এ বছর মার্চের শেষ বা এপ্রিলের গোড়ার দিক। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইউথ সার্ভিস দফতরের এক মিটিংয়ে বসেছি আমরা সবাই। কয়েকটা জরুরি বিষয়ে আলোচনা হবে। রয়েছে দেবরাজ দত্ত, কুন্তল কাঁড়ার, শেখ সাহাবুদ্দিন, মলয় মুখোপাধ্যায়, উজ্জ্বল রায়, দীপঙ্কর ঘোষ, দীপালি সিন্হা, আরও অনেকে। বেশ লম্বা মিটিং, ঘণ্টা দুয়েক পেরিয়ে গেল।

তার পর শুরু হল আড্ডা। কয়েক দিনের মধ্যেই অনেকেরই পর্বতাভিযানে বেরনোর কথা। শুভেচ্ছা জানালাম কুন্তল, রমেশ, বিপ্লব, সাহাবুদ্দিনকে। ওরা কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে যাচ্ছে। দলে ওরা ছাড়াও রয়েছে রুদ্রপ্রসাদ হালদার। অভিযানের সাফল্য ও ওদের সুস্থ প্রত্যাবর্তনের জন্য শুভেচ্ছা।

দীপঙ্করকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তো মাকালু যাচ্ছ। কবে রওনা হবে? জানাল, এপ্রিলের আট তারিখে। হাওড়া থেকে ট্রেন। রক্সৌল হয়ে কাঠমান্ডু যাবে প্রথমে। সেখানে দলের বাকি সবার সঙ্গে রওনা দেবে মাকালুর উদ্দেশে। আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। বললাম, জোরে চাপো তো আমার হাত! ও বুঝতে পারল আমার উদ্দেশ্য। বেশ জোরে চেপে ধরল। হেসে বলল, ‘‘কি! জোরে চাপতে পারছি তো?’’

গত বছর ধৌলাগিরি অভিযানে দীপঙ্করের হাত-পায়ের আঙুলগুলোতে মারাত্মক তুষারক্ষত হয়। প্রতি হাতের চারটে করে, দু’হাতের মোট আটটা আঙ্গুল কাটা পড়ে। চারটে আঙ্গুলের ওপরের দুটো কর নেই। শুধু দু’হাতের বুড়ো আঙুল আর অন্য আঙুলগুলোর নীচের একটা করে কর রক্ষা পায়। তাই দেখতে চেয়েছিলাম, কতটা জোরে ও কোনও কিছু চেপে ধরতে পারছে। মাকালু অভিযানে তো ওর হাতের পাঞ্জার জোর বারবার পরীক্ষিত হবে।

অবাকই হয়েছিলাম। এতগুলো আঙুল বাদ পড়ার পরেও ওর হাতে এত জোর, ভাবা যায় না। দুশ্চিন্তাও হল। যতই জোর থাকুক, হাতের পাঞ্জাগুলো তো স্বাভাবিক নেই। কারও হাত চেপে ধরা আর সাত-আট হাজার মিটার উঁচুতে ছয়-আট-দশ মিলিমিটার ব্যাসের চওড়া দড়ি মুঠো করে ধরা বা খাড়া ঢালে জুমার ধরে ঝুলে থাকা এক নয়। আমার মনের ভাব বুঝে দীপঙ্কর বলল, ‘‘জুমারিং অনেক প্র্যাকটিস করেছি। জুমার ঠেলে সুন্দর উঠে যেতে পারছি। এই হাত নিয়েই তো গত বছর চোয়ু আরোহণ করে এলাম, কোনও অসুবিধা হয়নি।’’

অভিযাত্রী: দীপঙ্কর ঘোষ।

সত্যি কথা। ২০১৮-র সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এই হাত-পা নিয়েই পৃথিবীর ষষ্ঠ উচ্চতম শৃঙ্গ চোয়ু আরোহণ করেছে ও। কিন্তু, হেমন্তের চোয়ু আর বসন্তকালের মাকালুর মধ্যে পার্থক্য আছে, সেটা আর মুখে বললাম না। ওর সারা শরীরে ফুটে রয়েছে আত্মবিশ্বাস। পর্বতারোহণে শরীরের জোরের থেকেও বেশি দরকার মনের জোর। দীপঙ্করের মনের জোর যে দুর্দান্ত, বলার অপেক্ষা রাখে না।

ওর হাত টেনে নিয়ে, আঙুলের মাথাগুলোতে আমার আঙুল বোলাতে বোলাতে বললাম, সেন্স কেমন? সূক্ষ্ম কোনও কিছুতে খোঁচা লাগলে ব্যথা হয় না? বলল, ‘‘জায়গাগুলো এখনও মারাত্মক সেন্সিটিভ‌। খুব যত্নে রাখতে হচ্ছে। ঠান্ডা জায়গায় আরও সাবধানে থাকতে হয়। চোয়ু-তে তো স্পেশাল গ্লাভস ব্যবহার করেছি।’’ ব্যাগ থেকে এক জোড়া গ্লাভস বার করল। ইলেকট্রিক গ্লাভস, রিচার্জেবল ব্যাটারি লাগানো। সুইচ অন করলে গরম হয়ে যাবে। হাতে ঠান্ডা কম লাগবে। নেড়েচেড়ে দেখলাম। অনেক জুতোতেও এমন সিস্টেম আছে। ভিতরে ছোট ইলেকট্রিক কয়েল থাকে, ব্যাটারি সেই কয়েলকে গরম করে। পা গরম থাকে।

অন্য এক চিন্তা মাথায় এল। দীপঙ্করের হাতের চারটে করে আঙুলেরই তো বেশ খানিকটা করে নেই। এই অবস্থায় গ্লাভস পরলে তা আঙুলগুলোর সঙ্গে শক্ত করে লেগে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে কি আরোহণের সময় ও দড়ি বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি দৃঢ় ভাবে ধরতে পারবে ও!

কিন্তু এখন এ সব নিয়ে আলোচনা করাটা উচিত হবে না। সব কিছু সেরে আগে সুস্থ ভাবে ফিরে আসুক। শুধু বললাম, ‘‘মাকালুর পুরো পথটাই তোমার দেখা। গত বার প্রায় সামিট করেই ফেলেছিলে। কোথায় ডিফিকাল্টি, ভালই জানো।’’ 

২০১৩-র এপ্রিলে মাকালু অভিযানে গিয়েছিল দীপঙ্কর। সে বার সামিট ক্যাম্প বা ক্যাম্প-৪ থেকে শীর্ষারোহণে বেরিয়েও পড়েছিল। কিন্তু দড়ি কম পড়ে যাওয়ায় ফ্রেঞ্চ কুলোয়ার-এর নীচ থেকে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছিল। মাকালুর প্রায় পুরো রাস্তাটাই ও চেনে। জানে, কত দীর্ঘ সময় খাড়া দেওয়ালে জুমারিং করে উঠতে হবে। ক্যাম্প-২ থেকে ক্যাম্প-৩ পর্যন্ত পুরোটাই খাড়া দেওয়াল বরাবর জুমারিং করে ওঠা। বেশির ভাগ অংশই পাথরের, তার ওপরে জমে থাকে বরফ। খাড়া, আর ভয়ঙ্কর পিছল। এর পর শীর্ষারোহণের পথে আছে ফ্রেঞ্চ কুলোয়ার, সেও পাথরের খাড়া দেওয়াল। এ সব জায়গায় হাতের জোরের চরম পরীক্ষা দিতে হবে। দীপঙ্কর ওর সেই শান্ত, পরিচিত হাসিটা হেসে জানাল, অনেক প্র্যাকটিস করেছে, সমস্যা হবে না। আর এ বার তো বেশ বড় দলও রয়েছে মাকালুতে।

দীপঙ্করের দুটো বড় গুণ ওর শান্ত স্বভাব আর আট হাজার মিটারের শৃঙ্গ-অভিযান নিয়ে ওর পেশাদারি চিন্তাভাবনা। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ভাবধারায় দীক্ষিত ওকে কেউ কখনও চিৎকার করতে দেখেনি। কারও ওপর রাগ হলে শান্ত ভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করত। সব কিছুতেই অবিচল। এভারেস্টে যাওয়ার আগে ওর বাবা মারা যান। এভারেস্ট থেকে সফল হয়ে ফেরার পর, মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হয়। এক দিন মায়ের অবস্থা একটু ভাল, ও সিদ্ধান্ত নেয়, মাকে ঘরে নিয়ে আসবে। কিন্তু নার্সিংহোমে পৌঁছনোর পর দেখে, মা গত হয়েছেন। বন্ধুকে ফোন করে ও অবিচল গলায় বলেছিল, ‘‘মাকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছিলাম, কিন্তু মা চলে গেল।’’

এই মানুষটাকেই ভেঙে পড়তে দেখেছিলাম ধৌলাগিরি থেকে ফিরে আসার পর। সফল ভাবে ধৌলাগিরি আরোহণ করেছিল ও। শৃঙ্গ থেকে নামার সময় দেখা হয় অন্য এক অভিযাত্রীর সঙ্গে। সেও বাঙালি, দীপঙ্করের পূর্বপরিচিত। শীর্ষের পথে সে তখন চরম ক্লান্ত হয়ে পথেই বসে আছে, চলাফেরায় অক্ষম। এই অবস্থায় নামানো অসম্ভব বুঝে সহযাত্রীরা তাকে ছেড়ে নেমে গেছে। দীপঙ্কর কিন্তু ওকে একলা ছেড়ে নেমে আসেনি। অসুস্থ যাত্রীকে নামানো সম্ভব নয় বুঝে দীপঙ্করের শেরপা ওকে নেমে যেতে বলেছিল, কিন্তু ও রাজি হয়নি। শেরপা দীপঙ্করকে ছেড়েই নেমে যায়। রাত হয়ে গিয়েছিল, ওই অবস্থায় চলচ্ছক্তিহীন এক জনকে নামানোর চেষ্টা করা প্রায় আত্মহত্যারই শামিল। সারা রাত তার সঙ্গে থেকে, তাকে উৎসাহ দিয়ে পর দিন তাকে নামিয়ে আনতে পেরেছিল দীপঙ্কর। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় থাকায় দুজনেই চরম তুষারক্ষতে আক্রান্ত হয়। তারই পরিণতি দীপঙ্করের অতগুলো আঙুল চলে যাওয়া।

অভিযাত্রীর কাছে এটা বিরাট ক্ষতি। কিন্তু কিছু লোক দীপঙ্করের পিছনে পড়ে গেল। দিনরাত সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল। ওর তখন উদ্‌ভ্রান্তের মতো অবস্থা। ডাক্তাররা আঙুলগুলো নিয়ে জবাব দিয়ে দিয়েছেন। জানিয়েছেন, অপারেশন করলে বেশি কাটা পড়বে। ন্যাচারাল অ্যাম্পুট, অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় আঙুলের উপরের যতটা অংশ শুকিয়ে পড়ে যায়, তার অপেক্ষা করলে যতটা বেশি সম্ভব আঙুল বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ। তত দিন সহ্য করতে হবে চরম যন্ত্রণা। জল লাগানো যাবে না, স্নান বারণ। সংক্রামিত জায়গাগুলোকে আঘাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অসম্ভব সে কৃচ্ছ্রসাধন।

তার উপর এই সমালোচনার ঝড়। অথচ তা দীপঙ্করের প্রাপ্য ছিল না। ও যদি অন্যান্য অভিযাত্রীদের মতো মৃত্যুপথযাত্রী সেই আরোহীকে ছেড়ে চলে আসত, কেউ জানতেই পারত না ওই উচ্চতায় কী ঘটেছিল। কে ভুল, কে ঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠারও অবকাশ থাকত না। শীর্ষ থেকে ফেরার পথে সে দিন মুমূর্ষু কারও সঙ্গে দেখা না হলে নিশ্চিত ভাবেই দীপঙ্করের আঙুলগুলো তুষারক্ষতে আক্রান্ত হত না। ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন রাতে ওই উচ্চতায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে?  ও খুব শান্ত ভাবেই বলছিল, ‘‘ছেড়ে আসতে পারিনি।’’ এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এত হইচই শুরু হয়েছিল যে, বন্ধুরা দীপঙ্করকে আড়ালে রাখার জন্য পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্ৰামে পাঠিয়ে দেয়। প্রখ্যাত পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায় সে সময় দেখা করেন দীপঙ্করের সঙ্গে। সব শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘‘ঈর্ষা কিন্তু অর্জন করতে হয় দীপঙ্কর।’’

মাস ছয়েকে ওর আঙুলের ক্ষতগুলো শুকিয়ে পড়ে যায়। তার পরই আঙুল ছোট হয়ে যাওয়ার সমস্যাগুলো বুঝতে পারে ও। ছোট থেকেই ও বেশ ধার্মিক, চলার পথে মন্দির পড়লে হাত স্বাভাবিক ভাবেই জোড়া হয়ে কপালে উঠে যেত। পাহাড়ের শীর্ষে পৌছলে পুজোর জন্য বরাদ্দ থাকত খানিকটা সময়। বাড়িতেও নিয়মিত পূজাপাঠ করত। আঙুল ছোট হয়ে যাওয়ার পর মজা করে বলত, ‘‘বহু দিনের অভ্যাসে যে দূরত্ব থেকে বাবা-মার ফটোতে হাত ছোঁয়াতাম, সেখান থেকে আর হাত পৌঁছচ্ছে না।’’ পরে অবশ্য অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। আঙুলের জোর বাড়াতে ক্যারম খেলা শুরু করেছিল। খাওয়াদাওয়া নিয়েও ছিল খুব সতর্ক। শরীরের ওজন কমাতে খাবারে নুন-চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফেলে। কিন্তু ফুচকাওয়ালা দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ত।

পেশাদারি ঢঙে, চিন্তাভাবনা করে অভিযানের জন্য শৃঙ্গ বাছাই করত দীপঙ্কর। অনেক আগে থেকে ভাবত পরের অভিযানের কথা। খোঁজ নিত— কোন শৃঙ্গে কত অভিযাত্রী যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বিখ্যাত ও দক্ষ কত জন রয়েছে, কারা কারা রুট ওপেন করছে। দীপঙ্কর যখনই কোনও আট হাজারি শৃঙ্গে গিয়েছে, দেখা গেছে সেখানে রয়েছে এক বড় অভিযাত্রী দল, তাদের মধ্যে নামীদামি সব পর্বতারোহী। বেড়ে গিয়েছে সেই অভিযানের সাফল্যের সম্ভাবনা।

১৯৬৫-র ১৫ অগস্ট হাওড়ার বেলানগরের এক সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারে দীপঙ্করের জন্ম। তিন ভাইবোনের মধ্যে দীপঙ্কর সবচেয়ে ছোট। ১৯৮১-তে মাধ্যমিক, ’৮৩-তে উচ্চমাধ্যমিক, বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক ১৯৮৫ সালে। পারিবারিক ব্যবসাতে যোগ দিয়েছিল তার পর। ১৯৮১-তেই অ্যাডভেঞ্চারে হাতেখড়ি ওর। প্রচুর ক্যাম্পিং, ট্রেকিং করেছিল। ১৯৯২-এ মানালির অটলবিহারী বাজপেয়ী ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করে ও, সে বছরই পর্বতাভিযানের শুরু। প্রথম অভিযান গঢ়বাল হিমালয়ের টেন্ট পিক। ১৯৯৪-এ জম্মু-কাশ্মীরের জওহর ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে ফের বেসিক ও অ্যাডভান্সড মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করে। পরের বছর দার্জিলিঙের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে করে মেথড অব ইনস্ট্রাকশন কোর্স, ১৯৯৭-এ উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কোর্স। পর্বতারোহণে যতগুলো কোর্স হয় তার সবগুলোই করেছে ও।

১৯৯৫-এ ক্লাইম্বিং লিডার হিসেবে গঢ়বালের ভানুটি শৃঙ্গে অভিযান। এর পর পরপর অভিযান—বছরে দুটো,  এমনকি তিনটেও। এ ভাবেই কেদারডোম, নর পর্বত, দেওটিব্বা, যোগীন, গঙ্গোত্রী, সুদর্শন, চতুরঙ্গী, ভাগীরথী, শিবা ও অন্যান্য শৃঙ্গ অভিযান। ২০১১-তে এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার আগে ৩৬টা অভিযানে অংশ নিয়েছিল দীপঙ্কর। কিন্তু সেগুলোর সবই ছিল ছয় হাজারি। ঝুলিতে কোনও সাত হাজারি শৃঙ্গ আরোহণ না থাকায় কিছুটা আপশোস ছিল মনে। ২০০৭-এ মলয় মুখোপাধ্যায় কামেট (৭৭৫৭ মিটার) আরোহণ করে ফিরলে দীপঙ্কর ওকে বলেছিল, ‘‘দেখ আমি এত বছর ধরে পাহাড়ে যাচ্ছি, আজ অবধি কোনও সাত হাজারি শৃঙ্গ আরোহণ করা হল না।’’

ছয় হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের ক্ষেত্রে শীর্ষে পৌঁছনোটাই ছিল ওর কাছে মুখ্য। কিন্তু আট হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের ক্ষেত্রে দীপঙ্কর ছিল অনেক সতর্ক। কোনও ঝুঁকি নিতে চাইত না। আট হাজারি শৃঙ্গ অভিযানে বরানগরের রাজীব ভট্টাচার্য জুটি হল ওর। সেই রাজীব, যাকে আমরা হারিয়েছি ধৌলাগিরি অভিযানে। ২০১৬-তে পৃথিবীর সপ্তম উচ্চতম শৃঙ্গে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি সে।

রাজীব-দীপঙ্কর এভারেস্টে ওঠে ২০১১-তে। পরের বছর পৃথিবীর চতুর্থ উচ্চতম লোৎসে শৃঙ্গে সফল আরোহণ করে ওরা। ২০১৩-তে দীপঙ্কর একাই যায় পঞ্চম উচ্চতম মাকালু, কিন্তু শেরপাদের ভুলে শৃঙ্গের অল্প নীচ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পরের বছর আবার সেই জুটির সাফল্য। এ বার কাঞ্চনজঙ্ঘা, পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। দীপঙ্করের থেকে রাজীব প্রায় দশ বছরের ছোট। গুরু বলে মানত ও দীপঙ্করকে। 

ফটোগ্ৰাফি প্রিয় ছিল দীপঙ্করের। খুব ভাল ছবি তুলত ও। ১৯৯৭ সালে নর পর্বত অভিযানে ছবি তুলতে গিয়ে তো প্রায় মৃত্যুমুখ থেকে বেঁচে ফিরেছিল। সেই অভিযানে দীপঙ্কর, অন্য এক রাজীব ও প্রসেনজিৎ সামিট ক্যাম্প থেকে বেরিয়েছিল সামিটের উদ্দেশ্যে। শীর্ষে পৌঁছেই ওদের চোখে পড়ে, এক দিকে বরফের ঢালের মধ্যে লম্বালম্বি এক ফাটল। রাজীব অন্যদের সতর্ক করে, ‘‘মনে হচ্ছে ওটা কর্নিশ, ও দিকে কেউ যেও না।’’ হাওয়ার টানে কখনও কখনও গিরিশিরার মাথায় বরফের ঝুলন্ত স্ল্যাবের মতো অংশ তৈরি হয়, ঠিক বাড়ির ছাদের কার্নিশের মতো। এক পাশ থেকে পুরোপুরি ঝুলে থাকলেও অন্য পাশ থেকে তা বোঝার উপায় থাকে না। ভুল করে ওই ঢালে উঠে পড়লে তা যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। দীপঙ্কর ছবি তুলতে তুলতে বিপজ্জনক সেই ফাটলের উপরে চলে যায়। পা পড়ার মুহূর্তেই ভুস করে ঢুকে যায় ফাটলে। সঙ্গীরা কাছেই ছিল, ওরা টেনে তোলে দীপঙ্করকে। বন্ধুদের তৎপরতায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচেছিল ও।

কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে শীর্ষারোহণ করে ফেরার পথে ওর এসএলআর ক্যামেরাটা ক্রিভাসে পড়ে যায়। ক্যামেরাটা তখন ছিল ওর শেরপার কাছে। অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় ক্রিভাস থেকে ক্যামেরা তুলতে অসুবিধে হবে ভেবে শেরপা নীচে ক্যাম্পে নেমে আসে। তাঁবুতে ফিরে সে কথা জানতে পেরে দীপঙ্কর পারলে তখনই ছুটে যায় ক্যামেরা উদ্ধারে। শেরপা বোঝায়, জায়গাটা সে চিহ্নিত করে এসেছে, সকাল হলেই ক্যামেরাটা নিয়ে আসবে। সারা রাত ঘুমোয়নি দীপঙ্কর। কাকভোরে শেরপা ক্যামেরা উদ্ধার করে আনলে তবে শান্ত হয়েছিল।

কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানের পর থেকে নিয়মিত ভাবে ফটোগ্ৰাফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করে দীপঙ্কর। পেয়েছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অগণিত পুরস্কার। দীর্ঘ পর্বতারোহী জীবনে প্রায় ৪৮টি অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে ও। প্রথম আরোহী হিসেবে পাঁচ-পাঁচটা শৃঙ্গে উঠেছে। অভিযান নিয়ে বেশ কয়েকটা বই লিখেছে, বানিয়েছে তথ্যচিত্র। পর্বতারোহণ করে পেয়েছে অসংখ্য পুরস্কার।

২০১১ ও ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্পোর্টস এক্সেলেন্স পুরস্কার ছাড়াও রাধানাথ শিকদার-তেনজিং নোরগে অ্যাডভেঞ্চার পুরস্কার, এক্সেলেন্স ইন মাউন্টেনিয়ারিং পুরস্কার, ভারত গৌরব পুরস্কার। সম্প্রতি পেল ২০১৮-র তেনজিং নোরগে ন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার অ্যাওয়ার্ড, কিন্তু নিজে জেনে গেল না এই পুরস্কারের খবর। 

জেঠতুতো দাদা-বৌদি আর তাদের ছেলে, ভাইপো সায়ন ছিল ওর প্রিয়পাত্র। দীপঙ্কর বিয়ে করেনি। বলত, বিয়ে করে সংসারী হওয়া ওর কম্মো নয়। জেঠতুতো দাদার সংসারই ছিল ওর সংসার। আর নিখাদ ভালবাসা ছিল পাহাড়ের প্রতি। সেই টানেই হয়তো রয়ে গেল হিমালয়ের তুষারশুভ্র বুকে। 

পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালু (৮৪৮১ মি.) আরোহণ করে নামার সময় হারিয়ে যায় দীপঙ্কর। এ বছর ১৬ মে, বৃহস্পতিবার। ক্যাম্প ফোর বা সামিট ক্যাম্পের (৭৬০০ মি.) ওপরের বরফের ঢালে শেষ দেখা যায় ওকে। এ বছর মাকালু অভিযানে ছিল ইন্ডিয়ান আর্মির বেশ বড়সড় একটা দল। সে দিনই দীপঙ্করের সঙ্গে আরোহণ করেছিল সেই দলের ষোলো জন। এ ছাড়াও ছিল আমেরিকা, পেরু-সহ বিভিন্ন দেশের দল। নামার সময় দীপঙ্কর ক্রমশই পিছিয়ে পড়তে থাকে। আর্মি দলের সদস্যরা একে একে তাকে পেরিয়ে নেমে আসে। ওই দলটির নেতা দীপঙ্করের কাছে পৌঁছলে দেখে, সে খুব ধীরে ধীরে নামছে। জায়গাটা ক্যাম্প ফোরের উপরের বরফের ঢাল, খুব খাড়াও নয়। মাঝারি ঢালের বরফের ময়দানের মাঝখান দিয়ে পথ। পুরো পথটাই দড়ি লাগানো। নীচে চোখে পড়ছে ক্যাম্প ফোরের তাঁবুগুলো। দলনেতা দীপঙ্করের কাছে জানতে চায়, সে নামতে দেরি করছে কেন। দীপঙ্কর জানায়, নীচেই ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে, সে ঠিক ধীরেসুস্থে নেমে যাবে। এও জানায়, শেরপাকে আগেই নীচে পাঠিয়ে দিয়েছে, ক্যাম্পে পৌঁছে গরম জল, চা বানিয়ে রাখতে।

আর্মি দলের লিডার দীপঙ্করের পাশ কাটিয়ে নামার সময় নীচে পিছল বরফের দেওয়ালে হড়কে পড়েও যায়, কিন্তু ফিক্সড রোপে অ্যাঙ্কর করে থাকার জন্য দড়িতেই আটকে যায়। উপরে ওঠার সময় যে দড়ি দেওয়ালে লাগাতে লাগাতে ওঠার পথ বানানো হয়, সেই দড়িই ফিক্সড রোপ। আরোহীরা সেই রোপে নিজের সেফটি লাগিয়ে ওঠানামা করে। ৪-৬ ফুটের ছোট দড়ির এক প্রান্ত আরোহীর কোমরে লাগানো থাকে, অন্য প্রান্ত ক্যারাবিনার নামের এক ইকুইপমেন্টের সাহায্যে ফিক্সড রোপে লাগিয়ে নেওয়া হয়। এ ভাবে চললে কোনও সময় পা পিছলে গেলেও নীচে গড়িয়ে পড়া আটকানো যায়।

পিছলে পড়ার দরুন আর্মি লিডার বেশ আহত হয়। ওই অবস্থাতেই প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে নীচে ক্যাম্প ফোরে পৌঁছয় সে। এর মধ্যেই হঠাৎ প্রবল এক তুষারঝড় আছড়ে পড়ে ওই এলাকায়। অল্প সময়ের জন্যই। তাতেই সব এলোমেলো করে দিয়ে যায়। ঝড় কেটে গিয়ে চারপাশ পরিষ্কার হলেও দীপঙ্কর ফেরেনি। অনেক ক্ষণ অপেক্ষার পরও না ফেরায় তার শেরপা উপরে উঠে তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। রাত হয়ে যাওয়ায় বেশি খোঁজাখুঁজি চালাতে পারেনি সে। কিন্তু পরের দু’দিন ওই এলাকায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি দীপঙ্করকে। হেলিকপ্টার নিয়ে তল্লাশি চালানো হয়, তাতেও খোঁজ মেলেনি। আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় এর পর আর হেলিকপ্টার-তল্লাশি সম্ভব হয়নি। ধরেই নেওয়া হয়, এ বছর আর দীপঙ্করের খোঁজ পাওয়া যাবে না। দু’-তিন দিন পরে আবহাওয়া কিছুটা ভাল হলে ফের হেলিকপ্টারে তল্লাশি শুরু হয়। অবশেষে একটা দেহকে স্পট করা যায়, ধারণা করা হয় সেটাই দীপঙ্করের দেহ। পরে চোদ্দো জন দক্ষ শেরপার দল উঠে ক্যাম্প ফোরের এলাকা থেকে দীপঙ্করের দেহ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ২৪ মে দীপঙ্করের দেহ ক্যাম্প-টু’তে নামিয়ে আনে তারা। মৃতদেহ নামাবার সময় উদ্ধারকারী শেরপা দলের এক শেরপা, নিমা শেরিং মারা যায়। 

দীপঙ্করের মৃত্যু সমস্ত পর্বতপ্রেমীদের নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। কী এমন হয়েছিল যে সফল আরোহণ করে নামার সময় প্রাণ হারাতে হল দীপঙ্করের মতো এক অভিজ্ঞ আরোহীকে! তাও কিনা অপেক্ষাকৃত নিরীহ এক বরফের ঢালে, ফিক্সড রোপ থাকা সত্ত্বেও! তা হলে কি ধরে নিতে হবে দীপঙ্করের কোনও ভুল হয়েছিল! মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে গিয়েছিল প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা! দীপঙ্কর যে ফিক্সড রোপ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল এটা বাস্তব। তার অর্থ, ও ঠিকমতো অ্যাঙ্কর করেনি। সেফটি লাগানো থাকলে তো ওর শরীর দড়িতেই ঝুলত। সে ক্ষেত্রে ওকে খুঁজে পেতে আট দিন লাগত না। 

কিন্তু দীপঙ্করকে যারা চেনে তারা ভাল ভাবেই জানে, সব ব্যাপারেই দীপঙ্কর কতটা নিঁখুত ছিল। ফিক্সড রোপ লাগানো এলাকায় ও সেফটি না লাগিয়ে নামবে, বিশ্বাস হয় না। তা হলে কি দীপঙ্করের সঙ্গে কথা বলার সময় সেই যে আশঙ্কা মনে এসেছিল, তা-ই ঘটল! সামিট করতে যাবার সময় দীপঙ্কর নিশ্চয়ই ওর সেই ব্যাটারি লাগানো গ্লাভস পরে উঠেছিল। আঙুল কাটা পড়ার পর ওর কাপড়ের গ্লাভসগুলোকে ও সেলাই করে কাটা আঙুলের মাপমতো ছোট করে নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাটারি লাগানো গ্লাভসের ভিতরে তো ইলেকট্রিক সার্কিট থাকে। ইচ্ছে মতো তাকে কাটছাঁট করা সম্ভব নয়। নামার সময় হয়তো সেটাই হাতে পরা ছিল। সেই গ্লাভসের আঙুলগুলোর মাথার ভিতরের অংশ তো ফাঁকা। হয়তো সেই তুষারঝড়ের মধ্যে ফিক্সড রোপে অ্যাঙ্কর পাল্টানোর চেষ্টার সময়েই সেই আর্মি লিডারের মতো দীপঙ্করেরও পা পিছলে যায়! আর হাত বাড়িয়ে দড়ি ধরতে গেলে গ্লাভসের সেই ফাঁকা জায়গা দিয়েই ধরতে যায় ও, যা কোনও কাজে লাগে না! দীপঙ্কর গড়িয়ে পড়ে নীচে।  

আসলে কী হয়েছিল, তা শুধু জানে দীপঙ্কর— আর হিমালয়। সেও তো দীপঙ্করের মতোই, অসম্ভব শান্ত। তার মনের কথা কোনও দিনও কেউ জানতে পারে না। আমরা শুধু অনুমান আর কল্পনাই করে নিতে পারি।