মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই বললেন, ‘‘তিন তিন বার মাইনে বাড়ানো হয়েছে জুনিয়র ডাক্তারদের।’’ মুখ্যমন্ত্রী মানে জ্যোতি বসু। ১৯৮৩। আমাদের মতো হাউস স্টাফ, ইন্টার্ন ও ডাক্তারি পড়ুয়াদের আন্দোলনে বাংলা তখন উত্তাল। ছাত্র-প্রতিনিধি হিসেবেই সে দিন তাঁর ঘরে যাওয়া। একযোগে বললাম, ‘‘মাইনে বাড়ানোর দাবি  পরে, আগে জনমুখী মূল দাবিগুলো নিয়ে বলুন। হাসপাতালে জীবনদায়ী, অত্যাবশ্যক ওষুধ সরবরাহ। চব্বিশ ঘণ্টা এক্স রে, ইসিজি, ব্লাড ব্যাঙ্ক, জরুরি পরীক্ষা খোলা রাখা। ওষুধ নীতির দাবি। স্বাস্থ্যের বাজেট বাড়ানোর দাবি।’’ জ্যোতিবাবু এক বার চোখ বোলালেন দাবিগুলোর দিকে। বললেন, চা খান।

মুখ্যমন্ত্রীর খাস বেয়ারা চা দিয়ে গিয়েছেন সুদৃশ্য কাপে। চুমুক দিলাম। উনি বললেন, ‘‘আপনারা ধর্মঘট তুলে নিন।’’ বললাম, আপনি দাবি মানলে আজই উঠে যাবে কর্মবিরতি। চোয়াল সামান্য শক্ত হয়েও নিমেষে নরম হয়ে গেল ওঁর। বললেন, ‘‘এ সব দাবি নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপনারা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন।’’

ফের সরব হলাম আমরা। বেড, ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জামের অভাবে বহু দিন ধরে বিপন্ন হচ্ছেন গরিব মানুষ। আমরা এর বিহিত চাইছি। জানিয়ে দিলাম, স্বাস্থ্য সাধারণ মানুষের অধিকার। আপনি মানুষের জন্য করা দাবিগুলো শুধু মেনে নিন। আমরা ইন্টার্ন হাউস স্টাফদের মাইনে বাড়ানোর দাবি তুলে নিচ্ছি।

’৮৩-র আন্দোলনের খবর, আনন্দবাজার পত্রিকায়।

’৮৩-র জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলন যে জায়গায় তখন, পিছু হঠার প্রশ্ন ছিল না। কয়েক দিন ধর্মঘটের পর সারা বাংলা জুনিয়র ডাক্তার ফেডারেশনের সাত প্রতিনিধিকে ডেকে পাঠিয়েছেন জ্যোতিবাবু। রাইটার্সে আমাদের পিছন পিছন ঢুকে পড়ছিলেন কয়েক জন সাংবাদিক। আটকালেন স্বাস্থ্যসচিব, ‘‘মিডিয়া এখানে থাকবে না। সিএম পছন্দ করেন না।’’ মিডিয়া বলতে সে দিন শুধুই খবরের কাগজ। টিভি চ্যানেল, সোশাল মিডিয়া সবই তখন ভবিষ্যতের গর্ভে।

ঘরে ঢুকতে বসতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী। বসলাম। আলোচনা শুরু। ‘‘আপনারা কী করবেন তা আপনাদের ব্যাপার। তবে ধর্মঘট না তুললে আমরাও চুপ করে বসে থাকব না।’’ আবার বললাম, প্রথম চারটে দাবি মানুষের, রোগীদের। ওগুলো অন্তত মেনে নিন, স্ট্রাইক তুলে নেব। 

‘‘মানুষের দাবি আপনাদের থেকে শিখব?’’ এই প্রথম একটু গলা তুললেন জ্যোতিবাবু। ‘‘না, তা কেন! হাসপাতালগুলোতে রাতদিন থেকে চিকিৎসা করি আমরা। রোগী, অসুস্থ মানুষের সমস্যা বুঝি বলেই রাজ্যের প্রধানকে জানাতে এসেছি। আপনিই পারেন হাসপাতালে সুষ্ঠু চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করতে।’’

‘‘বললাম তো, আগে স্ট্রাইক তুলুন, পরে ভাবব। সীমা ছাড়াচ্ছেন, বিপদে পড়বেন। আমার কথা শেষ, আর একটা মিটিং আছে। আপনারা চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন এ বার।’’ ছোট্ট একটা পেপার কাটিং জ্যোতিবাবুকে দেখানো হল। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রামনারায়ণ গোস্বামী বলেছেন, ‘‘আমিও সিপিএমের বাচ্চা। জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের সাধ ঘুচিয়ে দেব।’’ এই প্রথম এক ঝলক বিষাদ ছুঁয়ে গেল মুখ্যমন্ত্রীর অভিজাত মুখ। মৃদু স্বরে বললেন, ‘‘আমি তো বলিনি, ওঁকে বলুন।’’ ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। চললাম তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অম্বরীশ মুখোপাধ্যায়ের ঘরের দিকে।

গোটা রাজ্য ফুটছে। হাসপাতালে কাজ না করলেও বাইরে বসে প্যারালাল আউটডোরে অসংখ্য রোগী দেখছি আমরা। চলছে ইমার্জেন্সি পরিষেবা। দলে দলে সাধারণ মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। শাসক দলের লোকেরা সভা করে বলছেন, জুনিয়র ডাক্তাররা মানুষ মারছে, হাসপাতালের দুধ চুরি করছে এই ডাক্তাররা! পাল্টা পথসভা করছি আমরাও। মানুষ ভিড় করছেন আমাদের কথা শুনতে, দাবি জানতে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের বাইরে রাস্তায় দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে এক বৃদ্ধ এসে জড়িয়ে ধরলেন হাত, মুখটা শুকিয়ে গেছে বাবা, চলো, কিছু খাবে!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, ‘‘এ সব দাবি কারা লিখে দিয়েছে আপনাদের?’’ বললাম, সব দাবি আমাদের। আমরা ডাক্তার, দলীয় রাজনীতির দাস নই। নকশাল, এসইউসি, কংগ্রেস চেষ্টা করেও কেউ হাইজ্যাক করতে পারবে না এই আন্দোলন। ‘‘তাই?’’ হ্যাঁ, তাই। ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে বলতে পেরেছিলাম সে দিন। ক্ষমতা ছেড়ে দেয়নি। আঘাত নেমে এসেছে, ঝরেছে অনেক রক্ত। ভয় পাইনি। পড়ার বইয়ের বাইরের পড়া, শাণিত যুক্তি তক্কো গপ্পো গড়ে দিয়েছিল নৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা। দলদাস হইনি আমরা— জুনিয়র ডাক্তাররা।

রাজ্য উত্তাল। আমাদের জনমুখী দাবিগুলো তুলে ধরছে খবরের কাগজগুলো। দলে দলে বুদ্ধিজীবী এসে দাঁড়াচ্ছেন পাশে। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘এখন হাসপাতাল মানেই নরক গুলজার।’ মহাশ্বেতা দেবী কনভেনশন থেকে বলছেন, ‘‘তোমাদের পাশে থাকব। লড়ব।’’ এনআরএস-এ এসে বহু কবি লেখক বলছেন, ভয় পেয়ো না, এগিয়ে চলো। গোটা দেশের ডাক্তার সংগঠনগুলো পাশে। আমাদের মিছিল বদলে যাচ্ছে জনসমুদ্রে। ঠান্ডা মাথায় নিয়মিত বসে ঠিক করছি পথ। তখনকার সাতটা মেডিকেল কলেজ এক হয়ে তৈরি হয়েছে অল বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টর্স ফেডারেশন।

বাড়ছে কুৎসা, চোরাগোপ্তা আক্রমণও। এইচএসএ, আইএমএ চরমপত্র দিয়েও দাবি না মানায় ধর্মঘটে যোগ দিতেই গোটা রাজ্য স্তব্ধ। নানা জায়গায় জোর করে আটকে কাজ করানো হচ্ছে। হাসপাতালে লাঠি, পাটকেল হাতে নেমে পড়েছে গুন্ডার দল। সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা সিনিয়র ডাক্তারদের। সরকার অনড়। এক সন্ধ্যায় লালবাজার থেকে তিন ভ্যান পুলিশ ন্যাশনালে এসে জুনিয়র ডাক্তারদের পেটাতে শুরু করল। লাঠিচার্জ হল অনেক জায়গায়। মিহির জ্ঞান হারাল, মাথায় গভীর ক্ষত। গুন্ডারা পুলিশের সঙ্গে হাত লাগিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে আমাদের। ১৪ জন জুনিয়র ডাক্তারকে মারতে মারতে লালবাজার নিয়ে গেল পুলিশ।

ভারপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী বলেই দিয়েছিলেন, ‘‘মোকাবিলা হবে বেয়নেট পয়েন্টে।’’ পুলিশি তাণ্ডবের খবর পেয়ে চলে এসেছিলেন বিজয় বিশ্বাস স্যর, নব পাল স্যর। সব হাসপাতালে সিনিয়ররা আগলেছেন আহত ছাত্রদের। মধ্যরাতের কলকাতা কেঁপেছে স্লোগানে, ‘ডাক্তারদের রক্ত, হবে না তো ব্যর্থ।’ সব মিছিল শেষ হচ্ছে মধ্যরাতের রাজভবনের বাইরে। 

দলদাসদের দিয়ে হাসপাতাল খোলানোর খেলা শুরু হতেই রাতারাতি কলকাতায় চাকরি! ঠিক করলাম, কাজে যোগ দেব। উঠে গেল ধৰ্মঘট। আস্তে আস্তে অনেক দাবি মানল সরকার। ব্লাড ব্যাঙ্ক, এক্স-রে, ইসিজি পরিষেবা চালু করতে পেরেছিলাম। ওষুধের অভাব মিটেছিল অনেকটাই। রক্ত ব্যর্থ হয়নি আমাদের।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।