হলিউডের বিখ্যাত কমেডিয়ান স্টিফেন কোলবা| আমেরিকার নানা রিয়ালিটি শো-তে তিনি এখনও মানুষকে মাত করে রাখেন| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব অস্বস্তিতে থাকেন স্টিফেনকে নিয়ে| তাঁকে খুব ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেন| সেই স্টিফেন একটা নতুন শব্দ আমদানি করেছেন, শব্দটি হল, ‘ট্রুথিনেস’ (truthiness)। এটা সত্য নয়| তবে কী? যেটাকে মানুষ সত্য বলে মনে করছে| বাস্তব ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই | বরং বলা যায় সেটা এক ধরনের মিথ্যা|

গোটা পৃথিবীতে শাসক গণতন্ত্রের এহেন truthiness তৈরি করে| ট্রাম্প থেকে মোদী| বিষয়টা নিয়ে যখন ভাবছি, ঠিক সে সময় হাতে এসে ঠেকল একটা বই| দীপঙ্কর সিংহর ‘দ্য ইনফরমেশন গেম ইন ডেমোক্র্যাসি’| দীপঙ্কর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক| দীর্ঘ দিন ধরে মিডিয়া তথ্য এবং সংযোগ, এই বিষয় নিয়ে তিনি লিখে চলেছেন| গবেষণা করে চলেছেন| রাউটলেজ আন্তর্জাতিক এডিশন এই বইটি| যা নিয়ে সারা বিশ্বের বিদ্বৎসমাজে আলোচনা শুরু হয়েছে| এই বইটিতে দীপঙ্কর বলছেন, এই সময়ে মিডিয়া পুঁজিবাদের একটা বিরাট প্রকোপ আমাদের রাজনৈতিক এবং সমাজ জীবনে এসে পড়েছে| মিডিয়া হয়ে উঠেছে এক প্রবল পরাক্রান্ত শক্তি| এই শক্তির ভাল প্রভাব যেমন আছে তেমনই খারাপ দিকও আছে| মিশরে টিউলিপ বিপ্লবে মিডিয়ার ভূমিকা ছিল বিরাট| আবার মৌলবাদী শক্তি সে বিপ্লবেও মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করেছিল! প্রতিবিপ্লব আর বিপ্লব গুলিয়ে গিয়েছিল ফেসবুক বিপ্লবে| শাহবাগ আন্দোলনে মিডিয়াকে ব্যবহার করেছিল প্রগতিশীল শক্তি, আবার জামাতরাও মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের মতো করে সত্যকে ‘ম্যানুফ্যাকচার’ করে|

দীপঙ্কর বলছেন, প্রকৃত সত্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে এই ‘মিডিয়াটাইজড’ (mediatized) সত্য| দীপঙ্কর নাম দিয়েছেন, ‘মিডিয়াটাইজড’ গণতন্ত্র| এখানে রাজনৈতিক শক্তি তথ্যকে নিয়ে খেলছে| দীপঙ্কর বলছেন, আগে বলা হত ইনফরমেশন সোসাইটি, এখন সেটাকে বলা হচ্ছে নেটওয়ার্ক সোসাইটি| সামাজিক রূপান্তরের আর একটা নতুন স্তর| এখন জনগণকে একটা নির্বাচিত অংশ পরিবেশন করা হবে| সেটা জেনে মানুষকে গণতন্ত্রে খুশি রাখার চেষ্টা হবে| স্টিফেন কোলবা একেই বলছেন ট্রুথিনেস!

গণতন্ত্র মারা যাচ্ছে ট্রাম্প জমানায় এমনটাই অভিযোগ।ছবি এএফপি।

ভূমিকাতেই দীপঙ্কর দু’টি কার্টুনের কথা বলেছেন, একটিতে দেখা যাচ্ছে একটি টিভি শো| বিতর্ক হচ্ছে| আগে থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, কী প্রশ্ন করা হবে? অর্থাৎ প্রি স্ক্রিন্ড প্রশ্ন! রাজনেতা বলছেন. আমার জবাবটাও স্টক আনসার| কিন্তু প্রতিপক্ষ এবং সমস্ত মানুষকে অস্ত্রহীন করে দেওয়ার জন্য আমি রাখব একটা কেয়ারফুলি রিহার্সড জোক|

ভাবুন! কোথায় জনগণ? কোথায় রাজনেতা? আর কোথায় টিভি মিডিয়া? কে কোথায় দাঁড়িয়ে? দ্বিতীয় জোকটি হল, এক জন আমেরিকান সেনেটরের সচিব এসে তাঁর বসকে বলছেন. আপনি আপনার বক্তৃতায় প্রায়ই যে আমেরিকার জনগণের কথা বলেন, তিনি এসেছেন| আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান| অতএব, ভারতের ১৩০ কোটি মানুষ এখন এই ‘মিডিয়াটিজড’ গণতন্ত্রে একটা চরিত্র।

গোটা পৃথিবী জুড়ে এই আলোচনা শুরু হয়েছে| পোস্ট ট্রুথ পোস্ট ফ্যাক্ট জমানা একেই বলা হচ্ছে| আমেরিকায় এই বিষয়ে প্রচুর বই লেখা শুরু হয়েছে ট্রাম্প জমানায়| বলা হচ্ছে গণতন্ত্র মারা যাচ্ছে! আবার ট্রাম্প ভক্তরা সম্প্রতি মিডিয়াতে পাল্টা প্রচার শুরু করেছেন, আমেরিকায় শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রেরই জয় হচ্ছে! এ বার ‘টাইম’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিবন্ধ, আবার গণতন্ত্র বাঁচছে!

দ্য ট্রুথ ম্যাটার্স— এই বইটি লিখেছেন ব্রুশ বেরলেট। তিনি বলছেন, এই বইটি হল মার্কিন নাগরিকের গাইড, ফেক নিউজ আর মিথ্যা সংবাদ থেকে সত্যকে আলাদা করার। লেখক নিজে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সচিব ছিলেন। তিনি ফেক নিউজ-এর জন্য মিডিয়াকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়ার খবরে মানুষ কোনও দিনই সন্তুষ্ট ছিলেন না| টমাস জেফারসন ১৮০৭ সালে লেখা এক চিঠিতে জন নরভেল-কে বলেছিলেন যে, খবরের কাগজ না পড়লে আপনি বেটার ইনফরমড হবেন! লেখক বলছেন, আমেরিকান মিডিয়ার একটা ‘লিবারাল বায়াস’ আছে।

শিবা বৈদ্যনাথন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজ-এর অধ্যাপক| তিনি লিখেছেন নতুন বই, অ্যান্টি সোশ্যাল মিডিয়া| কী ভাবে ফেসবুক আমাদের বিচ্ছিন্ন করছে প্রকৃত সমাজ থেকে, আর কী ভাবে গণতন্ত্রকেও বিনষ্ট করছে|

দীপঙ্কর এই সমকালীন ভাবনাগুলি নিয়ে সংগৃহীত ইনপুটের ভিত্তিতে একটা তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন যাতে কাউকে দোষারোপ না করে ‘মিডিয়াটাইজড’ গণতন্ত্রের স্বরূপ খুঁজেছেন| নির্বাচনের আগে গণতন্ত্র যা ছিল প্রতিশ্রুত তা থেকে বাস্তব গণতন্ত্রের তফাতের ক্ষেত্রেও মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দীপঙ্কর উন্মোচিত করেছেন| এর নাম তিনি দিয়েছেন ‘প্রোগ্রামড্ ডেমোক্র্যাসি’! তাই গণমাধ্যম হয়ে উঠছে ‘মিডিয়াটিজড’ গণতন্ত্রের আত্মা!

এটাই তো আদর্শ আর প্রকৃত গণতন্ত্রের ফারাক!

গত চার বছরে এই মিডিয়াসৃষ্ট গণতান্ত্রিক স্বপ্নপূরণের ‘ইনফরমেশন গেম’ সত্যি আমরাও কম দেখলাম না!