পূর্বানুবৃত্তি: ফোনে কথা বলা নিয়ে অশান্তি শুরু হয় অরুণ ও তার স্ত্রী বিপাশার মধ্যে। এ দিকে উদ্দালক অভিরূপের কথা মতো হাসপাতালে কাজ পায় বেহালা বাজানোর। একটা দুটো করে অনেকেই তার বাজনা শোনে। কিন্তু এত লোকের মাঝে উদ্দালকের ভাল লাগে সুছন্দাকে। হাসপাতালের স্টাফ সুরেশ গল্পচ্ছলে তার সিনিয়র বরুণকে জানায়, ডাক্তার অভিরূপের এই মিউজ়িক্যাল হিলিং আইডিয়াটা মোটেও পছন্দ নয় ডাক্তার বেরা ও কুলকার্নির।

 

 

নিশ্চিন্ত হতে পারছে না অভিরূপের পিএ অঞ্জলি। টিভিতে কাল রাতে খবরটা দেখার পর থেকে ছটফট করছে। একটি বাংলা চ্যানেল নাম উচ্চারণ না করে ডাক্তার অভিরূপের সম্পর্কে যা যা বলেছে তাতে রীতিমতো মানহানির মামলা করা যায়। অবাক লাগে ওর। কোনও রকম প্রমাণ ছাড়াই এরা কী করে এক জন নামী মানুষকে অভিযুক্ত করছে! কাল থেকে অনেক বার অভিরূপকে ফোন করার চেষ্টা করেছে অঞ্জলি। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পাচ্ছে। 

আজ অনেক পেশেন্ট। তা ছাড়া আছে বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের স্পেশ্যাল মিটিং। এটা কাল রাতে ঠিক হয়েছে। খুব জরুরি মিটিং। হাসপাতালের কিছু স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা হবে। সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি কী ভাবে মোকাবিলা করতে হবে তারও আলোচনা হবে। মিটিংয়ে গোপনীয়তা চরম। পুরো বিষয়টা স্যরকে মেল করে দিয়েছে অঞ্জলি। কনসেন্ট মেলও চলে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে। তা হলে এখনও এলেন না কেন? দেরি করার মানুষ তো অভিরূপ নন। মোবাইলটা হাতে নিয়ে একরাশ চিন্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ও। ফোন করা উচিত হবে কি হবে না ঠিক করে উঠতে পারে না। এতগুলো বছর অভিরূপের সঙ্গে থেকেও আজও এই সামান্য সামান্য দ্বিধা থেকে বার হতে পারেনি। সব সময় ভিতরে ভিতরে সতর্ক থাকে, আচরণে যেন প্রফেশনালিজ়মকে অতিক্রম না করে যায়। অঞ্জলির  চিন্তায় ছেদ পড়ে ক্যাথি আসায়। ও কেরালার মেয়ে। নার্সিং স্টাফ। এ সময়ে তো ওর আসার কথা নয়!  তাই ক্যাথির দিকে অবাক হয়ে তাকায় অঞ্জলি।

“আনজুলি... জাস্ট লিসন ওয়ান থিং, প্লিজ় লুক ইন্টু দ্য ম্যাটার, সো দ্যাট ডক্টর মুখার্জি মে নট বি ইন হসপিটাল আফটার ফোর...”

এ রকম অদ্ভুত কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল অঞ্জলি। কোন ডাক্তার কত ক্ষণ থাকবে না থাকবে তা সম্পূর্ণ তার ব্যাপার। মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করে অঞ্জলি, “কেন?’’ 

“পরে বাতাবো। আখুন ইটা রাখো। ইট মে বি হেল্পফুল,” একটা ব্রাউন খাম বার করে অঞ্জলির হাতে দেয় ক্যাথি।

“কী এটা ? “

“পুরা কেস হিস্ট্রি অব বিলাস পাল!”

চমকে ওঠে অঞ্জলি। এই কাগজগুলোর জন্য সে গোপনে কম্পিউটারের বিশাল রাইকে অনুরোধ করেছিল। এও বলেছিল, এই ব্যাপারটা সে যেন পাঁচকান না করে। তার পরে কাগজগুলো ক্যাথির হাত দিয়ে আসবে এটা ভাবতে পারেনি অঞ্জলি। ক্যাথি বুঝতে পারে অঞ্জলির চিন্তাটা।

সে অল্প হেসে অঞ্জলির কাঁধে হাতটা রাখে, “ডোন্ট থিঙ্ক টু মাচ। উই অল রেসপেক্ট ডক্টর মুখার্জি। বিশাল ইজ় আ লিটলবিট ডরপোক। তাই আই টুক দ্য চান্স।’’

“তুমি কী করে পেলে? বিশাল তোমায় বলল?’’ জানতে চায় অঞ্জলি। আসলে সে জানতে চাইছিল বিশালের মারফত এই কথাটা আরও কেউ শুনল কি না। সে সব দিকে না গিয়ে চোখ টিপে একটুখানি ফাজিল হাসি হাসে ক্যাথি। 

“লাস্ট নাইট উই স্লেপ্ট টুগেদার...আনজুলি!” 

“ওহো! আই...আই... ফরগট...” মনে পড়ে যায় ক’দিন আগে রাতে প্যাথোলজি আর ফার্মাসির পিছন দিকের গলিতে দাঁড়ানো অন্ধকার দুই মূর্তির পারস্পরিক আদানপ্রদান, যা কিনা হঠাৎ অঞ্জলির চোখে পড়ে গিয়েছিল। পরে ক্যাথি ওকে বলেছে বিশালের কথা। সে যাই হোক এটা বোঝা যাচ্ছে যে বিশালের কাছ থেকে ব্যাপারটা শুনে এবং বিশালের হেজ়িটেশন বুঝতে পেরে ক্যাথি নিজেই পেপারটা হ্যান্ডওভার করল। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু সময়ের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না তো! কেন ডাক্তারকে আজ বিকেল চারটের আগে চলে যেতে হবে? ক্যাথি চলে যাচ্ছিল। অঞ্জলি আটকায়, ‘‘দাঁড়াও। এটা তো বলো, কেন ওকে বেলা চারটের আগেই চলে যেতে বলছ? আমার টেনশন হচ্ছে...”

“আমারও। সাম পিপল হ্যাজ বিন হায়ারড ফ্রম আউটসাইড...” ক্যাথি অঞ্জলির কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে।

“কী বলছ! কারা করছে এ সব?’’ 

“পরে বাতাবো। যোতোটুকু আমি শুনলাম... সাজিস করা হয়েছে... পারহ্যাপস হেডেড বাই ডক্টর কুলকার্নি অ্যান্ড আদারস।’’

অঞ্জলি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ছুটে চলে যায় ক্যাথি। কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না অঞ্জলির। কিন্তু শুধু শুধু এমন একটা ব্যাপার বানিয়ে বলার মতো মেয়ে নয় ক্যাথি। বিশেষত অভিরূপের ব্যাপারে। কারণ ডাক্তার ওর তুতো বোনের হার্ট অপারেশন করেছিলেন বিনামূল্যে। অঞ্জলি জানে সে জন্য অভিরূপের প্রতি ক্যাথি চিরকৃতজ্ঞ। হয়তো সে জন্যই ছুটে এসে খবরটা দিল। কিন্তু খবরটা ও পেল কোথা থেকে! বিশালই কি সোর্স? না কি অন্য কেউ? অঞ্জলি কী ভাবে অভিরূপকে কথাগুলো বলবে তাই ভাবছিল। ওর দৃঢ় ধারণা, বিলাস পালের ঘটনায় অভিরূপকে ফাঁসানো হয়েছে। এবং এখন মনে হচ্ছে এ সব কিছুর মূলে ওই ডক্টর কুলকার্নি। কিন্তু তিনি তো একা নন। আরও কে কে আছে সেটা ওকে জানতে হবে। অঞ্জলি অনেক ক্ষণ চিন্তা করে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অভিরূপ যদি এই হাসপাতাল ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়, তা হলে সেও চলে যাবে ওর সঙ্গে। পর মুহূর্তেই একটা ভয় মনে চেপে বসে, যদি উনি এ দেশেই না থাকেন, তা হলে ?

গালে হাত দিয়ে বসে আপন মনে চিন্তা করছিল অঞ্জলি। ফোন ক’বার বেজে গিয়েছে খেয়াল করেনি। শব্দটা কানে যেতে জিভ কেটে তাড়াতাড়ি মোবাইল ধরে।

“হ্যালো... স...স্যরি স্যর।”

“আরে কী ব্যাপার? নট ফিলিং ওয়েল? দু’বার রিং করলাম।’’

“আমি... আমি...” 

“আচ্ছা, শোনো... আজ যাচ্ছি না। শরীরটা খারাপ। বিশ্রাম দরকার। হয়তো বিকেলের দিকে...”

কথা শেষ করতে দেয় না অঞ্জলি। হড়বড় করে বলে ওঠে, “না স্যর, আসতে হবে না। আমি সব ম্যানেজ করে নেব। চিন্তা করবেন না।”

“অঞ্জলি! কী বলছ! আর ইউ ওকে?” অবাক গলায় একটু যেন ধমকেই ফেলে অভিরূপ। অঞ্জলিকে নিজে থেকে এত কথা বলতে সে এত বছরেও শোনেনি বোধহয়। এ বার অঞ্জলিও লজ্জা পেয়ে থেমে যায়।

কিন্তু অভিরূপ থামে না। ফোনের ও পার থেকে ভেসে আসে তার প্রশ্নবাণ।

“কী হয়েছে অঞ্জলি? সব ঠিক আছে তো? তোমাকে কী রকম অন্য রকম লাগছে!”

“না... না স্যর...আপনি বিশ্রাম করুন। আমি অফিসে খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি।’’

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু কিছু ঘটেছে কি? আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু আড়াল করছ।”

“স্যর, আপনি আজ না এসে ভাল করেছেন। আমি, পরে আপনাকে সব বলছি,” অঞ্জলি থেমে থেমে বলে। আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দেয় অভিরূপ। মনের তলায় খটকা লেগে থাকে। তার যাওয়া না-যাওয়ার সঙ্গে অঞ্জলির ভালমন্দের কোনও সম্পর্ক খুঁজে পায় না সে। অঞ্জলি বেশ শান্ত। ভদ্র, এফিশিয়েন্ট। কিছুটা মুখচোরা এই মহিলাটির সঙ্গে এত বছরেও এমন কোন চড়াই-উতরাই তৈরি হয়নি যা অভিরূপকে এক মিনিটও বিশেষ ভাবে ভাবাবে। পুরোটাই সাদামাটা সহজ-সরল একেবারে সমতল সম্পর্ক। এ রকম এক জন এক্সপার্ট সেক্রেটারি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অভিরূপ সেটা জানে। জানে বলেই অঞ্জলিকে বিশ্বাসও করে সে। কেন অঞ্জলি এমন ভাবে কথা বলল? কী সে বলতে চায়? মাথায় ঘুরতে থাকে অভিরূপের।

 

লাইফ ডেলি-র সাংবাদিক তিয়াষার সঙ্গে চেন্নাই হোটেলে মিট করার কথা আজ। সে দিনের মিটিংটা অভিরূপ নিজেই বাতিল করেছিল একটা সিরিয়াস কেস এসে পড়ায়। সে দিন অরুণকেও ডেকেছিল। পুরোটাই ভেস্তে গেল অরুণাচল থেকে এক পেশেন্ট চলে আসায়। তখনকার মতো তাকে টেম্পোরারি পেসমেকার দিয়ে ঠেকনা দিতে হয়েছে। তার পরের দিন স্থায়ী পেসমেকার বসল। এ সব ক্ষেত্রে বয়স্ক পেশেন্টদের ক্ষেত্রে লাইফ রিস্ক হয়েই যায়। আর অভিরূপের স্বভাব অনুযায়ী ও তার শেষ না দেখে ছাড়তে পারে না। কুলকার্নি চেয়েছিলেন ওই পেশেন্ট হাসপাতাল ফিরিয়ে দিক। পালস প্রায় ছিলই না। এ রকম পেশেন্টের বেঁচে থাকার চান্স প্রায় জ়িরো। আর কিছু হয়ে গেলে হাসপাতালের ক্ষতি। অভিরূপ সেটা পারেনি। ওই অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া মানে জেনেশুনে মানুষটাকে মেরে ফেলা। না, অভিরূপ সেটা পারবে না। ওর কাছে হাসপাতালের সুনাম দুর্নামের চেয়েও অনেক আগে মানুষের প্রাণ। সেই প্রাণ বাঁচানোর জন্য যা কিছু রিস্ক নেওয়া দরকার ও নেবে। তা ছাড়া এখনও সে চেয়ারম্যান। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটা কাউকে ছাড়বে না অভিরূপ। এ কারণে ওর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে হয়তো কেউ কেউ ঘোঁটও পাকাচ্ছে। বোঝে অভিরূপ। 

আজকের মিটিংয়ে ও এই নিয়ে কিছু বক্তব্য রাখবে এটাও ভাবা ছিল। কিন্তু শরীরটা একদম উল্টো সুরে বেঁকে বসল। শরীর, নাকি মন! থেকে থেকেই মনের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থেকে কেউ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, আজ সেই সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হবে। এ একটা অদ্ভুত অবস্থা। এই তুচ্ছ কারণে অভিরূপ গুরুদায়িত্ব থেকে পালিয়ে ঘরে শুয়ে আছে! এটা ভেবে ও নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না। বারবার দুটো কালো বড় চোখের চাউনি সব চিন্তা ওলটপালট করে দিচ্ছে। নিজেকে নিজে আর কতই বা ধমকে রাখা যায়। সে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে তাই অভিরূপ জম্পেশ করে পাশবালিশ আঁকড়ে শোয় পাশ ফিরে।