পূর্বানুবৃত্তি: অভিরূপের কথায় পিয়াসের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে তিয়াষা। পিয়াসকে সে ভাই মনে করলেও, পিয়াস তা মনে করে না। পিয়াস মনেপ্রাণে ভালবাসে তিয়াষাকে। তিয়াষা চলে আসে অভিরূপের দমদমের ফ্ল্যাটে। কিন্তু সারা দিন থাকলেও রাতে কোনও দিনই তিয়াষার সঙ্গে ফ্ল্যাটে থাকে না অভিরূপ। এ দিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে চরম সমস্যা থেকে মুক্তি পায় অভিরূপ। অরুণ ও তিয়াষার সঙ্গে একরাশ খুশি নিয়ে কোর্ট চত্বর থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাদের দেখা হয় ডাক্তার সুমন সেনের সঙ্গে। সুমনের সঙ্গে তার স্ত্রী ও কন্যা।

 

অরুণ কলেজছাত্রের মতো শূন্যে হাত ছুড়ে চিৎকার করে, ‘‘ইয়ে এ এ এ... এ তো মধুরেণ সমাপয়েৎ... এ কি খালি মুখে হয় না কি? চল চল পার্ক স্ট্রিট চল... এখনই.. আজকেই হয়ে যাক ছোট করে... মেন পার্টি রেজিস্ট্রির দিন হবে, আমরা সবাই দল বেঁধে মেদিনীপুর যাব। কি তিয়াষা, রাজি তো?’’

অভিরূপের দিকে তাকিয়ে গালে টোল ফেলে হাসে তিয়াষা, “ও যেখানে, আমিও সেখানে অবভিয়াসলি...”

সুমন অনেক ক্ষণ ধরেই নিজের কথা বলেছে। এ বার তিয়াষাকে দেখিয়ে অভিরূপকে বলে, “কিন্তু তুমি তো লটারি জিতেছ অভিরূপ। বৌদি এত সুন্দরী বলেই কি আমাদের ভুলে মেরে দিয়েছ?’’ তিয়াষা হাসিমুখে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু অভিরূপের উত্তরটা তীব্র বিষের বিন্দু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ওর কান বেয়ে বুকে মাথায়। অভিরূপ মাথা নেড়ে নেড়ে বলছে, “আরে না না, চুমকি নেই এখানে। উনি তিয়াষা। মিস তিয়াষা মিত্র। অ্যান এমিনেন্ট রিপোর্টার অব লাইফ ডেলি। আমাকে ও খুব সাহায্য করেছে। ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব চিরজীবন।’’

একটু কি অপ্রতিভ হয়ে যায় ডাক্তার সুমন সেন? সে দিকে খেয়াল করে না তিয়াষা। কোন এক অজ্ঞাত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় ওর চোখে পড়ে সামনে দাঁড়ানো সদাহাস্যময় বন্ধু অরুণ সাহার দিকে, যার চোখেও বুঝি ফুটে উঠেছে কী যেন এক হঠাৎ বিস্ময়। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে অরুণ মজার গলায় বলে, “কিন্তু অভিরূপ, তিয়াষার আরও একটা পরিচয় বোধহয় তোমার দেওয়া উচিত ছিল। ইউ আর সাপ্রেসিং দ্য ট্রুথ আই থিংক ...’’

“আচ্ছা...আচ্ছা সে সব কথা হবে পরে... এখন বলো তো, এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে না কি পার্ক স্ট্রিট যাবে? লেটস মুভ... সুমনদের রিইউনিয়নটা সেলিব্রেট করা যাক...’’ ব্যস্ত হয়ে কার পার্কিংেয়র দিকে পা চালাতে চায় অভিরূপ। ওরা পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সুমন অভিরূপ রাকা। একটু পিছনে অরুণ তার তিন জন অন্য ডাক্তার সঙ্গী-সহ। তিয়াষা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। কেন যে পায়ে কোনও জোর পাচ্ছে না ও! অথচ এই দিনটার জন্য তো কবে থেকে ও নিজেই অপেক্ষা করেছে। আজ অভিরূপ নির্ভার, নিশ্চিন্ত। কাল থেকে সে মাথা উঁচু করেই হাসপাতালে ঢুকবে। শেষ পর্যন্ত শত্রুরা তার বিশেষ কিছু ক্ষতি করে উঠতে পারেনি। আবার অভিরূপ মানুষের জন্য ঝাঁপ দেবে চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এত দিন ধরে তো তিয়াষাই এই সমস্ত স্বপ্ন দেখে এসেছে, দেখিয়ে এসেছে। ভেঙে পড়তে চাওয়া মানুষটাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরে রেখেছে এই সব স্বপ্নের কল্পনাজাল বিছিয়েই তো। তা হলে কেন পা চালিয়ে সোজা হয়ে গিয়ে অভিরূপের পাশে পাশে হাঁটতে পারছে না তিয়াষা? কেন বারবার পিছিয়ে পড়ছে! আর কেনই বা বুকের তলায় বোবা অভিমানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেখতে চাইছে, অভিরূপ ওকে সামনে ডেকে নেয় কি না। এই সব অকারণ ছেলেমানুষি অভিমানের কোনও অর্থ নেই এ বয়সে এসে, তা কি জানে না তিয়াষা? তবু কেন ওর মনে হচ্ছে, অভিরূপ বন্ধুদের পেয়েই ওকে ছেড়ে এ ভাবে এগিয়ে গেল! এটা কি কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা? মাথায় ঘুরপাক খায় তিয়াষার। এলোমেলো পা ফেলে এগোতে গিয়ে দল থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে সে। অভিরূপ আসে না। তার বদলে ছোট্ট মেয়েটা কোন এক ফাঁকে এসে ওর হাত ধরে। পিয়া। যার সঙ্গে এত ক্ষণের মধ্যে একটা কথাও হয়নি ওর। ভারী অবাক হয়ে তাকায় তিয়াষা। পিয়া হাসে। 

“মা বলল... যা ওই আন্টিটার সঙ্গে আয়। আন্টি একা হাঁটছে ...’’

মনে মনে আরও অবাক হয় তিয়াষা। রাকা ঠিক ওর দিকে নজর রেখেছে। অথচ দেখে মনে হবে এই মুহূর্তে সে ফিরে পাওয়া স্বামী ছাড়া জগতে কোনও কিছু নিয়েই উৎসাহী নয়। রাকাও তাকিয়ে আছে পিছন ফিরে। একটু কৃতজ্ঞতা মাখানো হাসি হাসে তিয়াষা। পিয়া হাত ধরে টানছে, “বলো না... বলো না... তুমি কী আন্টি? আই মিন হোয়াটস ইয়োর নেম...’’

“আমি...আমি, তুতান...” তিয়াষার নিজের কানেই অদ্ভুত শোনায় নামটা। কেনই যে বাড়ির সবার আদরের ডাকনামটাই মুখ দিয়ে বার হল এটাও একটা আশ্চর্য। বার হল আর সঙ্গে সঙ্গেই চোখের পাতায় হুড়মুড়িয়ে ভেসে এল বাবা-মা, ওর পোষা বেড়াল পিন্টু, পাড়ার বুড়ো রিকশাওয়ালা ভোলাদা, রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানের ঝন্টু, ছাদের এক পাশে উঁকি মারা ফুলে ভরা কৃষ্ণচূড়ার ডাল, বালুরঘাট বাসস্ট্যান্ডে আত্রেয়ী নদীর জল-ফুরনো চড়ায় ফুটে থাকা কাশফুলের গুচ্ছ, ত্রিতীর্থর রিহার্সাল রুম, শিক্ষক হরিমাধব মুখোপাধ্যায়...প্রখর রোদের তলায় জীবনের যাবতীয় জটিলতা এই আলিপুর কোর্ট চত্বরে মুহূর্তে এসেও যেন ভ্যানিশ হয়ে গেল। কত দিন, কত বছর, কত যুগ যেন কেউ ওকে তুতান বলে ডাকেনি। তুতানকে তিয়াষা নিজেই ভুলে গিয়েছিল। তাই সব্বাই যে ভুলেই থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কী! এখন যেন চারদিক থেকে সবাই এক সঙ্গে তুতানকেই ডাকতে চাইছে। কিন্তু সেই ডাকে বিহ্বল সাড়া দেওয়ার আগেই পিয়া আবারও হাত ধরে টানে।

“শোনো... শোনো না...’’

“হ্যাঁ শুনছি তো... বলো?”

“ইউ আর ভেরি বিউটিফুল।অ্যান্ড আই লাইক বিউটিফুল পার্সনস। তাই তো তোমার সঙ্গে ভাব করতে এলাম। আমার মাম্মাও সুন্দর, বাবাও সুন্দর, আর আমিও। এখন থেকে আমরা সবাই এক সঙ্গেই থাকব। আর আমি ব্লু হোয়েল খেলব না। আই প্রমিস টু মাম্মা।’’

এইটুকু মেয়ের গম্ভীর সুচিন্তিত মতামত শুনে হেসে ফেলে তিয়াষা। কী সুন্দর কথা বলছে। প্রতিটা কথায় ফুটে উঠছে ওর নিজস্ব ভাবনা। 

ওরা প্রায় গাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছে। অনেকটা দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে, পারস্পরিক লেগপুলিং, হাসি-ঠাট্টার বিরাম নেই। যেন কোর্টে নয়, কোনও পিকনিকে রয়েছে সবাই। সব চেয়ে বেশি কথা বলছে বোধহয় অভিরূপই। দূর থেকেই দেখে তিয়াষা। বুঝতে পারে না কোন অভিরূপ ওর চেনা। ধীর স্থির অচঞ্চল একাগ্র সেই চিকিৎসক যাকে ও প্রথম দিন থেকে দেখেছে, যে উদ্‌গ্রীব হয়ে অপেক্ষায় ছিল অফিসের গেটে, কখন তিয়াষা নেমে আসবে, না কি এই হঠাৎ উচ্ছল হালকা হাসির স্রোতে ভাসা মানুষটা, যে এত ক্ষণের মধ্যেও এক বারও পিছনে তাকিয়ে দেখল না তিয়াষা কোথায়, তিয়াষা পাশে নেই কেন। 

ওরা সবাই উঠে পড়েছে গাড়িতে। পিয়াও হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে মা-বাবার মাঝখানটাতে গুঁজে দিয়েছে নিজেকে। সুমনরা নিজেদের গাড়িটাকে কোথাও পাঠাল বোধহয়। অভিরূপের গাড়িতেই সবাই এক সঙ্গে বসেছে। সামনে পিছনে কোথাও ফাঁকা নেই। অভিরূপ ড্রাইভিং সিটে। সেখান থেকেই হাঁক পাড়ে, “আরে তিয়াষা কাম অন, ডোন্ট ডিলে। কোথাও একটা চেপে পড়ো।’’ পিছনের গাড়িটা চালাচ্ছে অরুণ। এ বারে সে ডাক দেয়, “তিয়াষা আমার গাড়িতে চলে এস।’’

হঠাৎ একটা দমকা খারাপলাগা ছড়িয়ে পড়ে তিয়াষার মনের ভিতর। কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে এনে দু’দিকে ঘাড় নাড়ে সে, “না অরুণদা, আমার হবে না। আপনারা যান...’’

“সে কী? কেন? তা হলে কী করে হবে? বাহ...” অরুণ নেমে পড়ে স্টিয়ারিং ছেড়ে।

“আমার একটা জরুরি কাজ আছে, অফিস যেতেই হবে।’’

“দূর... ভাবলাম সবাই মিলে যাব, মজা করব... সব জল ঢেলে দিচ্ছ... চলোই না বাবা...’’ অরুণের আকুতি দেখে তিয়াষা ওর হাতদুটো চেপে ধরে,  ‘‘প্লিজ় অরুণদা, ডোন্ট মাইন্ড, পরে কখনও চলে যাব আপনার চেম্বারে। আজ আমায় ছেড়ে দিন।’’ 

“তা হলে চলো তোমায় অফিসেই ছেড়ে দিই।”

“না না দরকার নেই, আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিচ্ছি। আপনারা যান। হ্যাভ আ গুড টাইম,’’ আবারও কষ্ট করে হাসে তিয়াষা। 

অভিরূপ বোধহয় এ দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে নামেনি গাড়ি থেকে। বসে বসেই চেঁচায়, “ওকে ছেড়ে দাও অরুণ। কাজ আছে বলছে যখন কী আর করব। উই আর গেটিং লেট...ওকে...ওকে... বাই তিয়াষা... কলিং ইউ লেটার... স্টার্ট করো অরুণ,’’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেও স্টার্ট লাগায়।

পর পর দুটো গাড়ি বেরিয়ে যায় তিয়াষার চোখের সামনে দিয়ে। ভরা দুপুরে চারদিকে অজস্র উকিল, ক্লায়েন্ট, আসামি, বাদী-প্রতিবাদী, অসংখ্য বিবদমান এবং মুক্তিকামী মানুষের ভিড়ে নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতে যেতে পা বাড়ায় তিয়াষা। এমনকি একটা ট্যাক্সি ডেকে নেওয়ার কথাও মনে পড়ে না ওর। মাথার উপরে জ্বলতে থাকা প্রখর সূর্য থেকে ঝরে পড়া বিন্দু বিন্দু ব্যাখ্যাহীন অচেনা ব্যথার স্রোত জনস্রোতের অজ্ঞাতে মিশে যেতে থাকে ওর বুকের ভিতরে হঠাৎ জেগে ওঠা বানভাসি চরে।

 

১৬

উদ্দালক বসেছিল গাছতলায়। বহু দিন পরে আবার ধর্মতলা চত্বর দিয়ে নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত এসেছে সে। আগে যখন দু’বেলা ঠিকমতো খাওয়া জুটত না, যখন শরীরটা অনেক বেশি হালকা ছিল, তখন এর চেয়েও অনেক অনেক লম্বা রাস্তা হেঁটে পাড়ি দিয়েছে সে। 

সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে তার মানুষ গবেষণা নিয়ে কাজ করে বেড়াত নিজের মনে। এখন হাসপাতালের মিউজ়িশিয়ান হয়ে পকেটে মাস গেলে ভালই টাকা আসছে, আর দু’বেলা ভরপেট খাবারও জুটছে। তাই ওর শরীরটাও ভারী হয়েছে অনেক। এখন আর বেশি হাঁটাহাঁটি করাই হয় না। মানুষের রিসার্চটা ইনকমপ্লিট হয়েই পড়ে আছে মগজের এক কোনায়। আর যেটুকু সময় পাওয়া যায়, সুছন্দা নামের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকেই কেটে যায়।