•  (গত সংখ্যার পর)  •

বর্মা লোকটিকে মোটেও সুবিধের মনে হয় না অলকেশের। সবে এসেছে পোস্টিং নিয়ে। এক দিন একটা আনুষ্ঠানিক মোলাকাতও হয়েছে তাঁদের। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার পর থেকে আর কোনও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। অলকেশও করেননি।

এমনিতেও জিআরপি’র সঙ্গে আরপিএফ-এর লোকেদের একটা চাপান-উতোর আছেই। আরপিএফ হল রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স। ওরা রেলকর্মী। জিআরপি বা গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ, রাজ্য পুলিশের অংশ। তাদের দায়িত্ব ভাগাভাগিও আলাদা। রেলের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আরপিএফ’এর। আর স্টেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব জিআরপি’র। অনেক সময়েই দেখা যায়, দায়িত্বের ভাগাভাগিটা কাগজে কলমে যতটা পরিষ্কার, বাস্তবে ততটা নয়। তাই এটা ওটা নিয়ে খটামটি লেগেই থাকে। তার উপর আবার আরপিএফের লোকজন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী। ওদের বেতন বেশি, সুযোগ-সুবিধাও কিছুটা বেশি। সেটাও ঠিক সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থানের সহায়ক নয়!

তা ছাড়া এই বর্মা লোকটাকে এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি অলকেশ। সুতরাং ওর সম্বন্ধে তিনি একটু সতর্ক। লোকটা নাকি মালও খায় না। অবশ্য এটা সত্য কি না তা যাচাই করে দেখার সুযোগ হয়নি অলকেশের। কিন্তু কথাটা কানে এসেছে। এই লোকের সঙ্গে কাজ করতে হবে ভেবেই বিরক্ত লাগছে তাঁর। তার উপর এত বড় একটা দায়িত্ব। এ বয়সে এ সব পোষায়?

‘আপনার কি এ বছরই রিটায়ারমেন্ট, লাহিড়ীদা, না সামনের বছর?’

সোমেশের হাতে কোনও কাজ নেই, বোঝাই যাচ্ছে। ছেলেটা এমনিতে ভালই, কিন্তু বড্ড মুখ আলগা। এটা অবশ্য কোনও গোপন তথ্য নয়। সবাই জানে।

‘সামনের বছরও না সোমেশ, তার পরের বছর। জানুয়ারিতে। কেন? তুমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে?’

‘কী যে বলেন, লাহিড়ীদা। আপনি চলে গেলে আমাদের মালের বোতল সাপ্লাই কে দেবে, পাড়ার ফাংশনে তবলা কে বাজাবে এ সব চিন্তায় আমরা সবাই মুহ্যমান!’

‘বাড়াবাড়ি কোরো না সোমেশ। ভরদুপুরে মালের বোতলের আলোচনা করার কী আছে? ঘরে মহিলারা আছেন।’

‘আহা, মরি মরি! মহিলাদের সামনে বোতল লেনদেন করতে বাধা নেই, আর মালের কথা উচ্চারণ করতে লজ্জা। কী শালার দরদ!’ সুলেখা মিত্রর কথাবার্তার যা ধরন, তার সঙ্গে গলার স্বরটাও মানানসই। তীক্ষ্ণ, কাঠ কাঠ উচ্চারণ।

‘ছিঃ সুলেখা। শালা-টালা বোলো না! মেয়েদের শ্যালক হয় না!’

শ্যামলের কথা শুনে খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল অনেকে।

‘কিন্তু লাহিড়ীদা, মালের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, জানেন। তবলাটা রিয়েল প্রবলেম। আচ্ছা, রিটায়ার করে কি আপনি চিত্তরঞ্জনেই থাকবেন, না কি...’ প্রশ্নটা শেষ করল না সোমেশ।

‘এখানে? রক্ষে করো! আমি অন্ডালের লোক, অন্ডালে ফিরে যাব।’

‘কেন, আমরা কি এতই খারাপ?’

‘আহা, খারাপ কেন হবে, সুলেখা? তবে এখানে তো আমার কিছুই নেই। কোয়ার্টারে থাকি। রিটায়ার করলে থাকব কোথায়?’

‘হ্যাঁ, এটা ঠিক। অন্ডালে তো আপনার বিরাট বাড়ি। তাই না রে সোমেশ? তুই তো গেছিস?’

‘শ্যামল, বাড়িটা আমার নয়, আমাদের। আমার বাবা করে গিয়েছিলেন বাড়িটা। আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য। তা তুমি কি এখন আমার নাড়িনক্ষত্র বিচার করবে? পনেরোই অগস্টের কাজকারবার কিছুটা এগিয়েছে? ডেকরেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলে?’

‘সেটাই তো আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম। আপনি স্বাধীনতা দিবসকে গালাগালি করতে শুরু করলেন!’

‘আমার কিন্তু মনে হয় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানটা...’ স্বাধীনতা উদ্‌যাপন নিয়ে সুলেখা মিত্রর ঠিক কী মনে হয়, সেটা আর জানা হল না অলকেশের। সুলেখার কথার মাঝখানেই তাঁর টেবিলে রাখা ওয়াকিটকি যন্ত্রটা খড়খড় করে সরব হয়ে উঠল।

‘ওয়ান-টু-থ্রি-জিরো-থ্রি ডাউন পূর্বা এক্সপ্রেস টু জিআরপি চিত্তরঞ্জন ওভার।’

‘ইয়েস। জিআরপি চিত্তরঞ্জন রেসপন্ডিং টু ওয়ান-টু-থ্রি-জিরো-থ্রি ডাউন পূর্বা এক্সপ্রেস। জিআরপি চিত্তরঞ্জন রেসপন্ডিং টু ওয়ান-টু-থ্রি-জিরো-থ্রি ডাউন পূর্বা এক্সপ্রেস ওভার।’

রেলে এখন ট্রেনের গার্ড, স্টেশন মাস্টার, জিআরপি, সবাইকে ওয়াকিটকির বদলে মোবাইল ফোন দেওয়া হচ্ছে। বড় বড় স্টেশনগুলিতে সবার হাতে সরকারি মোবাইল ফোন চলে এসেছে, কিন্তু সব জায়গায় মোবাইল চালু হতে অন্তত আরও বছর দুয়েক। তত দিন চিত্তরঞ্জনের মতো জায়গায় ওয়াকিটকিই ভরসা।

‘ট্রেন গার্ড সুধাময় ঘোষ স্পিকিং। ট্রেন গার্ড সুধাময় ঘোষ স্পিকিং। রিসিভিং ইউ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার ওভার।’

‘হ্যাঁ বলুন। অলকেশ লাহিড়ী বলছি। ওসি চিত্তরঞ্জন।’

‘অলকেশবাবু, ট্রেনে একটা ফেটালিটি হয়েছে মনে হচ্ছে। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে এক জন এক্সপায়ার করেছে। আমরা ডেডবডি নিয়ে চিত্তরঞ্জনে ঢুকছি। ইন সেভেন মিনিটস ওভার।’

‘ডেডবডি? কী হল? হার্ট অ্যাটাক নাকি? মেডিক্যাল কেস?’

স্টেশন মাস্টার ধীরেশ ব্যানার্জির গলা। নিয়ম অনুযায়ী তাঁরও ওয়াকিটকি একই ফ্রিকোয়েন্সিতে বেজে উঠেছে।

‘না। মেডিকো-লিগাল হতে পারে।’

‘মেডিকো-লিগাল? কী বলছেন? খুন-জখম নাকি? গোলাগুলি চলছে নাকি আপনার গাড়িতে?’

ধীরেশবাবুকে বেশ উদ্বিগ্ন শোনাচ্ছে।

‘না না, ট্রেনে কোনও গোলমাল নেই। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত, আমরা আসছি। বডিটা নামাবার জন্য রেডি থাকবেন প্লিজ। ওভার অ্যান্ড আউট।’

স্টেশন মাস্টার ধীরেশ ব্যানার্জিকে দেখতে পেলেন অলকেশ। ছুটে বেরিয়ে এসেছেন নিজের ঘর থেকে। প্ল্যাটফর্মের উপর হাঁকডাক করে বেয়ারা আর কুলিদের জড়ো করতে শুরু করেছেন। একটুতেই বড্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন ভদ্রলোক।

এটাই বাকি ছিল আজ। অলকেশ লাহিড়ীর উদ্বিগ্ন লাগছে না। লাগছে বিরক্ত। তিনি প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এলেন।

ঠিক কুড়ি মাস পরে ষাটে পড়বেন অলকেশ। অর্থাৎ চাকরির মেয়াদ শেষ। সেই চব্বিশ বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিলেন জুনিয়র কনস্টেবল হয়ে। তার পর ক্রমাগত চলেছে পুলিশের ঘানি টানা। সরকারি চাকরির নিয়ম মাফিক ধাপে ধাপে উঠেছেন। তবে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে থেমে যাননি। চাকরি জীবনের উপান্তে এসে একটা থানার অফিসার-ইন-চার্জ হয়ে যে বসতে পেরেছেন, তার মূলে আছে তাঁর দুটি সহজাত দক্ষতা।

এক হল, উপরওয়ালাকে খুশি রাখার ইচ্ছে এবং উদ্যম। আর নিজের আখের গুছিয়ে নিতে হয় কী ভাবে, সেটা পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক ভাবে বুঝে নিয়ে, সেই মতো কাজ হাসিল করার বিষয়ে দ্বিধাহীন নির্লজ্জতা। বহু বার, বহু জায়গায় বদলি হয়েছেন। যে কোনও নতুন পোস্টিং-এর ভালমন্দ বিচার করার একটাই মানদণ্ড অলকেশের, সেখানে দু’হাতে উপরি আয় করার সুযোগ আছে না নেই। ঘুষের রাস্তা খোলা থাকলে কোনও নতুন পোস্টিং-এ কোনও দিন আপত্তি করেননি তিনি।

এখন তাঁর তিনটে বাড়ি। অন্ডালে তাঁর পৈতৃক বাড়িটায় তাঁদের একান্নবর্তী সংসার। সে বাড়িটা বিরাট আকার ধারণ করেছে মূলত তাঁরই অর্জিত অর্থে। তা ছাড়া তাঁর কলকাতায় দুটো ফ্ল্যাট, একটা যাদবপুরে, একটা গড়িয়ায়। দুটোই ভাড়া দেওয়া। ভাড়াটেরা যে মাঝেমধ্যে গোলমাল করার চেষ্টা করেনি তা নয়, তবে তিনি পুলিশে কাজ করেন, ত্যাঁদড় ভাড়াটেকে ঠান্ডা করার অনেক রাস্তা তাঁর জানা। তাঁর একটা গাড়ি স্ত্রী এবং মেয়ে ব্যবহার করে, কলকাতায় আরও দুটো টাটা সুমো ভাড়া খাটে।

রিটায়ারমেন্টের মুখে এসে একটাই চিন্তা অলকেশের। চাকরিটা থাকতে থাকতে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। প্রাণপণে সম্বন্ধ দেখছেন, কিন্তু কিছুতেই লাগছে না। ডাকসাইটে সুন্দরী কিছু না মেয়েটা তাঁর, কিন্তু মোটামুটি সুশ্রী। ইস্কুলের গণ্ডি পার হয়ে অবশ্য লেখাপড়া আর বেশি দূর এগোয়নি। আর সেটাই হয়েছে সমস্যা। আজকাল একটু ভাল পাত্র হলেই বিএ, এমএ পাশ করা মেয়ে চায়। সঙ্গে বিশাল অঙ্কের পণ তো আছেই।

মেয়েকে কলকাতার আশুতোষ কলেজে ভর্তি করেছিলেন অলকেশ, বাংলা নিয়ে। কিন্তু সেখানে তার ক্লাসের একটি ছেলের সঙ্গে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে, এ কথা কানে আসা মাত্রই মেয়েকে একবস্ত্রে নিয়ে চলে এসেছিলেন। ছেলেটিকে ভাগিয়ে দিতে বেশি বেগ পেতে হয়নি অলকেশকে। দুই ধমকেই কাজ হয়েছিল। বাংলায় বিএ পড়া, গরিব ঘরের ছেলে। পুলিশ অফিসারকে ঘাঁটাবার বুকের পাটা তার ছিল না।

এটা মাস আষ্টেক আগের কথা। তার পর থেকেই নানা মহলে মেয়ের সম্বন্ধ দেখছেন অলকেশ। কোথাও লাগছে না। একটা বেশ এগিয়েছিল। এই চিত্তরঞ্জনেই থাকে ছেলেটি। ঠাকুরদার আমলের ওষুধের দোকান শহরে। সম্পন্ন পরিবার। বাপের একমাত্র ছেলে। কিন্তু আজ সকালেই তারা না করে দিয়েছে। সে জন্যই মেজাজটা বিগড়ে আছে অলকেশের। ভেবেছিলেন সামনের সপ্তাহে একবার কলকাতা যাবেন। তাঁর খুড়শ্বশুর একটা পাত্রের সন্ধান দিয়েছেন। তার মধ্যে এ সব উটকো ঝামেলা।

আজই খবর পেয়েছেন সামনের সপ্তাহে ডিআইজি সাহেব আসবেন, স্বাধীনতা দিবসের মিটিং করতে। কবে আসবেন এখনও জানাননি। এমনিতেই দৈনন্দিন কাজের হ্যাপা কম? আর তা ছাড়া, স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন করে তো এক পয়সাও উপরি আসবে না! অবশ্য ঠিকমত খেলতে পারলে একেবারে যে টু-পাইস করা যাবে না তাও হয়তো নয়! আসলে বড়সাহেব ঠিক কী চান, সেটা বুঝতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সেটা তো সামনের সপ্তাহের আগে হবে না। তখন হাতে আর বেশি দিন সময়ও থাকবে না। তার মধ্যেই...

এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই দূর থেকে ট্রেনের আওয়াজ পেলেন অলকেশ। স্টেশনমাস্টার ধীরেশবাবু তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

ট্রেন হুইস্‌লের একটা ভাষা আছে। রেলকর্মীরা সেই ভাষাটা বুঝতে পারেন। চারটে ছোট ছোট আওয়াজ, দু’-তিন সেকেন্ডের বিরতি, আবার চারটে ছোট ছোট আওয়াজ। কুক-কুক-কুক-কুক। তার মানে জরুরি সাহায্য দরকার ট্রেনের গার্ড বা চালকের। বড় ধরনের কিছু একটা গোলমাল।

ট্রেন এসে দাঁড়ানো মাত্রই ডেডবডি নামাতে অবশ্য বেশি সময় লাগল না অলকেশের। এ ক্ষেত্রে তো তিনি অল্প হলেও প্রস্তুতির সময় পেয়েছেন। অনেক সময় কোনও রকম অগ্রিম সতর্কীকরণ ছাড়াই এ ধরনের অবস্থা সামাল দিতে হয়েছে তাঁকে। তবে মৃতদেহটা শনাক্ত করা গেল না। ওই বৃদ্ধ বোধহয় একাই যাচ্ছিলেন ট্রেনে। সঙ্গে কেউ ছিল না।

এ অবস্থায় যা করা হয় তাই করলেন অলকেশ। বেওয়ারিশ ডেডবডি চালান করে দিলেন স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের মর্গে। সেখানে নিয়মমাফিক একটা ময়না তদন্ত করা হবে। কয়েক দিন পরে তাঁরা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাবেন। তার পর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। একটা ব্যাপারই একটু অবাক করেছে অলকেশকে। লোকটির মৃত্যু কী ভাবে ঘটল, সহযাত্রীরা কেউই নাকি বলতে পারেনি। দরজার কাছে গুটিসুটি হয়ে বসে ছিল লোকটি। হঠাৎই নাকি তার নিথর দেহ টান খেয়ে সামনের দিকে গড়িয়ে পড়ে। সে যে মৃত, এটা বুঝে উঠতে নাকি সময় লেগেছিল কাছেপিঠে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের।

অলকেশের অভ্যস্ত চোখ। বন্দুকের গুলিতে মৃত্যু, তাঁর বুঝতে অসুবিধে হয়নি। মৃতদেহের দিকে এক ঝলকের বেশি দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজনও বোধ করেননি তিনি। কিন্তু ট্রেন গার্ড সুধাময়বাবু বারে বারেই জোর দিয়ে বললেন যে কামরায় কোনও গোলাগুলি চলেনি এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। যে ক’জন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন অলকেশ, তাঁরাও সবাই একবাক্যে সুধাময় ঘোষের বক্তব্যকেই সমর্থন করলেন। গোলাগুলি তো দূরে থাক, কামরায় কোনও বচসাও নাকি হয়নি লোকটির সঙ্গে অন্য কারও। সে নাকি চুপচাপ বসে ছিল দরজার কাছে, হঠাৎই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

একটু বেশি সময় লাগল, কিন্তু তাঁর প্রাথমিক অনুমান যে নির্ভুল, এ কথা অলকেশ লাহিড়ী জানতে পারলেন কয়েক দিনের মধ্যেই। সে দিন ডিআইজি সাহেব এসেছেন। দফায় দফায় মিটিং চলেছে স্বাধীনতা দিবসের প্রস্তুতি নিয়ে। তাঁর সঙ্গে আর সুখদেব বর্মার সঙ্গে আলাদা আলাদা করে বৈঠক করেছেন ডিআইজি ইন্দুভূষণ মল্লিক। লাঞ্চের পর তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে বসবেন। সেই মিটিং-এ স্টেশন মাস্টারেরও থাকার কথা। এর ফাঁকেই এক বার নিজের অফিস ঘরে ঢুকেছিলেন অলকেশ। কোনও জরুরি বার্তা কোথাও থেকে এসেছে কি না দেখার জন্য। তেমন জরুরি কিছু নেই। কিন্তু হাসপাতাল থেকে অটোপ্‌সি রিপোর্টটা এসে পড়ে আছে।

গুলির আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে লোকটির। কিন্তু রিপোর্টে আর একটি তথ্য পেলেন অলকেশ। এক জায়গায় তাঁর চোখ আটকে গেল। ছাপানো কাগজটির যে অংশে মৃত ব্যক্তির লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য দুটি চৌকোনো বাক্স, পাশে ইংরেজিতে লেখা মেল অর ফিমেল, সেখানে কেউ এক জন সেই দুটি শব্দই কেটে দিয়েছেন। পাশে কালিতে লেখা রয়েছে ‘হিজড়া’। নীচে ডাক্তারের সই।

এত ব্যস্ততার মধ্যেও হাসি পেল অলকেশের। শ্যামলকে বলতে হচ্ছে ব্যাপারটা। কোথায় স্বাধীনতার ষাট বছরের ঝামেলা সামলাতেই জেরবার হয়ে যাচ্ছেন, এর মধ্যে বেওয়ারিশ ডেডবডি। তাও আবার শালা হিজড়ে!

 

•  (ক্রমশ)  •