকেও বোঝায় তা আমরা ভুলে গেলাম।... ভদ্রলোক এই অর্থনৈতিক শ্রেণির সমালোচনা করতে গিয়ে ভদ্রতাও বিসর্জন দিলাম।’’ একটিতে এই বিশ্লেষণের সঙ্গে আর একটিতে প্যারীচাঁদ মিত্র ও উনিশ শতক নিয়ে বিশ্বজিৎ রায়ের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ: ‘‘প্যারীচাঁদ তাই কেবল ইংরেজি শিখলেন না, প্রশ্ন করতে শিখলেন।’’ অবিসংবাদী বাঙালি ব্যক্তিত্ব ও বাঙালির বিদ্যা-বুদ্ধির চর্চা নিয়ে রচিত সব প্রবন্ধ রাজনৈতিক-এর (বীরুৎজাতীয় সাহিত্য সম্মিলনী, ২৫০.০০) ‘‘এই লেখাগুলিতে রাজনীতির সঙ্গ-অনুষঙ্গ নানা ভাবে এসেছে’’, জানিয়েছেন লেখক।   

‘‘আমরা ধরতে চেয়েছি কল্যাণীদির আরেকটা স্বর: ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী, আবার সূক্ষ্ম অপরাধবোধে যন্ত্রণাদীর্ণ। বাঙালি সেকালিনীদের বিশেষত বিধবাদের, নিত্য অসম্মান ও শোষণের যে ইতিহাস আড়ালেই থেকে গেছে, কল্যাণীদি তা আলোয় টেনে এনেছেন।’’ কল্যাণী দত্তের গত দিনের যত কথা/ সেকালিনী অন্তঃপুরিকাদের জীবনবৃত্তান্ত (থীমা, ১৭৫.০০) বইয়ের মুখবন্ধে লিখেছেন কল্যাণী ঘোষ। পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা লেখাগুলি পাঠককেও মর্মমূলে আঘাত করে। 

নাট্য-সমালোচক না হওয়া সত্ত্বেও বহু কাল লেখালেখি করে চলেছেন দীপেন্দু চক্রবর্তী নাটক নিয়ে। অননুকরণীয় গদ্যে লেখা তাঁর বিষয় যখন নাটক-এ (দে’জ, ২৫০.০০) বেশ কিছু মঞ্চাভিনয়ের রিভিউ-ও আছে। আর তার বাইরে যে আলোচনাদি সে সব রীতিমতো তর্ক উসকে দেয়: ‘‘চল্লিশের দশকে গণনাট্য আমাদের দেশীয় নাট্য ঐতিহ্যের অনেক অনেক মূল্যবান উপাদানকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।’’ 

প্রত্নবিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-৯১) ইংরেজিতে লেখালিখির ফাঁকে ফাঁকে যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাও করেছেন তা আজ প্রায় সম্পূর্ণই বিস্মৃত। ছাত্রপাঠ্য প্রাকৃত ভূগোল ও ব্যাকরণ প্রবেশ ছাড়া শিল্পিক দর্শন, শিবজীর চরিত্র, মেবারের রাজেতিবৃত্ত, পত্রকৌমুদী-র মতো বই ও অনেক প্রবন্ধও লেখেন তিনি। সুবিমল মিশ্র ছাত্রপাঠ্য বাদে অন্য বই ও বেশ কিছু প্রবন্ধ, চিঠিপত্র সঙ্কলন করেছেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র-র বাংলা রচনা সম্ভার বইয়ে (পরি: দে’জ, ৪০০.০০)।   

আওরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭) আর পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭), দুইয়ের মাঝে ব্যবধান ঠিক অর্ধ শতকের। সময়টা বাংলার ইতিহাসে ক্রান্তিকাল। উপনিবেশপূর্ব বাংলা ছিল মুঘলদের কাছে সুবাগুলোর মধ্যে স্বর্গভূমি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাল্লা বাংলার দিকেই ভারি ছিল। মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজ— এই পর্বের নবাবরা চাষি-কারিগর নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিয়েছিলেন। পলাশি পরবর্তী কাল আদতে লুঠের কাল। অনেক মিথ আর মিথ্যের জাল কাটিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়কে বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বেন্দু নন্দ (পলাশীর পূর্বে বাংলার ৫০ বছর। খড়ি, ৪৫০.০০)। 

‘বাংলার রেনেসাঁস: বোঝা না ভেলা?’ আলোচনা করতে গিয়ে শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘‘বাংলার রেনেসাঁস আসলে একটি সাংস্কৃতিক মোকাবিলার নাটক।... এত অল্প সময়ের মধ্যে এত মননশীল ও সৃজনশীল প্রতিভার উত্থান’’ আর কোথাও ঘটেছে কিনা সন্দেহ। রামমোহন থেকে শুরু করে ডিরোজিয়ো বিদ্যাসাগর মাইকেল রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নজরুল ওদুদ সুভাষচন্দ্রও রেনেসাঁসের আলোয় আলোচিত। বিপুল তথ্য ও বিশ্লেষণ সংবলিত বইটি (রেনেসাঁসের আলোয় বঙ্গ দর্শন। পুনশ্চ, ৫৭৫.০০) এ বাংলায় প্রথম প্রকাশিত হল। 

চল্লিশ বছর ধরে জীবন সর্দার ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায় একটানা লিখে গিয়েছেন আমাদের বাড়ির চারপাশের আরশিনগরের কথা। পাখি পোকা প্রজাপতি গাছপালা আর জীবজন্তুর কথা। শিশুর মনে জায়গা তৈরি করেছেন এই প্রতিবেশীদের জন্য। প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর (৯ঋকাল বুক্‌স, ৬০০.০০) আসলে দেখতে শেখায়, যা কিছু দেখলে আমাদের ভালবাসা মায়া বাড়বে প্রকৃতির জন্য। প্রকৃতিকে ভালবাসার এ এক সহজপাঠ।

আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের খুঁটিনাটি ঘটনাবলির অন্যতম আকর মহম্মদ সাকি মুস্তাদ খান ও মির্জা মহম্মদ কাজিমের মসির-ই-আলমগিরি। কাজিম আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের প্রথম দশ বছরের ইতিহাস লেখেন আলমগিরনামা বইয়ে। সম্রাটের মৃত্যুর পর সাকি মুস্তাদ খান বাকি ৪১ বছরের বৃত্তান্ত লেখেন এবং এক সঙ্গে তা প্রকাশিত হয়। যদুনাথ সরকার এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করলেও এত দিন বাংলা অনুবাদ হয়নি। এ বার সুকান্ত কুমার দে সে কাজ সম্পন্ন করলেন (মসির-ই-আলমগিরি। সোপান, ৩৫০.০০)। 

পশ্চিমবঙ্গের সমাজে দলিত ও আদিবাসীদের বিশেষ যোগদান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণনা কোথায়? ২০১১-র জনগণনার ভিত্তিতে পরিমার্জিত সংস্করণে প্রকাশিত হল পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী (সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা, গাঙচিল, ৪০০.০০)। লোকসংখ্যা, সাক্ষরতা এবং মুখ্যকর্মীদের পেশা— জোর দেওয়া হয়েছে এই তিনটি বিষয়ে। 

‘শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’-এর তুমুল সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও অমল চন্দ ছিলেন আত্মমগ্ন নির্জন মানুষ। পঁচিশ বছর আগে মাত্র আটান্ন বছর বয়সে প্রয়াত এই বিস্মৃত লেখকের গল্পসংগ্রহ (সঙ্কলন ও সম্পাদনা সুদীপ বসু, ধানসিড়ি, ২২৫.০০) প্রকাশ পেল। রচনাবলির দ্বিতীয় খণ্ডে থাকবে অমল চন্দের তিনটি উপন্যাস ও একটি নিবন্ধগ্রন্থ।    

সমুদ্র উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম থেকে জলেশ্বর পর্যন্ত প্রায় সাতশো কিমি অঞ্চলে লবণ উৎপাদন হত প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি পাওয়ার পরেই লবণ কারবারে তাদের একচেটিয়া অধিকার কায়েম হয়। শুরু হয় লবণ-উৎপাদক মলঙ্গীদের উপর তীব্র শোষণ। রবীন্দ্রনাথ মিশ্র লোনা ঘাম লোনা রক্ত/ মেদিনীপুরের লবণ ও মলঙ্গীদের সংগ্রাম (সেতু, ২৫০.০০) বইয়ে সেই ইতিহাসই সবিস্তার তুলে ধরেছেন। 

আটচল্লিশ বছর ন’দিনের বিচ্ছেদ বড় কম কথা নয়। শেকড় খোঁজার টানে আবার সেই দিঘপাইত গ্রাম, বাংলাদেশের যে গ্রাম ছেড়ে, যে মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল দয়াময়ীকে, মাত্র দশ বছর বয়সে। দেশ ছাড়ার সেই স্মৃতিমেদুর আখ্যান প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘দয়াময়ীর কথা’য়। এ বার প্রকাশ পেল সুনন্দা সিকদারের সেই শেকড়ে ফেরার আখ্যান দয়াময়ীর ফিরে দেখা (দীপ প্রকাশন, ১৬০.০০)।