সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষে মেয়েদের লেখাপড়া

বিদ্যাসাগরের আমলে প্রশ্ন তুলেছিল তৎকালীন ভারত সরকার। এ দিকে তাঁর পরামর্শেই স্কুলের মেয়েদের সেলাইয়ের পাশাপাশি, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল শেখানো শুরু হয়। দুশো বছর আগের এই মানুষটিকে বুঝলে সকলের জন্য শিক্ষা-র এই যুগে আজও গ্রামের গরিব বালিকা সংসারে খাটতে বাধ্য হত না, ধানখেতে পড়ে থাকত না তাদের রক্তাক্ত দেহ। অবন্তিকা পাল

girl education
শিক্ষাঙ্গন: মিড ডে মিলের বিরতিতে এখনকার স্কুলছাত্রীরা। ডানদিকে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ভাগের প্রচ্ছদ

চন্দ্রমুখী বসু ১৮৮২ সালে এবং পরবর্তী কালে স্বনামধন্য প্রথম দেশীয় নারী-চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় বেথুন কলেজ থেকে বাংলার প্রথম মহিলা স্নাতকের শিরোপা পেলেন। এই সাফল্য যতটা বাঙালি সমাজের, ততটাই স্কুল-প্রতিষ্ঠাতা ড্রিংকওয়াটার বেথুন ও তাঁর সুহৃদ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত। সর্বতোভাবে, ‘সবার জন্য শিক্ষা’ বলতে আজ যা বুঝি, ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন তাঁর ঘোষিত পথিকৃৎ। শ্রেণি নির্বিশেষে, লিঙ্গ নির্বিশেষে শিক্ষাগ্রহণের দরজাগুলিকে খুলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ব্রিটিশ কর্তারা যখন উঁচু জাতের ছেলে ছাড়া স্কুলে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন না, ঈশ্বরচন্দ্র তখন অতি অল্পবয়সেই সেই প্রচলিত ব্যবস্থার কঠোর বিরোধিতা করে, এমনকি মুচি-মেথরের ছেলেকেও শিক্ষালাভের পথ খুলে দিচ্ছেন। সাহেবদের অর্থানুকূল্যের তোয়াক্কা না করে, একের পর এক তৈরি করছেন বালিকা বিদ্যালয়। নিন্দিত হচ্ছেন, প্রতিহত হচ্ছেন। তবু নিজের ও সংসারের জন্য সামান্য অর্থ বাঁচিয়ে রেখে পুরো রোজগারটাই ঢেলে দিচ্ছেন স্কুলগুলির ব্যয়বহনে, জনহিতকর কাজে। না, ঈশ্বরচন্দ্র ঈশ্বর ছিলেন না। ফলত তাঁর মধ্যে ক্রোধ ছিল, আনন্দ-বেদনার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি ছিল। অর্ধশিক্ষিত ও উপহাসপ্রিয় বাঙালি বাবুদের প্রতিবন্ধকতায় তিনি ক্রুদ্ধ হতেন, বিব্রত হতেন। আবার বেথুন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে ঘরভর্তি বালিকাদের লেখাপড়া করতে দেখে আনন্দে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলতেন। দুশো বছর অতি নগণ্য সময়— এহেন মানুষের সাধনাকে অনুধাবন করতে বাঙালি আরও কয়েক শতাব্দী দায়বদ্ধ।

মেয়েদের শিক্ষা: তখন ও এখন

শুরু থেকেই এক শ্রেণির সুশিক্ষিত বাঙালি চেয়েছেন বই লিখে, বক্তৃতা দিয়ে নারীশিক্ষার মহিমা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবগত করতে। ১৮২২-এ ‘স্ত্রীশিক্ষাবিধায়ক’ নামে এমন একটি বই প্রকাশিত হয়। রচনাকার, পণ্ডিত গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার। দু’বছরের মধ্যে বইটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, তার তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৮৪০-এ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রীশিক্ষার গুরুত্ব বিষয়ে ইংরেজি ভাষায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে দুশো টাকা পুরস্কার পান। এর ঠিক দু’বছর পরেই, অর্থাৎ ১৮৪২ সালে ‘হিন্দু কলেজ’-এর ছাত্রদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা হয়। রামগোপাল ঘোষ মহাশয় ঘোষণা করেন, যে-দুই ছাত্র স্ত্রীশিক্ষার মাহাত্ম্য নিয়ে সবচেয়ে ভাল প্রবন্ধ লিখবে, তারা সোনা ও রুপোর পদক লাভ করবে। এই প্রতিযোগিতায় প্রথম হন মধুসূদন দত্ত, এবং দ্বিতীয় ভূদেব মুখোপাধ্যায়। 

১৮৪৭ সালে কলকাতার উপকণ্ঠে, বারাসত এলাকায় বাঙালি-পরিচালিত বাংলার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরোভাগে ছিলেন কালীকৃষ্ণ মিত্র, তাঁর দাদা নবীনকৃষ্ণ মিত্র এবং শিক্ষাবিদ প্যারীচরণ সরকার। এই বিদ্যালয় গঠনের প্রেক্ষাপটে ২৭ বছর বয়সি তরুণ ঈশ্বরচন্দ্রের সক্রিয় ভূমিকা না থাকলেও, তাঁর সমর্থন ছিল পূর্ণমাত্রায়। নবীনকৃষ্ণের কন্যা ও ঈশ্বরচন্দ্রের পরম স্নেহের কুন্তীবালা এই স্কুলের প্রথম ছাত্রী হিসেবে নাম লেখান। স্কুলের জমিটি যে হেতু দান করেছিলেন কালীকৃষ্ণ মহাশয়, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে পরবর্তী কালে বাংলার প্রথম স্বতন্ত্র বালিকা বিদ্যালয়টির নামকরণ হয় ‘বারাসাত কালীকৃষ্ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’।

বারাসতের ওই স্কুল বেথুন সাহেবকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, শহর কলকাতার মেয়েদের জন্য তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে উদ্যোগী হন। স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর গঠিত হয় ১৮৪৯ সালে। এই কাজে বেথুনকে সক্রিয় ভাবে সাহায্য করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ বিশিষ্টজন। স্কুলের প্রথম ছাত্রীরা ছিল মদনমোহন মহাশয়ের দুই কন্যা: ভুবনমালা ও কুন্দমালা। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এসে, মদনমোহন ‘সর্ব্বশুভকারী পত্রিকা’-র জন্য একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। কন্যাদের স্কুলে পাঠানোয় মদনমোহনের যে সব সতীর্থ ‘ওরে মদনা করলে কী’ বলে তীব্র তিরস্কার করেছিল, মদনমোহন যুক্তি সহকারে তাঁদের প্রত্যেকের অজ্ঞতাকে নস্যাৎ করলেন। তিনি দেশ-বিদেশের সফল নারীদের দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝালেন, বাঙালি মেয়েদের শিক্ষিত করা কতটা জরুরি। ১৮৪৯-এর ১০ মে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ সংবাদপত্রে মহাসমারোহে ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ স্থাপনের খবর প্রকাশিত হল ‘হিন্দু স্ত্রীলোকদিগের স্বাধীনতার শুভানুষ্ঠান’ শিরোনাম সহযোগে। নাতিদীর্ঘ সেই নিবন্ধে একটি বাক্য ছিল এই রকম: ‘বঙ্গদেশীয় অঙ্গনাদিগের অবস্থার বিষয় বর্ণন করিতে বসিলে দারুময়ী লেখনীও রোদন করে...।’

১৮৫০-এ দূর থেকে আগত বেথুন স্কুলের বালিকাদের গাড়ির বন্দোবস্ত থাকত। সেই গাড়ি লক্ষ্য করে পথচারীরা অশ্লীল মন্তব্য ছুড়ে দিত। এই দুশো বছরে পরিস্থিতির যে আমূল বদল প্রত্যাশিত ছিল, স্পষ্টতই তা ঘটেনি।

শুধুমাত্র চলতি বছরেই দেশে অন্তত তিরিশটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে স্কুলছাত্রীদের স্কুলের মধ্যে, স্কুলগাড়িতে অথবা স্কুলে যাতায়াতের হাঁটাপথে ধর্ষণ করা হয়েছে। নারীর নিরাপত্তা দিতে এই দেশ, এই সমাজ যে এখনও অক্ষম, সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। না-হলে মূলত এই বাংলায় সিঙ্গল-সেক্স স্কুলের প্রয়োজন ফুরোত। অথচ প্রাথমিক বিভাগ থেকেই এই বৈষম্য জিইয়ে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে, বালক ও বালিকা বিদ্যালয়ের বিভাজন করে। মদনমোহন মহাশয় বলেছিলেন, বহিরঙ্গের তফাতটুকু ছাড়া এক জন বালিকা বুদ্ধিমত্তার নিরিখে কোনও অংশেই এক জন বালকের সাপেক্ষে পিছিয়ে থাকে না, উপরন্তু বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রত্যুৎপন্নমতি। একুশ শতকের রাজ্যে, সমস্ত স্কুলকে কো-এডুকেশন হিসেবে রূপান্তরিত করা গেলে একশো সত্তর বছর আগেকার এই সরল তত্ত্বের বাস্তবায়ন সম্ভবপর হত। সমস্ত বাঙালি বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পড়তে যেত। জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই তারা অনুধাবন করত, এই সমাজের কাছে একটি মেয়ে ও একটি ছেলে সমান সুযোগ, সমান ব্যবহার প্রত্যাশা করে। বঙ্গীয় নারীরা প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন নিঃসন্দেহে। কর্মযজ্ঞে নিজেদের শামিল করতে পেরেছেন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলায় নিজেদের ছাপ রেখেছেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার পথগুলি যে আদৌ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৮৫০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র প্রথম ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’-এর অনারারি সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৮৫১ সালে এই পদটির স্থায়ীকরণ ঘটে। মূলত তাঁর পরামর্শেই স্কুলের মেয়েদের বই পড়া, হাতের লেখা অভ্যেস, পাটিগণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ভূগোল ও সূচিকর্ম শেখানো হতে থাকে। বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, জানানো হয়, অভিভাবকেরা আগ্রহী থাকলে ইংরেজি শিক্ষাও দেওয়া হতে পারে। ১৮৫০ থেকে ১৮৫৬— ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (পরে ‘বেথুন স্কুল’) কমিটির পরিচালনার দায়িত্বে সক্রিয় ছিলেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫৭-র নভেম্বর থেকে ১৮৫৮-র মে মাস— এই অল্প সময়ে তিনি তৈরি করেন ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয়। স্থান হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর, নদিয়া। বাংলার ছোটলাট তখন হ্যালিডে সাহেব, যাঁর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ। বিদ্যাসাগর ভারত সরকার তথা ইংল্যান্ড সরকারের অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই একে একে স্কুল খোলার প্রস্তাব দিচ্ছেন হ্যালিডে-কে। ছোটলাটও অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে অনুমোদন করে যাচ্ছেন। সমস্যা হল তখন, যখন দেখা গেল স্কুলগুলির কোষাগারে বালিকাদের বইপত্র কিংবা পণ্ডিতদের পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো ন্যূনতম অর্থও নেই। তাঁরা বিনা বেতনে, শুধুমাত্র ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মাসের পর মাস পড়িয়ে চলেছেন। কিন্তু কর্তব্যনিষ্ঠ ঈশ্বরচন্দ্র চাইলেন অনতিবিলম্বে সরকারি অর্থানুকূল্য পেতে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এ ভাবে চলতে থাকলে স্কুলগুলি অতি দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি একের পর এক চিঠি লিখতে থাকলেন ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশন ডিরেক্টর’-কে। ডিরেক্টর সাহেব সেই চিঠি পাঠালেন ইংল্যান্ড সরকারের উদ্দেশে।

কিন্তু না, ডিরেক্টর চাইলেও, অর্থের অভাব দূর হল না। উল্টে ভারত সরকার অভিযোগ করল, কার অনুমতিতে বিদ্যাসাগর এতগুলি বালিকা বিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন! বহু চেষ্টাচরিত্রের পর এককালীন সাড়ে তিন হাজার টাকা পাওয়া গেল, যা প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেকেরও কম। ভুললে চলবে না, বিদ্যাসাগর যখন বালিকা বিদ্যালয় নির্মাণে ব্যস্ত, বাংলার মাটিতে তখন সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। এক বছরকাল ব্যাপী চলতে থাকা টালমাটাল অবস্থার ফলে ব্রিটিশ সরকার সাময়িক ভাবে হলেও একটা প্রাথমিক ধাক্কা খেয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে সরকারি কোষাগারে। বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে ভারত সরকারের শিক্ষাখাতেও টান পড়ে।  এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সদ্য গড়ে ওঠে বালিকা বিদ্যালয়গুলি। বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন মেয়েদের শিক্ষা  কলকাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ুক। উপরন্তু এ মহাযজ্ঞে তিনি ইতিপূর্বে সরকারের নৈতিক সমর্থন ও আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। বলা যেতে পারে, এ ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের সময় অনুকূল ছিল না। ফলে ৪৩টি স্কুলের মধ্যে টিকে রইল মাত্র ৯টি। তিনি স্ব-উদ্যোগে একটি ‘নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাণ্ডার’ খুললেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেখানে অর্থদান করতে লাগলেন। কিন্তু ছাত্রীসংখ্যা কমে আসছিল। ফলত সরকারি সাহায্যের জন্য ১৮৫৮-র দ্বিতীয়ার্ধে বিদ্যাসাগর আবার এক-একটি স্কুলের খরচ আলাদা আলাদা ভাবে উল্লেখ করে অর্থ চাইতে লাগলেন। মাসিক ভিত্তিতে একে একে বেশ কয়েকটি স্কুল ভারত সরকারের পক্ষ থেকে টাকা পেতে লাগল। 

ছাত্রীদের পঠনপাঠনের বিষয় নির্বাচনে বিদ্যাসাগর যথাসম্ভব সাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। বালকদের সাপেক্ষে অতিরিক্ত যোগ হয়েছিল সূচিশিল্পের মতো কয়েকটি ‘মেয়েলি’ বিষয়। সময়টা উনিশ শতকের মাঝামাঝি। এমনিতেই প্রবল প্রতিবন্ধকতা আসছে বাঙালিদের মধ্যে থেকে। তার ওপর অর্থাভাব। তা সত্ত্বেও বালিকারা যাতে বিবিধ বিষয়ে নিজেদের পরিস্ফুট করার সুযোগ পায়, বিদ্যাসাগর সে ব্যাপারে সচেষ্ট হয়েছেন। এখন প্রশ্ন এই যে, এহেন মুক্তমনা মানুষটি কখনওই ‘ফিমেল নর্মাল স্কুল’ তৈরিতে সমর্থন জানালেন না কেন। এক বাক্যে তাঁর ভাবনার ব্যাপ্তিকে খাটো করে দেখলে তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার হবে না। ‘ফিমেল নর্মাল স্কুল’ অর্থাৎ বালিকাদের পড়ানোর জন্য বাঙালি মহিলাদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের স্কুল। সরকার মূলত বেথুন স্কুলের জন্য এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান তৈরিতে উদ্যোগী হয়। মেয়েরা যদি বাঙালি মেয়েদের দ্বারাই শিক্ষাপ্রাপ্ত হয় তবে আরও বেশি সংখ্যক বালিকার অভিভাবককে কন্যার স্কুলশিক্ষা বিষয়ে উৎসাহিত করা যাবে। ব্রিটিশদের এই প্রস্তাব যুক্তিপূর্ণ, কারণ ইংল্যান্ডেও দীর্ঘ কাল ধরে এমনটাই হয়ে আসছে।

কিন্তু পশ্চিম আর পূর্বে বড় রকমের সাংস্কৃতিক ব্যবধান আছে এবং ছিল, যা বিদ্যাসাগরের বিবেচনায় সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে। মেয়েরা স্কুলে পড়বে, শিক্ষিত পরিবারগুলিকে এ বিষয়ে সহমত করানো গিয়েছিল। কেননা পড়ুয়া মেয়েদের বয়স ছিল পাঁচ থেকে বারোর মধ্যে। বাল্যবিবাহে সিদ্ধহস্ত বাঙালি বারো-ঊর্ধ্ব মেয়েদের যে কখনওই পড়তে যাওয়ার অনুমতি দেবে না, বিদ্যাসাগর তা স্পষ্ট বুঝেছিলেন। এ জন্য নর্মাল স্কুলে অসম্মতি জানিয়ে প্রায় সমস্ত চিঠিতেই বিদ্যাসাগর মেয়েদের চরিত্রের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন। চরিত্র অর্থে নৈতিক চরিত্র, কারণ বিদ্যাসাগর কখনওই চাননি বিবাহিতা মেয়েরা স্কুলে পড়াতে গিয়ে সমাজের চোখে নিন্দিত হোক, পরিবারে ব্রাত্য হোক। সহজেই অনুমেয়, বিদ্যাসাগর কেন একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা নিয়েও সরব হন। এ সমস্তটাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুদীর্ঘ যাত্রাপথের অংশ। বিদ্যাসাগরের পরামর্শ উপেক্ষা করেই মেরি কারপেন্টার-এর কথামতো বেথুন স্কুল লাগোয়া নর্মাল স্কুল গঠিত হল। কিন্তু সেই স্কুলের স্থায়িত্ব ছিল সাকুল্যে তিন বছর। কিছু মহিলাকে পাওয়া গিয়েছিল প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য, যাঁদের বেশির ভাগই বিধবা। কিন্তু তাঁদের যাতায়াতে নিযুক্ত গাড়িটির জন্য কোনও মহিলা চালক পাওয়া গেল না। 

১৮৮২ সালে বেথুন কলেজ থেকে দেশের প্রথম মহিলা স্নাতক হিসেবে চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনীরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও মেয়েদের পর্দাপ্রথা কিন্তু উঠে গেল না। উল্লেখ্য যে, এই শিক্ষিত নারীরা অধিকাংশই ছিলেন প্রবাসী বাঙালি, বিত্তবান পরিবারের সন্তান। কয়েক দশক পরে, ১৯২৪ নাগাদ বেগম রোকেয়া যখন কলকাতায় এসে নারীশিক্ষা বিস্তারের জন্য সংগঠন তৈরি করতে চাইছেন,  তাঁকেও কিন্তু একই রকম নিন্দার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, স্বাধীনতার পর কিছুটা হলেও শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে মেয়েদের স্কুলমুখী করা গেল৷ নারীশিক্ষার পরিসরে শ্রেণিবৈষম্যের চিহ্ন এখনও অস্পষ্ট নয়। অকালে বিয়ে দিয়ে সংসারের জোয়াল টানতে টানতে ও সন্তানের জন্ম দিতে দিতে চিরক্লান্ত গ্রামীণ মেয়েদের কথা লিখতে গেলে দারুময়ী লেখনী বোধ হয় আজও কাঁদে। 

স্কুলছুট বনাম প্রকল্প

২০০৯-এ পার্লামেন্টে প্রস্তাবিত হল ‘রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট’। সবার জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে এই আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি পাশ হল ২০১০ সালে। সেখানে বলা হল, সংবিধান অনুযায়ী দেশের ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুরা বিনামূল্যে স্কুলে শিক্ষার সুযোগ পাবে। কিন্তু দেশের অবাঙালি রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে গত দশ বছরে মেয়েদের স্কুলছুটের হার আহামরি কিছু কমল না। ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, রাজস্থানের গ্রামগুলিতে ১০-১২ বছরের বালিকারা, বালকদের সাপেক্ষে ৮৫ শতাংশ বেশি গৃহশ্রম করে। এই শ্রমের মধ্যে যেমন বাড়ির লোকের জন্য রান্না করা আছে, তেমনই, মা কাজে বেরোলে ভাইবোনেদের দেখভালের দায়িত্বও রয়েছে। এই সব পারিশ্রমিকবিহীন কাজে বাধ্যত নিযুক্ত থাকার কারণে শিশুকন্যাদের স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়া হয়, স্কুলে যাওয়ার সুযোগই পায় না অনেকে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহের দৃষ্টিকোণটিও দৃঢ়। কমবয়সে বিয়ে দিলে কন্যাপণ কম দিতে হবে। ছ’-সাতটি সন্তানের মধ্যে অন্তত এক জনকেও অন্য সংসারে পাঠিয়ে দিলে পরিবারে খরচ কমবে। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য, মেয়েটির নিরাপত্তা। মাঠে-ঘাটে ধর্ষিত দেহ পড়ে থাকার দৃষ্টান্ত একুশ শতকে নিছক কম নয়। বিয়ে দিয়ে দিলে চোখে চোখে রাখার গুরুদায়িত্ব থেকে অভিভাবকদের নিষ্কৃতি। এমনিতেই অর্থকষ্টে জর্জরিত, তার ওপর মেয়ের এক বার ‘দুর্নাম’ রটে গেলে বিয়ে দেওয়াই যে অসম্ভব হয়ে পড়বে!  

তবে ভরসার কথা এই যে, বিদ্যাসাগরের বাংলায় ছবিটা এতটাও অন্ধকারাচ্ছন্ন  নয়। ‘অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট’ (অসর)-এর সমীক্ষায় পাওয়া ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গের চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জকই বলা যায়। সর্বভারতীয় এই সমীক্ষায় সম্প্রতি জানা গেল, ২০০৬ সালে এ রাজ্যে বয়ঃসন্ধির (নবম ও দশম শ্রেণির) মেয়েদের স্কুলছুটের হার যেখানে ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ,  ২০১৮-র শেষে সেই হার ২০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৮ শতাংশ। গ্রাফ দেখলে বোঝা যাবে, ২০১২-র পর থেকে মেয়েদের স্কুলছুটের হার দৃশ্যতই কমেছে। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে এ রাজ্যে শুরু হয় ছাত্রীদের জন্য অধুনা জনপ্রিয় একটি প্রকল্প। বৃহত্তর বঙ্গভূমি অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অন্য দুই রাজ্য, বিহার ও ওড়িশাতেও মেয়েদের স্কুলছুটের হার হিন্দি বলয়ের চেয়ে অনেকটা কম। 

পড়ুয়া কিশোরীদের যৎসামান্য অর্থ বা উপহার দিয়ে উদ্বুদ্ধ করার দৃষ্টান্ত বাঙালিদের কাছে নতুন নয়। ১৮৭৬-র এপ্রিলে ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ লিখছে: ‘সম্প্রতি আমাদিগের দয়াশীল গবর্ণমেন্ট স্ত্রীশিক্ষার উন্নতিসাধনার্থ দুইটী কার্য করিয়াছেন। প্রথমত, ছাত্রীবৃত্তিস্থাপন। দ্বিতীয়, বালিকাবিদ্যালয়ের পরিদর্শিকা নিয়োগ।... আপাতত বর্দ্ধমান, প্রেসিডেন্সী এবং ঢাকা এই তিন বিভাগে ছাত্রীবৃত্তির ব্যবস্থা হইতেছে, কারণ এই তিন বিভাগে স্ত্রীশিক্ষার সমধিক উন্নতি হইয়াছে, স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি দেখিলে অন্য অন্য বিভাগেও এ রীতি প্রবর্ত্তিত হইবে। ছাত্রীবৃত্তি দ্বারা স্ত্রীশিক্ষার যে কিয়ৎ পরিমাণে উৎসাহ দান করা হইবে তাহার
সন্দেহ নাই।”

শিবনাথ শাস্ত্রী এক দিন বড় মেয়ে হেমলতাকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যাসাগরের বাড়ি চলেছেন। রাস্তায় হেমলতা হঠাৎ চিন্তিত হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করল, এই যে ষোলো বছর বয়সেও সে অবিবাহিত, এ কথা জানলে পণ্ডিতমশাই কি কিছু মনে করতে পারেন? পিতা জানালেন, বিদ্যাসাগর সমস্ত রকম কুসংস্কার থেকে মুক্ত। এর পর বিদ্যাসাগরের বাড়িতে দীর্ঘ ক্ষণ আলাপচারিতা চলল। বেরনোর উপক্রম হলে শিবনাথ শাস্ত্রী, মেয়ের আশঙ্কার কথা বিদ্যাসাগরকে জানালেন। বিদ্যাসাগর হেমলতাকে বললেন, বিয়ের সময়ে তাঁর নিজের মেয়েদের বয়স হেমলতার চেয়েও বেশি ছিল। সকৌতুকে এও বললেন, তোমার বাবা যদি সুপাত্র খুঁজতে অসমর্থ হন, তবে উপযুক্ত পাত্র হিসাবে আমি হাতের কাছেই আছি। 

এ শতাব্দীতেও দেশ লড়াই করে চলেছে বাল্যবিবাহ নামক জ্বলন্ত সমস্যাটির সঙ্গে, যা মেয়েদের স্কুলছুটের অন্যতম প্রধান কারণ। গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের অষ্টম বা নবম শ্রেণির চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে অভিভাবকেরা জোর করছেন না, সেখানেও পরীক্ষাভীতি থেকে মুক্তি পেতে, অথবা এক বার অনুত্তীর্ণ হওয়ার লজ্জায় বিবাহকেই উপযুক্ত নিষ্কৃতির পথ ভেবে বসছে কিশোরীরা। এ রাজ্য বাল্যবিবাহ মোকাবিলায় ২০১৮-তে চালু করল আর-একটি প্রকল্প। আঠেরো বছরের বেশি যে সব মেয়েরা মাধ্যমিক স্তর অবধি পড়াশোনা করে বিয়ে করছে, তারা ও তাদের পরিবার বিবাহের জন্য পাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। সমালোচনা সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ‘টার্গেট’ কিন্তু শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার নয়। কারণ তাদের পরিবারের মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসরকারি স্কুলমুখী। সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তারা কতিপয় শহর ও মফস্সলের নিম্নবিত্ত পরিবার, এবং মুখ্যত গ্রামের অধিবাসী। প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অর্থ একাধারে যেমন তাদের কাছে ‘প্রয়োজন’, অন্য দিকে একটি পুরস্কার স্বরূপ, সমাজের উন্নতিসাধনে শামিল হওয়ার পুরস্কার।

১৮৫০ সালে হিন্দু স্কুলের সিনিয়র ছাত্ররা ‘সর্ব্বশুভকারী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা চালু করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁদের জন্য যে লেখাটি দেন, তার শিরোনাম ছিল ‘বাল্যবিবাহের দোষ’। বালিকাদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে, সুস্থ, স্বাভাবিক ও সমর্থ সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যে অত্যাবশ্যক, দূরদর্শী বিদ্যাসাগর তা উনিশ শতকে বসে প্রতি মুহূর্তে অনুধাবন করেছেন। দীর্ঘ প্রবন্ধটি ১৭০ বছর পরেও বিজ্ঞান ও সমাজবিদ্যার পরিসরে গবেষণার বস্তু হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক বাংলায় নারীশিক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা অনেক বেশি তৎপর। একে একে দূরীভূত হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৌচালয়ের সমস্যা। কো-এডুকেশন স্কুলের ক্ষেত্রে জায়গার অভাব দূর করার চেষ্টা চলছে। নবজাগরণের আদর্শগুলিকে মাথায় রেখে, তাকে সময়োপযোগী করে তুলে, মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগকে যত ত্বরান্বিত করা যায়, জাতির পক্ষে ততই মঙ্গল।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন