কাটি রাত সারি মেরি ম্যয়কদে মে/ খুদা ইয়াদ আয়া সবেরে সবেরে’
আমার অন্তরাত্মা ভোরের কুয়াশায় স্নান করতে গিয়ে আমাকেই দেখতে পায়... আর কোনও অবয়বই কখনও সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আমিই ব্রহ্ম, আমিই শক্তি... আমিময় এই আমি মানুষটা যাঁর সংগীতের কাছে সারা জীবন নতজানু হয়ে থাকতে পারে, তিনি জগজিৎ সিংহ। সাধারণত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যে খেলায় আমরা কাঁদি বা হাসি বা রেগে যাই, সেই খেলাটি আমায় ধোঁকা দেয় প্রায়ই। যার ফলে যে দিন আমার মা আমায় ছেড়ে চলে যায়, সে দিনও আমার কান্না আসছিল না সহজে, অথচ জগজিৎ সিংহের মৃত্যুর খবর আমার চোখে ইনস্ট্যান্ট ম্যাগির মতো ইনস্ট্যান্ট জল এনে দিয়েছিল। তার মানে আমার মা’র থেকে জগজিৎ সিংহ আমার প্রিয়— এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, এটা ডাহা মিথ্যে। আসলে ওঁর মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সঙ্গে ওঁর ব্যারিটোন আর pathos-মিশ্রিত আওয়াজের অনুরণন হচ্ছিল কানে। আমি ও আমার পরিবার হিমাচলে বেড়াচ্ছিলাম সে দিন। আনন্দে ছিলাম খুব। এক বন্ধু টেক্সট করে জানাল, জগজিতের মৃত্যুর খবর। কান্না এসে গেল তৎক্ষণাৎ। আমার মতো বেরহমের চোখেও!
আমার বাবার এক বন্ধুর ফ্যামিলির সঙ্গে আমাদের সখ্য ছিল খুবই। ওঁদের বাড়ির প্রত্যেকেই ছিলেন জগজিতের ভক্ত। রেকর্ড থেকে শুরু করে ক্যাসেট অবধি জগজিৎ বিরাজমান ছিলেন ওদের বাড়িতে। ওঁদের বাড়িতে যাতায়াতের মাধ্যমে জগজিৎ ও চিত্রা সিংহ আমার খুব কাছের হয়ে ওঠেন। এই সময়টা আমার কাছে খুব প্রয়োজনীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুর সময় আমি তখন মহীন শুনছি, সুমন শুনছি, ‘ক্যয়ামত সে ক্যয়ামত তক’ শুনে পাগল। কুমার শানুর সঙ্গে ‘স্পাইরোগাইরা’ ব্যান্ড শুনছি, ধাক্কা মারছেন বব ডিলান। এই সময়টায় হঠাৎ শুনলাম, ‘বাত নিকলেগি তো ফির দূর তলক জায়েগি...’ ভগবানে আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই। আমি সমকামীও নই। কিন্তু আল্লা কসম, এই গলাটিকে জড়িয়ে চুমু খেলেই এক্কেরে বেহেস্ত হাসিল হয়ে যেত।

জগজিৎ তাঁর হৃদয়-নিংড়ানো স্বরে শের ও শায়রির শাহেনশা ছিলেন। তাঁর গায়কি, অসাধারণ মেলোডিয়াস সুর করার দক্ষতা— তাঁর পরিমার্জিত যে ক্ষেত্রটি তিনি নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন, তা এক কথায় লা-জবাব। যদি প্রাক্-জগজিৎ সময়ের কথা ভাবি, তা হলে উপস্থিত থাকেন মেহেদি হাসান, গুলাম আলি, আবিদা পরভীন বা লেজেন্ডারি বেগম আখতার। এঁরা যে গজল বা নজ্ম পরিবেশন করেছেন, কিংবা সুরারোপ করেছেন, তার ভিত্তি মূলত হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীত। এঁদের কেরামতি, লয়কারি, শাস্ত্রীয় সংগীতের ওপর তুমুল দখল এঁদের শিখরে অধিষ্ঠিত করেছে। এখনও আমরা এঁদের সংগীতে মজে রয়েছি। মার্জনা চাইছি, আমি সত্যিই অনেক কম জানি এবং জানার চেষ্টাতেই রয়েছি। আমার কাছে গজল বা নজ‌্‌মের সাহিত্যগুণের এসেন্স বা খুশবু এনে দেয় জগজিতের সৃষ্টি। ‘পাত্তা পাত্তা বুটা বুটা’ মেহেদি হাসানের গাওয়া এই গজলটি ভীষণই জনপ্রিয়। কিন্তু কী জানি, আমার এই নির্বোধ মন প্রেমে পড়লেই হয়ে পড়ে নিশ্চুপ, নির্বাক। সন্তর্পণে প্রেমের নিঃসরণ হয় আর আর সেটা প্রচুর কেরামতি ও লয়কারিতে দিশা হারায়। তাই জগজিৎ যখন ‘পাত্তা পাত্তা বুটা বুটা’ গান, তখন তা যেন পদ্মপাতার ওপর টলটলে জল।

জগজিৎ তাঁর গানের সুর এবং সংগীতায়োজনে খুবই সমসাময়িক ছিলেন। যদিও সংগীতায়োজন তিনি নিজে করতেন না। কিন্তু তিনি বিশেষ নজর রাখতেন এর ওপর। আর একটি বিষয়ে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন। সেটা হল সাউন্ডস্কেপ বা শব্দকল্প। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জগজিৎ-চিত্রার ‘বিয়ন্ড টাইম্স’ অ্যালবামটি। ‘অপনি আঁখো কে সমুন্দর মে’ বা ‘লব-এ-খামোশ’ গানগুলিতে যে রেকর্ডিং আমরা শুনি,  তা সময়সাপেক্ষে ভীষণই আধুনিক। জগজিৎ-সংগীত যেমন প্রাতিষ্ঠানিক, তেমনই বৈপ্লবিক। ‘অপনি হাথো কি লকিরো মে বসা লে মুঝকো’ জগজিৎ যখন গান, মনে হয় ওই ভাবটিরই একমাত্র প্রয়োজন ছিল এই শায়রির। গানটি শুরু হয় মিড-অক্টেভ সা থেকে, ঝোঁক থাকে ক্রমাগত উচ্চ পরদায় যাওয়ার। কিন্তু হঠাৎই জগজিৎ লাইনের শেষ শব্দে গানটিকে তলার ধৈবতে বা ধা-তে নিয়ে যান। ‘মাইনর টনিক স্কেল’ হয়ে ওঠে ‘রিলেটিভ মাইনর’। আর আপাতদৃষ্টিতে প্রবল বিরহের এই গানটিও একটি পজিটিভ বার্তা বহন করতে থাকে।

জগজিৎ ও চিত্রা সিংহ— এই যুগলবন্দি আমার যৌবনকে লালন করেছে। জগজিৎ বেসলাইনে খেলতেন আর হায়ার নোট্স-এ অস্থির চিত্রাকে পরম স্নেহে-ভালবাসায় আদর করতেন (এখনকার মিউজিক প্রোডাকশন-এ ঠিক উলটো হয়)। এই আদরের স্পর্শ আমিও পেয়েছি। হঠাৎ এঁদের পুত্রসন্তান দুর্ঘটনায় মারা যান এবং চিত্রা সিংহ তার পর আর কোনও রেকর্ড করেননি। অনুষ্ঠানেও গান করেননি (জগজিৎ মারা যাওয়ার পর চিত্রা সিংহ কেমন আছেন— এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কোনও খবরই রাখে না)। জগজিৎ তখন ভীষণ জনপ্রিয়। তার কারণ, তখন যাঁরা কোনও দিনও গজল শুনতেন না, তাঁদের কাছেও গুলজারের মির্জা গালিব হিট। এত শোকের পরও জগজিৎ ‘সাজদা’ তৈরি করেছেন লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে। ‘মরাসিম’ করেছেন গুলজারের সঙ্গে। এ ছাড়া আরও অগুন্তি অ্যালবাম, ‘সরফরোশ’ ছবিতে অসামান্য ‘রেনডিশন’ যতীন-ললিতের সুরে, আমাদের চিরকাল মনে থাকবে।

জগজিৎ সিংহের সঙ্গে আমি পরিচিত হই লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘সা রে গা মা’-র সেটে। আমার প্রথম বিদেশযাত্রা সেটা— ১৯৯৮। ভীষণ বিপর্যস্ত ছিলাম নানা কারণে। এক দিন স্টুডিয়োর বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি, হঠাৎ কাঁধে হাত। ঘুরেই ভগবান দর্শন। জগজিৎ বললেন, ‘আচ্ছে গাতে হো, সিগারেট কিঁউ পিতে হো? ম্যয় ভি পিতা থা, ছোড় দিয়া, তুম ভি ছোড় দো বেটা’... ব্যস এইটুকুই। সেই মুহূর্ত ভুলতে পারব না কোনও দিন। আজও সিগারেট ছাড়িনি। কিন্তু সে দিনটা বড় অস্থির, বেহাল, দিশাহারা ছিল, ভাল ছিলাম না মোটেও। বেলাইনে চলে যেতে পারতাম... লাইনে আবার সেই ব্যারিটোনই নিয়ে আসে। অন্তত জগজিৎ সিংহের সঙ্গে কথা বললাম— এই ভেবেই বাকি দিনগুলো লন্ডনে কাটিয়েছিলাম।

লোকজন বলে আমার গলায় দুঃখ আছে। বন্ধুরা বলে, সেটা নাকি ‘বাই ডিফল্ট’। তাদের বলি, না রে, এই দুঃখ জগজিতের কাছ থেকে ধার করা। আর একে দুঃখই বা বলি কী করে? সুখও তো এখান থেকেই পাই। অন্ধকার গায়ে না মাখলে আলো পাব কী করে? জগজিৎ সিংহের pathos আমার সংগীতে বার বার ফিরে এসেছে। কখনও ‘এল সেই সাঁঝলগন’ বা কখনও ‘শহরে নেমেছে রাত’-এ (দুটোই চৈতালীর লেখা ও দ্বিতীয়টি শুভমিতার সঙ্গে ডুয়েট)। আজ যখন সমস্ত ভারতীয় পুরুষ সমস্বরে উচ্চ পরদায় চিৎকার করে প্রেম নিবেদন করছে, তখন জগজিৎ ব্যারিটোন গলায় গান, ‘আয়ে হ্যায় সমঝানে লোগ/ হ্যায় কিতনে দিওয়ানে লোগ’।

আদাব হুজুর...

   

chaitalilahiri@yahoo.co.in