• স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ধারাবাহিক উপন্যাস  পর্ব ১৭

চুয়ান্ন

rabi
ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

পূর্বানুবৃত্তি: সাবু তার বস জিনাদিকে বলে তাকে উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার করে দিতে। জিনাদি আঁচ করে, হয়তো কোনও হৃদয়ঘটিত ব্যাপারেই পালাতে চাইছে সাবু। জিনাদির থেকে বিদায় নিয়ে পণ্ডিতিয়ায় যাওয়ার কথা ভাবে সাবু। অনেক দিন পুঁটির সঙ্গে দেখা হয়নি তার। পার্ক স্ট্রিটে রিজুর সঙ্গে দেখা হয় সাবুর। রিজু স্বভাববশে খাওয়ানোর কথা বলে ওকে। কিন্তু উত্তরে খানিকটা খারাপ ভাবেই কথা শুনিয়ে দেয় সাবু। পরে নিজেরই খারাপ লাগে ওর। ভাবে, রিজুকে এতটা না বললেও পারত।

আজ বাবাও এ রকম কথাই বলছিল সকালে। আসলে বাড়িতে সকালে মা আর দিদির মধ্যে ধুন্ধুমার ঝামেলা হয়েছে। খুবই আনকমন ঘটনা, তা-ও ঘটেছে। আমি অফিস যাব বলে রেডি হচ্ছিলাম, তখনই গোলমালটা লেগেছিল।

দিদি সবার সামনে ঘোষণা করেছিল, “আমি দীপ্যকে বিয়ে করব না। আমি ওর সঙ্গে ব্রেকআপ করে নেব।”

“কী!” মা খাবার দিচ্ছিল আমায়। তাই কথাটা বুঝতে সময় লেগেছিল একটু।

দিদি আবার কথাটা বলেছিল। আর এ বার বেশ রাগ ও বিরক্তি মিশিয়ে।

মা থমকে গিয়েছিল এক মুহূর্তের জন্য। তার পর রাগে ফেটে পড়েছিল বোমার মতো।

মা বলেছিল, “কী বললি! দীপ্যর সঙ্গে ব্রেকআপ করে নিবি? ইয়ার্কি হচ্ছে! সবাই জেনে গিয়েছে। সামনে বছর ফাল্গুনে বিয়ে হবে। আর এখন এ সব ন্যাকামি শুরু করেছিস? আর এক বার বললে থাবড়ে তোকে সিধে করে দেব!”

“কী!” দিদিও এগিয়ে এসেছিল মায়ের দিকে, “দাও দেখি গায়ে হাত! কত সাহস বুঝব! আমার জীবন আমি যা খুশি করব। তুমি বলার কে!”

আমি বলার কে?” মা আর পারেনি। প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দিদির চুল ধরে টান মেরেছিল। সঙ্গে এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড়!

আমি আর বাবা এত আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম যে, প্রথমে নড়তে পারিনি। মা তো দিদিকে কখনও এমন করে মারে না!

ভ্যাবাচ্যাকা ভাব কাটিয়ে আমরা উঠে পড়ে কোনও মতে ছাড়িয়েছিলাম দু’জনকে। দিদি কাঁদছিল আর কী সব বলে চিৎকার করছিল। মা-ও কাঁদছিল। সঙ্গে হাতের কাছে রাখা বাটি, বিস্কুটের কৌটো দিদির দিকে ছুড়ে মারছিল ক্রমাগত।

বাবা দিদিকে আড়াল করেছিল বলে সে সব বাবার গায়েই লাগছিল।

আধঘণ্টা ধরে কুরুক্ষেত্র চলার পরে মা আর দিদি দু’জনে দু’ঘরে গিয়ে দরজা দিয়েছিল। বাবা দু’জনকে সামলে, মার খেয়ে, বিধ্বস্ত হয়ে আমার পাশে এসে বসে বলেছিল, “দেখলি কী হল! সিভিলাইজ়ড মানুষরা এ রকম করে?”

আমি বলেছিলাম, “দুটো ওয়র্ল্ড ওয়ার তো সো-কল্ড আনসিভিলাইজ়ড লোকজন করেনি!
তার পরেও যা যা যুদ্ধ হয়েছে সেগুলো কারা করেছে মনে নেই!”

বাবা মাথা নেড়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে বসেছিল কিছু ক্ষণ, তার পর বলেছিল, “বাড়ির মধ্যে এ রকম! লজ্জা করে আমার এখনকার দিনে বেঁচে থাকতে! সবাই এত হিংস্র কেন? কেউ কারও কথা ভাবছে না! এ ভাবে চললে আর কয়েক বছর পর কী হবে?”

আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু ভাবছিলাম দিদি কেন দীপ্যদাকে বিয়ে করবে না? দিদি কি সেদিনকার ব্যাপারটা জেনে গিয়েছে! কোনও দোষ না করেও আমার কেমন যেন অপরাধবোধ হচ্ছিল!

 

পণ্ডিতিয়ায় পৌঁছতে আমার চল্লিশ মিনিট লেগে গেল। অফিসের গেটের সামনে বিনয়কাকাকে দেখলাম। পাশের একটা চিঁড়েমুড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে কিছু একটা খাচ্ছে। আমায় দেখে হাসল। তার পর হাতের ঠোঙাটা বাড়িয়ে বলল, “একটু খাও না!”

আমি হেসে মাথা নেড়ে না বললাম।

বিনয়কাকা এগিয়ে এল এ বার আমার দিকে। তার পর কোনও গোপন কথা বলবে এমন গলায় বলল, “পুঁটির কী হয়েছে গো?”

আমি অবাক হলাম, “কেন? কী হয়েছে?”

“ক’দিন ধরেই কেমন যেন হয়ে আছে। মনখারাপ? মোবাইলও ব্যবহার করছে না!”

আমি হেসে ব্যাপারটা লাইট করে বললাম, “কই, কিছু না তো!”

“কী জানি বাবা!” বিনয়কাকা পিছিয়ে গেল, “যাও দেখো, বাবুর কেমন মুড!”

আমি হেসে অফিসে ঢুকে গেলাম। সামনেই
বড় রিসেপশন। তাতে রিনাদি বসে। আমায় খুব ভাল চেনে।

অন্য দিন আমি সোজা ওপরে চলে যাই। কিন্তু আজ রিনাদি আমায় আটকাল।

আমি অবাক হয়ে তাকালাম রিনাদির দিকে।

রিনাদি বলল, “ছোটসাহেব তো নেই!”

মানে! আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না।

রিনাদি একটু অপ্রস্তুত মুখে বলল, “মানে ছিলেন। কিন্তু একটু আগে বেরিয়ে গেলেন। তাই আপনি উপরে মানে...”

আমায় যেতে বারণ করছে! বিনয়কাকা বলল আছে, আর এর মধ্যেই নেই! বেরিয়ে গিয়েছে! বেরোলে তো আমি দেখতে পেতাম! বিনয়কাকাও দেখতে পেত, তা হলে?

চড়াৎ করে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল এক নিমেষে! কী অসভ্যতা এগুলো? রিসেপশনিস্টকে দিয়ে এ ভাবে আমায় খেদিয়ে দেওয়া!

আমার কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছে। রাগে মনে হচ্ছে শরীর ফেটে পড়বে। এত দূর থেকে ওর জন্য কেন আসি আমি, বোঝে না! ন্যাকামো হচ্ছে! কে না কে এনা, তার জন্য আমায় এ ভাবে অপমান করছে! ও জানে এনার আসল রূপ কী? জানে ও কী
করছে বাইরে?

আমি অফিস থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার এক পাশে দাঁড়ালাম। বিনয়কাকা অবাক হয়ে দেখল। কিন্তু আমি পাত্তা দিলাম না। রাগে হাত-পা কাঁপছে আমার। মাথা কাজ করছে না। মনে হচ্ছে পুঁটিকে হাতের কাছে পেলে গলা টিপে মেরে ফেলব।

কিন্তু সে সব না করে আমি মোবাইলটা খুললাম। তার পর এনার আর ওর নতুন প্রেমিকের চুমু খাওয়ার যে ছবিগুলো তুলেছিলাম, সেগুলো সব বার করলাম। আমার নিজের একটা গোপন ইমেল আইডি আছে। বানানো নামে। কেউ জানে না তার কথা। সেটা থেকে পুঁটির পারসোনাল ইমেলে পাঠিয়ে দিলাম ছবিগুলো।

 

ও মোবাইল ব্যবহার করে না তো কী হয়েছে। অফিসে তো কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয়। সেখান থেকে নিশ্চয়ই নিজের ইমেল খোলে ও! ব্যস, সেটা খুললেই এটা চোখে পড়বে। বেশ হবে। জানতেও পারবে না কে পাঠিয়েছে, কিন্তু আমার কার্যসিদ্ধি হবে।

আমি মনে মনে কেমন যেন জান্তব উল্লাস টের পেলাম। চাপা গলায় বললাম, “নে দেখ, কার পিছনে ঘুরছিস! কার জন্য নিজের লাইফ নষ্ট করছিস!” 

১১

পুঁটি (দিন: ছত্রিশ)

সুদীপ্ত থাকে শিলিগুড়িতে। ও আমায় নিতে এসেছিল স্টেশনে। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে এখানে। তবে খুব জোরে নয়। বরং কিছুটা ঘ্যানঘেনে ধরনের। আকাশের মুখ কালো। রাস্তাঘাট পিছল। জুলাইয়ের প্রায় শেষ। এখন তো বৃষ্টি হবেই। স্বাভাবিক।

বাবার শরীর আস্তে আস্তে ভাল হচ্ছে। জেঠু আর ছোটকা যদিও অফিসে যেতে দিচ্ছে না। তা-ও দেখছি, বাবাকে অফিস থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও অফিসকে বাবার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। ঘরে বসেও নানা রকম চিন্তাভাবনা, কাজকম্ম
করে যাচ্ছে।

বাগালের কাজের জন্য প্রাইস জমা দিতে হবে সামনের সপ্তাহে। আমাদের কাজ শেষ। লাস্ট মিনিট চেকিং চলছে।

নর্থ বেঙ্গলে একটা কাজের সুযোগ এসেছে এই সময়। পনেরোটা চা-বাগানে এক সঙ্গে ইনফ্রাস্ট্রাকচার আপগ্রেডেশন হবে। তার জন্য আমাদের কাছে একটা চিঠি এসেছিল যে এসে যেন দেখা করি।

চা-বাগানের মালিকেরা কনসর্টিয়াম করেছে একটা। সেখান থেকেই টার্নকি বেসিসে একটা কোম্পানিকে কাজটা দেওয়া হবে।

আমাদের অফিস থেকে সিনিয়র কাউকে পাঠাবার কথা ছিল। কিন্তু আমি নিজে যেচে পড়ে কাজটা করব বলেছি। আসলে এক দিনের কাজ। সেটা সেরে নিয়ে দার্জিলিং যাব দু’দিনের জন্য। সেটাই ইচ্ছে ছিল।

মা আপত্তি করেছিল খুব। বলেছিল, “না, যেতে হবে না। আজকাল কী হয়েছে তোর? সারা ক্ষণ এমন গোঁজ হয়ে থাকিস কেন? নিজের গাড়ি ব্যবহার করিস না! মোবাইল ব্যবহার করিস না। আর এখন হিমালয়ে যাবি বলছিস!”

“হিমালয়!” আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।

“নয়তো কী! দার্জিলিং যাবি কেন? সত্যি করে বল তো, এনার জন্য এ সব করছিস, না? একটা মেয়ের জন্য এমন কেউ করে!” মা কান্না আর রাগের মাঝামাঝি অবস্থার চোখ-মুখ নিয়ে কথাটা বলেছিল।

আমি এই অবস্থাটা খুব ভাল করে জানি। আমার মাধ্যমিকের আগে, এইচ এস-এর আগে থেকে শুরু করে নানা সময়ে বারবার এই মুখটার সামনে পড়েছি। আমার রিঅ্যাকশন অনুযায়ী মুখটা
কখনও কান্নার দিকে আবার কখনও রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আমি শেষ পয়েন্টটা এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলাম, “আমি হিমালয়ে কেন যাব?”

মা বলেছিল, “তুই না বললেও আমি জানি, কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে সেটা তো বলছিস না! তার উপর তোদের ফ্যামিলিতে তোর দাদুর এক কাকা চলে গিয়েছিল হিমালয়ে। আমি কি জানি না! তোদের শরীরে জিন আছে পাহাড়ে যাবার!”

“পাহাড়ে যাবার জিন!” আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। এমন জিন হয় না কি!

মা বলেছিল, “নয়তো কী! আমি জানি তুই আর ফিরবি না!”

“মা প্লিজ়!” আমার বিরক্ত লাগছিল, “আমি জাস্ট দুটো দিন একা একটু পাহাড়ে থাকতে চাই। বুধবার যাব। এক দিনে কাজ সেরে পরের দিন দার্জিলিঙে চলে যাব। শুক্র-শনি থেকে আবার রোববার চলে আসব।”

“তুই আসবি না, আমি জানি,” মা কান্নার দিকে যাবে বলে মনস্থ করেছিল এ বার।

“কী বিপদ রে বাবা!” আমি বলেছিলাম, “দার্জিলিং যাব একটু, তাই নিয়ে এত কান্নাকাটি কেন! তুমি কী বলো তো!”

মা এ বার বাবার দিকে ঘুরে বলেছিল, “আমি ছেলের বিয়ে দিতে চাই! ওকে একটা সুন্দরী দেখে বৌ এনে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে!”

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমি কি কোনও আর্লি টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির নভেলে আটকে পড়েছি! সেখানে তো মায়েরা এ রকম বলত! আর সুন্দরী দেখে মানে? এমন রিগ্রেসিভ চিন্তাভাবনা কেন লোকজনের!

মায়ের কথা শুনে আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, “সিরিয়াসলি! এ সব কী বলছ!”

মা বলেছিল, “না, আমি আজ থেকেই পাত্রী দেখব। এ ভাবে চোখের সামনে ছেলেকে বিবাগী হতে দেখা সম্ভব নয়! আমি মরে যাব দেখিস!”

“যা, ঘুরে আয়,” বাবা ছোট্ট করে বলেছিল শুধু।

“কী বললে!” মা এমন করে ঘুরে বাবার দিকে তাকিয়েছিল যেন বাবা এক সঙ্গে দুটো বিয়ে করে নতুন বৌ দু’জনকে বাড়িতে এনে তুলবে বলে ঘোষণা করেছে।

বাবা বলেছিল, “ও যাবে। ঘুরবে। তার পর চলে আসবে। সিম্পল!”

মা বলেছিল, “তোমার কী করে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল বলো তো!”

বাবা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, “কেন?”

“তোমার তো হার্টই নেই! দেখছ ছেলে সারা ক্ষণ মুখ চুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তার উপর পাহাড়ে যাবে! আর তাকে তুমি যেতে বলছ!”

বাবা এ বার বলেছিল, “তোমার কী হয়েছে! এ রকম করছ কেন? সব ঠিক থাকবে। আমাদের কি ওর মতো বয়স ছিল না! আমাদের কি এমন লিন পিরিয়ড যায়নি?”

মা এ বার আমার দিকে ঘুরে বলেছিল, “পাহাড়ি কোনও মেয়েকে আবার জুটিয়ে আনিস না!”

আমি হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম। এই তো সন্ন্যাসী হওয়ার কথা হচ্ছিল, আবার গৃহী হয়ে গেলাম
কী করে!

মা বলেছিল, “অমন সুন্দর মেয়েদের দেখে আবার গলে যাস না। আমি কিন্তু মেনে নেব না!”

আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বলেছিলাম, “কেউ যদি আমার সঙ্গে হিমালয়ে গিয়ে সাধনসঙ্গিনী হতে চায়, তা হলে কথা দিতে পারছি না!’

 

কাল কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে আমার। আজ তাই দার্জিলিঙে এসেছি। সুদীপ্ত এসেছে আমার সঙ্গে।

সুদীপ্তর সঙ্গে আমার বেশ কয়েক বছরের আলাপ। আমার চেয়ে বছরদুয়েকের ছোট ও। এম কম করছে। শিলিগুড়ির ছেলে। একটু চুপচাপ। প্রচুর বই পড়ে আর সিনেমা দেখে। খুব মিষ্টি ছেলে।

আমি ওকে অফিসের ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করে বলেছিলাম পাহাড়ে যাব। ও শুনেই বলেছিল, “চলে এস, আমি আছি কোনও অসুবিধে হবে না!”

সত্যি অসুবিধে হয়নি। এক দিনের যে কাজটা ছিল, সেটা সেরে আজ দুপুরেই আমরা এসে পৌঁছেছি দার্জিলিঙে।

রাজভবনের পাশে যেখান থেকে খাদের পাশের রাস্তাটা শুরু হয়েছে, সেখানকার একটা হোটেলে উঠেছি। জেঠুই বুক করে দিয়েছিল।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন