লম্বা ছায়াটা চুপ করে আছে তাঁবুর মুখে। নতমুখ, কপালে ঘাম। ভারী বুট এলোমেলো আঁচড় কাটছে মেঝেতে। স্তব্ধ দুপুরে অস্বস্তিটা স্পষ্ট ধরা পড়ে যাচ্ছে: ‘মাফ কর দে না দোস্ত... মেরা কোই কসুর তো নেহি হ্যায়!’

জলপাই পোশাকের দীর্ঘ হাতটা এগিয়ে আসে যাঁর দিকে, তাঁর ফ্যালফেলে চোখ ধীরে ধীরে স্যাঁতসেঁতে হয়ে ওঠে। মোমিন খানের বিদায়ী ছায়াটা এখনও লম্বা হয়ে পড়ে আছে তাঁর স্মৃতির উঠোনে।

দেওয়াল-ঘেঁষা চৌকির কোনায় রংচটা বালিশটা কোলে টেনে আটান্ন বছর আগের এক দুপুরে পানকৌড়ির মতো ডুব দিচ্ছেন সমীররঞ্জন চৌধুরী— ‘‘পাকিস্তান এয়ারবেসে সেটাই ছিল আমার শেষ দিন।’’ সেই সব টুকরো টুকরো ছবি এখনও মাছির মতো বিনবিন করে তাঁর চোখের সামনে। পাকিস্তানের কোয়েটা এয়ারবেসে ফেলে আসা গ্রাউন্ড ক্যাপ্টেন-জীবনের দশটা বছর গত কয়েক দিনে যেন নতুন করে বাসা বেঁধেছে তাঁর আটপৌরে জানলায়।

পূর্ব শহরতলির সরু গলি আর পাড় বাঁধানো পুকুরের কোলে আঢাকা নর্দমা পেরিয়ে তাঁর বাড়ির দরজায় পৌঁছলে খুব সন্তর্পণে ডেকে নিচ্ছেন ভিতরে। তার পর ফিসফিস করে বলছেন, ‘‘সময়টা বড় দ্রুত বদলে যাচ্ছে জানেন! মন খুলে যে একটু পুরনো দিনে ফিরব, তারও আর জো নেই, সবাই যেন চোখ রাঙিয়ে আছে!’’

পুলওয়ামা এবং তার পাল্টা হানার আবহে আদ্যন্ত এক বাঙালির পাক বায়ুসেনা-জীবনের খোঁজ নিতে গিয়ে তাই শর্তের কাছেই মাথা নোয়াতে হয়— নাম যদি বা জানানো যায়, ঠিকানা কিংবা ছবি, নৈব নৈব চ! চায়ের কাপে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে খানিক চুপ করে থেকে তাই বলছেন, ‘‘দোষ তো করিনি কিছু। পরিস্থিতির ফেরেই তো আমাকে যোগ দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের বায়ুসেনায়!’’ 

তার পর, একের পর এক, নিশ্চুপে বদলে গিয়েছে তাঁর দেশ, আর রাষ্ট্রের অনুশাসনে বারে বারে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। সমীররঞ্জন তাঁর ক্লান্ত মাথাটা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বলছেন, ‘‘দেশ তো স্বেচ্ছায় বদল করিনি, পরিস্থিতিই বারে বারে ঠেলে দিয়েছে সীমান্তে, আর বদলে দিয়েছে আমার স্বদেশের ঠিকানা!’’

নারকেল-সুপুরির ছায়া-ঢাকা পথ। বাড়িটা যেন আগলে রেখেছে নিম-কাঁঠালের সারি। জন্ম এবং নাবালক বয়সটা পূর্ববঙ্গের নরম ছায়াচ্ছন্ন চট্টগ্রামের এক শহরতলিতে বেড়ে ওঠা তাঁর। অথচ নিবিড় শান্ত সেই গ্রাম, দেশভাগের পরে রাতারাতি অচেনা হয়ে উঠেছিল যেন। সেই সব দিন-রাত্রির কথা এখনও মনে আছে তাঁর। 

পাড়াপড়শিদের অনেকেই আঁধারের আড়ালে ভিটে-গোয়াল-ধানজমি পিছনে ফেলে চোখ মুছে বদলে ফেলেছিলেন বাপ-ঠাকুরদার দেশ। কেউ পাড়ি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে, কেউ বা আরও দূরের কোনও অচেনা বসতে। সমীররঞ্জনের মনে আছে, বন্ধু-প্রতিবেশী-স্বজন সব হারিয়ে খাঁখাঁ সেই গ্রামটার কথা। বলছেন, ‘‘দেশভাগের ঝড়ঝাপটা আমাদের উপরেও যে আসেনি এমন নয়। হুমকি, চোখ রাঙানো, ভয় দেখানো, সবই মুখ বুজে সইতে হয়েছে দিনের পর দিন। কিন্তু নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে দেশ বদল করতে রাজি ছিল না আমাদের পরিবার।’’ 

তাই, পুরনো খেলার সাথী রাতারাতি মুখ ফেরালেও, গ্রামের চেনা সারল্যে ভ্রুকুটির ভাঁজ দেখা দিলেও, ছিন্নমূল না হয়ে বরং আষ্টেপৃষ্ঠে চেনা মাটিতেই শেকড় ছড়িয়েছিলেন তাঁরা। পরিস্থিতি থিতিয়ে এলে আপন আবাসে পুরনো স্বস্তিই বুঝি খুঁজেছিল চৌধুরী পরিবার। টিকে থাকার সেই লড়াইয়ে দেশভাগের যন্ত্রণা ছিল, তবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসংখ্য পরিবারের মতো ভিটে-ছাড়া না-হওয়ার নীরব স্বস্তিটুকুও ছিল বইকি। 

সমীররঞ্জন বলছেন, ‘‘হয়তো মেনে নিতে হয়েছিল অনেক অন্যায় আবদার, কিন্তু দেশ ছাড়ার কথা কখনও ভাবতে পারিনি।’’ নিজের উঠোনে রয়ে যাওয়ার সেই আপাত স্বস্তির মাঝেই, কিশোরবেলার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। আর তখনই, আচমকা তলব হয়েছিল পাক সেনাবাহিনীতে। 

নিপাট বাঙালি যুবা, কিছুটা ভয় আর খানিক অস্বস্তি নিয়েই পাড়ি দিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে। বছরখানেকের প্রশিক্ষণ পর্ব মিটলে, ১৯৬১’র জুন মাসে সদ্য-তরুণ প্রথম পোস্টিং পেয়েছিলেন। পুব-বাংলার সবুজ ছেড়ে এক্কেবারে পশ্চিম সমুদ্রের তীরে ঝাঁকে ঝাঁকে এফ-৮৬, ক্যানবেরা আর সাবরে বিমানের পরিচর্যা— বায়ুসেনা জীবনে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল এ কাজেই। পাক বায়ুসেনার গ্রাউন্ড ক্যাপ্টেন হতে চলা ছেলেটির সামনে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ‘এনিমি টার্গেট’— ইন্ডিয়া। 

পুরনো টেবিলের উপরে টিভির পর্দা জুড়ে থরথর করে কাঁপছে ঘোষিকার গলা। ঝিমঝিম আলো-আঁধারি ফুঁড়ে সীমান্তের লম্বা করিডর, ওয়াঘা উজিয়ে অটারীর মাটির দিকে ছন্দোবদ্ধ পা ফেলে এগিয়ে আসছেন অভিনন্দন বর্তমান। 

মিগ-ভাঙা উইং কমান্ডারের প্রত্যাবর্তনের সেই সন্ধেয় ফুলকাটা প্লেটের উপরে ঠক করে খালি চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন সমীররঞ্জন। পাঞ্জাবির খুঁটে চশমার কাচ মুছে খুব নিচু স্বরে বলছেন, ‘‘এই সব দিনে, এখনও মনে পড়ে মানসিক নির্যাতনের সেই রাতগুলো। জানেন, শেষ রাতে আমাদের ঘুম থেকে তুলে দেওয়া হত। ব্যারাকের সামনে দাঁড় করিয়ে জারি হত হুকুম, ড্রিল শুরু কর! ঘণ্টাখানেকের পরিশ্রমের পরে সবে হয়তো ক্যাম্পে ফিরেছি, ফের তলব হল— এ বার নির্দেশ ফাইল করে দাঁড়ানোর। অন্ধকার রাতে শুরু হল মাথা গুনতি!’’ মাথা গুনে গুনে এ ভাবেই এক সময়ে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল পাক ফৌজের বাঙালি সেনাদের। 

তবে সে সব অনেক পরের কথা। তার মাঝে অবশ্য বায়ুসেনার ক্লাসে তাঁদের পাখিপড়া করে শেখানো হয়েছে এনিমি টার্গেটের রূপরেখা। শেখানো হয়েছে, থাকতে হবে অপেক্ষায়, আর সুযোগ পেলেই তিরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে ফেলতে হবে পড়শি দেশের মাঠ-ঘাট-বসত।

সেনা বাহিনীর সেই খর জীবনে সুযোগটা প্রথম এসেছিল ১৯৬৫ সালে। ‘‘কালো ব্ল্যাকবোর্ডে হলুদ চক দিয়ে এঁকে এঁকে বোঝানো হত ভারতের আকাশ সীমা লঙ্ঘনের ফাঁক-ফোঁকরগুলো। বুঝিয়ে দেওয়া হত, কী ভাবে কখন আমাদের ভেসে পড়তে হবে ‘শত্রু’ আকাশে। তার পর ‘কাজ’ সেরে কী ভাবে ফিরে আসতে হবে পাক বায়ুসেনার নিরাপদ ডেরায়,’’ মাথা নিচু করে একটানা কথাগুলো বলে খানিক থামলেন তিনি। যুদ্ধ না থাকলেও বায়ুসেনার সেই শিবির যেন যুদ্ধের গন্ধ নিয়েই গরম হয়ে ছিল বছরের পর বছর। সমীররঞ্জন বলছেন, ‘‘বলতে দ্বিধা নেই, সেই সময়ে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমাদের মধ্যে যেন নিঃশব্দে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল পড়শি দেশের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের বিষ। বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, হ্যাঁ, এটাই আমার কাজ, এটাই লক্ষ্য!’’

সে বার ভারত-পাক যুদ্ধ শুরু হল। ব্যারাকে-বেসে শুরু হল তাঁদের ‘স্পেশাল ট্রেনিং’। সেই সব প্রশিক্ষণ পর্বের পরে বরাদ্দ থাকত লম্বা একটা ক্লাস। তাঁর মনে পড়ছে, ‘‘ভারত-বিরোধী উত্তেজক কথার নিরন্তর চাষ চলত সেই সব ক্লাসে। তার পর ছিল ‘বুস্টিং সেশন’। যুদ্ধ মহড়ার পরে হইচই নাচের আসর, যেন এইমাত্র এনিমি টার্গেটে বম্বিং করে গুঁড়িয়ে এলাম কোনও শত্রু ঘাঁটি!’’ যুদ্ধের সেই সব বোমারু রাতে টি-লিঙ্কে বসে পাক বায়ুসেনার সাফল্যে তাঁকেও উল্লাসে মেতে উঠতে হয়েছে। ‘‘হ্যাঁ, তা ছিল বাধ্যতামূলক’’, একটা দীর্ঘশ্বাস যেন ধাক্কা খায় শহরতলির রংচটা দেওয়ালে। 

যুদ্ধে পাক বাহিনী যে ক্রমেই পিছু হটছে, এ খবর আসতে শুরু করেছিল দিন কয়েক পরেই। ফৌজিরা যাতে দমে না যান, সে জন্য তাঁদের উৎসাহিত করার বহর গেল বেড়ে। কিন্তু উৎসাহের আড়ালে কি আর ধামাচাপা দেওয়া যায় সবটুকু! সমীররঞ্জন বলছেন, ‘‘চাপা স্বরে কর্তাদের আলোচনা, তাদের মুখের ভাঁজে হতাশায় ধরা পড়ছিল অনেক না-বলা কথা। খবর আসছিল, বিভিন্ন সীমান্তে পাকিস্তান বায়ুসেনার ক্যানবেরা কিংবা সাবরে বিমান একের পর এক ভেঙে পড়েছে। ফৌজিদের মন যাতে ভেঙে না যায়, সে জন্য গ্রাউন্ড স্টাফদের কাছে যুদ্ধের আপডেট আসাও এক সময় বন্ধ হয়ে গেল।’’

ব্যারাক জুড়ে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকল সংশয়, ভয় আর বিভ্রান্তি। সেই বিভ্রান্তির কুয়াশা আরও গাঢ় হতে শুরু করেছিল ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা থিতিয়ে আসতেই।  

ঝাঁক ঝাঁক যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ সত্যিই এক সময়ে চুপ করে গিয়েছিল। বায়ুসেনার বাঙালি কর্মীদের কাছে কানাঘুষোয় আসতে থাকল খবর— পুবের দেশে রোষ জমছে। খবর পাচ্ছিলেন, অনেক দূরে পড়ে থাকা তাঁর স্বদেশ, নিম-কাঁঠালে ঘেরা তাঁর শহরতলির বাড়ি, তাঁর খেলার মাঠ, পুরনো স্কুলের আনাচ-কানাচে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে খান সেনার হানাহানি। সুদূর করাচি-কোয়েটা-চাকওয়ালের এয়ারবেসে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সেনারা বুঝতে পারছিলেন, সংগোপনে যুদ্ধের গর্ভে সাবালক হয়ে উঠছে পূর্ব পাকিস্তান। আর তা গুঁড়িয়ে দিতে, যে ‘স্পেশাল ট্রেনিং’য়ে এত দিন সড়গড় হয়ে উঠেছিলেন সমীররঞ্জনেরা, তারই প্রয়োগ শুরু হয়েছে ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, চট্টগ্রামের মাঠঘাটে। খান সেনার বেয়নেটের খোঁচা যেন বিঁধতে থাকল তাঁদের পাঁজরে। কোলের বালিশটা সজোরে বিছানার উপরে ছুড়ে ফেলে তিনি বলছেন, ‘‘সেই প্রথম বুঝলাম, যে শিক্ষা পেয়েছি এত দিন, তারই আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে উঠছে আমার ফেলে আসা স্বদেশ।’’ সেই বিকেলটা এখনও পুকুরের অতল থেকে যেন বুজকুড়ি কেটে উঠে আসে তাঁর কাছে। 

খবর এল, ভারতীয় নৌবহর, আইএনএস বিক্রান্ত-এর উপরে আক্রমণ হেনেছে পাক বোমারু বিমান। মেঝেতে ভারী বুট ঠুকে খান সেনাদের নাচে উচ্ছল হয়ে উঠেছে কোয়েটা এয়ারবেসের লন। সেই উল্লাসের বিকেলে সেনা ব্যারাকের এক নিঝুম রেন-ট্রির নীচে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বলছেন, ‘‘সে দিন প্রথম পাক আনুগত্যে রোষ জমল। মনে হল, এ কী আত্মঘাতী কাজ করে চলেছি!’’ দেয়ালে ঠেকানো মাথা সামান্য এলিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘‘সেই শুরু। তার পর একটু একটু করে পাক আনুগত্য মুছে যেতে থাকল। মনে হল, সদ্য ভূমিষ্ঠ হতে চলেছে আমার নতুন স্বদেশ, বাংলাদেশ। আর, ভারতবর্ষ নামে যে দেশটা ধাইমার মতো পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ভূমিষ্ঠ হতে সাহায্য করছে, তার বিরুদ্ধেই কি না বন্দুক ধরেছি!’’ নিভৃতে জমে ওঠা সেই আক্ষেপের আঁচ তা হলে কি বাঙালি সেনাদের চোখেমুখে আঁকিবুঁকি কেটেছিল কিছু?  

মাসখানেকের মধ্যেই চিঠি এল। নিপাট তিন লাইনের চিঠি— ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবন্দি করা হল আপনাকে।’ তখন বর্ষা। কাজ থেকে ছুটি হয়ে গেল সমীররঞ্জনের। তিনি একা নন, বিভিন্ন ব্যারাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় সাড়ে ন’শো বাঙালি সেনাকে জড়ো করা হল এক জায়গায়। ‘‘শুরু হল মানসিক পীড়ন। মধ্যরাতের প্যারেড, রাতবিরেতে ড্রিল করানোর পাশাপাশি বন্ধ হল তেল-সাবান, চুল-দাড়ি কাটার নাপিত, হুহু করে কমে গেল বরাদ্দ রেশন। মাসিক ভাতা কমে দাঁড়াল মাত্র ২০ টাকা।’’ প্রায় দেড় বছর যুদ্ধবন্দি থাকার পরে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হল নতুন স্বদেশ, বাংলাদেশে।

টিভি’টা বন্ধ করে দিলেন। অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘‘সে-ও যেন ছিল এক প্রত্যাবর্তন!’’

ফাগুনের অকাল বৃষ্টিরাতে কাশি শুরু হল তাঁর। বলছেন, ‘‘কোনটা যে স্বদেশ আর কোনটা নয়, বুঝতে পারি না আর। তবুও টুকরো টুকরো সেই সব উষ্ণ আদরগুলো মনে পড়ে এখনও।’’

হলুদ টিনের বোর্ড দিক নির্দেশ করছে— বিএন ৩৭। লবুজ লনের কোল ঘেঁষে সার দিয়ে তাঁবু। পতপত করে উড়ছে চাঁদ-তারা সবুজ পতাকা। সাড়ে পাঁচশো বায়ুসেনার ব্যাটেলিয়ন জুড়ে রোজার মাস। শুধু তিনিই ভিন্নধর্মী, হিন্দু। নিঝুম রান্নাঘরের এক কোনায় ফুটছে ফেনা উথলানো ভাত। হাঁড়ির মধ্যে মাথা কুটে মরছে জোড়া ডিম। এ বেলাটা ডিম-ভাতে পার করে দিতে পারলে রাতে চিকেন সুরুয়া অপেক্ষা করছে। সমীররঞ্জন বলছেন, ‘‘যুদ্ধের বাইরেও একটা জগৎ ছিল। পরস্পরের প্রতি ছিল সহানুভূতি, সহমর্মিতা। ভাবতে পারেন, যুদ্ধবন্দি হওয়ার পরেও আমার পিঠে হাত রেখে উইং কমান্ডার আক্রম রেজা আর সেলিম খান জানিয়ে গিয়েছিল, ‘হিম্মত রাখ চৌধুরি, জিত তেরাই হোগা।’’ মোমিন খানের বাড়িয়ে দেওয়া সেই হাত এখনও প্রলম্বিত ছায়ার মতো পড়ে আছে তাঁর উঠোনে।

নতুন বাংলাদেশে পুরনো শেকড় আর প্রোথিত হল না। 

অনেক দিন পরে পশ্চিম থেকে পুবে ফিরে টের পেলেন, চেনা বাংলাদেশ যুদ্ধের ছায়ায় অচেনা হয়ে উঠেছে। পা ছড়িয়ে সুখ-দুঃখের গল্প করা পড়শি কখন যেন সরে গিয়েছেন অনেক দূরে। যে প্রতিবেশীর ভরসায় দেশ আঁকড়ে পড়ে ছিলেন এত দিন, তাঁর মুখেও যেন অচেনা কাঠিন্য, পাড়ার লাইব্রেরিতে বইগুলোও যেন অন্য মলাটে বদলে গিয়েছে। যে আপ্রাণ গরবে আঁকড়ে ছিলেন এত দিনের স্বদেশ, সেও বুঝি নতুন পড়শির মতো অচেনা। 

দেশ ফের বদলে গিয়েছিল সমীররঞ্জনের। অনেক টানাপড়েনের পরে, এক রাতের ট্রেনে সপরিবার শিয়ালদহ স্টেশনে এসে নেমেছিলেন। মাস কয়েক আত্মীয়বাড়িতে আশ্রিত থাকার পরে এক সময়ে থিতু হয়েছিলেন কলকাতায়। শহরের উপকণ্ঠে এক আধা-মফস্‌সলে নিতান্তই সাদামাটা তাঁর ঠিকানা। পাক বায়ুসেনার প্রাক্তন গ্রাউন্ড ক্যাপ্টেনের আটপৌরে বাড়ির ছাদে ছায়া ফেলে ভেসে যায় উড়োজাহাজ, আর তাঁর জানলায় রাতচরা পাখির মতো উড়ে আসে অতীত। অস্ফুটে বলেন, ‘‘আখির মেরা তো কুছ কসুর নেহি থা...’’