বছর তেইশের মেয়েটির পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন অচিন্ত্যকুমার। মেয়েটি বসেছিল চেয়ারে। অচিন্ত্যকুমার হঠাৎ হাঁটু মুড়ে বসে এমন একটা কাণ্ড করে ফেলবেন, বুঝতে পারেনি সে। ঘটনার আকস্মিকতা তাঁকে বিস্মিত, সঙ্কুচিত করে তোলার আগেই প্রণত অচিন্ত্যকুমার মেয়েটির একটা হাত স্পর্শ করে বললেন, “তুমি কবিতারূপিণী ঈশ্বর–করুণা, তুমি আমার সাধনা। ভেবেছিলাম তোমাকে আমি আশীর্বাদ করব, কিন্তু এখন তুমি তোমার হাত আমার মাথায় ছোঁয়াও।” মেয়েটি কী করবে বুঝে ওঠার আগেই অচিন্ত্যকুমার তাঁর হাত টেনে নিয়ে নিজের মাথায় রাখলেন।

বিকেল তখনও তপ্ত দ্বিপ্রহরের হাত ছাড়েনি। অক্টোবরের শেষ দিন। সালটা ১৯৭৪। একাত্তর-ছোঁয়া অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের তত দিনে একশো চল্লিশখানা বই প্রকাশিত। ‘বেদে’ থেকে ‘পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ’ হয়ে ‘বীরেশ্বর বিবেকানন্দ’ বা কবিতার বই ‘উত্তরায়ণ’ পর্যন্ত কল্লোলিত যাত্রা তখন শেষ–পারানির পথে। ঘরের মধ্যে বই আর বই। নিজের প্রত্যেকটি বইয়ের সামনে নিয়ে গেলেন মেয়েটিকে। এক–এক করে সব ক’টি বইতে হাত রাখতে হল কবিমানসীকে। বললেন, “তোমার হাতের অমৃতস্পর্শ দাও।”

অথচ এই কিছু ক্ষণ আগেও মেয়েটি ভেবেছিল, আজ আর কবির দেখা পাবে না সে। ফোনে কথা হয়েছিল। তিনটের সময় যেতে বলেছিলেন। গাড়ি লেট করল। তা ছাড়া মালদা থেকে এসেছে সে। কলকাতার রাস্তাঘাট তাঁর কাছে গোলকধাঁধা। অচিন্ত্যকুমারই তাঁকে চিঠিতে ছবির মতো করে পথ বুঝিয়ে দিয়ে লিখেছিলেন, “রজনী সেন লেনে ঢুকে একটা রাস্তা ক্রশ করে খানিকটা এগিয়ে এলেই বাঁয়ে ২৩ নম্বর বাড়ি। লোহার হাল্কা গেট আছে, সেটা ঠেলে নির্দ্বিধায় বিজয়িনীর মত ভিতরের প্যাসেজে ঢুকবে।”

এই পর্যন্ত মালদার বাঁশবাড়ির দেবযানী চক্রবর্তীকে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর মামা প্রদীপ বাগচী। কাঙ্ক্ষিত বাড়িটির যে গেট ঠেলে তাঁর বিজয়িনীর মতো প্রবেশ করার কথা, সেই গেটেই তখন দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর পরমপুরুষ অচিন্ত্যকুমার। কবির চোখে–মুখে উদ্বেগের ছাপ। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে— “আমি সেই তিনটে থেকে দাঁড়িয়ে আছি যদি বাড়ি চিনতে না পারো। যদি ফিরে যাও।” বিদায়বেলায় উপহার দিলেন দুটো বই— ‘সমগ্র কবিতা’ আর ‘ভাগবতী তনু রবীন্দ্রনাথ’।

অর্ধ–শতাব্দীর দুই প্রান্তের এই দুই নারী ও পুরুষের বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে পঁয়তাল্লিশ বছরের। দুজনের সংযোগসেতু ‘দেশ’ পত্রিকা। মালদা থেকে বেরোবে কলেজপড়ুয়া এক দল ছেলেমেয়ের একটি ছোট পত্রিকা। তার প্রধান ঋত্বিক দেবযানী চক্রবর্তী— সবচেয়ে উৎসাহী, উদ্দীপ্ত এবং ভয়ডরহীন। পত্রিকার নাম ঠিক করেছেন তিনিই— ‘উৎস সুকান্ত’। কিন্তু তাতে কি শুধুই নিজেদের লেখা থাকবে? সেই সময়ের খ্যাতনামা কয়েক জন কবির কবিতা চেয়ে ‘দেশ’–এর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেন চিঠি, ব্যক্তিগত ঠিকানা জানা নেই বলে। কবিতা পাঠালেন কেউ–কেউ। অচিন্ত্যকুমার পাঠালেন কবিতাহীন একটি চিঠি। ১৯৭৪–এর ৪ জুলাই। প্রতিশ্রুতি দিলেন, আগামী কোনও সংখ্যায় কবিতা দেবেন অবশ্যই। দেবযানী কী লিখলেন এর উত্তরে? জানা নেই। তবে প্রথম চিঠির চোদ্দো দিনের মধ্যেই অচিন্ত্যকুমারের চিঠির সম্বোধনে উপস্থিত ‘পাপু’— দেবযানীর ডাকনাম। ‘প্রথম পুরুষ’ নামে কবিতা থাকল এই চিঠিতে, পাপুর পত্রিকার জন্য; সেই সঙ্গে চিরাচরিত পুরুষোচিত ইঙ্গিত, একটু টোকা মেরে দেখার ইচ্ছা— “কেন জানি না তোমার সম্পর্কে একটি অন্তরের টান— আত্মীয়তা অনুভব করছি। চলে যাবার দিন সন্নিহিত হয়ে এসেছে, বোধ হয় তারি জন্য।” শেষ বাক্যের ছিপে গেঁথে দিলেন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলের সূক্ষ্ম টোপ।

প্লাবনপুণ্যা: দেবযানী চক্রবর্তী, এখন যেমন।

বঁড়শির ক্ষতে দেবযানী জর্জরিত হলেন নিশ্চয়ই। তা না হলে দ্বিতীয় আর তৃতীয় চিঠির দূরত্ব দুই সপ্তাহের হলেও কাছে টানার ভাষায় দূরত্ব নেই একটুও: “তোমার নাম ‘পাপু’ কেন বলতে পারো? আমার মনে হচ্ছে তুমি ‘প্লাবনের’ পা আর ‘পুণ্যের’ পু নিয়ে ‘পাপু’ হয়েছ, তুমি প্লাবনপুণ্যা। …আমার কেবলই ইচ্ছে হচ্ছে কোথাও কোনো নির্জনে–নিবিড়ে তুমি আমাকে তোমার কবিতা পড়ে শোনাও আর আমি শুনতে শুনতে কবি হয়ে উঠি।” চিঠিগুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধান এর পর ক্রমশই কমে আসবে, সেই সঙ্গে বেড়ে যাবে ভাষার অন্তর–ভেদী অন্তরঙ্গতা: “আমি কবি মধুমান— তুমি কবি মধুমতী। ভেবেছিলাম তোমাকে ‘মধুমতী’ বলে সম্বোধন করব। পরে অনুভব করলাম তুমি তার চেয়ে বেশি, অনেক বেশি।… জীবনের পরিব্যাপ্ত অনুভবের ভূমিতে তুমি আমার মধুমত্তমা।”

দেবযানীকে অচিন্ত্যকুমার বলেছিলেন চিঠির উত্তরগুলির নকল রেখে পাঠাতে। বাংলা কথাসাহিত্যের স্বরাট এবং লোকপ্রিয় কবি অচিন্ত্যকুমার হয়তো ভেবেছিলেন ভাবীকালে এই দুই পত্রধারা জন্ম দেবে পত্রাশ্রিত এক অনুপম প্রেমকাব্যের। কিন্তু দেবযানী তা করেননি। তাঁকে লেখা অচিন্ত্যকুমারের ৩৫খানা চিঠি আগলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো বসে আছেন। চার দশকের ঋতুলাঞ্ছনা চিঠিগুলোকে জীর্ণ করেছে। সেলোটেপের আঠায় জোড়া দিয়েছেন ছিন্নপত্র। এই অমূল্য অক্ষরধন কোনও প্রতিষ্ঠানে দান করতেও মন চায় না তাঁর।

অচিন্ত্যকুমারকে লেখা নিজের প্রত্যুত্তরগুলোর নকল রাখলেন না কেন দেবযানী? “আমি রাখিনি। আসলে বাণিজ্যিক বুদ্ধি আমার কোনও কালে নেই। আর প্রতিষ্ঠিত অমরত্বের শব–ছোঁওয়া লোভে আমি বিখ্যাতও হতে চাই না। তবে অচিন্ত্যকুমার সম্বন্ধে আমার মনে প্রশ্ন জাগে: আমি কি তাঁর কাছে স্বপ্নের বিয়াত্রিচে ছিলাম?” ইতালীয় কবি দান্তের প্রেমিকা বিয়াত্রিচে। মৃত্যুর পরেও তো তিনিই কবিকে পথ দেখাবেন স্বর্গের— ডিভাইন কমেডি।

দেবযানীর কী কী নাম দিয়েছিলেন অচিন্ত্যকুমার? তালিকাটা বেশ দীর্ঘ— প্লাবনপুণ্যা, মধুমত্তমা, মিষ্টি সই, পাপুমণি, রাণী, পপি, পপ, পাপুয়া, সোনামণি, অমিয়নির্ঝর, অপরিমিতা, উন্মুখ নিরালা, প্রার্থনাতীতা, উষ্ণা, অনীহা, কল্পনাতীতা। নামের প্রত্যুত্তরে নাম দেননি দেবযানী। তাঁর মনে হয়েছিল যা অচিন্ত্যকুমারকে মানায়, তা হয়তো তাঁর ক্ষেত্রে শোভন হবে না। সেই সঙ্গে একটা নির্লিপ্তি কাজ করছিল সেই তরুণীর মনে। তাই তো ‘অনীহা’ নামও পেয়েছেন কবির সম্বোধনে। এমনকি ‘দেশ’ পত্রিকায় ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ সংখ্যায় ‘কল্পনাতীতা’ নামে একটি কবিতাও লিখেছিলেন অচিন্ত্যকুমার। কবিমানসীর কাছে সেই সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছে এই ভাবে: “তোমাকে নিয়ে আমি একটা কবিতা লিখেছি— ‘কল্পনাতীতা’। ‘দেশ’–এ দু–তিন সপ্তাহের মধ্যে বেরুবে মনে হচ্ছে। পড়লেই বুঝতে পারবে এ একান্ত করে তুমি।” এর পরেও পাপু তাঁর কোনও নাম দেননি, অথচ চতুর্থ চিঠি থেকেই অচিন্ত্যকুমার পত্রান্তে স্বাক্ষরস্থানে নিজের নামের বদলে একের পর এক রাখতে চেয়েছেন প্রেমচিহ্ন— সম্রাট, মিতা, রাজা, সোনামন, ক্ষীরসমুদ্র, অমৃতপ্লাবন। ১৬ নম্বর চিঠিতে শেষ পর্যন্ত ‘মিতা’ অচিন্ত্যকুমারের আকুল আর্তি: “তুমি আমার একটা ডাক–নাম রাখো— যে নামে আমি তোমার একান্ত হব, সমবয়সী হব। আমি কিন্তু তোমাকে সহস্র নামে ডাকব— অর্থে–অনর্থে, কারণে–অকারণে, তুমি আপত্তি করতে পারবে না।” দেবযানীকে অগত্যা একটা ডাক–নাম রাখতে হল— ‘অর্ক’। গ্রহণ করলেন এই নাম, তাই শেষ আঠারোটি চিঠির শেষে ‘অর্ক’ নামেই ইতি টেনেছেন কবি–কল্লোল।

মালদা স্টেশন থেকে টোটোতে আধ ঘণ্টাও লাগে না বাঁশবাড়ি। যে দোতলা সুদৃশ্য বাড়িটির সামনে দাঁড়ালাম, এক দিন এখানেই আসার কথা ছিল অচিন্ত্যকুমারের। চল্লিশ বছর আগে প্রতিবেশীদের কাছে এই বাড়িটার নাম ছিল ‘ফুলের বাড়ি’। বাড়ির সামনের বাগানে ফুটত নানা রঙের ফুল। বাগানে এখন ঘর উঠে গেছে। বারান্দা আর রাস্তার মাঝে দুই ধাপ পাথর বসানো সিঁড়ি। বারান্দা-লাগোয়া ঘরে আতিথেয়তার মাঝেই ‘প্লাবনপুণ্যা’ উপস্থিত হলেন। সত্তর ছুঁতে এখনও বছর দুয়েক বাকি। অন্য ঘরে তাঁর মা শয্যাশায়ী। দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ চোখে। তবু অচিন্ত্যকুমার প্রসঙ্গে আজও তিনি যে ‘তরুণী পাপু’, তা বোঝা গেল কিছু ক্ষণ পরেই। তাঁর কলেজ-জীবন, নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা, বাড়িতে লুকিয়ে রাখা নিষিদ্ধ বইপত্রের কথা বলতে বলতেই কখন যেন অর্গলহীন হয়ে গেলেন কবিমানসী। সেই সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘‘একদম ভেবো না যে সেই মানুষটির জন্য আমি সংসারী হইনি। বিয়ে, সংসার, শ্বশুরবাড়ি, এ সব থেকে আমি শতহস্ত দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কবির সঙ্গে আলাপ হওয়ার অনেক আগেই।’’

১৯৭৪–এর ৪ জুলাই থেকে ১৯৭৫–এর ২২ ডিসেম্বর। আঠারো মাসে মোট ৩৫টি চিঠি পেয়েছেন মালদা–বাসিনী পাপু। এই সময় অচিন্ত্যকুমার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন বারবার। দেবযানীকে যেমন সেই অসুস্থতার কথা জানাচ্ছেন, আবার ভিন্ন সাক্ষ্যেও এসেছে কল্লোল যুগের অন্যতম সেনাপতির ‘কিছুতেই সুস্থ না হয়ে উঠতে পারা’র কথা। ‘ছন্দিতা’ পত্রিকা সেই সময়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সম্মানে একটি সংখ্যার আয়োজন করছিলেন। তার সম্পাদক গৌরগোপাল দাশকে একটি চিঠিতে লিখেছেন, “আমি এখনো খুব অসুস্থ। নীচে নামা বারণ। অতি কষ্টে ও অতি প্রয়োজনে লিখছি তোমাকে।’’ এই অসুস্থতার কথা বারবার দেবযানীকেও লিখেছেন তিনি, কিন্তু সেই পত্রভাষা তো সম্পাদকমশাইকে লেখা চিঠির সঙ্গে মিলতে পারে না। একই সময়ে পাপু তথা দেবযানীকে লিখছেন, “অনেকে বলেছে কোনো আরোগ্যনিবাসে চলে যেতে, নয়তো কোনো নার্সিং হোমে।… পাপু, তুমি জেনে রাখো তোমার বুকেই আমার আরোগ্যনিবাস, তোমার কোলেই আমার নার্সিং হোম।… তুমি বিশ্বাস করো, তোমার কথাসুধাই এখন আমার একমাত্র সঞ্জীবনী।”

অচিন্ত্যকুমার চেয়েছেন ‘কবি মধুমতী’ তাঁর ‘অচিনকুমার’কে নিয়ে একটা কবিতা লিখুক। সেটা পেয়ে ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবেন না, বুক–পকেটের মানি–ব্যাগের একটি গোপন কক্ষে লুকিয়ে রাখবেন— “কেউ টের পাবে না, শুধু আমি জানব, প্রতি নিঃশ্বাসে জানব এ আমার পাপুর, প্লাবনপুণ্যার উপহার।” সেই সঙ্গে অনুরোধ করেছেন, “তোমার ছোট একটা ছবি চিঠির মধ্যে করে আমাকে পাঠিয়ে দিও। আমি আমার ঠাকুরের এলবামে রেখে দেব।”

পাপুর উত্তর নেতিবাচক ছিল। কারণ সে দেখতে ‘বাজে’। তাতে কবির প্রতিক্রিয়া: “যে প্রতিটি রক্তবিন্দুতে বাজছে, নিরন্তর বাজাচ্ছে আমাকে, সে বুঝি কখনো বাজে হতে পারে?” তবু দেবযানী তক্ষুনি ছবি পাঠাননি। অন্তত তিনটে চিঠিতে এই অনুরোধ এসেছে। তিন মাস পর একটির জায়গায় দুটি ছবি পেয়ে অচিন্ত্যকুমারের উচ্ছ্বাস: “তোমার ছবি দুটো কী সুন্দর উঠেছে! কিন্তু হাসিহাসি মুখ করনি কেন? চশমাপরাটা বেশ গম্ভীর— হেডমিসট্রেসের মত, চশমাছাড়াটা তবু একটু অন্তরঙ্গতায় কমনীয়— কিন্তু যা–ই বলো দুইই আমার পূজাভরা হৃদয়ের প্রতিমা— ক্ষণে ক্ষণে কত বার যে দেখছি আদ্যোপান্ত তা ছবি ছাড়া আর কেউ জানে না।”

অচিন্ত্যকুমার নিজেই মালদার বাঁশবাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন, পাপুকে দেখবেন বলে। জানতে চেয়েছিলেন পথনির্দেশ। বলেছিলেন, কলকাতার এসপ্লানেড থেকে বাসে চেপে বসবেন। সোজা মালদা। থাকার জন্য ডাকবাংলোর খোঁজও করেছিলেন। কিন্তু দেবযানী বলেছিলেন, কোনও ডাকবাংলো নয়, উঠতে হবে তাঁদের বাড়িতেই। কবি–কল্লোল তাতে সম্মতি জানিয়ে লিখলেন, “মালদায় তোমাকে ছাড়া এক পা–ও চলব না, তুমিই আমার সর্বময়ী কর্ত্রী হবে।” এর পরেই কবি একটি আশঙ্কার কথা লিখেছেন— বাংলার বাইরে বা মফস্‌সলে যেখানেই যান, সেখানেই একটা হইচইয়ের মধ্যে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয়। নানা সভায় টেনে নিয়ে যায় লোকে, নানা রকম বক্তৃতায়–কবিতায়–কথকতায় বসিয়ে দেয় তাঁকে। ক্লান্তির অন্ত থাকে না। তাই তিনি লুকিয়ে, জানান না দিয়ে মালদা যেতে চান: “সেটা কি সম্ভব? তুমি তোমার আঁচলের তলায় তোমার বুকের শঙ্খদুটির মতই কি আমাকে তোমার নিবিড় সান্নিধ্যে গোপন করে রাখতে পারবে?”

হঠাৎ এই শরীরী ইঙ্গিত? অসংযমের উদ্ভাস? না, ঠিক হঠাৎ নয়। এর আগের চিঠিতেই কবিতার কথা, দেবযানীদের পত্রিকার আয়োজনের কথা বলতে বলতে অচিন্ত্যকুমার লিখেছিলেন: “আচ্ছা, আমি যদি চিঠিতে কখনো অন্তরের টানে তোমার প্রতি প্রগাঢ় হয়ে উঠি, ভালোবাসার ভাষা যদি ব্যাকরণ মানতে না চায়, তাহলে কি তুমি বিরক্ত হবে? মুখ ফিরিয়ে নেবে? কথা কইবে না?” দেবযানী এই প্রসঙ্গগুলি এড়িয়ে গেছেন বারবার। নাছোড় কবিপুরুষ রেয়াত করেননি সেই নিস্পৃহতা: “কোথায় তোমার মন ধরা যায় উত্তর দাওনি তো? সে কি তোমার করতলে, চোখ দুটিতে, না কি ঠোঁট দুটিতে, না কি আরো নিভৃতে? একটু বলবে? না কি সেই লজ্জা?”

অতঃপর দেবযানী চিঠিতে আদর দিয়েছেন ‘অতি অল্প’। সেই সামান্য নিয়েই কবি অনন্ত আনন্দসাগরে ভেসেছেন। নারীর সেই ক্ষীণ ‘প্রশ্রয়ে’ অর্গলহীন হয়েছে যৌনতার ভাষা: “এত দিন যখন জ্বর ছিল প্রতি রাত্রে তুমি চুপি–চুপি আসতে, আমার নিঃসঙ্গ বিছানায় আমার শিয়রে এসে বসতে। আমার মাথা তোমার কোলে তুলে নিয়ে কপালে–চুলে হাত বুলিয়ে দিতে, দুই মিষ্টি হাতের কোমল আদরে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে। সেদিন যখন জ্বর অন্ত হল, দেখলাম তুমি আবার এসেছ মধ্যরাতে। কী ভীষণ শীত পড়েছে, মনে হল কাঁপছ তুমি। এস, বলে আমি ডাকলাম আর তুমি শিয়রে না বসে একেবারে আমার লেপের মধ্যে ঢুকে পড়লে। তোমার গা–হাত–পা ঠাণ্ডা, তুমি তখনো শীতে কাঁপছ। আমি তোমাকে আমার দুই বাহুর মধ্যে নিবিড় স্নেহে জড়িয়ে ধরলাম, তুমিও লতার মত সর্বাঙ্গ দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে রইলে। কী আশ্চর্য, কতক্ষণ পরে মনে হল আমাদের মধ্যে একটি তন্তুরও আর ব্যবধান নেই। উপরে লেপের আচ্ছাদন, ভিতরে নিস্তব্ধ মসৃণতা। সে যে কী মধুর উত্তাপ–উত্তেজনা, শীত পর্যন্ত থমকে দূরে সরে রইল। সহসা দেখি, বহুদিনের উপবাসী প্রসুপ্ত সিংহ কেশর ফুলিয়ে দৃপ্ত গর্জন করে উঠেছে— সে দৃপ্ততা বুঝি কল্পনায়ও আনা যায় না— আমি তাকে শাসন করতে যাই কিন্তু সে নিবৃত্ত হতে চায় না, বলে, আমার মনোনীত গুহাকে পেয়েছি এত দিনে, আমার জন্মজন্মান্তরের নিবাস, আমার ইহজীবনের শেষ আশ্রয়। আমি তাকে উন্মাদ হতে দিই না, কিন্তু সে বলে, ঐ দেখ সোনামুখী গুহা আমাকে ডেকে নেবার জন্যে অঝোরে অমিয়ক্ষরণ করছে, বিস্তৃত করেছে পথঘাট, বাধা দিও না। উদ্ধতকে আমি তবু সংযত করি, বলি, তার আগে সোনামুখী গুহার কাছে সংবাদ নাও সে তোমার গভীরবিদার দুর্ধর্ষতাকে সহ্য করতে পারবে কিনা? সোনামুখী গুহা কী বলে?”

এই চিঠির উত্তরে কি লিখেছিলেন দেবযানী? মনে নেই তাঁর এখন আর, তবে সম্পূর্ণ যে এড়িয়ে যাননি, শিখাহীন উস্কানির মৃদু আগুন যে ছিল তা বোঝা যায় অচিন্ত্যকুমারের পরের চিঠিতেই: “আমি ডাকাত, আর সোনামুখী বুঝি কম আগুন? নিজে তো সাত হাত লেলিহান শিখা, তার উপর বুকে আবার দু’স্তুপ তপ্ত বারুদ। অর্কের তো শুধু খনন আর খনন, সোনামুখীর সে কী গ্রাস, কী ওথলানো! এক কড়া গরম দুধ নয়, তার চেয়ে বেশি— এক সমুদ্র ফেনকল্লোল! আচ্ছা, আমি এত সুন্দর নাম রাখলাম— কথাসুন্দরী, সোনামুখী, তুমি তো উলটে একটাও নাম রাখলে না। নাম হতে পারে রক্তমুখ, নাম হতে পারে দোর্দণ্ড। আমি সোনামুখীর আরেকটা নাম রাখলাম— শকুন্তলা, সেই সুবাদে তার বুকের দুই সখীর নাম প্রিয়ংবদা আর অনসূয়া! শকুন্তলার বিপরীত নাম রাখতে পারো, দুষ্মন্ত বলে। তুমি যখন অর্কের কোলে রাণী হয়ে বসো তখন যে রাজদণ্ড ধরে তুমি রাজত্ব পরিচালনা করো সেই প্রেক্ষিতে নাম রাখতে পারো দণ্ড। তুমি দণ্ডধর আর আমি দণ্ডদাতা। এসব নামের সাহায্যে অনেক কথা— অনেক বেশি কথা বলতে পারো তুমি— কি, পারো না?”

পাঁচ থেকে বাইশ— এই আঠারোটা চিঠির কোনও কোনওটাতে যৌনতার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। ১৯৭৫–এ ৯ জানুয়ারির চিঠির শেষ অংশে যেন মনোবিকলনের বিদ্যুৎ-তাড়না: “দুই সখী প্রিয়ংবদা আর অনসূয়াকে কী আদর যে করছি! কী যে পীড়ন! একেকটা রাত তো শুধু ওদের সঙ্গে খেলা করেই কাটিয়ে দিই।” পরমপুরুষ ‘অর্ক’র এই নিবিড় নির্ভরতা-ভরা পত্রগুচ্ছ আঁচলে আগলে আজও দেবযানীর নিশ্চিত বিশ্বাস— “অচিন্ত্যকুমারের জীবনের শেষ আঠারো মাস আমিই তাঁর প্রেরণা ও প্রেম।”

সত্যিই কি তাই? তবে মুনা মালতী? এই তরুণীকে বাদ দিয়ে দেব একেবারে?

ঢাকায় থাকতেন মুনা। অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে তাঁরও চিঠিপত্র চলত অনর্গল। তাঁকেও তো প্রায় একই সময়ে, ওই জীবনসায়াহ্নেই লিখছেন: “মনে কোর, আমি তোমার গত কোনো জন্মের সমবয়সী বন্ধু— কিংবা ভবিষ্য কোনো জন্মের অন্তরঙ্গ।” অচিন্ত্যকুমার তাঁর ‘মধুমত্তমা’ দেবযানীকে ১৯৭৪–এ লিখছেন: “আমার কেউ নেই।… আমি নিঃসন্তান, আমার স্ত্রী আছেন বটে কিন্তু সংসারবিমুখ, সম্পূর্ণ উদাসীন।” তাঁর কিছু দিন আগে ঢাকাবাসিনী মালতীকে লিখছেন: “ভগবান জানেন আমি কত নিঃসঙ্গ।… তবু ভাগ্যের অহেতুক করুণার মত হঠাৎ কখনো মালতী ফুটে ওঠে— নিরর্গল হও, তোমার কথার পরিপ্লাবী শান্তি দিয়ে আমাকে স্নিগ্ধ করো।” এই মালতীর কাছেও ডাক–নাম চেয়েছিলেন দেবযানীর ‘অর্ক’। মালতী কবিকে সম্বোধন করতেন ‘মুসাফির’ বলে। এমনকি মালদার বাঁশবাড়ির মতো ঢাকাতেও এক বার ঘুরে আসতে চেয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছে নিভৃতে দিতে চেয়েছিলেন ‘সর্বঢালা আদর’।

২৯ জানুয়ারি ১৯৭৬। এটাই অচিন্ত্যকুমারের প্রয়াণ-তারিখ। তার ঠিক এক মাস সাত দিন আগে শেষ চিঠিটি পেয়েছিলেন মালদার ‘পাপুয়া’। অসুস্থ ‘অর্ক’ তাঁকে উতলা হতে নিষেধ করে লিখেছিলেন: “আরোগ্য আরামের কথা যখন ভাবি তখন তো তোমাকেই দেখি, তোমাকেই অনুভব করি।” দেবযানী জানতেন না মালতীর কথা। তা হলে জানতে পারতেন তিনি ছাড়াও অন্তত আরও এক জন পেয়েছিল অচিন্ত্যকুমারের শেষ চিঠি, সেই ডিসেম্বরেই: “সোনামণি, আমার স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়ে গেছে— আর বেশিদিন থাকা চলবে না। শুধু একটু দেরি করছি যদি তোমার ঘরে একটু আদর আস্বাদ করতে পারি।”

বয়স নারী-পুরুষ সম্পর্কে কখনও দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় না। একদা এই অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তই তরুণ-তরুণীর প্রেম নিয়ে লিখেছিলেন ‘প্রথম কদম ফুল’-এর মতো গল্প। সৌমিত্র-তনুজা-শুভেন্দুকে নিয়ে ১৯৬৯ সালেই সে গল্প থেকে হয়েছিল সাড়া-জাগানো ছবি। কিন্তু তারুণ্যের প্রেমই তো সব নয়। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় দাঁড়িয়েও কি তাই অচিন্ত্য পৌরুষী টানাপড়েনে ছিন্ন হতে হতে খুঁজতে চেয়েছিলেন শেষবেলার কদম ফুল?

 

কৃতজ্ঞতা: সন্দীপ দত্ত, সুরঞ্জন প্রামাণিক, দ্যো চক্রবর্তী