চোখের কোণে বলিরেখায় রায়মঙ্গলের ঢেউ। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে বয়স। তবে চুল দেখলে বোঝার উপায় নেই, সত্তর পেরিয়েছে সেও হল বেশ কিছু বছর। কানের গোড়ায়, ঘাড়ের ধারে বেখেয়াল কলপের রং।

ব্যস, ওইটুকুই বিলাসিতা। হাঁটু পর্যন্ত মিলের ধুতি কিংবা হাতকাটা খাটো পাঞ্জাবি জল-জঙ্গলে লড়াইয়ের সাক্ষী। আক্ষরিক অর্থেই। পায়ে চটি নেই, মাথায় ছাতা নেই। ঝরঝর বৃষ্টিতে চুপচুপে ভিজে এক হাঁটু কাদা নিয়ে বোটে উঠলেন ভদ্রলোক। বঙ্কিমী গল্পে এমন চরিত্রেরই নাম হয় রামা কৈবর্ত।

তিনি মতিন মণ্ডল। কাকভেজা দেহাতি শরীর নিয়ে বোটে উঠতেই কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এলেন সারেঙ। ওটাই দস্তুর। বোটের ধারেকাছে থাকা মীন-শিকারী বউ, ডাঙ্গুলিবাজ ছোকরা, খেয়ার অপেক্ষায় যাত্রী— সকলেরই চোখে সম্ভ্রম। সকলের চোখেই তিনি ‘বিশেষ’। ‘সর্দার’কে এখনও সম্মান দেয় সুন্দরবন।

সম্মান, না কি ডর! ‘গব্বর সিং’ যখন চলচ্চিত্রের পর্দা  ছাপিয়ে উত্তর ভারতীয় সমাজে আতঙ্কের ‘আইকন’, মতিন তারও এক দশক আগে থেকে সুন্দরবনের ‘ত্রাস’। ঢেউ চুলে তখন কলপ ছিল না। চোখে ছিল আগুন। তেল-চকচকে শরীরে লোহার শক্তি। পোশাকে অতিরিক্ত বলতে কেবল কাঁধ ছাপিয়ে কানের লতি ছুঁয়ে থাকা পাইপ গান। কেনা নয়, হাতে বানানো।

সম্পদ: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে এ ভাবেই।

হাতবোমার মশলার মিশেল এখনও গড়গড়িয়ে বলতে পারেন ‘মতিনদা’। ঠিক যেমন বলতে পারেন, ব-দ্বীপের সুন্দরবনে এ দিক-ও দিক গজিয়ে ওঠা কোন চরে কবে ক’টা চারা রোপণ করা হয়েছে। এক সময় যে চরে কাদাজলে দিনভর লুকিয়ে থেকে নিঝুম রাতে ডাকাতিতে বেরোতেন তিনি, এখন সে চরেই লুকিয়ে থাকেন কাঠ পাচারকারীদের ধরতে। সুন্দরবনের মতিন শোনাচ্ছিলেন রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হয়ে ওঠার গল্প। ডাকাত থেকে জঙ্গল সংরক্ষণে সর্বক্ষণের কর্মী। যদিও তিনি বাল্মীকিকে চেনেন না, শোনেননি রবিনহুডের গল্প। 

‘‘মাঝরাতে গ্রামে ঢোকার মুহূর্তে বন্দুক ফুটিয়ে দিতাম। লোকে বুঝে যেত মতিন এসে গিয়েছে। দপদপ করে কুপি নিভে যেত এ জানলা ও জানলায়।’’ ষাট-সত্তরের দশকের সুন্দরবনে মতিনরা ছিলেন চলতা-ফিরতা ডাকু গন্ডারু।

পূর্ণিমার রাত। চিকচিক করছে বিদ্যাধরীর জল। ডান হাতে বালি দ্বীপের জঙ্গল। বাঁ হাতে অনেক দূরে লুব্ধকের মতো জ্বলছে গ্রামের দু’একটা আলো। আর টেলিফোন টাওয়ারের বিপ বিপ লাল আলো সভ্যতার সংকেত বহন করছে। গা-ছমছমে পরিবেশ রোমহর্ষক করতে সঙ্গী বনকর্মী সে রাতেই শুনিয়েছিলেন মতিনের গল্প। সাক্ষাৎ হবে পরদিন সকালে। নোঙর ফেলা বোট ছলাৎছল জলের শব্দে চক্রাকারে ঘুরছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত বদলাচ্ছে জঙ্গল আর গ্রাম। ডান দিক সরে যাচ্ছে বাঁ দিকে। বাম, ডানে।

ষাট-সত্তরের সুন্দরবনে অবশ্য রাজনীতির নোঙর শক্ত ছিল। ডান-বাম গুলিয়ে ফেলার সুযোগ ছিল না। মতিনরা জানতেন দেশে একটাই দল— কংগ্রেস। তাদের ছায়ায় থাকতে পারলে ‘কাজ’ হবে। নইলে দলই গড়া যাবে না! বামেদের মরিচঝাঁপি তখনও রাজনীতিতে নতুন রঙের জাল ছড়ায়নি ব-দ্বীপের জলকাদায়। দল নিয়ে বার কয়েক ‘অ্যাকশন’-এ গিয়েছেন মতিন। সব এখন তাঁর মনেও নেই। অথবা থাকলেও বলতে চান না। এত দিনে তিনি বুঝে গিয়েছেন, সে দিন গিয়েছে। আগে রাজনৈতিক অ্যাকশনে তাঁদের ভাড়া করা হত। এখন কেবল অ্যাকশনই আছে, ডাকাতি নেই। মুখ কুঁচকে মতিনের তাই বলতে অসুবিধা হয় না, ‘‘আজকাল আর ডাকাতি কই? সবই তো রাজনীতি!’’

দশ-বারো-পনেরো জনের দল নিয়ে মতিনরা যা করতেন, এলাকার পুরনো লোকেরা এখনও তার বর্ণনা দেন রবিনহুডের চালচিত্রে। আর মতিন শোনান পেট আর সাহসের ব্যস্তানুপাত।

‘‘জঙ্গলে বাঘ যেমন নিজের এলাকা ভাগ করে নেয়, আমরাও তেমন অঞ্চল চিহ্নিত করে রাখতাম। কেউ কারও ডেরায় ঢুকতুম না,’’ ভাজা কাঁকড়ার দাঁড় ভাঙতে ভাঙতে আঙুল তুলে নিজের এলাকা চেনাতে শুরু করলেন মতিন।

গোসাবা জুড়ে তাঁর সাম্রাজ্য। পড়শি এলাকার অনুকূল মিস্ত্রি, খগেন মণ্ডল, বড় শিব, ছোট শিবরা মতিনকে শ্রদ্ধা করতেন। একদা সুন্দরবনের ওই সব দুর্ধর্ষ ডাকাতদের অনেকেই এখনও মতিনকে ডরান। মতিনও ঢুকতেন না তাঁদের এলাকায়। কোনও কারণে যাতায়াত হলে ‘হিস্সা’ পাকা ছিল।

অ্যাকশনে গেলে অবশ্য হিস্সার ব্যাপার থাকত না। তখন সকলে এক। মরিচঝাঁপি সেই গল্পে বাঁক আনল। অ্যাকশনের খবর এসেছিল মতিনদের কানেও। ওঁরা যাননি। তবে শুনেছিলেন, পড়শি সর্দাররা কেউ কেউ রং বদলেছেন। কুমিরমারি পেরিয়ে ফুলতে থাকা কালিন্দী-রায়মঙ্গলের দিকে কোনও কোনও দলের যাতায়াত বাড়ল। কেউ কেউ ঢুকতে শুরু করলেন সীমান্ত পেরিয়ে ও পার বাংলার জলেও।

তার পর মরিচঝাঁপি ঘটল। মতিনরা বুঝলেন, সেই কংগ্রেস আর নেই। নতুন জমানায় নতুন ‘অ্যাকশন’।

কংগ্রেস আমলকে ভালবাসার আরও একটা কারণ ছিল মতিনের। তখন জমিদার ছিল। ইন্দিরা গাঁধী তুলে দেওয়ার পরেও ছিল। সুন্দরবনে ওই সব জমিদারদের সিন্দুকই তো ভাঙতে যেতেন তাঁরা। বাইরে থেকে বন্দুক ফুটিয়ে কড়া নাড়তেন সদর দরজায়। লাথি মেরে ভাঙা হত দরজা। সিন্দুক ভাঙতে হত শাবল-গাঁইতি দিয়ে।

জমিদার গেল, জোতদার এল। ডাকাতির ধরন বদলাল না। তার পরেও পেটে টান পড়লে জলে যেতে হত। খুব দরকার পড়লে, খবর থাকলে, তাঁরা ধরতেন মুদিখানার মাল-বোঝাই ট্রলার। তবে সে ঘটনা ঘটেছে কম। ‘‘খাবার না এলে গ্রামের মানুষ খাবে কী?’’

জল-বালি চোখে আচমকাই খেলে গেল মানবিকতার জোয়ার। বিদ্যাধরীর নরম স্রোতের মতো। ডাকাতির গল্প ঘুরল পেটের উপন্যাসে। সর্দার শোনাচ্ছেন ছেলেবেলার গল্প। কৃষিজীবী ভূমিহীন বাবা কী ভাবে চলে এলেন সুন্দরবনে, সে আর এখন মনে নেই তাঁর। মনে আছে, নোনা জলের সঙ্গে লড়াই করা যেত না। বাঁধ ভেঙে জল ঢুকলে বছরের মতো বন্ধ হয়ে যেত চাষের কাজ। গেঁড়ি-গুগলি খেয়ে দিন কাটত। অভুক্ত রাত কাটত নৌকোয় শুয়ে। জালে মাছ উঠলে পরদিন রান্না চাপত উনুনে। ‘‘পয়সা নেই, খাবার নেই। বৃষ্টির জল আটকানোর ছাওয়া নেই মাথায়। করব কী?’’

ডাকাতিতে সেই হাতেখড়ি মতিনদের। লুঠের মাল প্রথমে ভাগ হত দলে। তার পর গ্রামে। পড়শি বাড়ির মেয়ের বিয়ে থেকে শুরু করে অসুস্থ বৃদ্ধের চিকিৎসা, সবেতেই থাকতেন তাঁরা। হিন্দু-মুসলিমেরও ভাগ ছিল না। ‘‘পেটে খাবার থাকলে তবে না ধর্ম!’’ অবলীলায় বলে চলেছেন মতিন। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, গ্রামের মানুষের চোখে তিনি এবং তাঁরা মসিহা। গল্পের সূত্র ধরে লঞ্চের বনকর্মী বলছেন তাঁদের বাপ-কাকারা মতিনদের কী চোখে দেখতেন। ‘‘খবর না দিয়ে পুলিশ ঢুকতে পারত না গ্রামে। মতিনকাকার দাওয়ায় পৌঁছতে হলেও গ্রামের মানুষকে বোঝাতে হত পুলিশকে।’’ সর্দাররা কখনও পালাতেন, কখনও ধরা দিতেন। মাঝে মাঝে পুলিশে যাওয়া তাঁদের কাজে সম্মানের বিষয় ছিল। বখরা দিলে পুলিশ গায়ে হাত দিত না। তবে কোনও কোনও ঘটনায় ঘানি টানতে হয়েছে মতিনকেও। রাতভর রুলের দাপট সহ্য করতে হয়েছে। অন্য এলাকার সর্দাররাও কখনও কখনও ধরিয়ে দিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী এলাকার দলকে। তেমনই এক ঘটনায় কুখ্যাত বাচ্চু সর্দারের কী হয়েছিল, শোনালেন ইতিমধ্যেই গল্পে যোগ দেওয়া স্থানীয় চাষি গৌরদা।

বাচ্চুকে নাকি অনেক দিন ধরে খুঁজছিল পুলিশ। সে ছিল জলের ডাকাত। নৌকো থেকে গ্রেফতারের সময়েও বাচ্চু গুলি চালিয়েছিল। বদলা নিতে নোঙরের কাছি দিয়ে বাচ্চুকে বেঁধেছিল পুলিশ। ফেলে দিয়েছিল জলে। তার পর বোট চালিয়ে দিয়েছিল। ডাঙায় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখেছিলেন গ্রামবাসী। শিউরে উঠেছিলেন। শেষমেশ যখন বাচ্চুকে বোটে তোলা হয়, নোনা জলে ফুলে গিয়েছিল শরীর। তবে শ্বাস ছিল।

নব্বইয়ের দশকের সেই দৃশ্যেই সম্ভবত ভাটার টান লেগেছিল জল-জঙ্গলের ডাকাতির। মতিনরা ফিরতে শুরু করেন মূল ধারায়। মতিন অবশ্য আরও একটা সূত্র দেন। ‘‘বাম জমানায় সুন্দরবনে বড়লোক কমে গিয়েছিল। লুঠ করব কী?’’

বড়লোক তো কমবেই। গত পাঁচ-ছয় দশকে সুন্দরবনে জঙ্গল কেটে গ্রাম বেড়েছে। রসদ কমেছে। ম্যানগ্রোভ যত কাটা পড়েছে, বাঁধ ভেঙে গ্রামে নোনা জল ঢুকে জমি নষ্ট হয়েছে তত। কমেছে জলের শস্য। মাছ-কাঁকড়ার জন্য ‘কোর’ জঙ্গলে ঢুকতে হয়েছে। লড়াই হয়েছে বাঘের সঙ্গে। অন্য দিকে বাজার হয়েছে শহরমুখী। ফলে স্থানীয় জোতদারদের হাতেও পয়সা কমেছে। মতিনরা বুঝতে পারছিলেন বিষয়গুলি। আয়লা দৃষ্টি ফর্সা করল। হুঁশ ফিরল সকলের। মতিনরা দেখলেন, যেখানে যেখানে ম্যানগ্রোভ আছে, সেখানে পাড় ভেঙেছে কম। জল ঢুকে নোনা হয়নি জমি। সেই থেকেই জঙ্গল বাঁচানোর আন্দোলনে পুরোপুরি ঢুকে পড়লেন মতিনরা। কালে কালে সে আন্দোলনে পাশে পেয়েছেন অন্য সর্দারদেরও। কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং এনজিও-ও মতিনদের মতো মানুষকে মূলধারায় ফিরতে সাহায্য করেছে।

দীর্ঘ দিন ধরে সুন্দরবন কোর জঙ্গলের বাইরে গ্রাম লাগোয়া চরগুলোয় ম্যানগ্রোভ লাগানোর কাজ করছে এই সমস্ত এনজিও। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ম্যানগ্রোভ চারাও তাঁরা তৈরি করছেন বিভিন্ন ব্লকে। সেই চারা ইতিমধ্যেই পোঁতা হয়েছে প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে। কিন্তু শুধু ম্যানগ্রোভ লাগালেই তো হবে না! তাকে রক্ষাও করতে হবে। দেখতে হবে কেউ যাতে সেই গাছ কেটে না ফেলে। যাতে নষ্ট না হয় সুন্দরী, গরানের চারা। কাঠ শিকারীদের ভয়ও আছে। ‘‘জঙ্গল রক্ষার সেই কাজেই প্রয়োজন হল মতিনদের,’’ বললেন এনজিও কর্মী অজন্তা দে। সুন্দরবনের চর-দ্বীপ হাতের তালুর মতো চেনেন মতিনরা। রাতের পর রাত যে চরে লুকিয়ে কেটেছে তাঁদের, এখন সেখানেই গাছ পাহারা দেন তাঁরা। অচেনা নৌকো দেখলেই হাঁক ওঠে। জল ধরে সংকেত পৌঁছে যায় আশপাশের চরে থাকা প্রহরীদের কানে। মতিনরা বুঝে গিয়েছেন, জঙ্গলই পেট চালাবে তাঁদের। জলে মাছ-কাঁকড়া থাকবে, মাঠে নোনা লাগবে না।

মতিনের মতোই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে এক সময় কিছু কিছু ‘অন্যায়’ করে ফেলেছিলেন মাধব সর্দার, রঙ্গলাল মণ্ডলরাও। এখন জঙ্গল বাঁচানোর কাজে তাঁরাও যুক্ত। শীতের বিকেলে চরের ধারে ডিঙি নিয়ে বসে থাকা মাধবের কাছে পর্যটকদের বোট পৌঁছলে তিনি চিনিয়ে দেন ‘বন্ধু’পোকা আর ‘শত্রু’পোকাদের।

চরের ধারে তেমনই এক নৌকোয় দেখা হল মাধব আর রঙ্গলালের সঙ্গেও। বোটের বালতিতে কাঁকড়া দিতে দিতে মাধব শুনিয়ে দিলেন, জঙ্গলে চোখের সামনে কী ভাবে বাঘ নিয়ে গিয়েছিল তাঁর ভাইকে। ‘‘আপনেরা গঙ্গার মিঠে হাওয়ায় থাকেন তো! জল-জঙ্গলের নোনা হাওয়ার গল্প বুঝবেন না।’’ নৌকো ঠেলে চলে গেলেন মাধব।

কাঁকড়া শেষ করলেন মতিন। অঝোরে বৃষ্টি তখনও। ডাঙায় বোট লাগালেন সারেঙ। মতিনকে ঘাটে নামতে দেখে এগিয়ে এলেন জনৈক। কাদা পেরিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন সর্দারের দিকে। ঘাট ছাড়ল বোট। চিকচিক পারদের মতো জমে থাকা কপালের ঘাম মুছে সারেঙ বললেন, ‘‘মতিনদাকে দেখলে এখনও বড্ড ডর হয়।’’ এত ক্ষণ স্থির বসে থাকা বনকর্মী রেলিংয়ে গা এলিয়ে বললেন, ‘‘ওই ভয়টা আছে বলেই তো ম্যানগ্রোভ বাঁচানো যাচ্ছে!’’

‘গব্বর’ মতিনদের কথায় এখনও সুন্দরবন ওঠে-বসে।