কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব যদি ‘ভারত’ নামক একটি দেশের ধারণা তৈরি করে থাকেন, তবে ‘রাষ্ট্র’ নামক ভারতের আদি প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ বাসুদেব। মহাভারতের মহারণ কেবল কৃষ্ণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, এমন মনে করা এক ধরনের সরলীকরণ। বরং বলা যেতে পারে, মহাভারত আসলে সেই ছাতা যেখানে স্বাধীন রাজ্যগুলো এসে জড়ো হচ্ছে একটি বৃহৎ শক্তির ছত্রছায়ায়। আপাতদৃষ্টিতে সেই বৃহৎ শক্তি পাণ্ডব ভ্রাতৃগণ, পারমার্থিক দৃষ্টিতে সেই মহান শক্তি বসুদেবপুত্র শ্রীকৃষ্ণ। তিনিই রাষ্ট্র, তিনিই মহাভারত। ভীষ্মপর্বে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, রাজাতেই মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ, তাই রাজা হলেন শ্রীভগবানের বিভূতিস্বরূপ। আবার তিনিই বলছেন, নরগণের মধ্যে আমিই নরাধিপ—নরাণাঞ্চ নরাধিপম্। নর বা মানুষ রাজা হলে তাঁর পূর্ণ বিকাশ ঘটে। সেই রাজাদের রাজা হলেন বাসুদেব। কী ভাবে?

মহাভারতের আদিপর্বের স্বয়ম্বর পর্বাধ্যায়ে প্রথম কৃষ্ণের দর্শন পাওয়া যায়। বারণাবতের জতুগৃহ থেকে পালিয়ে তপস্বীর বেশে কুন্তী-সহ পাণ্ডবরা পাঞ্চাল ও কীচক দেশের ভিতর দিয়ে একচক্রা পৌঁছে সেখানকার অধিপতি বক নামক রাক্ষসকে হত্যা করলেন। তার পর সোমাশ্রয়ণে গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে পাণ্ডবরা গেলেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে। পাঞ্চালীকে (পাঞ্চালকেও) জয় করে যখন কুম্ভকারের কর্মশালায় কুন্তীর কাছে নিয়ে এলেন, তখন কৃষ্ণ ও বলরাম দুই ভাই সেখানে পৌঁছলেন। তাঁরা পিসি কুন্তীকে প্রণাম করে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা আমাদের চিনলে কী প্রকারে? কৃষ্ণ হেসে জবাব দিলেন, স্বয়ম্বর সভায় দেখেই চিনেছি; অগ্নি গুপ্ত থাকলেও প্রকাশ পায়, পাণ্ডব ভিন্ন কার এত বিক্রম যে অত শক্তিশালী রাজাদের পরাজিত করে দ্রৌপদী নামক ধন আহরণ করে! পাণ্ডবরা অগ্নি, তাঁরা আপাতত গোপনে থাকুন, এতে সমৃদ্ধি হবে। এই কথা বলে কৃষ্ণ-বলরাম বিদায় নিলেন।

বেশ কিছুকাল গোপনে থাকার পরে পাণ্ডবরা কৃষ্ণ ও বিদুরের পরামর্শে হস্তিনাপুরে রাজত্বের দাবি নিয়ে এলে ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্মকে সামনে রেখে পাণ্ডবদের অর্ধেক রাজত্ব দিতে চাইলেন এবং তাঁদের খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করতে বললেন। কিন্তু সে এলাকা তো সভ্য মানুষের বাসের অনুপযুক্ত। পক্ষী, সর্প, দানবরা থাকে সেখানে। ঘন জঙ্গল। বন ধ্বংস না করলে নগর হবে কী প্রকারে! কৃষ্ণ বললেন, চিন্তা কোরো না।

কয়েক দিন পর অগ্নি এক বহুভোজী ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বললেন, আমি খাণ্ডববন দগ্ধ করতে বাসনা করি। ইন্দ্রের সখা তক্ষক নাগ এখানে থাকে বলে পেরে উঠি না। তোমরা উত্তম ধনুর্ধর, যদি এই বন পুড়িয়ে দিতে পারো, বড় ভাল হয়। শ্বেতকী রাজার নিরন্তর যজ্ঞে প্রচুর ঘৃতপান করে এমন অরুচি হয়েছে যে প্রাণীদের মেদ ভক্ষণ না করলে সুস্থ হব না। খেয়াল রেখো, কোনও প্রাণী যেন খাণ্ডববনের বাইরে যেতে না পারে। কৃষ্ণ ও অর্জুন সেই বন দগ্ধ করলেন, প্রাণীরা বেরিয়ে যেতে চাইলে তাদের ধরে পুনরায় জ্বলন্ত বনে ফেলে দেওয়া হল। জায়গা ফাঁকা হল, অধিবাসীদের পুনর্বাসনের ঝামেলাও থাকল না। তক্ষক সে সময় বনে ছিলেন না। তাঁর পুত্র অশ্বসেন, ময়দানব, চারটি শার্ঙ্গক পক্ষী— এই ছয় জন ছাড়া খাণ্ডবের আর কেউ জীবিত রইল না। অরণ্য ধ্বংস করে জনপদ গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে মহাভারতের আদিপর্বেই অর্জুনের সঙ্গে কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রার বিবাহ হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের ভাগিনেয় অভিমন্যু জন্মেছেন, দ্রৌপদী পঞ্চপুত্র লাভ করেছেন।

ময় দানব কৃতজ্ঞ চিত্তে কৃষ্ণের কথামতো মনুষ্য অনুকরণের অসাধ্য সভা বানাতে আরম্ভ করলেন। মৈনাক পর্বত থেকে মণিরত্ন এল। কৃষ্ণ এই সময় পিতা বসুদেবের কাছে দ্বারকায় গেলেন। কৃষ্ণের পরামর্শে দগ্ধ বনের উপর গড়ে উঠল ইন্দ্রপ্রস্থ নগর। ইতিমধ্যে নারদ এসে যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম বিষয়ে নানা উপদেশ দিলেন এবং রাজসূয় যজ্ঞ করতে বললেন। দ্রুতগামী রথে দূত পাঠিয়ে দ্বারকা থেকে কৃষ্ণকে আনানো হল ইন্দ্রপ্রস্থে। শুরু হল মন্ত্রপর্বাধ্যায়। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, সব তো ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের মাথার উপরে রয়েছেন জরাসন্ধ— তাঁর ভয়ে সবাই কাঁপে, তিনিই প্রকৃত সম্রাট। করূষ দেশের বক্র, করভ, মেঘবাহন, মুর, ভগদত্ত সকল রাজা তাঁর অনুগামী। পশ্চিম ও দক্ষিণ দেশের রাজা পুরুজিৎ ছাড়া কেউ আমাদের পক্ষে নেই। বঙ্গ-পুণ্ড্র-কিরাতের রাজা পৌণ্ড্রক, ভোজরাজা ভীষ্মক প্রমুখ জরাসন্ধকে শ্রেষ্ঠ বলে মানেন।

শ্রীকৃষ্ণের রাজনীতি বুঝতে এ বার মগধরাজ জরাসন্ধের পুরো পরিচয় জানা প্রযোজন। তাঁর দুই স্ত্রী অস্তি ও প্রাপ্তি, এঁদের বাবা, মানে জরাসন্ধের শ্বশুর মথুরার রাজা কংস। তাঁকে কৃষ্ণ বহু আগেই পরাস্ত করেছেন। মথুরাধিপতি, শূরসেন সাম্রাজ্যের অধিপতি কংস একই সঙ্গে যাদব, অন্ধক, বৃষ্ণি ও ভোজদের রাজা, তাঁকে বধ করে তিনটি রাজ্যই কৃষ্ণের অধিকারে। জরাসন্ধের আর দুই অনুগত নৃপতি হংস ও ডিম্ভককে তত দিনে ইহজগৎ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন কৃষ্ণ।

কিন্তু রাজনীতির খেলা তখনও বাকি। শ্রীকৃষ্ণ উসকে দিলেন যুধিষ্ঠিরকে, ‘‘এক সময় জরাসন্ধের ভয়ে রৈবতক পর্বতের এক দুর্গম জায়গায় বহু দিন লুকিয়ে ছিলাম। অন্ধক, বৃষ্ণিরা আমার সঙ্গে আছে, আর আছে আমার যাদব আঠারো হাজার ভাই, পুত্রগণ এবং আপনারা। জরাসন্ধকে না সরাতে পারলে রাজসূয় যজ্ঞ সম্ভব নয়। শিবের অনুগ্রহপ্রাপ্ত জরাসন্ধের অধীনে ছিয়াশি জন রাজা রয়েছেন। কেবল চোদ্দো জন রাজা তাঁর বশে নেই।’’

যুধিষ্ঠির ভয় পেয়ে রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প ত্যাগ করতে উদ্যত হলে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, চিন্তা করবেন না মহারাজ যুধিষ্ঠির! কংসের জামাই, মগধরাজ জরাসন্ধকে গুপ্ত উপায়ে বধ করব। জরাসন্ধ শুধু প্রজাহিতৈষী রাজা নন, তাঁর রাজ্যও সমৃদ্ধিশালী, সম্মুখ যুদ্ধে তাঁকে হারানো অসম্ভব। তিনি মহাদেবকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন।

কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন অদ্বার দিয়ে যজ্ঞগৃহে প্রবেশ করে উপবাসক্লিষ্ট জরাসন্ধকে গুপ্ত উপায়ে হত্যা করলেন এবং জরাসন্ধের পুত্রকে অধীনস্থ রাজা করলেন। জরাসন্ধের অধীন ছিয়াশি জন রাজা যুধিষ্ঠিরকে কর দিতে সম্মত হলেন। আর কোনও বড় বাধা রইল না। কৃষ্ণ পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের পরামর্শ দিয়ে দ্বারকায় চলে গেলেন। পাণ্ডব ভাইরা বেরোলেন রাজ্য জয় করতে। শুধু যুধিষ্ঠির রইলেন ইন্দ্রপ্রস্থে। কৃষ্ণের পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্জুন উত্তরে গিয়ে কুলিন্দ, আনর্ত, শাকলদ্বীপ জয় করে প্রাগজ্যোতিষপুরে গেলেন। সেখানকার রাজা ভগদত্ত তাঁর কিরাত চীন প্রভৃতি দেশের সৈন্য নিয়েও পরাজিত হলেন। পরে কৃষ্ণ কামরূপের রাজা নরক ও শোণিতপুরের রাজা বাণকে পরাজিত করেছিলেন। উত্তর-পূর্ব ভারত শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর আত্মীয়, সখা পাণ্ডবদের হস্তগত হল।

অতঃপর অর্জুন কাশ্মীর, লোহিতদেশ, ত্রিগর্ত, সিংহপুর, চোল, কম্বোজ, গন্ধর্ব, হরিবর্ষ ইত্যাদি রাজ্য জয় করলেন। বাসুদেবের ইচ্ছা অনুযায়ী ভীমসেন পাঞ্চাল, বিদেহ, চেদি, অযোধ্যা, পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত, সুহ্ম প্রভৃতি জয় করলেন। সহদেব মৎস্য, অবন্তী, ভোজকট, কিষ্কিন্ধ্যা, মাহীষ্মতী, ত্রিপুরা, দ্রাবিড়, কেরল, অন্ধ্র, কলিঙ্গ, লঙ্কার রাজাদের পরাধীন করলেন। নকুল মালব, মদ্র, দ্বারকা প্রমুখ রাজ্যের অধিপতিদের কর আদায় করলেন। কৃষ্ণের উপদেশ মতো রাজসূয় যজ্ঞ শুরু হল।

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব ঋত্বিকদের আনলেন। উপস্থিত হলেন কৌরবগণ। সমস্ত পরাজিত রাজারা এসে পৌঁছলেন। ব্যাস হলেন ব্রহ্মা— প্রধান ঋত্বিক। ভীষ্ম-দ্রোণ সব কিছুর দেখাশোনা করতে লাগলেন। দুঃশাসন খাদ্য বিভাগ, অশ্বত্থামা অভ্যর্থনা, বিদুর ব্যয়ের দায়িত্বে। যুধিষ্ঠির হলেন সম্রাট। কিন্তু কে হবেন পুরুষোত্তম? সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ কে? ভীষ্ম জানেন, যুধিষ্ঠিরের সম্রাট হওয়ার পেছনে আসল মস্তিষ্ক হলেন বাসুদেব— তিনি রাজা বানানোর কারিগর। যুধিষ্ঠিরকে পিতামহ ভীষ্ম বললেন, তেজ, বল ও পরাক্রমে বৃষ্ণিকুলসম্ভব কৃষ্ণই শ্রেষ্ঠ, তাঁকেই অর্ঘ্য দাও। সহদেব তা দিলেন এবং কৃষ্ণ সেই অর্ঘ্য গ্রহণ করলেন।

চেদিরাজ শিশুপাল গর্জে উঠলেন। তিনি ভীষ্ম ও যুধিষ্ঠিরকে ভর্ৎসনা করে বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের কন্যা রুক্মিণীর পতি শ্রীকৃষ্ণের নিন্দা করতে লাগলেন। কৃষ্ণ কেন সর্বশ্রেষ্ঠ হিসাবে পুরুষোত্তমের মর্যাদা পাবেন? তিনি তো রাজাই নন। বয়োবৃদ্ধ হিসাবে বসুদেব এই সম্মান পেতে পারেন, পাণ্ডবহিতৈষী হিসাবে দ্রুপদ এই উপাধির যোগ্য, আচার্য হিসাবে দ্রোণ, পুরোহিত ধরলে দ্বৈপায়ন, পুরুষশ্রেষ্ঠ ভীষ্ম আছেন, সর্বশাস্ত্রবিদ অশ্বত্থামা রয়েছেন, রাজেন্দ্র দুর্যোধন উপস্থিত। কৃষ্ণের অর্চনা যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে রাজাদের ডাকলেন কেন!

চেদিরাজ আরও জানালেন, তাঁরা রাজা যুধিষ্ঠিরকে কর দিয়েছেন, কৃষ্ণকে নয়। আসলে এই সভা কৃষ্ণকে উপহাস করছে। নপুংসকের বিবাহ, অন্ধের রূপদর্শনের সঙ্গে তুলনীয় হল কৃষ্ণের রাজা না হয়েও রাজযোগ্য এই পূজা। শিশুপাল সভা ত্যাগ করতে উদ্যত হলেন। ভীষ্ম তখন বললেন, অস্যাং হি সমিতৌ রাজ্ঞামেকমপ্যজিতং যুধি।/ ন পশ্যামি মহীপালং সাত্বতীপুত্রতেজসা।।

এই সভায় এমন এক জন রাজাকেও দেখছি না যিনি কৃষ্ণের কাছে পরাজিত হননি। ভীষ্ম এও বললেন, কৃষ্ণ স্বয়ং হৃষীকেশ, তাঁর পূজায় সকলের পূজা সম্পন্ন হয়, তিনি সনাতন পরমাত্মা। গঙ্গাপুত্র কৃষ্ণের দৈহিক শক্তির অনন্যসাধারণ বর্ণনা দিলেন। বহু রাজা শিশুপালকে সমর্থন করলে সেই সব নৃপতিদের ভীষ্ম শৃগাল বলে গালি দিলেন, শিশুপালকে সারমেয় বললেন। শিশুপাল কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি ভীষ্মকে বললেন, জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে গোপের স্তব করতে চাও? তুমি কুলাঙ্গার! শাস্ত্রে আছে, স্ত্রী-গো-ব্রাহ্মণ-অন্নদাতা-আশ্রয়দাতাকে হত্যা করতে নেই। কৃষ্ণ গোহত্যা, স্ত্রীহত্যা করেছে। হে ভীষ্ম, তুমি প্রাজ্ঞ? তুমি ক্লীব, তোমার আবার ধর্ম! এই কৃষ্ণ অন্যায়ভাবে ধার্মিক রাজা জরাসন্ধকে হত্যা করেছে, একে আমরা মানব না। কৃষ্ণ বুঝলেন, শিশুপালের নেতৃত্বে বিরাট রাজবাহিনী তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্যত। তখন বাসুদেব সুদর্শন চক্র দিয়ে শিশুপালের শিরশ্ছেদ করলেন। রাজারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও ভয়ে কিছু বলতে পারলেন না। রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হল।

এর পর দ্যূতপর্ব্যাধ্যায়। জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে বনবাসে গিয়েছেন পাণ্ডবগণ। পাশা খেলায় এই লাঞ্ছনা হত না যদি কৃষ্ণ সেখানে থাকতেন। সেই সময় বাসুদেব শাল্বনগরের অধিপতি সৌভের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। সৌভকে হত্যা করার পর পাণ্ডবদের দুঃসংবাদ শুনে কাম্যকবনে গিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস শেষ হলে স্বয়ং কৃষ্ণ ভাগিনেয় অর্জুনপুত্র অভিমন্যুকে নিয়ে গিয়েছেন বিরাটরাজকন্যা উত্তরার সঙ্গে বিবাহ দিতে। বাসুদেবের নেতৃত্বে বিবাহোৎসবের পর দিন বিরাট রাজার সভায় বসলো মন্ত্রণা, কী উপায়ে হস্তিনাপুর দখল করা যায়। কৃষ্ণ প্রস্তাব দিলেন, হস্তিনায় দূত পাঠানো হোক অর্ধেক রাজত্বের দাবি নিয়ে। বলরাম আপত্তি করলেন। কিন্তু কৃষ্ণের কথা মতো দ্রুপদের পুরোহিত দূত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গেলেন। বিরাট রাজ্য থেকে কৃষ্ণ-বলরাম বেরিয়ে পড়লেন দ্বারকার উদ্দেশে। বাসুদেব জানিয়ে দিলেন, যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। সম্মুখ সমর।

মহাভারতের মহারণে দুর্যোধন ও অর্জুন দুজনেই কৃষ্ণকে চান নিজ পক্ষে। কিন্তু অর্জুন পেলেন অযুধ্যমান বাসুদেবকে, দুর্যোধন লাভ করলেন অর্বুদসংখ্যক নারায়ণী সেনা। কৃষ্ণ অর্জুনের সারথি হলেন, যা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে নিন্দনীয়। কৃষ্ণ যুদ্ধে অপরাজেয়। ইতিমধ্যে তিনি গান্ধার, ভোজ, পাণ্ড্য, কলিঙ্গ, বারাণসী, প্রাগজ্যোতিষ প্রভৃতি দেশের রাজাদের পরাজিত করেছেন। মহাযুদ্ধের আয়োজন চলছে, হস্তিনা দখলের লড়াই।

যুদ্ধায়োজনের এমনই এক দিনে কৃষ্ণ ও অর্জুন একসঙ্গে মদ্যপান করছেন। সেই সময় সেখানে এলেন সঞ্জয়। তিনি কৃষ্ণার্জুনের পদপ্রান্তে বসলেন। আসবপানে মত্ত কৃষ্ণ সঞ্জয়কে বললেন, ধৃতরাষ্ট্রকে ক’টা দিন প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ করে নিতে বলো, স্বয়ং আমি অর্জুনের সহায়। অর্জুনকে পরাজিত করবেন, এই আশা করা মানে ধৃতরাষ্ট্র কালগ্রাসে পতিত হয়েছেন। এর পরের দিন উপপ্লব্য নগর থেকে কৃষ্ণ হস্তিনার দিকে রওনা দিলেন। ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, পাণ্ডবদের রাজত্বের অংশ দিন। দুর্যোধন জানালেন, সূচ্যগ্র ভূমিও তিনি দেবেন না। পাঁচটি গ্রামও (কুশস্থল, মাকণ্ডী, অবিস্থল প্রভৃতি) পাণ্ডবদের দিতে সম্মত হলেন না কৌরবরা। কৃষ্ণ বৈবাহিক দুর্যোধনের আতিথেয়তা গ্রহণ না করে বিদুরের বাড়িতে উঠলেন।

উপপ্লব্য নগরে ফিরে বাসুদেব কৃষ্ণ পাণ্ডবদের বললেন— সাম, দান, ভেদ, দণ্ডনীতি সব প্রয়োগ করেছি কিন্তু যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব নয়। ভীষ্ম-দ্রোণ-অশ্বত্থামা-কর্ণ প্রভৃতি বীরসকল দুর্যোধনের পক্ষে আছেন। সংখ্যায় অল্প হলেও আমরা ক্লীব বা কাপুরুষ নই, সুতরাং মহারণ হবে, ক্ষত্রিয় বীরের পক্ষে সমর সমীচীন।

যুদ্ধের ঠিক আগের দিন কৌরবদের দূত হয়ে পাণ্ডব শিবিরে এলেন শকুনিপুত্র ঊলূক। তিনি এসে কৃষ্ণকে কংসের ভৃত্য, গোবধকারী ইত্যাদি ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগলেন। দু’পক্ষ তেতে উঠল। শুরু হল বাচিক যুদ্ধ।

কুরুক্ষেত্রের অস্ত্রযুদ্ধের দিন বেজে উঠল বাসুদেবের পাঞ্চজন্য আর অর্জুনের দেবদত্ত শঙ্খ। অর্জুন তবুও সম্মত হলেন না আত্মীয়বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। কৃষ্ণ বললেন, অর্জুনের এই বিষাদ ক্লীবতা। তার পর সেই বিশ্বরূপদর্শন এবং ভীষ্মপর্বের কৃষ্ণার্জুনসংবাদ, যাকে ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ বলা হয়।

কুরুক্ষেত্রের মহারণে বৈশ্যরা কৃষ্ণের পক্ষে ছিলেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, কৃষ্ণের প্রপিতামহী এবং কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের পিতামহী ছিলেন বৈশ্যকন্যা। মহারণে কৌরবপক্ষের সব রাজা এবং বীর অযুধ্যমান কৃষ্ণের কৌশলে পরাজিত হলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্য একে একে পতিত হলেন। গদাযুদ্ধে কৃতী দুর্যোধনকে
বধ করা হল বাসুদেবের কূট কৌশলে। যুধিষ্ঠির একচ্ছত্র সম্রাট হলেন। দুর্যোধনজননী গান্ধারীর সব অভিশাপ গিয়ে পড়ল পুরুষোত্তম কৃষ্ণের উপর— পঁয়ত্রিশ বছর পর বাসুদেবের জ্ঞাতিরাও পরস্পর হানাহানি করে লুপ্ত হবেন, সব হারিয়ে কৃষ্ণ বনে বনে ঘুরে শোচনীয় ভাবে নিহত হবেন, কৌরব বিধবাদের মতো যাদব বিধবাদের আর্তনাদে আকাশ বিদীর্ণ হবে। গান্ধারীর অভিশাপ ফলবতী হয়েছিল।
কিন্তু তার পূর্বেই ‘মহাভারত’ একটি ছাতার নীচে চলে এল, যে ছাতার নাম যুধিষ্ঠির, আর ছত্রপতি পুরুষোত্তম— বাসুদেব কৃষ্ণ। পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পর কৃষ্ণের ভাগিনেয়পুত্র পরীক্ষিৎ হস্তিনার সিংহাসনে বসলেন আর ইন্দ্রপ্রস্থে রাজা হলেন কৃষ্ণের পৌত্র বজ্র।

একলব্যের কথা না বললে শ্রীকৃষ্ণের রাষ্ট্র-ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যাবে। একলব্য নামের নিষাদ দ্রোণকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে গুরুদক্ষিণা দিয়েছিলেন। তর্জনী-মধ্যমা দিয়ে তির ছুড়তেন এই অসামান্য ধনুর্ধর। যুবরাজ দুর্যোধন তাঁকে মহাভারতের সমস্ত বনের রাজা ঘোষণা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের মহারণে একলব্য যোগ দিতে এসে ভীষ্মকে দেখে ঠিক করেন যে তিনি যুদ্ধ করবেন না। এই ‘রাষ্ট্র’-এর নির্দেশে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হরণ করেছিলেন দ্রোণ। পরে কৃষ্ণ একটি ভারী পাথর দিয়ে একলব্যের মাথা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। অভিযোগ, একলব্য নাকি দুর্যোধনের জামাই ও কৃষ্ণের পুত্র শাম্বকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের মহারণের পর সারা ভারত কৃষ্ণের পদতলে এসেছিল— পল্লব, বিদেহ, মিথিলা, মৎস্য, চক্র, অবন্তী, আভির, অটবী, বহুধান্য, ত্রিপুরা, উত্তরজ্যোতিষ সমস্ত রাজ্য বাসুদেবকে ‘রাজার রাজা’ বলে স্বীকার করে নেয়। রাজা হলেন ভগবানের বিভূতিস্বরূপ আর ‘রাজার রাজা’ হলেন স্বয়ং ভগবান।
কিন্তু তা স্থায়ী হয় মাত্র ৩৫ বছর। তার পর ‘জরা’ নামের এক অরণ্যচারী ব্যাধের বাণে ঘটে শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ।